বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বক্সার প্রোটোকলের পর চিং সংস্কার: অপমানজনক পরাজয় কীভাবে চীনকে আধুনিকায়নের পথে ঠেলে দেয়

Series: ক্রুসেড: ধর্ম, সাম্রাজ্য ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 19, 2026
বক্সার প্রোটোকলের পর চিং সংস্কার: অপমানজনক পরাজয় কীভাবে চীনকে আধুনিকায়নের পথে ঠেলে দেয়
বক্সার প্রোটোকলের পর চিং সংস্কার

১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকল চিং সাম্রাজ্যের জন্য শুধু একটি অপমানজনক আন্তর্জাতিক চুক্তি ছিল না; এটি ছিল এমন এক ধাক্কা, যা রাজদরবারকে বুঝতে বাধ্য করেছিল যে পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা আর আগের মতো চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বিদেশি সেনারা বেইজিং দখল করেছে, রাজদরবার রাজধানী থেকে পালিয়েছে, ৪৫০ মিলিয়ন হাইকওয়ান টেলের ক্ষতিপূরণ চাপানো হয়েছে, দাগু দুর্গ ধ্বংস করা হয়েছে এবং রাজধানীতে বিদেশি সেনাদের স্থায়ী উপস্থিতি মেনে নিতে হয়েছে। এই বিপর্যয়ের পর চিং শাসকদের সামনে প্রশ্ন ছিল আর সংস্কার করা উচিত কি না—প্রশ্ন ছিল, সংস্কার না করলে সাম্রাজ্য আদৌ টিকে থাকবে কি না।

বক্সার সংকটের আগেও চীনে আধুনিকায়নের চেষ্টা হয়েছিল। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে স্বশক্তিকরণ আন্দোলনের মাধ্যমে আধুনিক অস্ত্রাগার, জাহাজ নির্মাণকেন্দ্র, টেলিগ্রাফ, খনি ও কারখানা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। কিছু কর্মকর্তা পশ্চিমা প্রযুক্তি গ্রহণের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু সেই সংস্কারের মূল দর্শন ছিল পুরোনো রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে শুধু বিদেশি প্রযুক্তি গ্রহণ করা।

প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধে ১৮৯৫ সালের পরাজয় এই সীমাবদ্ধতার নির্মম প্রমাণ দেয়। জাপান শুধু পশ্চিমা অস্ত্র কেনেনি; রাষ্ট্র, শিক্ষা, সেনাবাহিনী, প্রশাসন এবং শিল্পব্যবস্থাকে গভীরভাবে পুনর্গঠন করেছিল। বিপরীতে চীন আধুনিক যুদ্ধজাহাজ ও অস্ত্র কিনলেও তার প্রশাসনিক কাঠামো, সামরিক নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা পুরোনোই থেকে যায়।

এরপর ১৮৯৮ সালে গুয়াংশু সম্রাটের নেতৃত্বে শত দিবসের সংস্কার আরও গভীর পরিবর্তনের চেষ্টা করে। শিক্ষা, প্রশাসন, সামরিক ব্যবস্থা এবং অর্থনীতিকে দ্রুত আধুনিক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু সম্রাজ্ঞী বিধবা সিশি ও রক্ষণশীল অভিজাতদের হস্তক্ষেপে সেই উদ্যোগ অল্প সময়ের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়।

মাত্র দুই বছর পর বক্সার সংকট দেখিয়ে দেয়, যে সংস্কারগুলোকে বিপজ্জনক মনে করে স্থগিত করা হয়েছিল, সেগুলোর অনেকটাই আসলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য ছিল। ১৯০০ সালের পরাজয় চিং দরবারের রক্ষণশীল অংশের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়।

সিশি নিজেও এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিলেন। বক্সারদের বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করার রাজনৈতিক জুয়া ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি উপলব্ধি করেন যে আধুনিক বিশ্বের সামরিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে চিং সাম্রাজ্যকে আর রক্ষা করা যাবে না। ফলে যে শাসক ১৮৯৮ সালে দ্রুত সংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনিই ১৯০১ সালের পর ব্যাপক পরিবর্তনের অনুমোদন দেন।

এই নতুন সংস্কার কর্মসূচি সাধারণভাবে শিনঝেং বা “নতুন নীতি” নামে পরিচিত। এর লক্ষ্য ছিল শুধু কয়েকটি কারখানা বা অস্ত্রাগার নির্মাণ নয়; সেনাবাহিনী, শিক্ষা, প্রশাসন, পুলিশ, অর্থনীতি এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেও পুনর্গঠন করা।

সামরিক সংস্কার ছিল সবচেয়ে জরুরি ক্ষেত্রগুলোর একটি। বক্সার সংকট প্রমাণ করেছিল চিং সেনাবাহিনী সংখ্যায় বড় হলেও সংগঠন, প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব এবং আধুনিক অস্ত্র ব্যবহারে বিদেশি বাহিনীর তুলনায় পিছিয়ে। বিভিন্ন প্রদেশে পৃথকভাবে গড়ে ওঠা বাহিনী কেন্দ্রীয় নির্দেশও সবসময় মানত না।

এ কারণে আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নতুন সেনাবাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ দ্রুততর হয়। ইউরোপীয় এবং বিশেষ করে জাপানি সামরিক মডেল অনুসরণ করে ইউনিট পুনর্গঠন করা হয়। আধুনিক রাইফেল, কামান, ড্রিল, স্টাফ ব্যবস্থা এবং অফিসার প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়।

এই নতুন সেনাবাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র হয়ে ওঠে ইউয়ান শিকাইয়ের বেইয়াং আর্মি। তার বাহিনী বক্সার সংকটের আগেই আধুনিকীকরণের পথে ছিল, কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে তা আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়। সামরিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং পেশাদার অফিসার তৈরির ওপর নতুন গুরুত্ব দেওয়া হয়।

চিং সরকার দীর্ঘমেয়াদে একটি কেন্দ্রীয় আধুনিক সেনাবাহিনী গড়ে তোলার পরিকল্পনাও করে। লক্ষ্য ছিল প্রাদেশিক বাহিনীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন শক্তিশালী সামরিক কাঠামো তৈরি করা।

কিন্তু সামরিক আধুনিকায়নের একটি অপ্রত্যাশিত ফলও ছিল। নতুন সেনাবাহিনী শুধু আধুনিক অস্ত্র শেখেনি; তার সদস্যদের মধ্যে আধুনিক জাতীয়তাবাদ, সাংবিধানিক চিন্তা এবং বিপ্লবী মতাদর্শও ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী ১৯১১ সালের বিপ্লবে এই নতুন সেনাবাহিনীর সদস্যরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

শিক্ষা সংস্কার ছিল আরও মৌলিক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চিং রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রের ভিত্তি ছিল সাম্রাজ্যিক পরীক্ষা ব্যবস্থা। পরীক্ষায় মূলত কনফুসীয় শাস্ত্র, সাহিত্যিক দক্ষতা এবং ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো।

কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা করতে প্রকৌশলী, সামরিক কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ এবং আধুনিক আইন ও প্রশাসনে প্রশিক্ষিত মানুষের প্রয়োজন ছিল। পুরোনো পরীক্ষাব্যবস্থা আর রাষ্ট্রের এই নতুন চাহিদা পূরণ করতে পারছিল না।

ফলে নতুন বিদ্যালয় স্থাপন দ্রুত বাড়তে থাকে। পাঠ্যক্রমে গণিত, বিজ্ঞান, ভূগোল, বিদেশি ভাষা, ইতিহাস এবং আধুনিক প্রশাসনিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রাদেশিক ও স্থানীয় পর্যায়ে নতুন ধরনের বিদ্যালয় তৈরি হয় এবং পশ্চিমা ও জাপানি শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন মডেল অনুসরণ করা হয়।

সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন আসে ১৯০৫ সালে, যখন শতাব্দীপ্রাচীন সাম্রাজ্যিক পরীক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়। চীনের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি ছিল এক বিশাল পরিবর্তন।

পরীক্ষা ব্যবস্থা শুধু কর্মকর্তা নিয়োগের পদ্ধতি ছিল না; এটি ছিল শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণির সামাজিক জীবনের কেন্দ্র। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরিবারগুলো তাদের সন্তানকে ক্লাসিক্যাল শিক্ষায় প্রস্তুত করত, যাতে তারা পরীক্ষা পাস করে সরকারি কর্মকর্তা হতে পারে। সেই ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার অর্থ ছিল পুরোনো কনফুসীয় প্রশাসনিক সমাজের একটি মৌলিক স্তম্ভ সরিয়ে দেওয়া।

এর বদলে আধুনিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত শিক্ষাগত যোগ্যতার গুরুত্ব বাড়ে। ফলে শিক্ষিত তরুণদের মানসিক জগতও বদলাতে থাকে। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, রাজবংশ, জাতি, নাগরিকত্ব, বিজ্ঞান এবং আধুনিক রাজনীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়।

বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোও দ্রুত বাড়ে। বিশেষ করে জাপান চীনা শিক্ষার্থীদের প্রধান গন্তব্য হয়ে ওঠে। ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি, তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল এবং সাংস্কৃতিকভাবে পরিচিত হওয়ার কারণে হাজার হাজার চীনা তরুণ সেখানে পড়তে যান।

জাপানে তারা শুধু আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই শেখেনি; সাংবিধানিক রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র এবং বিপ্লবী চিন্তার সঙ্গেও পরিচিত হয়। অনেক ভবিষ্যৎ বিপ্লবী নেতা বিদেশে পড়াশোনার সময় চিংবিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।

এই শিক্ষা সংস্কার তাই রাজবংশকে শক্তিশালী করার জন্য শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত রাজবংশের সমালোচকদেরও শক্তিশালী করে।

প্রশাসনিক সংস্কারেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। বিদেশি সম্পর্ক পরিচালনাকারী পুরোনো জংলি ইয়ামেন বিলুপ্ত করে আধুনিক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। নতুন মন্ত্রণালয়কে প্রশাসনিক কাঠামোর উচ্চ পর্যায়ে স্থান দেওয়া হয়।

এর গুরুত্ব ছিল প্রতীকী। পুরোনো চীনা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সম্রাটকে বিশ্বের কেন্দ্রীয় শাসক হিসেবে দেখার ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু উনিশ শতকের পরাজয় চীনকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখন সমান সার্বভৌম রাষ্ট্র, কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং আধুনিক পররাষ্ট্রনীতির নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বাণিজ্য, পুলিশ, শিক্ষা ও সামরিক প্রশাসনের জন্যও নতুন বা পুনর্গঠিত প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়। প্রশাসনিক বিভাগগুলোর কার্যক্রম আধুনিক মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলে।

পুলিশ ব্যবস্থার আধুনিকায়নও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় নিরাপত্তা কাঠামোর পাশাপাশি শহরে আধুনিক পুলিশ বাহিনী গড়ে ওঠে। বেইজিং এবং অন্যান্য বড় শহরে নগর শৃঙ্খলা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক নজরদারিতে নতুন পদ্ধতি চালু হয়।

অর্থনৈতিক আধুনিকায়নও নতুন নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। শিল্প, বাণিজ্য এবং অবকাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য সরকার উদ্যোগ নেয়। রেলপথ নির্মাণ, খনি, ব্যাংকিং এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করা হয়।

কিন্তু এই ক্ষেত্রে চিং সরকার একটি বড় সমস্যার মুখে পড়ে—আধুনিকায়নের জন্য অর্থ দরকার, অথচ বক্সার ক্ষতিপূরণসহ বিদেশি আর্থিক দায় ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রের বাজেটকে চাপে ফেলেছে।

৪৫০ মিলিয়ন টেল ক্ষতিপূরণের বার্ষিক কিস্তি, পূর্ববর্তী বিদেশি ঋণ এবং নতুন সামরিক ও শিক্ষা প্রকল্পের ব্যয় একসঙ্গে বহন করা সহজ ছিল না। ফলে সরকার নতুন কর, প্রাদেশিক অবদান এবং বিদেশি ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে থাকে।

এই আর্থিক চাপ পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সমস্যাও সৃষ্টি করে। বিশেষ করে রেলপথ নির্মাণের অর্থায়ন এবং বিদেশি ঋণের প্রশ্ন জনগণের মধ্যে গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করে। ১৯১১ সালের রেলওয়ে সুরক্ষা আন্দোলন চিংবিরোধী রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাৎক্ষণিক কারণ হয়ে ওঠে।

শিনঝেং সংস্কারের আরেকটি বড় দিক ছিল আইনি ও বিচারব্যবস্থার পরিবর্তন। বিদেশি শক্তিগুলো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়েছিল যে চীনের বিচারব্যবস্থা আধুনিক আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বহির্দেশীয় বিচারাধিকারের কারণে বিদেশি নাগরিকরা সাধারণ চীনা আদালতের আওতার বাইরে বিশেষ সুবিধা ভোগ করত।

চিং সরকার তাই আধুনিক আইনসংহিতা, আদালত এবং বিচারিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ শুরু করে। জাপানি এবং ইউরোপীয় আইনব্যবস্থা অধ্যয়ন করা হয়। লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের প্রশাসন আধুনিক করা এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদেশিদের বিশেষ বিচারিক অধিকার বিলুপ্ত করার যুক্তি শক্তিশালী করা।

অর্থাৎ সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল হারানো সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের উপযোগী আধুনিক রাষ্ট্র তৈরি করা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে সাংবিধানিক সংস্কারের ধারণায়। বক্সার সংকটের আগে চিং রাজদরবারের বড় অংশ সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের ধারণাকে বিপজ্জনক বলে মনে করত। কিন্তু জাপানের উত্থান নতুন উদাহরণ তৈরি করেছিল। জাপান সম্রাটকে বজায় রেখেও সংবিধান, সংসদ এবং আধুনিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরি করেছে।

চিং কর্মকর্তাদের বিভিন্ন দল জাপান, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয় বিদেশি রাজনৈতিক ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রাজদরবার ধীরে ধীরে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ঘোষণা করে।

প্রাদেশিক পর্যায়ে নির্বাচিত পরামর্শমূলক সভা গড়ে ওঠে এবং ভবিষ্যৎ জাতীয় সংসদের পরিকল্পনা করা হয়। ১৯০৮ সালে একটি সাংবিধানিক রূপরেখা এবং দীর্ঘ সময়সীমার সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়।

কিন্তু এখানেই চিং সংস্কারের অন্যতম বড় দুর্বলতা প্রকাশ পায়। শিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় জনগণের একটি অংশ মনে করেছিল পরিবর্তনের গতি অত্যন্ত ধীর। রাজদরবার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা ছাড়তে চাইছে না—এমন সন্দেহ দ্রুত বাড়তে থাকে।

১৯০৮ সালে সম্রাজ্ঞী সিশি এবং গুয়াংশু সম্রাট অল্প সময়ের ব্যবধানে মারা গেলে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। শিশু সম্রাট পুয়ি সিংহাসনে বসেন এবং বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতা রিজেন্সির হাতে যায়।

এই সময় রাজদরবার যে মন্ত্রিসভা গঠন করে, সেখানে রাজপরিবারের সদস্যদের অতিরিক্ত উপস্থিতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সাংবিধানিক সংস্কারের সমর্থকেরা মনে করেন, সরকার আধুনিক প্রতিষ্ঠান তৈরির নামে প্রকৃতপক্ষে মাঞ্চু রাজপরিবারের ক্ষমতাই রক্ষা করছে।

ফলে সংস্কারের একটি গভীর রাজনৈতিক বৈপরীত্য তৈরি হয়। চিং সরকার রাষ্ট্রকে আধুনিক করতে গিয়ে এমন সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি সৃষ্টি করেছিল, যারা পরে রাজবংশের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আরও জোরালো প্রশ্ন তুলতে শুরু করে।

নতুন বিদ্যালয় শিক্ষিত তরুণ তৈরি করল; তারা রাজনৈতিক সংস্কার দাবি করল। বিদেশে পাঠানো শিক্ষার্থীরা আধুনিক জাতীয়তাবাদ ও বিপ্লবী চিন্তা নিয়ে ফিরল। নতুন সেনাবাহিনী আধুনিক অফিসার তৈরি করল; তাদের একটি অংশ রাজবংশের বিরুদ্ধে দাঁড়াল। নতুন প্রাদেশিক পরিষদ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা তৈরি করল; তাদের সদস্যরা কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা শুরু করলেন।

যে আধুনিকায়ন রাজবংশকে বাঁচানোর জন্য শুরু হয়েছিল, সেটিই এক অর্থে রাজবংশকে চ্যালেঞ্জ করার নতুন প্রতিষ্ঠান ও নতুন মানুষ তৈরি করেছিল।

এই কারণে শিনঝেং সংস্কারকে ব্যর্থ বলে একেবারে বাতিল করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন ছিল বাস্তব এবং গভীর। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা, নতুন সেনাবাহিনী, পুলিশ, সরকারি মন্ত্রণালয়, আইনি সংস্কার এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠন পরবর্তী প্রজাতান্ত্রিক চীনের ওপরও প্রভাব ফেলেছিল।

চিং রাজবংশ ১৯১২ সালে পতন করলেও তার শেষ দশকের অনেক সংস্কার নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গঠনের ভিত্তির অংশ হয়ে থাকে। অর্থাৎ রাজবংশ নিজেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হলেও তার আধুনিকায়নের কিছু প্রকল্প সাম্রাজ্যের মৃত্যুর পরও বেঁচে ছিল।

বক্সার প্রোটোকলের সঙ্গে এই সংস্কারের সম্পর্ক তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯০১ সালের পরাজয় না ঘটলে চিং সরকার এত দ্রুত ও এত বিস্তৃত পরিবর্তনের পথে যেত কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট যে বক্সার বিপর্যয় রক্ষণশীলদের অনেক পুরোনো যুক্তি ভেঙে দিয়েছিল।

আগে বলা সম্ভব ছিল, পশ্চিমা রাষ্ট্রব্যবস্থা গ্রহণ করলে চীনের ঐতিহ্য নষ্ট হবে। কিন্তু ১৯০০ সালের পর আরও কঠিন প্রশ্ন সামনে আসে—পরিবর্তন না করলে চীন কি বিদেশি শক্তির সামনে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই টিকে থাকতে পারবে?

এই প্রশ্নের উত্তর হিসেবে চিং সরকার আধুনিকায়নের পথ বেছে নেয়। কিন্তু সময় তার হাতে খুব কম ছিল। জাপান কয়েক দশক ধরে যে পরিবর্তন করেছিল, চিং সরকার তার বড় অংশ এক দশকের মধ্যে করার চেষ্টা করছিল।

একই সঙ্গে সরকারকে বিদেশি ক্ষতিপূরণ দিতে, রাজনৈতিক বিরোধ সামলাতে, প্রাদেশিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং রাজপরিবারের স্বার্থ রক্ষা করতে হচ্ছিল। ফলে সংস্কারের গতি ও গভীরতা নিয়ে অসন্তোষ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

১৯১১ সালের অক্টোবরে উচাংয়ে বিদ্রোহ শুরু হলে সেটি দ্রুত বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। নতুন সেনাবাহিনীর সদস্য, বিপ্লবী সংগঠন, প্রাদেশিক রাজনৈতিক অভিজাত এবং অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠী মিলে চিং সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।

মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে সাম্রাজ্যিক শাসনের ভিত্তি ভেঙে পড়ে। ১৯১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শিশু সম্রাট পুয়ির নামে সিংহাসন ত্যাগের ঘোষণা আসে এবং চিং রাজবংশের পতন ঘটে।

এই পরিণতি এক গভীর ঐতিহাসিক পরিহাস বহন করে। বক্সার প্রোটোকলের অপমান চিং সরকারকে সংস্কারের পথে ঠেলে দিয়েছিল, কিন্তু সেই সংস্কারই এমন প্রতিষ্ঠান, সেনাবাহিনী, শিক্ষিত শ্রেণি ও রাজনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি করেছিল যা শেষ পর্যন্ত রাজবংশের পতনকে ত্বরান্বিত করে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সংস্কার করাই চিংদের ভুল ছিল। বরং সমস্যা ছিল সংস্কার খুব দেরিতে শুরু হওয়া, রাজনৈতিক আস্থা হারিয়ে ফেলা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে রাজবংশীয় ক্ষমতা রক্ষার প্রচেষ্টার সংঘাত।

১৯০১ সালের পর চিং শাসকেরা রাষ্ট্রকে আধুনিক করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তখন জনগণের একটি বড় অংশের কাছে প্রশ্ন ছিল শুধু রাষ্ট্র কীভাবে আধুনিক হবে নয়; বরং এই রাষ্ট্রকে কে শাসন করবে

এই কারণেই বক্সার-পরবর্তী সংস্কার আধুনিক চীনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। একদিকে এর শুরু চিং সাম্রাজ্যের জাতীয় অপমান ও রাজনৈতিক দুর্বলতা থেকে, অন্যদিকে এর পরিণতি প্রজাতান্ত্রিক যুগের শিক্ষা, প্রশাসন, সেনাবাহিনী এবং আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে যুক্ত।

বক্সার প্রোটোকল চীনকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করেছিল, কিন্তু একই সঙ্গে পুরোনো ব্যবস্থার অকার্যকারিতা এত নির্মমভাবে প্রকাশ করেছিল যে আধুনিকায়ন আর ঐচ্ছিক প্রকল্প হিসেবে থাকেনি। সেনাবাহিনী থেকে বিদ্যালয়, পরীক্ষা ব্যবস্থা থেকে মন্ত্রণালয়, আইন থেকে সংবিধান—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পরিবর্তনের চাপ তৈরি হয়।

সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক বৈপরীত্য এখানেই। যে বিদেশি শক্তিগুলোর কাছে পরাজয় চিং রাজবংশকে অপমানিত করেছিল, সেই পরাজয়ের ধাক্কাই তাকে এমন পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায় যা আধুনিক চীনের অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ১৯০১ সালের বক্সার বিপর্যয় তাই শুধু একটি পুরোনো সাম্রাজ্যের পতনের পূর্বাভাস ছিল না; এটি একই সঙ্গে নতুন ধরনের চীনা রাষ্ট্র, আধুনিক শিক্ষা, পেশাদার সেনাবাহিনী এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের যুগের দরজাও খুলে দিয়েছিল।


You may also like