আওরঙ্গজেবের ধর্মনীতি ও বিদ্রোহ: জিজিয়া, রাজপুত, শিখ, জাট ও মারাঠা প্রতিরোধের ইতিহাস
Series: মুঘল সাম্রাজ্য: উত্থান, ঐশ্বর্য ও পতনের ইতিহাস
- Author: Admin
- August 24, 2026
আওরঙ্গজেবের ধর্মনীতি ও বিদ্রোহ
আওরঙ্গজেবের শাসনকালকে মুঘল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি বলা হয়। একদিকে তিনি ছিলেন দক্ষ প্রশাসক, কঠোর পরিশ্রমী সম্রাট এবং সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক বিস্তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া শাসক। অন্যদিকে তাঁর ধর্মনীতি, জিজিয়া পুনঃআরোপ, কিছু মন্দির ধ্বংসের নির্দেশ, রাজপুতদের সঙ্গে সংঘর্ষ, শিখ গুরু তেগ বাহাদুরের মৃত্যুদণ্ড, জাট ও মারাঠা বিদ্রোহ—এসব ঘটনা তাঁর যুগকে গভীর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তবে আওরঙ্গজেবের সময়কার সব বিদ্রোহকে কেবল ধর্মীয় নিপীড়নের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ইতিহাসের জটিল বাস্তবতা সরলীকৃত হয়ে যায়। ধর্ম, রাজস্ব, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, রাজবংশীয় উত্তরাধিকার, সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং কেন্দ্রীয় শাসনের বিস্তার—সবকিছুই এসব সংঘর্ষে ভূমিকা রেখেছিল।
আওরঙ্গজেব ব্যক্তিগতভাবে তাঁর পূর্বসূরি আকবরের তুলনায় অনেক বেশি রক্ষণশীল সুন্নি মুসলিম জীবনধারা অনুসরণ করতেন। তিনি রাজদরবারের কিছু আচার-অনুষ্ঠান সীমিত করেন, সংগীতের ওপর রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা কমান এবং ইসলামি আইনভিত্তিক বিচার ও প্রশাসনের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁর নির্দেশে ফতাওয়া-ই-আলমগিরি নামে হানাফি ইসলামি আইনের একটি বৃহৎ সংকলন প্রস্তুত করা হয়।
তবে ব্যক্তিগত ধার্মিকতা এবং রাষ্ট্রনীতি সব সময় এক ছিল না। আওরঙ্গজেবের প্রশাসনে বিপুলসংখ্যক হিন্দু মনসবদার ও রাজপুত অভিজাত কর্মরত ছিলেন। তাঁর শাসনের বিভিন্ন সময়ে হিন্দু অভিজাতদের অংশগ্রহণ এমনকি আগের যুগের তুলনায় সংখ্যায় কম ছিল না। রাজা জয় সিংহ, যশবন্ত সিংহ এবং পরে বিভিন্ন মারাঠা ও রাজপুত অভিজাত মুঘল রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ফলে তাঁকে এমন শাসক হিসেবে দেখানো, যিনি সব অমুসলিমকে রাষ্ট্র থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন, ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়।
তবে ১৬৭৯ সালে জিজিয়া পুনঃআরোপ তাঁর ধর্মনীতির সবচেয়ে প্রতীকী সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে। আকবর ১৫৬৪ সালে এই কর বাতিল করেছিলেন। জিজিয়া ঐতিহ্যগত ইসলামি শাসনব্যবস্থায় নির্দিষ্ট অমুসলিম প্রজাদের ওপর আরোপিত কর ছিল। আওরঙ্গজেবের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উভয় অর্থ বহন করেছিল।
জিজিয়া পুনঃআরোপকে অনেকে তাঁর ধর্মীয় রক্ষণশীলতার স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে কিছু ইতিহাসবিদ এটিকে সাম্রাজ্যের আর্থিক চাপ, ইসলামি বৈধতা এবং উলামাদের সমর্থন অর্জনের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও বিশ্লেষণ করেন। কারণ তখন দাক্ষিণাত্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক ব্যয়, বিভিন্ন সীমান্তে বিদ্রোহ এবং রাজস্বসংকট সাম্রাজ্যের ওপর চাপ বাড়াচ্ছিল।
যাই হোক, জিজিয়ার প্রতীকী প্রভাব ছিল গভীর। অমুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশের কাছে এটি আকবরের সুলহ-ই-কুল নীতির বিপরীত দিকে ফিরে যাওয়ার বার্তা হিসেবে ধরা পড়ে। এর ফলে আওরঙ্গজেবের শাসনের প্রতি অসন্তোষের রাজনৈতিক ভাষা ধর্মীয় মাত্রাও পেতে থাকে।
মন্দিরনীতি আরও জটিল বিষয়। জনপ্রিয় আলোচনায় কখনো দাবি করা হয় যে আওরঙ্গজেব সমস্ত হিন্দু মন্দির ধ্বংসের পরিকল্পনা করেছিলেন। এটি সঠিক নয়। তাঁর আমলে বহু মন্দির টিকে ছিল এবং কিছু হিন্দু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান জমি ও রাজস্ব-সংক্রান্ত সুবিধাও পেয়েছিল। কিন্তু একই সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ধ্বংস বা রূপান্তরের নির্দেশ তাঁর শাসনামলে সত্যিই দেওয়া হয়েছিল।
বিশেষভাবে কাশীর বিশ্বনাথ মন্দির এবং মথুরার কেশব দেব মন্দিরের ধ্বংস তাঁর ধর্মনীতির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এসব পদক্ষেপ শুধু ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার ফল ছিল কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে; কারণ মন্দির তখন অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রতীকও ছিল। বিদ্রোহী বা বিরোধী রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে যুক্ত ধর্মীয় স্থাপনা আক্রমণ মধ্যযুগীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রদর্শন হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
তবে এমন পদক্ষেপের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাবকে ছোট করে দেখাও ভুল। রাজকীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ধ্বংস অমুসলিম প্রজাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও অসন্তোষ বাড়াতে পারে, বিশেষ করে যখন একই সময়ে জিজিয়া পুনঃআরোপ এবং অন্যান্য রক্ষণশীল নীতি কার্যকর হচ্ছিল।
আওরঙ্গজেবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকটগুলোর একটি ছিল রাজপুতদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। আকবর রাজপুতদের মুঘল সাম্রাজ্যের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত করেছিলেন। জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের সময়ও এই সম্পর্ক মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল।
কিন্তু মারওয়ারের শাসক রাজা যশবন্ত সিংহ ১৬৭৮ সালে উত্তরাধিকারী পুত্র ছাড়াই মারা গেলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। পরে তাঁর বিধবার গর্ভে পুত্র অজিত সিংহের জন্ম হয়। আওরঙ্গজেব মারওয়ারের উত্তরাধিকার প্রশ্নে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন এবং অঞ্চলটির ওপর মুঘল নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করেন।
রাঠোর অভিজাতেরা এই হস্তক্ষেপ মেনে নেননি। দুর্গাদাস রাঠোর অজিত সিংহকে রক্ষা এবং মারওয়ারের স্বাধীন বংশীয় শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ প্রতিরোধ সংগঠিত করেন। দ্রুতই মেওয়ারের সিসোদিয়া রাজপরিবারও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
এই রাজপুত যুদ্ধকে কেবল ধর্মীয় বিরোধ হিসেবে দেখা ভুল হবে। মূল প্রশ্ন ছিল রাজবংশীয় উত্তরাধিকার ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনে মুঘল হস্তক্ষেপ। কিন্তু জিজিয়া পুনঃআরোপ ও অন্যান্য ধর্মীয় নীতির কারণে সংঘর্ষটি আরও তীব্র রাজনৈতিক প্রতীক লাভ করে।
আওরঙ্গজেবের জন্য রাজপুত বিদ্রোহ বিশেষভাবে ক্ষতিকর ছিল, কারণ রাজপুতরা দীর্ঘদিন মুঘল সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। যে শক্তি আকবরের সময় সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের অন্যতম সহযোগী ছিল, আওরঙ্গজেবের আমলে তার একটি অংশই দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধে জড়িয়ে পড়ে। এতে সাম্রাজ্যের সামরিক ভারসাম্য দুর্বল হয়।
উত্তর ভারতের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহ ছিল জাট বিদ্রোহ। মথুরা ও আগ্রার আশপাশে কৃষক, জমিদার এবং স্থানীয় যোদ্ধা সম্প্রদায়ের মধ্যে মুঘল রাজস্বব্যবস্থা ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দীর্ঘদিন ধরে জমছিল।
১৬৬৯ সালের দিকে গোকুলার নেতৃত্বে জাট বিদ্রোহ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মুঘল বাহিনী শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহ দমন করে এবং গোকুলাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু জাট প্রতিরোধ শেষ হয়নি। পরে রাজারাম জাট এবং চূড়ামনের নেতৃত্বে নতুন করে শক্তি সংগঠিত হয়।
জাট বিদ্রোহের পেছনে ধর্মীয় উত্তেজনার পাশাপাশি কঠোর রাজস্ব আদায়, স্থানীয় প্রশাসনের অত্যাচার এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রশ্ন কাজ করেছিল। মথুরার কেশব দেব মন্দির ধ্বংসের মতো ঘটনাও এই অঞ্চলে মুঘলবিরোধী আবেগকে গভীর করে।
পরবর্তী সময়ে জাটরা শুধু বিদ্রোহী কৃষকগোষ্ঠী হিসেবে থাকেনি। তারা দুর্গ নির্মাণ, সশস্ত্র বাহিনী সংগঠন এবং আঞ্চলিক রাজস্ব নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভরতপুরকে কেন্দ্র করে জাট রাজ্য গড়ে ওঠা এই দীর্ঘ প্রতিরোধেরই পরিণতি।
পাঞ্জাবে শিখদের সঙ্গে আওরঙ্গজেবের সম্পর্কও ক্রমে সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিখ সম্প্রদায়ের সামরিকীকরণের সূচনা অবশ্য তাঁর আগে। জাহাঙ্গীরের সময় গুরু অর্জন দেবের মৃত্যুর পর গুরু হরগোবিন্দ শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যে সামরিক আত্মরক্ষার ধারণাকে শক্তিশালী করেছিলেন।
আওরঙ্গজেবের সময় এই সম্পর্কের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো ১৬৭৫ সালে নবম শিখ গুরু তেগ বাহাদুরের মৃত্যুদণ্ড। ঘটনাটির কারণ ও সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে ভিন্নতা আছে। শিখ ঐতিহ্যে তিনি বিশেষভাবে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আত্মত্যাগী শহীদ হিসেবে স্মরণীয়।
মুঘল দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁকে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কর্তৃত্ববিরোধী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছিল। কিন্তু দিল্লিতে তাঁর মৃত্যুদণ্ড শিখ ঐতিহাসিক স্মৃতিতে গভীর আঘাত সৃষ্টি করে এবং শিখ-মুঘল সম্পর্ককে আরও সংঘাতপূর্ণ করে তোলে।
তাঁর পুত্র গুরু গোবিন্দ সিংহ শিখ সম্প্রদায়কে আরও সুসংগঠিত সামরিক ও ধর্মীয় কাঠামো দেন। ১৬৯৯ সালে তিনি খালসা প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে শিখদের একটি স্বতন্ত্র, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং অস্ত্রধারণে প্রস্তুত ধর্মীয়-সামরিক সম্প্রদায় হিসেবে পুনর্গঠন করা হয়।
পাহাড়ি রাজা এবং মুঘল বাহিনীর সঙ্গে গুরু গোবিন্দ সিংহের একাধিক সংঘর্ষ ঘটে। আনন্দপুরের অবরোধ এবং পরবর্তী ঘটনাগুলো শিখ ঐতিহাসিক স্মৃতিতে গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর চার পুত্রের মৃত্যুও মুঘল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে শিখ প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
আওরঙ্গজেব ও গুরু গোবিন্দ সিংহের সম্পর্কের শেষ পর্যায়ে ‘জাফরনামা’ বিশেষভাবে আলোচিত। এতে গুরু সম্রাটের নৈতিক ও রাজনৈতিক আচরণের কঠোর সমালোচনা করেন। ফলে আওরঙ্গজেবের শেষ জীবনে শিখ সমস্যা শুধু স্থানীয় সীমান্ত সংকট নয়, একটি ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক-সামরিক প্রতিরোধে রূপ নিচ্ছিল।
তবে আওরঙ্গজেবের সবচেয়ে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল প্রতিরোধ ছিল মারাঠাদের সঙ্গে সংঘর্ষ। শিবাজীর উত্থান শাহজাহানের শেষ যুগেই শুরু হয়েছিল, কিন্তু আওরঙ্গজেবের আমলে তা পূর্ণ সাম্রাজ্যিক সংকটে পরিণত হয়।
মারাঠা সমস্যা ধর্মের পাশাপাশি স্পষ্টভাবে সার্বভৌমত্ব, রাজস্ব, দুর্গ ও আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন ছিল। শিবাজীর প্রশাসনে মুসলিম কর্মকর্তা ছিলেন, আবার মুঘল সেনাবাহিনীতে বিপুল হিন্দু ও রাজপুত সেনাপতি কাজ করতেন। ফলে এটিকে সরাসরি ধর্মযুদ্ধ বলা যায় না।
শিবাজী দ্রুত অশ্বারোহী বাহিনী, পাহাড়ি দুর্গ এবং আকস্মিক আক্রমণ ব্যবহার করে মুঘলদের সমস্যায় ফেলেন। ১৬৬৩ সালে শায়েস্তা খানের ওপর হামলা, ১৬৬৪ সালে সুরাট আক্রমণ, ১৬৬৫ সালের পুরন্দর চুক্তি এবং ১৬৬৬ সালে আগ্রা থেকে শিবাজীর পলায়ন মুঘল-মারাঠা সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
১৬৭৪ সালে শিবাজী ছত্রপতি হিসেবে রাজ্যাভিষেক করে নিজের সার্বভৌম ক্ষমতাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেন। তাঁর মৃত্যুর পর সম্ভাজি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, কিন্তু আওরঙ্গজেবের সঙ্গে যুদ্ধ আরও তীব্র হয়।
১৬৮১ সালে আওরঙ্গজেব নিজেই দাক্ষিণাত্যে চলে যান, এবং জীবনের বাকি প্রায় ২৬ বছর সেখানেই সামরিক অভিযানে কাটান। ১৬৮৯ সালে সম্ভাজি বন্দি ও নিহত হলেও মারাঠা প্রতিরোধ ভেঙে পড়েনি। রাজারাম এবং পরে তারাবাই যুদ্ধ চালিয়ে যান।
এই ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল মারাঠা শক্তির বিকেন্দ্রীভূত চরিত্র। একটি রাজধানী বা একজন রাজাকে সরিয়ে পুরো প্রতিরোধ শেষ করা সম্ভব ছিল না। মুঘলরা দুর্গ দখল করত, মারাঠারা অন্যত্র আক্রমণ করত; মুঘল বাহিনী এগিয়ে গেলে মারাঠারা রসদপথে আঘাত করত। ফলে যুদ্ধ বছরের পর বছর চলতে থাকে।
এই সময় আরও ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহও ঘটে। সতনামী বিদ্রোহ ১৬৭২ সালে দিল্লির দক্ষিণাঞ্চলে মুঘল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একটি উল্লেখযোগ্য সংঘর্ষে পরিণত হয়। শুরুতে স্থানীয় বিবাদ থেকে জন্ম নেওয়া এই বিদ্রোহ দ্রুত সামরিক রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত মুঘল বাহিনী তা দমন করে।
এসব বিদ্রোহ একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সমন্বিত ছিল না। রাজপুত, জাট, শিখ, মারাঠা বা সতনামীরা কোনো একক আওরঙ্গজেববিরোধী জোটের অংশ ছিল না। প্রত্যেক প্রতিরোধের নিজস্ব আঞ্চলিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কারণ ছিল।
তবু সাম্রাজ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে ফল ছিল সমষ্টিগত। একই সময়ে উত্তর-পশ্চিমে আফগান সীমান্ত, রাজস্থানে রাজপুত, পাঞ্জাবে শিখ, আগ্রা-মথুরায় জাট এবং দাক্ষিণাত্যে মারাঠাদের মোকাবিলা করতে হলে বিপুল সামরিক সম্পদ ছড়িয়ে দিতে হতো।
আওরঙ্গজেবের ধর্মনীতি এই সমস্যাগুলো কতটা সৃষ্টি করেছিল, সে প্রশ্নের সরল উত্তর নেই। জিজিয়া ও নির্দিষ্ট মন্দির ধ্বংসের মতো সিদ্ধান্ত অবশ্যই কিছু অমুসলিম গোষ্ঠীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বাড়িয়েছিল। বিশেষ করে আকবরের সময় তৈরি অন্তর্ভুক্তিমূলক সাম্রাজ্যিক ভাবমূর্তির সঙ্গে তুলনা করলে পরিবর্তনটি স্পষ্ট।
কিন্তু রাজপুত বিদ্রোহের ক্ষেত্রে মারওয়ারের উত্তরাধিকার প্রশ্ন, জাটদের ক্ষেত্রে রাজস্ব ও স্থানীয় শাসন, মারাঠাদের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব এবং শিখদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রদায়গত ও রাজনৈতিক বিবর্তনও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই কারণেই ‘আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাই একাই মুঘল সাম্রাজ্য ধ্বংস করেছে’—এমন বক্তব্যও অতিসরল। তাঁর মৃত্যুর পরও মুঘল সাম্রাজ্য কয়েক দশক টিকে ছিল এবং বহু অঞ্চলে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব কার্যকর ছিল। পতনের জন্য উত্তরাধিকার যুদ্ধ, জাগির সংকট, দাক্ষিণাত্যের ব্যয়, প্রাদেশিক শক্তির উত্থান এবং প্রশাসনিক অতিবিস্তারসহ বহু কারণ কাজ করেছে।
তবে এটাও সত্য যে আকবরের তৈরি রাজনৈতিক সমঝোতার কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ আওরঙ্গজেবের সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাজপুতদের একটি বড় অংশের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘর্ষ মুঘল রাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে ক্ষতিকর ছিল। আগে যারা সাম্রাজ্যের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সেনাপতি ও সহযোগী ছিল, তাদের একটি অংশই এখন সাম্রাজ্যের সামরিক সম্পদ ক্ষয় করছিল।
আর জিজিয়া ও মন্দিরনীতি তাঁর শাসনের নৈতিক ভাবমূর্তিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মুঘল সম্রাটকে সব সম্প্রদায়ের সার্বভৌম শাসক হিসেবে উপস্থাপনের আকবরীয় ধারণা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে যায়। ফলে আঞ্চলিক বিদ্রোহীরা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিরোধকে শুধু রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয় মর্যাদা ও পরিচয়ের ভাষাতেও প্রকাশ করতে পারে।
আওরঙ্গজেবের সামনে আরও একটি মৌলিক সমস্যা ছিল সাম্রাজ্যের আকার। তিনি যে সময়ে এতগুলো বিদ্রোহ মোকাবিলা করছেন, একই সময়ে বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয় করে দক্ষিণে বিশাল নতুন ভূখণ্ড যুক্ত করছেন। ফলে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ক্রমে এমন অঞ্চলের ওপর কর্তৃত্ব দাবি করছিল, যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে তার সামরিক ও আর্থিক ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠছিল।
দাক্ষিণাত্য যুদ্ধের ফলে সম্রাট দীর্ঘদিন উত্তর ভারত থেকে দূরে থাকেন। স্থানীয় কর্মকর্তা ও প্রাদেশিক অভিজাতেরা ক্রমে স্বাধীন রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরি করার সুযোগ পায়। রাজস্বের বড় অংশ দক্ষিণের যুদ্ধে চলে যায় এবং মনসবদারদের জন্য উৎপাদনশীল জাগিরের সংকট বাড়ে।
অন্যদিকে যে শক্তিগুলো বিদ্রোহ করছিল, তারা যুদ্ধের মধ্যেই নিজেদের রাষ্ট্রক্ষমতা গড়ে তুলছিল। জাটরা পরে ভরতপুর রাজ্য গড়ে তুলবে, শিখরা অষ্টাদশ শতাব্দীতে শক্তিশালী সামরিক সংঘে পরিণত হবে, রাজপুত রাজ্যগুলো নিজেদের স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখবে এবং মারাঠারা মুঘলদের উত্তরাধিকারের প্রধান দাবিদার শক্তিগুলোর একটিতে পরিণত হবে।
এই দিক থেকে আওরঙ্গজেবের শেষ যুগ একটি গভীর পরিবর্তনের সময়। তিনি বিদ্রোহ দমন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধই বিদ্রোহীদের আরও সংগঠিত করে। কেন্দ্র যত বেশি সামরিক চাপ প্রয়োগ করেছে, কিছু অঞ্চলে স্থানীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক সংগঠন তত শক্তিশালী হয়েছে।
১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যু হলে মুঘল সাম্রাজ্য মানচিত্রে বিশাল কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ক্লান্ত ছিল। মারাঠা সমস্যা অমীমাংসিত, রাজপুতদের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত, শিখ প্রতিরোধ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে এবং জাট শক্তি পুরোপুরি দমন হয়নি।
আওরঙ্গজেবের ধর্মনীতি ও বিদ্রোহের ইতিহাস তাই কোনো একক ধর্মীয় সংঘাতের গল্প নয়; এটি একটি অতিবিস্তৃত সাম্রাজ্য, কঠোর কেন্দ্রীকরণ, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং ধর্মীয় পরিচয়ের পরস্পর জড়িয়ে যাওয়ার ইতিহাস। জিজিয়া ও মন্দিরনীতি তাঁর শাসনের প্রতি অসন্তোষ বাড়িয়েছিল, কিন্তু সেই অসন্তোষ রাজস্ব, উত্তরাধিকার, ভূমি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে মিশেই বিস্ফোরক হয়ে ওঠে।
আকবর যে মুঘল রাষ্ট্রকে বহুবিধ অভিজাত ও আঞ্চলিক শক্তির সমঝোতার ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন, আওরঙ্গজেবের যুগে সেই ভারসাম্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভেঙে পড়তে শুরু করে। রাজপুত, শিখ, জাট ও মারাঠা প্রতিরোধ একে অপরের মতো ছিল না, কিন্তু সম্মিলিতভাবে তারা দেখিয়ে দিয়েছিল যে সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি যত বিশালই হোক, স্থানীয় রাজনৈতিক বৈধতা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক সমঝোতা দুর্বল হয়ে গেলে শুধু যুদ্ধের মাধ্যমে একটি বিশাল সাম্রাজ্যকে অনির্দিষ্টকাল ধরে রাখা যায় না।
নূরজাহান: মুঘল সাম্রাজ্যের পর্দার আড়ালে থাকা সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীর ইতিহাস
ইসাবেলা প্রথম: যে স্প্যানিশ রানি ইউরোপ ও আমেরিকার ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিলেন
জোয়ান অব আর্ক: কিশোরী কৃষককন্যা কীভাবে ফ্রান্সের যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন?
আওরঙ্গজেবের ক্ষমতা দখল: শাহজাহানকে বন্দি করে কীভাবে মুঘল সিংহাসন জয় করেছিলেন?
দারা শিকোহ বনাম আওরঙ্গজেব: শাহজাহানের চার পুত্রের রক্তক্ষয়ী উত্তরাধিকার যুদ্ধ
মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনীতি ও বাণিজ্য: কৃষি, বস্ত্রশিল্প, বাংলা ও ইউরোপীয় বণিকদের আগমন