বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বক্সার ক্ষতিপূরণের অর্থ কোথায় গিয়েছিল? যুক্তরাষ্ট্রের ফেরত দেওয়া অর্থ ও চীনা শিক্ষার্থীদের ইতিহাস

Series: ক্রুসেড: ধর্ম, সাম্রাজ্য ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 19, 2026
বক্সার ক্ষতিপূরণের অর্থ কোথায় গিয়েছিল? যুক্তরাষ্ট্রের ফেরত দেওয়া অর্থ ও চীনা শিক্ষার্থীদের ইতিহাস
বক্সার ক্ষতিপূরণের অর্থ কোথায় গিয়েছিল?

১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকলে চীনের ওপর চাপানো ৪৫০ মিলিয়ন হাইকওয়ান টেল রুপার ক্ষতিপূরণ আধুনিক চীনের ইতিহাসে জাতীয় অপমানের অন্যতম পরিচিত প্রতীক। এর ওপর বার্ষিক ৪ শতাংশ সুদ এবং ৩৯ বছরের পরিশোধসূচি যোগ হওয়ায় কাগজে-কলমে মোট দায় প্রায় ৯৮২ মিলিয়ন টেল পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু এই বিপুল অর্থ আসলে কোথায় যাচ্ছিল? বিদেশি শক্তিগুলো কি পুরো অর্থ শুধু নিজেদের সরকারি কোষাগারে নিয়ে গিয়েছিল? আর কীভাবে এই ক্ষতিপূরণেরই একটি অংশ পরে চীনা শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল?

বক্সার ক্ষতিপূরণের ইতিহাসের এই দ্বিতীয় অধ্যায়টি প্রথমটির চেয়ে অনেক বেশি জটিল। যে অর্থ ১৯০১ সালে চীনের পরাজয়ের শাস্তি হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল, তার একটি অংশ কয়েক বছরের মধ্যেই আধুনিক চীনের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিনিময়ের অর্থে পরিণত হতে শুরু করে। তবে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত দান হিসেবে দেখলেও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়।

ক্ষতিপূরণের ৪৫০ মিলিয়ন টেল কোনো একটি রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়নি। বক্সার সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন বিদেশি সরকার, তাদের সামরিক ব্যয়, নাগরিক, ব্যবসা ও অন্যান্য দাবির ভিত্তিতে অর্থটি বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভাগ করা হয়েছিল। সবচেয়ে বড় অংশ ছিল রাশিয়ার—প্রায় ২৮.৯৭ শতাংশ। জার্মানির অংশ ছিল প্রায় ২০.০২ শতাংশ, ফ্রান্সের ১৫.৭৫ শতাংশ এবং ব্রিটেনের ১১.২৫ শতাংশ। জাপান পায় প্রায় ৭.৭৩ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল প্রায় ৭.৩২ শতাংশ। ইতালিসহ আরও কয়েকটি রাষ্ট্রও তুলনামূলক ছোট অংশ পেয়েছিল।

অর্থাৎ চীনের দেওয়া ক্ষতিপূরণের একটি বড় অংশ ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর দিকে যাচ্ছিল। এসব অর্থের উদ্দেশ্য হিসেবে সামরিক অভিযানের ব্যয়, বিদেশি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি এবং বক্সার সহিংসতার ফলে তৈরি বিভিন্ন দাবি দেখানো হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ছিল ২৪,৪৪০,৭৭৮.৮১ মার্কিন ডলার। পরবর্তী ঘটনাবলি বোঝার জন্য এই সংখ্যাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়, এই সম্পূর্ণ অঙ্ক চীনের কাছ থেকে নেওয়া হবে না।

এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল চীনা কূটনীতিক লিয়াং চেংয়ের। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চীনের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সময় জানতে পারেন যে মার্কিন সরকারের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও দাবির তুলনায় বরাদ্দকৃত ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বেশি হতে পারে। তিনি বিষয়টি নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন হে-সহ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রশ্নটি ধীরে ধীরে কূটনৈতিক আলোচনায় পরিণত হয়। তবে প্রক্রিয়াটি একেবারে সরল ছিল না। পরবর্তী ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি কতটা ন্যায্য ছিল এবং ফেরত দেওয়া অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হবে—এই দুই প্রশ্নেই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল।

শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের প্রশাসন অতিরিক্ত বলে বিবেচিত ক্ষতিপূরণের একটি বড় অংশ মওকুফ করার উদ্যোগ নেয়। ১৯০৮ সালের ২৫ মে মার্কিন কংগ্রেস এ বিষয়ে যৌথ প্রস্তাব অনুমোদন করে। একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মোট দাবি ২৪,৪৪০,৭৭৮.৮১ ডলার থেকে ১৩,৬৫৫,৪৯২.৬৯ ডলারে নামিয়ে আনা হয়। নতুন ব্যবস্থা ১৯০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়।

১৯২৪ সালের মার্কিন সরকারি নথিতে প্রথম পর্যায়ে মওকুফ করা অর্থের পরিমাণ ১১,৯৬১,১২১.৭৬ ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। হিসাবের বিভিন্ন পর্যায়, সুদ ও অর্থপ্রদানের কাঠামোর কারণে ঐতিহাসিক বর্ণনায় সংখ্যার উপস্থাপন কিছুটা ভিন্ন দেখা যায়, কিন্তু মূল বিষয়টি পরিষ্কার—যুক্তরাষ্ট্র তার প্রাপ্য বলে নির্ধারিত অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আর নিজের জন্য গ্রহণ করেনি।

কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্মতা রয়েছে। প্রচলিত ভাষায় একে প্রায়ই “বক্সার ক্ষতিপূরণের অর্থ চীনকে ফেরত দেওয়া” বলা হয়। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ছিল। অর্থ চীনের হাতে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ব্যয় করার জন্য তুলে দেওয়া হয়নি। মওকুফ থেকে সৃষ্ট অর্থ শিক্ষামূলক কাজে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়।

এখান থেকেই শুরু হয় বক্সার ক্ষতিপূরণ এবং চীনা শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার বিখ্যাত সম্পর্ক।

চিং সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, এই অর্থ ব্যবহার করে প্রতিবছর নির্বাচিত চীনা শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হবে। মার্কিন সরকারি ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, চীন বছরে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

এটি শুধু সাধারণ বিদেশে পড়াশোনার প্রকল্প ছিল না। চীনের আধুনিকায়নের জন্য নতুন ধরনের শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণি গড়ে তোলার পরিকল্পনার সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক ছিল। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, কৃষি, শিক্ষা, প্রশাসন এবং অন্যান্য আধুনিক বিষয়ে প্রশিক্ষিত তরুণদের দেশে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্র ও সমাজের আধুনিকায়নে কাজে লাগানোর প্রত্যাশা করা হয়।

যে অর্থ কয়েক বছর আগে বিদেশি সেনাবাহিনীর হাতে চীনের পরাজয়ের প্রতীক ছিল, সেটিই এখন চীনা তরুণদের বিদেশে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শেখানোর অর্থে রূপান্তরিত হচ্ছিল।

শিক্ষার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়াও ছিল অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। প্রার্থীদের পরীক্ষা দিয়ে নির্বাচিত হতে হতো। প্রথম দিকের শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর আগে ভাষা, বিজ্ঞান এবং অন্যান্য বিষয়ে প্রস্তুত করার প্রয়োজন দেখা দেয়।

এই প্রয়োজন থেকেই বেইজিংয়ে একটি বিশেষ প্রস্তুতিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ছিংহুয়া কলেজ, যার প্রাথমিক প্রধান উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য নির্বাচিত চীনা শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা।

প্রতিষ্ঠানটির জন্য ব্যবহৃত হয় একটি সাবেক রাজকীয় উদ্যানের এলাকা। শিক্ষার্থীরা সেখানে ইংরেজি, বিজ্ঞান এবং আমেরিকান উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয় অধ্যয়ন করত। পরবর্তীকালে এই প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে নিজের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম পরিচিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।

এখানে ইতিহাসের অসাধারণ একটি পরিহাস রয়েছে। বক্সার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। সেই আন্দোলনের পরাজয়ের পর বিদেশিরা চীনের ওপর বিপুল ক্ষতিপূরণ চাপায়। আবার সেই ক্ষতিপূরণের একটি অংশই পরে এমন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্মে ভূমিকা রাখে, যা আধুনিক চীনের বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিগত বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।

বক্সার ক্ষতিপূরণ বৃত্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া শিক্ষার্থীরা শুধু ডিগ্রি অর্জন করেননি। তারা এমন এক সময় আমেরিকায় যাচ্ছিলেন, যখন চীন নিজেই দ্রুত রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৯১১ সালে চিং রাজবংশ পতন করে, প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়।

বিদেশে পড়া এই নতুন প্রজন্ম দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, প্রকৌশল, প্রশাসন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করে। বক্সার ক্ষতিপূরণের শিক্ষা কর্মসূচি তাই শুধু ব্যক্তিগত বৃত্তি ছিল না; এটি আধুনিক চীনের মানবসম্পদ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে ওঠে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি নিঃস্বার্থ মানবিক উদ্যোগ হিসেবে দেখাও যথার্থ নয়। রুজভেল্ট প্রশাসনের কাছে শিক্ষা ছিল চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ার একটি কার্যকর মাধ্যম। আমেরিকায় শিক্ষিত চীনা তরুণেরা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা নিয়ে দেশে ফিরবে—এমন প্রত্যাশাও মার্কিন নীতিনির্ধারণে ছিল।

অর্থাৎ এখানে একই সঙ্গে শিক্ষা, কূটনীতি এবং নরম প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি কাজ করছিল। পরবর্তী গবেষণায় আরও দেখানো হয়েছে, চীনা পক্ষ অর্থের কিছু অংশ অবকাঠামো বা অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহারের আগ্রহ দেখালেও মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি অংশ শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে ছিল।

তাই “যুক্তরাষ্ট্র টাকা ফেরত দিল এবং চীন নিজের ইচ্ছামতো তা ব্যবহার করল”—এমন সরল বর্ণনা পুরো ইতিহাস তুলে ধরে না। অর্থ ফেরতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী ছিল, কিন্তু কীভাবে সেই অর্থ ব্যবহৃত হবে, তা নিয়েও মার্কিন প্রভাব ছিল।

বক্সার ক্ষতিপূরণের মার্কিন অধ্যায় এখানেই শেষ হয়নি। প্রথম মওকুফের পরও যুক্তরাষ্ট্রের পাওনা হিসেবে আরও অর্থ থেকে গিয়েছিল। ১৯২৪ সালে মার্কিন কংগ্রেস আবারও পদক্ষেপ নেয়। এবার অবশিষ্ট ৬,১৩৭,৫৫২.৯০ ডলার পর্যন্ত অর্থ মওকুফ করার অনুমোদন দেওয়া হয়, যাতে তা চীনের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে ব্যবহৃত হতে পারে।

১৯২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজের নির্বাহী আদেশে এই দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয়। অর্থ পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে China Foundation for the Promotion of Education and Culture। চীনা ও মার্কিন সদস্যদের সমন্বয়ে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠান শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যবহারের দায়িত্ব পায়।

এর ফলে বক্সার ক্ষতিপূরণের ফেরত দেওয়া মার্কিন অর্থের প্রভাব শুধু বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানো বা ছিংহুয়া কলেজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে তা গবেষণা, বিজ্ঞান, গ্রন্থাগার, বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে।

এই অর্থের প্রশাসন নিয়েও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আসে। ১৯২৯ সালের মার্কিন সরকারি নথিতে দেখা যায়, ছিংহুয়া কলেজ এবং যুক্তরাষ্ট্রে চীনা শিক্ষামিশনের জন্য ব্যবহৃত অর্থের তত্ত্বাবধান চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং পরবর্তী অর্থ China Foundation-এর মাধ্যমে পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ ছিল না যার ক্ষতিপূরণের অংশ পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য রাষ্ট্রের অংশ নিয়েও নতুন ব্যবস্থা তৈরি হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় চীন জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবেশ করার পর তাদের ক্ষতিপূরণের অংশ নিয়ে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের পর রুশ অংশ নিয়েও দীর্ঘ কূটনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি হয়।

কিছু বিদেশি শক্তি পরবর্তী সময়ে নিজেদের ক্ষতিপূরণের অর্থের অংশ চীনে শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বা অন্যান্য উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ব্যবস্থা করে। ফলে ১৯০১ সালে নির্ধারিত ৩৯ বছরের পুরো ক্ষতিপূরণসূচি কোনো পরিবর্তন ছাড়াই শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি।

এটি বোঝা জরুরি, কারণ অনেক সময় বলা হয় চীন ৪৫০ মিলিয়ন টেল মূলধন এবং সুদসহ পুরো প্রায় ৯৮২ মিলিয়ন টেল বিদেশিদের দিয়ে দিয়েছিল। বাস্তবে পরবর্তী আন্তর্জাতিক পরিবর্তন, মওকুফ, স্থগিতকরণ এবং অর্থের পুনর্বিন্যাসের কারণে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল।

কিন্তু এই পরবর্তী পরিবর্তন ১৯০১ সালের মূল চুক্তির কঠোরতাকে বাতিল করে না। চুক্তি স্বাক্ষরের মুহূর্তে চীনকে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণই মেনে নিতে হয়েছিল এবং তার রাজস্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সেই দায়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মওকুফের গুরুত্ব তাই দুটি বিপরীত দিক থেকে দেখা যায়। একদিকে এটি চীনের ওপর চাপানো একটি অতিরিক্ত আর্থিক দাবি কমিয়ে দিয়েছিল এবং সেই অর্থকে শিক্ষায় ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করেছিল। অন্যদিকে শিক্ষা কর্মসূচির কাঠামোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র চীনের ভবিষ্যৎ শিক্ষিত শ্রেণির ওপর সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগও পেয়েছিল।

এই দ্বৈত চরিত্রই বক্সার ক্ষতিপূরণ বৃত্তির ইতিহাসকে এত আকর্ষণীয় করে তোলে।

চীনা শিক্ষার্থীদের জন্য অবশ্য সুযোগটি ছিল বাস্তব এবং অত্যন্ত মূল্যবান। বিশ শতকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিজ্ঞান, প্রকৌশল, কৃষি ও আধুনিক গবেষণায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে পড়াশোনার সুযোগ পাওয়া চীনা তরুণদের জন্য বিশ্বমানের জ্ঞান ও গবেষণার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পথ খুলে দেয়।

পরবর্তী কয়েক দশকে বিদেশে শিক্ষিত চীনা বুদ্ধিজীবী ও বিজ্ঞানীরা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আধুনিক পেশাগত ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই বৃহত্তর বিদেশে-শিক্ষা আন্দোলনের মধ্যে বক্সার ক্ষতিপূরণ বৃত্তি একটি বিশেষ স্থান দখল করে।

ছিংহুয়ার ইতিহাস এই উত্তরাধিকারের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ। একটি বিদেশমুখী প্রস্তুতিমূলক বিদ্যালয় থেকে ধীরে ধীরে এটি পূর্ণাঙ্গ চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্ব এতটাই বেড়ে যায় যে আজ এর সূচনাকে বক্সার ক্ষতিপূরণের ইতিহাস থেকে আলাদা করে দেখা কঠিন।

এখানেই ১৯০১ এবং ১৯১১ সালের মধ্যে এক অসাধারণ ঐতিহাসিক রূপান্তর দেখা যায়। ১৯০১ সালে রুপার হিসাবের খাতায় যে অর্থ ছিল পরাজয়ের জরিমানা, এক দশকের মধ্যে তার একটি অংশ বই, পরীক্ষাগার, বিদেশযাত্রা এবং শিক্ষার্থীদের বৃত্তির অর্থে রূপান্তরিত হয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বক্সার ক্ষতিপূরণ শেষ পর্যন্ত চীনের জন্য “ভালো” হয়ে গিয়েছিল। মূল ক্ষতিপূরণ ছিল সামরিক পরাজয়ের পর চাপিয়ে দেওয়া একটি বিশাল আর্থিক দায়। যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের অংশের একটি অংশ মওকুফ করলেও অন্য দাবিগুলো তখনও ছিল এবং চীন দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনৈতিক চাপ বহন করেছে।

বরং শিক্ষার ইতিহাসটি দেখায়, একটি অপমানজনক আন্তর্জাতিক বন্দোবস্তের মধ্যেও চীনা কূটনীতিক ও সংস্কারকরা কীভাবে কিছু সম্পদকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়নের কাজে ঘুরিয়ে দিতে পেরেছিলেন।

এ ক্ষেত্রে লিয়াং চেংয়ের কূটনৈতিক ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবির অতিরিক্ত অংশ নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং অর্থ ফেরতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে তিনি এমন একটি প্রক্রিয়ার সূচনায় ভূমিকা রাখেন, যার ফল বহু দশক ধরে অনুভূত হয়েছে।

অন্যদিকে রুজভেল্ট প্রশাসনও বুঝেছিল যে সামরিক শক্তি বা ক্ষতিপূরণের তুলনায় শিক্ষা দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারে। আমেরিকায় পড়াশোনা করা চীনা শিক্ষার্থীরা শুধু জ্ঞান নিয়ে ফিরবে না; তারা মার্কিন সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও চিন্তার সঙ্গেও পরিচিত হবে।

ফলে বক্সার ক্ষতিপূরণের অর্থের এই অংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষাকে কূটনৈতিক প্রভাবের একটি নতুন মাধ্যমেও পরিণত করেছিল।

ইতিহাসের বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত এর পরিহাস। বক্সার আন্দোলন বিদেশি মিশনারি, বিদেশি প্রতিষ্ঠান এবং পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে বিস্ফোরিত হয়েছিল। আন্দোলনের পরাজয়ের পর বিদেশিরা চীনের ওপর ক্ষতিপূরণ চাপায়। সেই ক্ষতিপূরণেরই একটি অংশ আবার চীনা তরুণদের পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠায় এবং পশ্চিমা বিজ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে তাদের আরও গভীরভাবে যুক্ত করে।

অর্থাৎ যে আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল বিদেশি প্রভাব প্রতিহত করা, তার পরিণতির একটি অপ্রত্যাশিত ফল হয়ে দাঁড়ায় চীনের আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিনিময়ের বিস্তার।

আর সেই উত্তরাধিকারের সবচেয়ে স্থায়ী প্রতীক ছিংহুয়া। ১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকল, ১৯০৮ সালের মার্কিন মওকুফ, ১৯০৯ সাল থেকে শিক্ষাবৃত্তির বাস্তবায়ন এবং ১৯১১ সালে ছিংহুয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা—ঘটনাগুলো এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক শৃঙ্খলে যুক্ত।

এই কারণে বক্সার ক্ষতিপূরণের অর্থ কোথায় গিয়েছিল—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু “বিদেশি শক্তির কাছে” বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এর বড় অংশ অবশ্যই বিজয়ী ও দাবিদার বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর জন্য নির্ধারিত হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তনে তার কিছু অংশ পরে মওকুফ, পুনর্বিন্যাস বা চীনের ভেতরে শিক্ষা ও সংস্কৃতির কাজে ব্যবহৃত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেরত দেওয়া অংশ এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ। পরাজয়ের ক্ষতিপূরণ হিসেবে নির্ধারিত সেই অর্থের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত চীনা শিক্ষার্থীদের বিদেশে পাঠিয়েছে, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে এবং ছিংহুয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের জন্মে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বক্সার ক্ষতিপূরণের ইতিহাস তাই শুধু রুপা বিদেশে চলে যাওয়ার ইতিহাস নয়। এটি একই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ, কূটনীতি, অর্থনীতি, নরম শক্তি এবং শিক্ষার ইতিহাস। ১৯০১ সালে যে অর্থ ছিল চীনের জাতীয় অপমানের প্রতীক, তারই একটি অংশ পরবর্তী প্রজন্মের হাতে জ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষার সম্পদে রূপান্তরিত হওয়া আধুনিক চীনের ইতিহাসের অন্যতম অসাধারণ বৈপরীত্য।


You may also like