বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

জিপিএস কীভাবে পৃথিবীর যেকোনো স্থানে আপনার অবস্থান নির্ভুলভাবে বের করে?

  • Author: Admin
  • August 21, 2026
জিপিএস কীভাবে পৃথিবীর যেকোনো স্থানে আপনার অবস্থান নির্ভুলভাবে বের করে?
জিপিএস

স্মার্টফোনে মানচিত্র খুললেই কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটি ছোট বিন্দু জানিয়ে দেয় আপনি ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন। গাড়িতে পথনির্দেশ চালু করলে সেটি শুধু বর্তমান অবস্থানই দেখায় না, আপনি কোন দিকে এবং কত দ্রুত এগোচ্ছেন তাও বুঝতে পারে। অচেনা শহরে রাস্তা খোঁজা, বিমান ও জাহাজ পরিচালনা, কৃষিজমিতে নির্দিষ্ট স্থানে যন্ত্র চালানো, জরুরি উদ্ধারকাজ কিংবা কোনো পণ্যবাহী যান অনুসরণ—এসবের পেছনে কাজ করছে জিপিএস বা বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থা। বাইরে থেকে ব্যাপারটি খুব সহজ মনে হলেও এর ভেতরে রয়েছে মহাকাশে ঘুরতে থাকা উপগ্রহ, অত্যন্ত নির্ভুল পারমাণবিক ঘড়ি, আলোর গতিতে ছুটে আসা বেতার সংকেত, জটিল জ্যামিতিক হিসাব এবং এমনকি আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সংশোধন।

জিপিএসের মূল ধারণাটি আশ্চর্যজনকভাবে সরল। পৃথিবীর চারদিকে এমন কিছু উপগ্রহ ঘুরছে, যাদের অবস্থান নির্দিষ্ট সময়ে কোথায় রয়েছে তা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে জানা যায়। প্রতিটি উপগ্রহ ক্রমাগত একটি বেতার সংকেত পাঠায়। সেই সংকেতের মধ্যে মূলত বলা থাকে—“আমি কোথায় আছি এবং ঠিক কোন সময়ে এই সংকেতটি পাঠিয়েছি।” আপনার ফোন সেই সংকেত গ্রহণ করে হিসাব করে সংকেতটি উপগ্রহ থেকে ফোন পর্যন্ত পৌঁছাতে কত সময় নিয়েছে। বেতার তরঙ্গ প্রায় আলোর গতিতে চলাচল করে। তাই সময় জানা গেলে দূরত্বও হিসাব করা সম্ভব। মৌলিক ধারণাটি হলো, দূরত্ব সমান সংকেতের গতি ও যাত্রাসময়ের গুণফল।

জিপিএস ব্যবস্থার উপগ্রহগুলো পৃথিবীর খুব কাছের নিম্ন কক্ষপথে নয়। এগুলো পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে প্রায় বিশ হাজার দুই শত কিলোমিটার উচ্চতায় মধ্যম পৃথিবী কক্ষপথে ঘোরে। একটি উপগ্রহ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে প্রায় বারো ঘণ্টা সময় নেয়। উপগ্রহগুলোকে বিভিন্ন কক্ষপথে এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে, যাতে পৃথিবীর অধিকাংশ উন্মুক্ত স্থানে একই সময়ে একাধিক উপগ্রহ আকাশে দৃশ্যমান থাকে। কার্যকর ব্যবস্থায় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত উপগ্রহও রাখা হয়, ফলে কোনো একটি উপগ্রহ সাময়িকভাবে ব্যবহারযোগ্য না হলেও পুরো ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায় না।

প্রতিটি জিপিএস উপগ্রহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রগুলোর একটি হলো পারমাণবিক ঘড়ি। সাধারণ হাতঘড়ি বা ফোনের ঘড়ির তুলনায় এটি অবিশ্বাস্যভাবে নির্ভুল। এত নিখুঁত সময়ের প্রয়োজন কেন, তা বোঝার জন্য সংকেতের গতির দিকে তাকাতে হয়। আলো এক সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার অতিক্রম করে। অর্থাৎ সময়ের হিসাবে অত্যন্ত সামান্য ভুলও দূরত্বের হিসাবে বড় ভুল সৃষ্টি করতে পারে। মাত্র এক মাইক্রোসেকেন্ডের সময়গত ত্রুটি দূরত্বে প্রায় তিন শত মিটারের ভুল তৈরি করতে পারে। ফলে কয়েক মিটার পর্যায়ে অবস্থান জানতে হলে সংকেতের সময় অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করতে হয়।

ধরা যাক, আপনার ফোন একটি উপগ্রহের সংকেত গ্রহণ করল এবং হিসাব করে জানল উপগ্রহটি থেকে আপনার দূরত্ব প্রায় বিশ হাজার কিলোমিটার। শুধু এই তথ্য দিয়ে আপনার অবস্থান জানা সম্ভব নয়। কারণ আপনি সেই উপগ্রহকে কেন্দ্র করে বিশ হাজার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের একটি কাল্পনিক গোলকের পৃষ্ঠের যেকোনো স্থানে থাকতে পারেন। অর্থাৎ একটি উপগ্রহ কেবল সম্ভাব্য অবস্থানের একটি বিশাল ক্ষেত্র নির্ধারণ করতে পারে।

এবার দ্বিতীয় একটি উপগ্রহ থেকে দূরত্ব জানা গেল। তখন আপনার অবস্থানকে একই সঙ্গে দুটি কাল্পনিক গোলকের শর্ত পূরণ করতে হবে। দুটি গোলক পরস্পরকে ছেদ করলে সম্ভাব্য অবস্থান অনেক কমে আসে। তৃতীয় উপগ্রহ যুক্ত হলে আরেকটি গোলক পাওয়া যায় এবং তিনটি গোলকের ছেদ থেকে সম্ভাব্য অবস্থান আরও নির্দিষ্ট হয়ে যায়। এই ধারণাকে অনেক সময় সহজভাবে ত্রিভুজায়ন বলা হলেও জিপিএসের ক্ষেত্রে আরও যথাযথ ধারণা হলো দূরত্বভিত্তিক বহুবিন্দু অবস্থান নির্ণয়, কারণ এখানে মূলত কোণ নয়, একাধিক পরিচিত বিন্দু থেকে দূরত্ব ব্যবহার করা হয়।

তাহলে তিনটি উপগ্রহই কি যথেষ্ট? আদর্শ গণিতের জগতে অনেক ক্ষেত্রে তিনটি পরিচিত দূরত্ব দিয়ে অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তব জিপিএসে আরেকটি বড় সমস্যা রয়েছে—আপনার ফোনের ঘড়ি উপগ্রহের পারমাণবিক ঘড়ির মতো নির্ভুল নয়। ফোনে অত্যন্ত ব্যয়বহুল পারমাণবিক ঘড়ি বসানো বাস্তবসম্মতও নয়। ফলে ফোনের ঘড়িতে সামান্য ত্রুটি থাকলে সব উপগ্রহের হিসাব করা দূরত্বেই ত্রুটি দেখা দেয়।

এই সমস্যার সমাধান করে সাধারণত চতুর্থ উপগ্রহ। জিপিএস গ্রহণযন্ত্রকে মূলত চারটি অজানা মান বের করতে হয়—পৃথিবীর ত্রিমাত্রিক স্থানে তার তিনটি স্থানাঙ্ক এবং নিজের ঘড়ির সময়গত ত্রুটি। চারটি স্বাধীন উপগ্রহ সংকেত পাওয়া গেলে চারটি সমীকরণের সাহায্যে এই অজানা মানগুলো নির্ণয় করা যায়। ফলে ফোনে পারমাণবিক ঘড়ি না থাকলেও উপগ্রহগুলোর অত্যন্ত নির্ভুল সময়কে ব্যবহার করে ফোন নিজের ঘড়ির ত্রুটিও হিসাবের মধ্যে সংশোধন করতে পারে।

বাস্তবে আধুনিক ফোন শুধু চারটি উপগ্রহের সংকেত নিয়েই থেমে থাকে না। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এটি একই সময়ে অনেক উপগ্রহের সংকেত গ্রহণ করতে পারে। যত বেশি উপযুক্ত উপগ্রহ পাওয়া যায়, তত বেশি অতিরিক্ত পরিমাপ ব্যবহার করে গণনার অনিশ্চয়তা কমানো সম্ভব হয়। তবে শুধু উপগ্রহের সংখ্যা নয়, আকাশে তাদের অবস্থানগত বিন্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। যদি সব দৃশ্যমান উপগ্রহ আকাশের একই অংশে কাছাকাছি থাকে, তাহলে গণনার নির্ভুলতা তুলনামূলকভাবে কমতে পারে। বিপরীতে উপগ্রহগুলো আকাশের বিভিন্ন দিকে ভালোভাবে ছড়িয়ে থাকলে অবস্থান নির্ণয়ের জ্যামিতি উন্নত হয়।

উপগ্রহের পাঠানো সংকেতের মধ্যে শুধু সময় থাকে না। এতে উপগ্রহের কক্ষপথ সম্পর্কিত অত্যন্ত নির্ভুল তথ্যও থাকে। গ্রহণযন্ত্রকে জানতে হয় সংকেত পাঠানোর মুহূর্তে সংশ্লিষ্ট উপগ্রহটি মহাকাশের ঠিক কোথায় ছিল। প্রতিটি উপগ্রহ তার নিজস্ব কক্ষপথের সূক্ষ্ম তথ্য সম্প্রচার করে। পাশাপাশি পুরো উপগ্রহসমষ্টির তুলনামূলক সাধারণ কক্ষপথ তথ্যও পাঠানো হয়, যাতে গ্রহণযন্ত্র বুঝতে পারে কোন কোন উপগ্রহ আকাশে পাওয়া যেতে পারে।

এই মহাকাশভিত্তিক ব্যবস্থার পেছনে পৃথিবীতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কাজ করে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র উপগ্রহগুলোর কক্ষপথ ও ঘড়ির আচরণ পর্যবেক্ষণ করে। উপগ্রহের পূর্বাভাসিত অবস্থান ও প্রকৃত অবস্থানের মধ্যে সামান্য পার্থক্য হলেও তা শনাক্ত করা হয়। প্রয়োজনীয় সংশোধিত তথ্য পরে উপগ্রহে পাঠানো হয়, যাতে ব্যবহারকারীদের কাছে সম্প্রচারিত কক্ষপথ ও সময়সংক্রান্ত তথ্য যথাসম্ভব নির্ভুল থাকে। অর্থাৎ আপনার ফোন সরাসরি মহাকাশের উপগ্রহ থেকে সংকেত পেলেও সেই নির্ভুলতার পেছনে ভূমিতে থাকা একটি বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো কাজ করছে।

জিপিএস সংকেত পৃথিবীতে পৌঁছানোর পথে বায়ুমণ্ডলের কারণেও কিছুটা বিলম্বিত হয়। বিশেষ করে আয়নমণ্ডল সংকেতের গতিপথ ও যাত্রাসময়ে প্রভাব ফেলতে পারে। এর নিচের বায়ুমণ্ডলীয় স্তরেও জলীয়বাষ্প, চাপ ও তাপমাত্রাজনিত বিলম্ব তৈরি হয়। গ্রহণযন্ত্র বিভিন্ন গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে এসব ত্রুটির একটি অংশ সংশোধন করে। উন্নত গ্রহণযন্ত্র একাধিক কম্পাঙ্কের সংকেত তুলনা করে আয়নমণ্ডলীয় বিলম্ব আরও কার্যকরভাবে নির্ণয় করতে পারে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো বহুপথ সংকেত। আপনি যদি উঁচু ভবনে ঘেরা শহরের রাস্তায় দাঁড়ান, উপগ্রহের সংকেত সরাসরি ফোনে পৌঁছানোর পরিবর্তে কোনো ভবনের কাচ, দেয়াল বা অন্য পৃষ্ঠে প্রতিফলিত হয়ে ফোনে আসতে পারে। প্রতিফলিত পথে সংকেতকে একটু বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। গ্রহণযন্ত্র যদি সেটিকে সরাসরি আসা সংকেত হিসেবে ধরে, তাহলে উপগ্রহের দূরত্ব বেশি বলে মনে হবে এবং অবস্থানেও ভুল দেখা দিতে পারে। এ কারণেই খোলা মাঠে জিপিএস সাধারণত বেশি নির্ভুল, কিন্তু সুউচ্চ ভবনের মাঝখানে অবস্থানের বিন্দু কখনো কখনো রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে লাফিয়ে যেতে দেখা যায়।

সুড়ঙ্গ, ভূগর্ভস্থ কক্ষ কিংবা বড় ভবনের গভীরে জিপিএস দুর্বল বা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে যাওয়ার কারণও একই। উপগ্রহগুলো থেকে আসা সংকেত পৃথিবীতে পৌঁছানোর সময় অত্যন্ত দুর্বল থাকে। আকাশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হলে ফোন পর্যাপ্ত পরিষ্কার সংকেত পায় না। জিপিএস তাই পৃথিবীর যেকোনো স্থানে তাত্ত্বিকভাবে অবস্থান নির্ধারণের ব্যবস্থা হলেও বাস্তবে আকাশ দৃশ্যমান থাকা এর কার্যকারিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

স্মার্টফোন অবশ্য শুধু জিপিএসের ওপর নির্ভর করে না। আধুনিক ফোনে উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ণয়ের পাশাপাশি মোবাইল যোগাযোগকেন্দ্র, বেতার নেটওয়ার্ক, গতিসংবেদক, ঘূর্ণনসংবেদক এবং অন্যান্য তথ্যও কাজে লাগানো হতে পারে। ফোন প্রথমবার চালু করে একেবারে নতুন স্থানে অবস্থান বের করতে শুধু উপগ্রহ সংকেতের ওপর নির্ভর করলে কিছুটা সময় লাগতে পারে। কিন্তু যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে উপগ্রহের সম্ভাব্য অবস্থান ও প্রয়োজনীয় সহায়ক তথ্য দ্রুত পাওয়া গেলে গ্রহণযন্ত্র অনেক দ্রুত সংকেত শনাক্ত করতে পারে। এই পদ্ধতিকে সহায়তাপ্রাপ্ত জিপিএস বলা হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণাও পরিষ্কার করা দরকার। সাধারণ অবস্থান নির্ণয়ের সময় আপনার ফোনকে নিজের অবস্থান জানার জন্য জিপিএস উপগ্রহের কাছে কোনো বার্তা পাঠাতে হয় না। উপগ্রহগুলো মূলত সম্প্রচারকের মতো সংকেত পাঠিয়ে যায়, আর ফোন একটি গ্রহণযন্ত্র হিসেবে সেই সংকেত শোনে ও নিজের অবস্থান নিজেই হিসাব করে। তাই শুধু জিপিএস ব্যবহার করে অবস্থান নির্ণয় করতে মোবাইল ইন্টারনেট অপরিহার্য নয়। তবে মানচিত্র নামানো, যানজটের তথ্য পাওয়া, ঠিকানা অনুসন্ধান করা কিংবা সহায়তাপ্রাপ্ত অবস্থানসেবা ব্যবহারে ইন্টারনেট দরকার হতে পারে।

জিপিএসের নির্ভুলতার ক্ষেত্রে পৃথিবীর ঘূর্ণনও বিবেচনায় নিতে হয়। উপগ্রহ থেকে সংকেত আপনার ফোনে পৌঁছাতে অতি সামান্য হলেও সময় লাগে এবং সেই সময়ে পৃথিবী নিজ অক্ষের চারদিকে কিছুটা ঘুরে যায়। অত্যন্ত নির্ভুল গণনায় এই ঘূর্ণনের প্রভাব বাদ দেওয়া যায় না। গ্রহণযন্ত্রের গণনায় তাই পৃথিবীর ঘূর্ণনজনিত সংশোধনও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব সংশোধন না করলে জিপিএস দ্রুত ভুল হয়ে যেত। উপগ্রহ পৃথিবীর তুলনায় দ্রুত গতিতে চলার কারণে বিশেষ আপেক্ষিকতার প্রভাবে তার ঘড়ির গতিতে একটি পরিবর্তন আসে। আবার উপগ্রহ পৃথিবীপৃষ্ঠের তুলনায় দুর্বল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে থাকার কারণে সাধারণ আপেক্ষিকতার প্রভাবে তার ঘড়ি অন্য হারে চলে। দুটি প্রভাব বিপরীত দিকে কাজ করলেও তাদের মোট ফল শূন্য নয়। সব মিলিয়ে উপগ্রহের পারমাণবিক ঘড়ি পৃথিবীর ঘড়ির তুলনায় প্রতিদিন প্রায় আটত্রিশ মাইক্রোসেকেন্ড এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখাত। শুনতে অতি সামান্য মনে হলেও এই ত্রুটি সংশোধন না করলে অবস্থান নির্ণয়ে প্রতিদিন বহু কিলোমিটারের ভুল জমা হতে পারত। তাই উপগ্রহের সময়ব্যবস্থায় আপেক্ষিকতার প্রভাব পরিকল্পিতভাবেই বিবেচনা করা হয়।

সাধারণ স্মার্টফোনে খোলা আকাশের নিচে ভালো পরিস্থিতিতে অবস্থানের ত্রুটি প্রায় কয়েক মিটারের মধ্যে থাকতে পারে। কিন্তু সব জিপিএস ব্যবহার একই মাত্রার নির্ভুলতায় সীমাবদ্ধ নয়। জরিপ, নির্মাণ, কৃষি ও বৈজ্ঞানিক কাজে ভূমিতে পরিচিত অবস্থানের সংশোধনী কেন্দ্র ব্যবহার করে অনেক বেশি নির্ভুল ফল পাওয়া যায়। উন্নত বাস্তবসময়ের গতিশীল সংশোধন পদ্ধতিতে বাহক তরঙ্গের পর্যায় বিশ্লেষণ এবং কাছাকাছি নির্দিষ্ট কেন্দ্রের সংশোধনী তথ্য ব্যবহার করে অনুকূল পরিস্থিতিতে সেন্টিমিটার পর্যায়ের অবস্থান নির্ণয়ও সম্ভব।

বর্তমান স্মার্টফোনের অবস্থান নির্ণয়কে শুধু মার্কিন জিপিএস ব্যবস্থার সঙ্গে এক করে দেখাও পুরোপুরি সঠিক নয়। অনেক আধুনিক গ্রহণযন্ত্র একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের বৈশ্বিক উপগ্রহ নেভিগেশন ব্যবস্থা থেকে সংকেত গ্রহণ করতে পারে। ফলে আকাশে ব্যবহারযোগ্য উপগ্রহের সংখ্যা বাড়ে, বিশেষ করে শহর বা আংশিক বাধাযুক্ত স্থানে অবস্থান নির্ণয়ের সুযোগ উন্নত হয়। ব্যবহারকারীর কাছে সবকিছু সাধারণভাবে ‘জিপিএস’ নামে পরিচিত হলেও ফোনের ভেতরের গ্রহণযন্ত্র বাস্তবে একাধিক উপগ্রহসমষ্টির তথ্য একত্রে ব্যবহার করতে পারে।

জিপিএস শুধু অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশই নির্ণয় করে না; এটি উচ্চতাও হিসাব করতে পারে। তবে সাধারণ গ্রহণযন্ত্রে অনুভূমিক অবস্থানের তুলনায় উচ্চতার হিসাব প্রায়ই কম নির্ভুল হয়। এর একটি কারণ উপগ্রহগুলোর জ্যামিতিক বিন্যাস। আমরা পৃথিবীপৃষ্ঠে থাকায় আকাশের উপরের অংশে উপগ্রহ দেখতে পাই, কিন্তু আমাদের নিচে সমানভাবে উপগ্রহ থাকে না। ফলে উল্লম্ব দিকের গণনার জ্যামিতি অনুভূমিক দিকের তুলনায় দুর্বল হতে পারে। তাছাড়া জিপিএস থেকে পাওয়া উচ্চতা এবং প্রচলিত সমুদ্রপৃষ্ঠভিত্তিক উচ্চতা একই ধারণা নয়; নির্ভুল উচ্চতা পেতে পৃথিবীর প্রকৃত আকৃতি ও মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মডেলও বিবেচনা করতে হয়।

আপনি যখন গাড়িতে চলছেন, ফোন একটির পর একটি অবস্থান গণনা করে। ধারাবাহিক অবস্থানের পরিবর্তন থেকে চলার দিক ও গতি বোঝা সম্ভব। আরও উন্নতভাবে উপগ্রহ সংকেতের কম্পাঙ্কে গতিজনিত সূক্ষ্ম পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেও গতি নির্ণয় করা যায়। এ কারণেই জিপিএস শুধু মানচিত্রে একটি স্থির বিন্দু দেখানোর প্রযুক্তি নয়; এটি চলমান যানবাহনের পথ, গতি ও সময় নির্ণয়েরও অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যবস্থা।

জিপিএসের আরেকটি অসাধারণ কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত ব্যবহার হলো নির্ভুল সময় সরবরাহ। মোবাইল যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো, আর্থিক লেনদেনের সময়চিহ্ন এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত নির্ভুল সময় দরকার হয়। জিপিএস উপগ্রহের পারমাণবিক ঘড়ি এই সময় সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। অর্থাৎ জিপিএসের গুরুত্ব শুধু ‘আমি কোথায় আছি’ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; আধুনিক প্রযুক্তির বহু অবকাঠামোর সময় সমন্বয়ের সঙ্গেও এটি জড়িত।

তবে জিপিএস অপরাজেয় ব্যবস্থা নয়। আয়নমণ্ডলের অস্বাভাবিকতা, পাহাড়, ঘন বন, সুউচ্চ ভবন, সংকেত প্রতিফলন, উপগ্রহের অবস্থানগত জ্যামিতি এবং গ্রহণযন্ত্রের মান নির্ভুলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। ইচ্ছাকৃতভাবে শক্তিশালী বেতার সংকেত দিয়ে প্রকৃত উপগ্রহ সংকেতকে চাপা দেওয়া হলে গ্রহণযন্ত্র অবস্থান হারাতে পারে। আবার নকল উপগ্রহ সংকেত তৈরি করে কোনো গ্রহণযন্ত্রকে ভুল অবস্থান বিশ্বাস করানোর চেষ্টাও সম্ভব। বিমান, জাহাজ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে তাই শুধু একটি অবস্থান উৎসের ওপর নির্ভর না করে অতিরিক্ত নেভিগেশন ও যাচাইব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে পকেটের ছোট স্মার্টফোনটি যখন কয়েক সেকেন্ডে আপনার অবস্থান দেখায়, তখন তার পেছনে কাজ করা প্রক্রিয়াটি বিশাল। পৃথিবী থেকে প্রায় বিশ হাজার কিলোমিটার ওপরে ছুটে চলা একাধিক উপগ্রহ নিজেদের অবস্থান ও অত্যন্ত নির্ভুল সময় ক্রমাগত সম্প্রচার করছে। সেই সংকেত আলোর গতিতে পৃথিবীতে এসে আপনার ফোনে পৌঁছাচ্ছে। ফোন সংকেতের যাত্রাসময় থেকে উপগ্রহগুলোর আপাত দূরত্ব বের করছে, একাধিক দূরত্বের সমীকরণ মিলিয়ে নিজের ত্রিমাত্রিক অবস্থান ও ঘড়ির ত্রুটি নির্ণয় করছে, তারপর বায়ুমণ্ডল, পৃথিবীর ঘূর্ণন, উপগ্রহের কক্ষপথ এবং অন্যান্য ত্রুটির প্রভাব যতটা সম্ভব সংশোধন করছে।

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক সম্ভবত এখানেই—আপনার ফোন আসলে কোনো উপগ্রহকে জিজ্ঞেস করে না আপনি কোথায় আছেন। মহাকাশের উপগ্রহগুলো শুধু জানিয়ে যায় তারা কোথায় আছে এবং তাদের ঘড়িতে ঠিক কত সময়। আপনার হাতে থাকা ক্ষুদ্র গ্রহণযন্ত্র সেই তথ্য শুনে নিজেই হিসাব করে বের করে পৃথিবীর কোথায় আপনি দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েক মিটারের একটি নীল বিন্দুর পেছনে তাই লুকিয়ে রয়েছে মহাকাশ প্রকৌশল, পারমাণবিক সময়পরিমাপ, বেতার যোগাযোগ, ত্রিমাত্রিক জ্যামিতি, পৃথিবীবিজ্ঞান এবং আপেক্ষিকতার পদার্থবিজ্ঞানের এক অসাধারণ সমন্বয়।


You may also like