জাহাঙ্গীরের শাসনকাল: নূরজাহানের ক্ষমতা, রাজদরবারের রাজনীতি ও মুঘল সাম্রাজ্যের নতুন অধ্যায়
Series: মুঘল সাম্রাজ্য: উত্থান, ঐশ্বর্য ও পতনের ইতিহাস
- Author: Admin
- August 21, 2026
জাহাঙ্গীরের শাসনকাল
আকবরের দীর্ঘ ও শক্তিশালী শাসনের পর ১৬০৫ সালে নূরউদ্দিন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর মুঘল সিংহাসনে বসেন। তাঁর জন্মনাম ছিল সেলিম। আকবরের জীবনের শেষ পর্যায় থেকেই পিতা-পুত্রের সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠেছিল এবং যুবরাজ সেলিম নিজের রাজনৈতিক বলয় গড়ে তুলেছিলেন। ফলে জাহাঙ্গীরের সিংহাসন আরোহণ কোনো নিরবচ্ছিন্ন উত্তরাধিকারের ঘটনা ছিল না; এর পেছনে ছিল বহু বছরের উত্তেজনা, রাজদরবারের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং ভবিষ্যৎ সিংহাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা। তবু তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর আকবরের প্রশাসনিক ভিত্তি ভেঙে না দিয়ে মূলত সেটিই বজায় রাখেন। জাহাঙ্গীরের যুগ তাই মুঘল সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণের চেয়ে বেশি পরিচিত রাজদরবারের রাজনীতি, নূরজাহানের উত্থান, উত্তরাধিকার সংকট এবং শিল্প-সংস্কৃতির সূক্ষ্ম বিকাশের জন্য।
জাহাঙ্গীরের জন্ম হয় ১৫৬৯ সালের ৩১ আগস্ট ফতেহপুর সিক্রিতে। দীর্ঘদিন উত্তরাধিকারী সন্তানের অপেক্ষায় থাকার পর আকবর তাঁর জন্মকে বিশেষ আশীর্বাদ হিসেবে দেখেছিলেন। যুবরাজ সেলিম সামরিক, প্রশাসনিক ও দরবারি পরিবেশে বড় হন। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর স্বাধীন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে। আকবরের জীবনের শেষদিকে তিনি আল্লাহাবাদকে কেন্দ্র করে নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেন এবং এমনকি নিজের নামে মুদ্রা চালু ও ফরমান জারির মতো কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত হন।
১৬০৫ সালের অক্টোবরে আকবরের মৃত্যুর পর সেলিম জাহাঙ্গীর উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন। ‘জাহাঙ্গীর’ অর্থ পৃথিবী বিজয়কারী। শুরুতেই তিনি এমন একজন শাসকের ভাবমূর্তি নির্মাণের চেষ্টা করেন, যিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন এবং প্রশাসনিক অত্যাচার নিয়ন্ত্রণ করবেন। তাঁর শাসনের সঙ্গে বিখ্যাত ‘ন্যায়ের শৃঙ্খল’ বা জাঞ্জির-ই-আদল-এর কাহিনি যুক্ত। আগ্রা দুর্গে এমন একটি শিকল স্থাপনের কথা বলা হয়, যা টেনে সাধারণ প্রজা সরাসরি সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারত। এর বাস্তব ব্যবহার কতটা ব্যাপক ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এর প্রতীকী অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—জাহাঙ্গীর নিজেকে ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত উৎস হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু তাঁর রাজত্বের শুরুতেই সবচেয়ে বড় বিপদ আসে নিজের পরিবার থেকে। জাহাঙ্গীরের জ্যেষ্ঠ পুত্র যুবরাজ খসরু মির্জা পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। ১৬০৬ সালে তিনি পাঞ্জাবের দিকে অগ্রসর হয়ে সমর্থন সংগ্রহের চেষ্টা করেন। বিদ্রোহ দ্রুত দমন করা হয় এবং খসরুকে বন্দি করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রতি কঠোর আচরণ করা হয় এবং তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কার্যত শেষ হয়ে যায়।
খসরুর বিদ্রোহের সঙ্গে শিখ গুরু অর্জন দেবের ইতিহাসও যুক্ত হয়ে পড়ে। খসরুকে আশীর্বাদ বা সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে গুরু অর্জন দেবকে জরিমানা এবং পরে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৬০৬ সালে তাঁর মৃত্যু শিখ-মুঘল সম্পর্কের ইতিহাসে একটি গভীর মোড় তৈরি করে। পরবর্তী শিখ গুরুদের সময় সম্প্রদায়ের সামরিকীকরণ আরও বাড়তে থাকে। ফলে জাহাঙ্গীরের প্রথমদিকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি সিদ্ধান্ত পরবর্তী শতাব্দীর শিখ-মুঘল সম্পর্কেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।
জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর আত্মজীবনী লেখার প্রবণতা। তাঁর স্মৃতিকথা ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরি’ বা জাহাঙ্গীরনামা থেকে তাঁর শাসন, ব্যক্তিগত রুচি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, পশুপাখি, প্রকৃতি ও শিল্প সম্পর্কে অসাধারণ তথ্য পাওয়া যায়। বাবরের মতো জাহাঙ্গীরও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি আরও সূক্ষ্ম ছিল—পাখি, প্রাণী, উদ্ভিদ, অদ্ভুত প্রাকৃতিক ঘটনা এমনকি বিরল প্রাণীর শারীরিক বৈশিষ্ট্যও তিনি নথিবদ্ধ করতেন।
মুঘল চিত্রকলাও তাঁর সময়ে বাস্তবধর্মী পর্যবেক্ষণের অসাধারণ উচ্চতায় পৌঁছে যায়। শিল্পী উস্তাদ মনসুরের মতো চিত্রকর বিরল পাখি ও প্রাণীর অত্যন্ত সূক্ষ্ম ছবি আঁকতেন। আকবরের সময় যেখানে বৃহৎ কাহিনিচিত্র ও ঐতিহাসিক দৃশ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, জাহাঙ্গীরের যুগে ব্যক্তিচিত্র, প্রকৃতি এবং সূক্ষ্ম বাস্তবধর্মী পর্যবেক্ষণ বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। সম্রাট নিজেও শিল্পীর কাজ বিচার করতে এবং কখনো কখনো কোন অংশ কোন শিল্পী এঁকেছেন তা শনাক্ত করতে পারতেন বলে দাবি করেছেন।
তবে জাহাঙ্গীরের শাসনের রাজনৈতিক চরিত্র সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে বদলে যায় মেহেরুন্নিসার সঙ্গে তাঁর বিবাহের পর। মেহেরুন্নিসা ছিলেন পারস্য বংশোদ্ভূত একটি অভিজাত পরিবারের কন্যা। তাঁর পিতা মির্জা গিয়াস বেগ মুঘল প্রশাসনে উচ্চপদে উঠে আসেন এবং পরবর্তীকালে ইতিমাদ-উদ-দৌলা উপাধি লাভ করেন। মেহেরুন্নিসার প্রথম স্বামী আলি কুলি ইস্তাজলু, যিনি শের আফগান নামে পরিচিত ছিলেন, মৃত্যুবরণ করার পর তিনি কিছু সময় মুঘল রাজদরবারে অবস্থান করেন।
১৬১১ সালে জাহাঙ্গীর তাঁকে বিয়ে করেন। পরে তিনি নূরমহল এবং শেষ পর্যন্ত নূরজাহান—‘জগতের আলো’ উপাধি লাভ করেন। এই বিবাহের পর তিনি সাধারণ রাজমহিষীর সীমার মধ্যে থাকেননি। কয়েক বছরের মধ্যেই নূরজাহান মুঘল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসাধারণ প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন।
নূরজাহানের ক্ষমতা সম্পর্কে ইতিহাসে প্রায়ই অতিরঞ্জিত দুটি বিপরীত ধারণা দেখা যায়। একদিকে তাঁকে এমনভাবে দেখানো হয় যেন জাহাঙ্গীর সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন এবং নূরজাহান একাই সাম্রাজ্য শাসন করতেন। অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা একেবারেই অস্বীকার করা হয়। বাস্তবতা ছিল মাঝামাঝি কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নূরজাহান সত্যিই এমন কিছু সাম্রাজ্যিক অধিকার ব্যবহার করেছিলেন যা মুঘল রাজপরিবারের নারীদের জন্য অসাধারণ ছিল।
তাঁর নামে বা তাঁর নামসহ মুদ্রা জারি হওয়ার নজির রয়েছে। তিনি ফরমান জারি করতে পারতেন এবং দরবারি নিয়োগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় প্রভাব বিস্তার করতেন। শিকারে তাঁর দক্ষতার কথাও সমসাময়িক বিবরণে পাওয়া যায়। রাজদরবারে তাঁর পরিবারের সদস্যদের অবস্থানও দ্রুত শক্তিশালী হয়। তাঁর পিতা ইতিমাদ-উদ-দৌলা সাম্রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে উঠে আসেন এবং ভাই আসফ খানও অত্যন্ত প্রভাবশালী অভিজাতে পরিণত হন।
এ থেকেই ইতিহাসে কখনো কখনো ‘নূরজাহান গোষ্ঠী’ ধারণাটি ব্যবহার করা হয়। তবে এটিকে কঠোরভাবে সংগঠিত একটি স্থায়ী রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখা ঠিক নয়। দরবারে আত্মীয়তা, বিবাহ, ব্যক্তিগত আনুগত্য, মনসব ও সামরিক স্বার্থের ভিত্তিতে জোট ক্রমাগত পরিবর্তিত হতো। নূরজাহান, তাঁর পিতা, ভাই এবং রাজপরিবারের বিভিন্ন সদস্যের স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে এক হলেও সব সময় একই ছিল না।
এই রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে ছিলেন যুবরাজ খুররম, যিনি পরে শাহজাহান নামে সম্রাট হবেন। আসফ খানের কন্যা আরজুমান্দ বানু বেগম, পরবর্তী মুমতাজ মহল, ১৬১২ সালে খুররমকে বিয়ে করেন। ফলে খুররম নূরজাহানের পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিকভাবে যুক্ত হন। প্রথমদিকে নূরজাহান ও খুররমের মধ্যে সহযোগিতা ছিল এবং জাহাঙ্গীরও খুররমকে ক্রমশ সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হিসেবে গুরুত্ব দিতে থাকেন।
খুররমের মর্যাদা বৃদ্ধিতে মেওয়ারের বিরুদ্ধে মুঘল অভিযানের সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আকবরের সময়েও মেওয়ার পুরোপুরি মুঘল কর্তৃত্ব স্বীকার করেনি। মহারানা প্রতাপের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রানা অমর সিংহ প্রতিরোধ চালিয়ে যান। দীর্ঘ সামরিক চাপের পর ১৬১৫ সালে সমঝোতা হয়। মেওয়ার মুঘল সর্বময় কর্তৃত্ব স্বীকার করলেও রানা নিজে সম্রাটের দরবারে উপস্থিত হতে বাধ্য হননি এবং চিতোর দুর্গ পুনর্নির্মাণ না করার মতো শর্ত আরোপিত হয়।
এই সমঝোতার ফলে আকবরের সময় থেকে চলা মুঘল-মেওয়ার সংঘর্ষ কার্যত শেষ হয়। এটি ছিল জাহাঙ্গীরের শাসনের বড় রাজনৈতিক সাফল্যগুলোর একটি এবং যুবরাজ খুররমের মর্যাদাও এতে বৃদ্ধি পায়।
দাক্ষিণাত্যেও মুঘলদের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছিল। আহমদনগরের পক্ষে মালিক আম্বর গেরিলা কৌশল, দ্রুত অশ্বারোহী বাহিনী এবং দাক্ষিণাত্যের ভূগোল ব্যবহার করে মুঘলদের বারবার সমস্যায় ফেলেন। জাহাঙ্গীরের সময় মুঘলরা কিছু সাফল্য অর্জন করলেও মালিক আম্বরকে সম্পূর্ণ দমন করা যায়নি। এটি প্রমাণ করে যে আকবরের আমলে শুরু হওয়া দাক্ষিণাত্য সমস্যা তখনো সমাধান থেকে অনেক দূরে ছিল।
সাম্রাজ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ছিল কান্দাহার। মধ্য এশিয়া, ভারত ও পারস্যের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই শহর মুঘল ও সাফাভি সাম্রাজ্যের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্র ছিল। আকবরের সময় কান্দাহার মুঘলদের হাতে আসে। কিন্তু ১৬২২ সালে সাফাভি শাহ আব্বাস প্রথম কান্দাহার দখল করেন।
কান্দাহার রক্ষায় ব্যর্থতা জাহাঙ্গীরের শাসনের একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক ও সামরিক বিপর্যয় ছিল। একই সময়ে যুবরাজ খুররমকে সেখানে অভিযানের নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহের পথে যান। ফলে একটি সীমান্ত সংকট দ্রুত উত্তরাধিকার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
নূরজাহানের রাজনৈতিক অবস্থানও এ সময় বদলাচ্ছিল। তাঁর প্রথম বিবাহের কন্যা লাডলি বেগমের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের কনিষ্ঠ পুত্র শাহরিয়ারের বিবাহ হয়। এর ফলে ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার নিয়ে নূরজাহানের অবস্থান সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। খুররম আশঙ্কা করেন যে সম্রাটের মৃত্যুর পর নূরজাহান হয়তো শাহরিয়ারকে সিংহাসনে বসাতে চাইবেন।
১৬২২ সালে যুবরাজ খুররম বিদ্রোহ করেন। মুঘল সাম্রাজ্যের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত গুরুতর সংকট। তিনি ইতোমধ্যে দক্ষ সেনাপতি এবং বিপুল সামরিক অনুসারীর অধিকারী ছিলেন। কয়েক বছর ধরে সংঘর্ষ চললেও শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মসমর্পণ করেন। যদিও তাঁকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়নি, সম্রাটের জীবনের শেষ বছরগুলোতে উত্তরাধিকার প্রশ্ন আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
এর মধ্যেই ঘটে জাহাঙ্গীরের শাসনের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাগুলোর একটি। শক্তিশালী সেনাপতি মহাবত খান নূরজাহান ও তাঁর পরিবারের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ১৬২৬ সালে তিনি আকস্মিকভাবে জাহাঙ্গীরকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। ঘটনাটি কার্যত একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মতো ছিল।
এই সংকটে নূরজাহানের রাজনৈতিক দক্ষতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি প্রথমে জাহাঙ্গীরকে মুক্ত করার চেষ্টা করেন এবং পরে পরিস্থিতির সঙ্গে কৌশলে মানিয়ে নিয়ে মহাবত খানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে সক্ষম হন। শেষ পর্যন্ত সম্রাট ও নূরজাহান আবার স্বাধীনতা ফিরে পান। ঘটনাটি দেখায় যে নূরজাহান শুধু প্রাসাদের অন্তঃপুরে প্রভাবশালী ছিলেন না; তিনি সরাসরি সামরিক-রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করার ক্ষমতাও রাখতেন।
জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের অবনতি এই সময় রাজদরবারের ক্ষমতার ভারসাম্যকে আরও পরিবর্তন করে। তিনি দীর্ঘদিন মদ্যপান ও আফিম ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং জীবনের শেষ পর্যায়ে তাঁর শারীরিক দুর্বলতা বাড়তে থাকে। ফলে প্রশাসনের দৈনন্দিন অনেক বিষয়ে নূরজাহান, আসফ খান এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ অভিজাতের ভূমিকা বৃদ্ধি পায়।
তবে জাহাঙ্গীরকে নিছক বিলাসী ও নিষ্ক্রিয় সম্রাট হিসেবে দেখা সঠিক নয়। তিনি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন, মনসব ও জাগির বণ্টন পর্যবেক্ষণ করতেন এবং সাম্রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রশ্নে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর স্মৃতিকথায় শাসনসংক্রান্ত বহু বিস্তারিত সিদ্ধান্তের উল্লেখ পাওয়া যায়। নূরজাহানের উত্থান জাহাঙ্গীরের অনুপস্থিতির ফলে নয়, বরং সম্রাটের অনুমোদনের মধ্য দিয়েই সম্ভব হয়েছিল।
এই যুগে মুঘল রাজদরবারের অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগও বৃদ্ধি পায়। ইউরোপীয় বণিক ও দূতেরা সাম্রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছিল। ইংরেজ দূত স্যার টমাস রো ১৬১৫ থেকে ১৬১৯ সাল পর্যন্ত জাহাঙ্গীরের দরবারে অবস্থান করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জন করা। জাহাঙ্গীরের দরবার সম্পর্কে তাঁর বিবরণ মুঘল রাজনৈতিক সংস্কৃতি বোঝার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
জাহাঙ্গীরের সময় স্থাপত্যেও একটি পরিবর্তন দেখা যায়। নূরজাহান তাঁর পিতা ইতিমাদ-উদ-দৌলার জন্য আগ্রায় যে সমাধিসৌধ নির্মাণ করান, সেটি মুঘল স্থাপত্যের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সাদা মার্বেল, সূক্ষ্ম পাথরের অলংকরণ এবং পিয়েত্রা দুরা ধরনের কাজের বিকাশ পরবর্তী শাহজাহানি স্থাপত্যের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যায়। তাজমহলের আগের মুঘল স্থাপত্যে ইতিমাদ-উদ-দৌলার সমাধি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ।
১৬২৭ সালের ২৮ অক্টোবর জাহাঙ্গীর কাশ্মীর থেকে ফেরার পথে মারা যান। তাঁর মৃত্যু সঙ্গে সঙ্গে বহুদিনের উত্তরাধিকার সংকটকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। নূরজাহান শাহরিয়ারকে সমর্থন করার চেষ্টা করেন, অন্যদিকে আসফ খান নিজের জামাতা খুররমের পক্ষে অবস্থান নেন। শেষ পর্যন্ত আসফ খানের রাজনৈতিক পদক্ষেপ সফল হয় এবং খুররম ১৬২৮ সালে শাহজাহান হিসেবে মুঘল সিংহাসনে বসেন।
শাহজাহানের উত্থানের পর নূরজাহানের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন কার্যত শেষ হয়ে যায়। তিনি লাহোরে তুলনামূলক নিভৃত জীবন কাটান এবং ১৬৪৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরে গেলেও তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব মুছে যায়নি। মুঘল ইতিহাসে অন্য কোনো সম্রাজ্ঞী এত প্রকাশ্যভাবে মুদ্রা, ফরমান, দরবারি নিয়োগ এবং সাম্রাজ্যিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হননি।
জাহাঙ্গীরের শাসনকে আকবর ও শাহজাহানের মাঝখানের একটি নিছক পরিবর্তনকাল হিসেবে দেখাও ভুল। তাঁর আমলে আকবরের তৈরি প্রশাসনিক রাষ্ট্র মোটামুটি স্থিতিশীল থাকে, মেওয়ারের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের অবসান ঘটে, মুঘল চিত্রকলা ও প্রাকৃতিক ইতিহাসচর্চা নতুন উচ্চতায় পৌঁছে এবং রাজপরিবারের নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতার এক বিরল দৃষ্টান্ত তৈরি হয়। একই সঙ্গে খসরুর বিদ্রোহ, খুররমের বিদ্রোহ, মহাবত খানের অভ্যুত্থান এবং কান্দাহার হারানোর মতো ঘটনাগুলো ভবিষ্যতের মুঘল উত্তরাধিকার রাজনীতির বিপজ্জনক চরিত্রও স্পষ্ট করে দেয়।
জাহাঙ্গীরের যুগের আসল বৈশিষ্ট্য ছিল সাম্রাজ্যের শক্তি ও রাজদরবারের ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির পাশাপাশি বিকাশ। প্রশাসন ও অর্থনীতি তখন এতটাই শক্তিশালী ছিল যে একাধিক পারিবারিক সংকটের মধ্যেও সাম্রাজ্য ভেঙে পড়েনি। কিন্তু একই সময়ে সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে প্রতিযোগিতা ক্রমেই সেনাবাহিনী, অভিজাত গোষ্ঠী ও রাজপরিবারের বিবাহসম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল।
আকবর মুঘল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক কাঠামোকে সুসংহত করেছিলেন; জাহাঙ্গীরের সময় সেই কাঠামোর ভেতরে রাজদরবারের ক্ষমতা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও উত্তরাধিকার রাজনীতির জটিলতা সম্পূর্ণরূপে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আর এই যুগের কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছিলেন নূরজাহান—একজন সম্রাজ্ঞী যিনি শুধু জাহাঙ্গীরের স্ত্রী ছিলেন না, বরং মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার রাজকীয় ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায় সৃষ্টি করেছিলেন।
সম্রাট আকবরের সাম্রাজ্য বিস্তার: রাজপুতানা, গুজরাট, বাংলা ও দাক্ষিণাত্য জয়ের ইতিহাস
আকবরের সিংহাসন আরোহণ ও দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ: কিশোর সম্রাট যেভাবে মুঘল সাম্রাজ্য রক্ষা করেছিলেন
বক্সার প্রোটোকলের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: চীনা জাতীয়তাবাদ, বিদেশবিরোধিতা ও ‘জাতীয় অপমানের’ স্মৃতি
বক্সার প্রোটোকল থেকে ১৯১১ সালের বিপ্লব: অসম চুক্তি কীভাবে চিং রাজবংশের পতন ত্বরান্বিত করেছিল
বক্সার প্রোটোকলের পর চিং সংস্কার: অপমানজনক পরাজয় কীভাবে চীনকে আধুনিকায়নের পথে ঠেলে দেয়
বক্সার ক্ষতিপূরণের অর্থ কোথায় গিয়েছিল? যুক্তরাষ্ট্রের ফেরত দেওয়া অর্থ ও চীনা শিক্ষার্থীদের ইতিহাস