বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বক্সার প্রোটোকলের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: চীনা জাতীয়তাবাদ, বিদেশবিরোধিতা ও ‘জাতীয় অপমানের’ স্মৃতি

Series: ক্রুসেড: ধর্ম, সাম্রাজ্য ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 19, 2026
বক্সার প্রোটোকলের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: চীনা জাতীয়তাবাদ, বিদেশবিরোধিতা ও ‘জাতীয় অপমানের’ স্মৃতি
বক্সার প্রোটোকলের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকল চীনের ইতিহাসে শুধু একটি অসম চুক্তি বা পরাজয়ের দলিল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নয়; এর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ছিল চীনা জাতীয়তাবাদের ভাষা, বিদেশি শক্তি সম্পর্কে রাজনৈতিক মনোভাব এবং ‘জাতীয় অপমান’-এর ঐতিহাসিক স্মৃতি গঠনে। ৪৫০ মিলিয়ন হাইকওয়ান টেল ক্ষতিপূরণ, বেইজিংয়ে বিদেশি সেনা, লেগেশন কোয়ার্টারের বিশেষ মর্যাদা, দাগু দুর্গ ধ্বংস এবং অস্ত্র আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার মতো শর্তগুলো চীনা জনগণের কাছে একটি মৌলিক সত্যকে দৃশ্যমান করেছিল—রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হলেও তার সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণ ছিল না।

এই উপলব্ধি নতুন ছিল না। প্রথম আফিম যুদ্ধের পর থেকেই চীন একের পর এক অসম চুক্তির মুখোমুখি হচ্ছিল। হংকং হারানো, চুক্তিবন্দর খোলা, বিদেশিদের বহির্দেশীয় বিচারাধিকার, বিভিন্ন অঞ্চলে বিদেশি কনসেশন এবং জাপানের কাছে তাইওয়ান হারানো—সবকিছু মিলিয়ে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে চীনের আন্তর্জাতিক অবস্থান ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

কিন্তু বক্সার প্রোটোকল এই দীর্ঘ অপমানের ইতিহাসকে চীনের রাজধানীর মধ্যেই দৃশ্যমান করে দেয়। বিদেশি সৈন্যরা শুধু উপকূলীয় বন্দর বা দূরের কোনো কনসেশনে অবস্থান করছিল না; তারা বেইজিংয়ের লেগেশন কোয়ার্টারে স্থায়ী প্রহরী রাখছিল। সমুদ্র থেকে রাজধানীর পথে বিদেশি সামরিক পোস্ট ছিল। চীনের নিজস্ব প্রতিরক্ষা দুর্গ ধ্বংস করা হয়েছিল।

এর প্রতীকী শক্তি ছিল অসাধারণ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চিং সম্রাটকে রাজনৈতিক মহাবিশ্বের কেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করা হতো। অথচ এখন সেই সম্রাটের রাজধানীর কাছেই বিদেশি রাষ্ট্রগুলো অস্ত্রধারী সৈন্য নিয়ে বিশেষ সুরক্ষিত অঞ্চল পরিচালনা করছে।

সার্বভৌমত্ব আর বিমূর্ত রাজনৈতিক ধারণা ছিল না; বেইজিংয়ের রাস্তায় তার সীমাবদ্ধতা চোখে দেখা যেত।

বক্সার ক্ষতিপূরণও এই স্মৃতিকে দীর্ঘায়িত করে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও চীনের রাজস্ব থেকে বছরের পর বছর বিদেশি শক্তিগুলোর জন্য অর্থ দিতে হতো। ফলে পরাজয় কোনো একটি অতীত ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যেই তার উপস্থিতি থেকে যায়।

এই অভিজ্ঞতা আধুনিক চীনা জাতীয়তাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণাকে শক্তিশালী করে—রাষ্ট্রকে শুধু আধুনিক হলেই চলবে না, তাকে পূর্ণ সার্বভৌমও হতে হবে।

উনিশ শতকের সংস্কারপন্থীরা অনেক সময় সমস্যার সমাধান হিসেবে পশ্চিমা প্রযুক্তি, শিল্প ও সামরিক সংগঠন গ্রহণের কথা বলেছিলেন। কিন্তু ১৯০১ সালের পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় চীনের অধস্তন অবস্থান না বদলালে বিদেশি শক্তির রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ অব্যাহত থাকবে।

এই উপলব্ধি থেকেই “জাতি” ধারণা নতুন রাজনৈতিক অর্থ পেতে শুরু করে। ঐতিহ্যবাহী সাম্রাজ্যিক আনুগত্যের পরিবর্তে চীনা জাতির সম্মিলিত অস্তিত্ব, ভূখণ্ড এবং সার্বভৌম অধিকার নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়।

বক্সার আন্দোলন নিজেও বিদেশিবিরোধী ছিল, কিন্তু বক্সারদের বিদেশিবিরোধিতা এবং পরবর্তী আধুনিক জাতীয়তাবাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল। বক্সারদের আন্দোলনের মধ্যে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বাস্তব ক্ষোভ থাকলেও একই সঙ্গে মিশনারি, চীনা খ্রিস্টান, রেলপথ এবং পশ্চিমা প্রযুক্তির বিরুদ্ধে কুসংস্কার ও নির্বিচার সহিংসতাও ছিল।

পরবর্তী প্রজন্মের অনেক জাতীয়তাবাদী তাই উপলব্ধি করেন যে শুধু বিদেশিদের ঘৃণা করে বা আধুনিক প্রযুক্তি প্রত্যাখ্যান করে চীনকে শক্তিশালী করা যাবে না। বরং বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে চীনকেই বিজ্ঞান, শিক্ষা, সামরিক সংগঠন ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় শক্তিশালী হতে হবে।

এই বৈপরীত্য আধুনিক চীনা জাতীয়তাবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে—বিদেশি রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরোধিতা, কিন্তু একই সঙ্গে বিদেশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি থেকে শেখার আগ্রহ।

বক্সার বিপর্যয়ের পর চিং সরকারের শিনঝেং সংস্কারও এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। নতুন বিদ্যালয়, বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানো, আধুনিক সেনাবাহিনী এবং সংবাদপত্রের বিস্তার রাজনৈতিক সচেতনতার নতুন পরিবেশ তৈরি করে।

জাপান, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করা চীনা শিক্ষার্থীরা দেশে ফিরে শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান নিয়ে আসেননি; তারা জাতীয়তাবাদ, প্রজাতন্ত্র, সাংবিধানিক সরকার, নাগরিক অধিকার এবং আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা নিয়েও ফিরেছিলেন।

এই নতুন শিক্ষিত প্রজন্মের চোখে চীনের বিদেশি অপমান এবং চিং সরকারের দুর্বলতা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে বিদেশি আধিপত্যের বিরোধিতা ধীরে ধীরে রাজবংশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গেও মিশে যায়।

১৯১১ সালের সিনহাই বিপ্লবের সময় এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয়। বিপ্লবীরা যুক্তি দেয়, যে চিং সরকার একের পর এক অসম চুক্তি মেনে নিয়েছে এবং বিদেশিদের সামনে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেই সরকার আধুনিক চীনের নেতৃত্ব দিতে পারে না।

বক্সার প্রোটোকলের অপমান তাই রাজবংশের বৈধতা ক্ষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়।

চিং রাজবংশ পতনের পরও সমস্যার সমাধান হয়নি। ১৯১২ সালে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও বিদেশি কনসেশন, বহির্দেশীয় বিচারাধিকার এবং বিভিন্ন অসম চুক্তির অনেক বিধান বহাল ছিল। ফলে নতুন প্রজাতান্ত্রিক সরকারও পূর্ণ সার্বভৌম চীন গড়ে তুলতে পারেনি।

এটি জাতীয়তাবাদী হতাশাকে আরও বাড়ায়। রাজবংশ বদলেছে, কিন্তু বিদেশিদের বিশেষাধিকার পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে প্রশ্ন ওঠে—রাজনৈতিক বিপ্লবের পরও যদি বিদেশি রাষ্ট্রগুলো বিশেষ সুবিধা ধরে রাখে, তাহলে জাতীয় স্বাধীনতা কতটা অর্জিত হয়েছে?

এই হতাশা বিশেষভাবে বিস্ফোরিত হয় ১৯১৯ সালের মে চতুর্থ আন্দোলনে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভার্সাই শান্তি বন্দোবস্তে জার্মানির শানতুং-সংক্রান্ত অধিকার চীনের কাছে ফেরত না দিয়ে জাপানের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চীনা শিক্ষার্থী ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

বেইজিংয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করে এবং আন্দোলন দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের ক্ষোভ শুধু ভার্সাইয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছিল না; এটি কয়েক দশকের অসম চুক্তি ও বিদেশি অবমাননার বিরুদ্ধে বৃহত্তর জাতীয় প্রতিবাদের অংশ ছিল।

এখানেই বক্সার প্রোটোকলের স্মৃতি নতুন রাজনৈতিক ভাষা পায়। বক্সাররা বিদেশিদের বিরুদ্ধে সহিংস গণআন্দোলন করেছিল; মে চতুর্থ প্রজন্ম বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিজ্ঞান, শিক্ষা, রাজনৈতিক সংগঠন এবং আধুনিক জাতীয়তাবাদের ভাষায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেয়েছিল।

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশিবিরোধিতা ধীরে ধীরে নির্বিচার বিদেশি-বিদ্বেষ থেকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সার্বভৌমত্বের দাবিতে রূপান্তরিত হয়।

তবে দুই প্রবণতা সবসময় পরিষ্কারভাবে আলাদা ছিল না। বিদেশি শক্তির সঙ্গে সংঘাতের সময় জাতীয়তাবাদ কখনও কখনও পশ্চিমা সংস্কৃতি, ধর্ম বা বিদেশি নাগরিকদের প্রতিও সন্দেহে রূপ নিত। আধুনিক চীনা রাজনীতিতে তাই বিদেশি আধিপত্যের বৈধ সমালোচনা এবং সাধারণ বিদেশি-বিদ্বেষের মধ্যে টানাপোড়েন দীর্ঘদিন ধরে দেখা গেছে।

বক্সার বিদ্রোহের স্মৃতি এই বিতর্কে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বক্সারদের বিদেশি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকারী হিসেবে দেখা সম্ভব; অন্যদিকে তাদের হাতে বহু চীনা খ্রিস্টান ও বিদেশি বেসামরিক মানুষের হত্যাকাণ্ডও ঘটেছিল।

ফলে বক্সারদের স্মৃতি চীনা জাতীয়তাবাদের জন্য একই সঙ্গে আকর্ষণীয় এবং অস্বস্তিকর। তারা বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে রাগের প্রতীক, কিন্তু একই সঙ্গে দেখায় অনিয়ন্ত্রিত বিদেশিবিরোধিতা কীভাবে সহিংসতা ও কৌশলগত বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।

বিশ শতকের প্রথমার্ধে চীনা জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন ধারাই অসম চুক্তি বিলোপকে কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। জাতীয়তাবাদী কুওমিনতাং এবং পরবর্তীকালে চীনা কমিউনিস্ট আন্দোলন—উভয়ই বিদেশি বিশেষাধিকার ও সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের বিরোধিতাকে রাজনৈতিক বৈধতার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহার করে।

তাদের মতাদর্শ ও রাষ্ট্রচিন্তা ভিন্ন হলেও একটি মৌলিক বিষয়ে মিল ছিল—আধুনিক চীনের পুনর্জন্ম অর্থ পূর্ণ জাতীয় সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার।

১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে বিদেশি কনসেশন, শুল্কস্বাধীনতা এবং বহির্দেশীয় বিচারাধিকারের প্রশ্ন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে থাকে। বিভিন্ন সরকার বিদেশি শক্তির সঙ্গে নতুন চুক্তির মাধ্যমে পুরোনো অসম ব্যবস্থার কিছু অংশ পরিবর্তনের চেষ্টা করে।

কিন্তু জাপানি সাম্রাজ্যবাদের উত্থান “জাতীয় অপমান”-এর স্মৃতিকে আরও শক্তিশালী করে। ১৯৩১ সালে মাঞ্চুরিয়া দখল এবং ১৯৩৭ সালে পূর্ণমাত্রার চীন-জাপান যুদ্ধ বিদেশি আগ্রাসনের অভিজ্ঞতাকে নতুন মাত্রা দেয়।

ফলে উনিশ শতকের আফিম যুদ্ধ থেকে বক্সার প্রোটোকল এবং সেখান থেকে জাপানি আগ্রাসন—এই ঘটনাগুলো পরবর্তী জাতীয় স্মৃতিতে এক দীর্ঘ ধারাবাহিক বিদেশি আক্রমণ ও দুর্বলতার যুগ হিসেবে যুক্ত হতে থাকে।

এই ধারাবাহিকতার জন্যই পরে “জাতীয় অপমানের শতাব্দী” বা Century of Humiliation ধারণাটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। সাধারণভাবে উনিশ শতকের আফিম যুদ্ধের যুগ থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিদেশি শক্তির হাতে চীনের পরাজয়, ভূখণ্ড হারানো এবং অসম চুক্তির সময়কে এই ধারণার মধ্যে রাখা হয়।

বক্সার প্রোটোকল এই স্মৃতির কেন্দ্রীয় উদাহরণগুলোর একটি। কারণ এতে অপমানের প্রায় সব উপাদান একসঙ্গে উপস্থিত ছিল—সামরিক পরাজয়, বিদেশি রাজধানী দখল, আর্থিক ক্ষতিপূরণ, বিদেশি সেনা, প্রতিরক্ষা সীমাবদ্ধতা এবং প্রকাশ্য কূটনৈতিক শাস্তি।

এই স্মৃতি শুধু অতীত নিয়ে শোক করার জন্য ব্যবহৃত হয়নি। এর সঙ্গে একটি রাজনৈতিক শিক্ষা যুক্ত হয়েছে—চীন দুর্বল হলে বিদেশি শক্তি তাকে শোষণ করবে; তাই রাষ্ট্রকে শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হতে হবে।

এই ধারণা আধুনিক চীনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অত্যন্ত শক্তিশালী। জাতীয় শক্তি এবং সার্বভৌমত্বকে প্রায়ই ঐতিহাসিক অপমান পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর শর্ত হিসেবে দেখা হয়।

এখানে ইতিহাসের স্মৃতি ও রাষ্ট্রগঠনের সম্পর্ক স্পষ্ট হয়। অতীতের অপমান শুধু বইয়ের অধ্যায় নয়; তা বর্তমান নীতির জন্য যুক্তি তৈরি করতে পারে। শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা—এসব প্রশ্নকে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

তবে ‘জাতীয় অপমান’-এর স্মৃতির ব্যবহারও সবসময় সরল নয়। ইতিহাসকে যদি শুধু “বিদেশিরা চীনকে অপমান করেছে” এই একমাত্র কাঠামোয় দেখা হয়, তাহলে চিং সরকারের দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট, বক্সারদের সহিংসতা এবং চীনা সমাজের নিজস্ব সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যেতে পারে।

বক্সার সংকটের পূর্ণ ইতিহাসে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদ যেমন বাস্তব, তেমনি চিং সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাও বাস্তব।

এই ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বক্সার প্রোটোকল থেকে শেখার শিক্ষা শুধু শক্তিশালী বিদেশিদের সম্পর্কে সতর্ক থাকা নয়। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন, শিক্ষা, সামরিক প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক বৈধতাও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।

বক্সারদের ক্ষেত্রে আরও একটি শিক্ষা ছিল—বিদেশিবিরোধী আবেগ যদি বাস্তব সামরিক ক্ষমতা, কূটনৈতিক হিসাব এবং রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে তা বিপরীত ফল দিতে পারে। বিদেশি প্রভাব দূর করার উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত আরও বড় বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ এবং আরও কঠোর চুক্তি ডেকে এনেছিল।

এই কারণেই পরবর্তী চীনা আধুনিকায়নের অনেক চিন্তাবিদ জাতীয় শক্তি গঠনে বিজ্ঞান, শিক্ষা ও শিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বিদেশিদের বিরুদ্ধে শুধু আবেগ নয়, রাষ্ট্রের বাস্তব ক্ষমতাই হবে সার্বভৌমত্বের ভিত্তি—এই ধারণা ক্রমে শক্তিশালী হয়।

বক্সার ক্ষতিপূরণের একটি অংশ যখন পরে শিক্ষা ও বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর কাজে ব্যবহৃত হয়, তখন ইতিহাসে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা দেয়। জাতীয় অপমানের অর্থই আধুনিক জাতীয় সক্ষমতা তৈরির একটি উপকরণে পরিণত হয়।

ছিংহুয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের বিকাশ এই পরিবর্তনের প্রতীক। যে বক্সার সংকট আধুনিক প্রযুক্তির বিরুদ্ধে সহিংস বিদেশিবিরোধিতার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তার পরবর্তী ক্ষতিপূরণের অর্থের একটি অংশ থেকেই আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়।

অর্থাৎ চীনের প্রতিক্রিয়া শেষ পর্যন্ত শুধু বিদেশিদের প্রত্যাখ্যান করা ছিল না; বরং বিদেশি জ্ঞান গ্রহণ করে চীনকে এমনভাবে শক্তিশালী করা যাতে ভবিষ্যতে তাকে আর অসম চুক্তি মেনে নিতে না হয়।

বক্সার প্রোটোকলের দীর্ঘমেয়াদি উত্তরাধিকার তাই দ্বিমুখী। একদিকে এটি ক্ষোভ, বিদেশি শক্তির প্রতি সন্দেহ এবং জাতীয় অপমানের স্মৃতি তৈরি করেছে। অন্যদিকে এটি আধুনিক শিক্ষা, রাষ্ট্রসংস্কার, জাতীয় ঐক্য এবং সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তাকেও তীব্র করেছে।

এই দুই ধারাই আধুনিক চীনা জাতীয়তাবাদে বারবার ফিরে আসে।

একদিকে স্মৃতি বলে—চীন একসময় দুর্বল ছিল এবং বিদেশি শক্তিগুলো সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছিল। অন্যদিকে শিক্ষা বলে—সেই পরিস্থিতি যাতে আর ফিরে না আসে, তার জন্য রাষ্ট্রকে শক্তিশালী, আধুনিক এবং ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

এই কারণেই ১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকল শুধু চিং সাম্রাজ্যের শেষ দশকের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। চিং রাজবংশ পতনের পরও এর রাজনৈতিক অর্থ বেঁচে থাকে, প্রজাতান্ত্রিক যুগে নতুন ব্যাখ্যা পায় এবং পরবর্তী জাতীয় রাজনৈতিক স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

বেইজিংয়ের বিদেশি সেনা, ৪৫০ মিলিয়ন টেলের ক্ষতিপূরণ, ধ্বংস করা দাগু দুর্গ এবং বিদেশিদের জন্য সুরক্ষিত লেগেশন কোয়ার্টার—এসব দৃশ্য পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্নের প্রতীক হয়ে ওঠে: চীন কীভাবে এমন দুর্বল অবস্থায় পৌঁছেছিল এবং ভবিষ্যতে কীভাবে সেই অপমান পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আধুনিক চীনের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। কেউ সাংবিধানিক সংস্কার, কেউ প্রজাতন্ত্র, কেউ জাতীয়তাবাদী বিপ্লব, আবার কেউ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে শক্তিশালী রাষ্ট্র নির্মাণের চেষ্টা করেছে।

তাদের মধ্যে বিরোধ যত গভীরই হোক, বিদেশি আধিপত্যের যুগের স্মৃতি ছিল একটি শক্তিশালী সাধারণ ঐতিহাসিক পটভূমি।

বক্সার প্রোটোকলের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সম্ভবত এখানেই—এটি একটি পরাজয়কে জাতীয় স্মৃতিতে পরিণত করেছিল। সেই স্মৃতি শুধু বিদেশিবিরোধী ক্ষোভ তৈরি করেনি; বরং পূর্ণ সার্বভৌমত্ব, আধুনিক রাষ্ট্র, বিজ্ঞান, সামরিক শক্তি এবং জাতীয় পুনর্জাগরণের দাবিকেও শক্তিশালী করেছে।

এই কারণে ১৯০১ সালের চুক্তি ইতিহাসে শুধু “চীনের ওপর চাপানো শর্তের তালিকা” নয়। এটি আধুনিক চীনের আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ক্ষত—যার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, জাতীয় শক্তি পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা এবং ‘আর কখনও এমন অপমান নয়’—এই দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা।


You may also like