বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আবিষ্কারের যুগের সূচনা: ইউরোপীয়রা কেন নতুন সমুদ্রপথ খুঁজেছিল?

সিরিজ: আবিষ্কারের যুগ: সমুদ্র অভিযান ও নতুন বিশ্বের সন্ধান

আবিষ্কারের যুগের সূচনা: ইউরোপীয়রা কেন নতুন সমুদ্রপথ খুঁজেছিল?
বাণিজ্য, রাজশক্তি ও নৌপ্রযুক্তির মিলনে শুরু হয় ইউরোপের মহাসমুদ্র অভিযাত্রা।

পঞ্চদশ শতাব্দীর গোড়ায় পর্তুগালের কোনো বন্দরে দাঁড়িয়ে আটলান্টিকের দিকে তাকালে সামনে দেখা যেত বিপুল জলরাশি। ইউরোপীয় নাবিকদের কাছে আফ্রিকার দীর্ঘ উপকূলের অনেক অংশ তখনও অপরিচিত। অথচ সেই উপকূল ধরে দক্ষিণে এগোনোর সিদ্ধান্তই পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে বাণিজ্য, যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যের ইতিহাস বদলে দেবে। এই অভিযাত্রার পেছনে নিছক কৌতূহল ছিল না। ছিল মসলার লাভজনক বাজার, সোনার চাহিদা, রাজকীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা।

ইতিহাসে এই পর্বকে সাধারণত “আবিষ্কারের যুগ” বলা হয়। তবে শব্দটির সীমাবদ্ধতা মনে রাখা জরুরি। ইউরোপীয়দের কাছে অপরিচিত ভূখণ্ডে বহু আগে থেকেই মানুষ বসবাস করত, রাষ্ট্র গড়ত এবং বাণিজ্য করত। ভারত মহাসাগরে আরব, ভারতীয়, পূর্ব আফ্রিকান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় নাবিকদের সুপ্রতিষ্ঠিত যোগাযোগ ছিল। ফলে এই যুগের বিশেষত্ব পৃথিবীর প্রথম সমুদ্রযাত্রায় নয়; বিশেষত্ব ছিল ইউরোপীয়দের নতুন দূরপাল্লার নৌসংযোগ গড়া এবং সেই সংযোগকে রাজনৈতিক আধিপত্যে রূপ দেওয়ায়।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল এশিয়ার মূল্যবান পণ্য। ভারতের গোলমরিচ, শ্রীলঙ্কার দারুচিনি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লবঙ্গ ও জায়ফল ইউরোপে দামি বাণিজ্যপণ্য হিসেবে বিক্রি হতো। রান্না, ওষুধ প্রস্তুতি ও সামাজিক মর্যাদা প্রকাশে এগুলোর ব্যবহার ছিল। তবে পচা মাংসের স্বাদ ঢাকতেই ইউরোপীয়রা মসলা কিনত—এমন জনপ্রিয় ব্যাখ্যা বিভ্রান্তিকর। মসলার উচ্চমূল্যের প্রধান কারণ ছিল চাহিদা, দূরবর্তী উৎপাদনকেন্দ্র এবং দীর্ঘ পরিবহনব্যবস্থা।

এশিয়া থেকে ইউরোপে পৌঁছাতে এসব পণ্য একাধিক বাণিজ্যিক অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যেত। ভারত মহাসাগর পেরিয়ে লোহিত সাগর কিংবা পারস্য উপসাগর, তারপর স্থলপথ এবং ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর—এমন বিভিন্ন পথ ব্যবহৃত হতো। ভেনিসের মতো নগররাষ্ট্র এই বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছিল। পরিবহন, শুল্ক, ঝুঁকি ও বিভিন্ন ব্যবসায়ীর লাভ যুক্ত হয়ে দাম বাড়ত। পর্তুগিজ শাসক ও ব্যবসায়ীদের কাছে তাই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে একটি প্রশ্ন: উৎপাদনকেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা গেলে লাভের কতটা নিজেদের হাতে রাখা সম্ভব?

এখানে ১৪৫৩ সালে অটোমানদের কনস্টান্টিনোপল দখলের কথা প্রায়ই আসে। কিন্তু শহরটির পতনের পর এশিয়ার সব বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল—এটি সঠিক নয়। বাণিজ্য চলেছিল, যদিও ক্ষমতার পরিবর্তন ও সংঘাত তার শর্তকে প্রভাবিত করেছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ, পর্তুগিজদের আটলান্টিক উদ্যোগ এর আগেই শুরু হয়। কাজেই সমুদ্র অভিযানের সূচনাকে একটি ঘটনার ফল হিসেবে দেখলে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি আড়াল হয়ে যায়।

মসলার পাশাপাশি ইউরোপীয়দের প্রবল আগ্রহ ছিল সোনায়। পশ্চিম আফ্রিকার সোনা সাহারা অতিক্রম করে উত্তর আফ্রিকার বাজারে পৌঁছাত। ইউরোপীয়রা সেই সম্পদের কথা জানত, কিন্তু উৎপাদনাঞ্চলের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ সীমিত ছিল। আফ্রিকার উপকূল ধরে এগিয়ে সাহারার বাণিজ্যপথের বাইরেও সোনার উৎসে পৌঁছানোর আশা তৈরি হয়। রাজদরবারের ব্যয়, যুদ্ধের অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে মূল্যবান ধাতুর গুরুত্ব এই আগ্রহ আরও বাড়িয়েছিল।

প্রশ্ন হলো, এই উদ্যোগে পর্তুগাল কেন এগিয়ে গেল? আইবেরীয় উপদ্বীপের পশ্চিম প্রান্তে তার অবস্থান ছিল আটলান্টিকমুখী। মাছ ধরা, উপকূলীয় নৌচলাচল এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের অভিজ্ঞতাও ছিল। তুলনামূলক ছোট রাজ্যটির পক্ষে স্থলভাগে শক্তিশালী প্রতিবেশীদের মোকাবিলা করে বিস্তার ঘটানো সহজ ছিল না। সমুদ্র নতুন সুযোগ এনে দেয়। রাজতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতা, অভিজাতদের সামরিক আকাঙ্ক্ষা এবং বণিকদের মুনাফার প্রত্যাশা ধীরে ধীরে একই উদ্যোগে যুক্ত হয়।

১৪১৫ সালে উত্তর আফ্রিকার সেউতা দখল এই অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ঘটনা। পর্তুগিজদের কাছে এটি ছিল মুসলিম শক্তির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এবং বাণিজ্যিক অবস্থান অর্জনের প্রচেষ্টা। কিন্তু একটি বন্দর দখল করলেই অভ্যন্তরের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সেউতা থেকে প্রত্যাশিত সুবিধা সহজে মেলেনি। অন্যদিকে আফ্রিকার সম্পদ ও বাণিজ্য সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ে। উপকূল ধরে আরও দক্ষিণে যাওয়ার উদ্যোগ সেই বৃহত্তর পরিস্থিতির মধ্যে বিকশিত হয়।

পর্তুগালের রাজপুত্র হেনরি দ্য নেভিগেটর এই প্রাথমিক অভিযাত্রার উল্লেখযোগ্য পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর ভূমিকা প্রধানত অভিযান সংগঠন, অর্থায়ন ও রাজনৈতিক সমর্থনে; তিনি নিজে বিখ্যাত দূরসমুদ্র অভিযানের অধিনায়ক ছিলেন না। সাগ্রেসে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সুবিন্যস্ত আধুনিক নৌবিদ্যালয়ের প্রচলিত গল্পও নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে বলা ঠিক নয়। বাস্তবে অগ্রগতি ঘটেছিল নাবিক, জাহাজনির্মাতা, মানচিত্রকার ও অর্থদাতাদের অভিজ্ঞতা একত্র হওয়ার মাধ্যমে।

সমুদ্রযাত্রার লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে ধর্মও জড়িয়ে ছিল। আইবেরিয়ায় খ্রিস্টান ও মুসলিম শক্তির দীর্ঘ সংঘর্ষ পর্তুগিজ শাসকদের রাজনৈতিক কল্পনাকে প্রভাবিত করেছিল। তাঁরা খ্রিস্টধর্ম বিস্তার এবং মুসলিম প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে সহযোগী খোঁজাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। আফ্রিকা বা প্রাচ্যে শক্তিশালী খ্রিস্টান শাসক প্রেস্টার জনের রাজ্য খোঁজার আকাঙ্ক্ষাও ছিল। বাণিজ্যিক লাভ ও ধর্মীয় উদ্দেশ্য প্রায়ই একই অভিযানের যুক্তি হিসেবে পাশাপাশি উপস্থিত হতো।

এসব আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত জাহাজ দরকার ছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীতে ব্যবহৃত ক্যারাভেল তুলনামূলক ছোট, সহজে চালানো যায় এমন জাহাজ হিসেবে উপকূল অনুসন্ধানে কার্যকর হয়। লাতিন পালের বিন্যাস নাবিকদের বাতাসের সঙ্গে কোণ করে চলার সুবিধা দিত। তবে এক ধরনের জাহাজই সব সমস্যার সমাধান করেনি। অভিযানের দূরত্ব, মালবহন ও সমুদ্রের অবস্থার প্রয়োজন অনুযায়ী জাহাজের গঠন এবং পালের ব্যবস্থায় পরিবর্তন চলতে থাকে।

চৌম্বক কম্পাস, উপকূলীয় নৌমানচিত্র এবং আকাশের পর্যবেক্ষণও নৌচলাচল উন্নত করেছিল। এসব জ্ঞানের অনেকটাই ইউরোপীয়দের একক সৃষ্টি ছিল না; ভূমধ্যসাগরীয় যোগাযোগ ও ইসলামি জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রযুক্তি ও ধারণা ছড়িয়েছিল। অক্ষাংশ নির্ণয়ের পদ্ধতি উন্নত হলেও নির্ভুল দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় তখন সম্ভব ছিল না। ফলে অবস্থান অনুমান, সমুদ্রের গভীরতা মাপা এবং অভিজ্ঞ নাবিকের বিচারবোধের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা থাকত।

বড় শিক্ষা এসেছিল বাতাস ও স্রোত বুঝে। আফ্রিকার উপকূল ধরে দক্ষিণে যাওয়ার পর একই পথ ধরে উত্তরে ফেরা সব সময় সহজ ছিল না। নাবিকেরা বুঝতে শেখেন, কখনো তীর ছেড়ে অনেকটা সমুদ্রে গিয়ে সুবিধাজনক বাতাস ধরতে হয়। ‘ভোল্তা দু মার’, অর্থাৎ সমুদ্র ঘুরে ফেরার কৌশল, আটলান্টিক যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মহাসাগরে সবচেয়ে ছোট পথই যে সবচেয়ে কার্যকর পথ নয়, এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের অভিযানকে সম্ভব করে।

মাদেইরা ও আজোরেসের মতো আটলান্টিক দ্বীপে পর্তুগিজ বসতি স্থাপনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দ্বীপগুলো রসদ, কৃষি এবং সামুদ্রিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। মাদেইরায় চিনির উৎপাদন বাণিজ্যিক সুযোগ বাড়ায়। একই সঙ্গে এই বিস্তারের অন্ধকার দিকও স্পষ্ট হয়: আফ্রিকার উপকূলে মানুষের বন্দিত্ব ও দাসবাণিজ্য বাড়তে থাকে। ইউরোপীয় সমুদ্র সম্প্রসারণের ইতিহাসে নতুন যোগাযোগের পাশাপাশি শোষণ ও সহিংসতাও শুরু থেকেই উপস্থিত ছিল।

রাজকীয় অনুমতি ও বাণিজ্যিক সুবিধা দিয়ে অভিযানের ব্যয় সামলানোর ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। প্রতিটি সফল যাত্রা পরবর্তী উদ্যোগের জন্য কিছু তথ্য এবং কখনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য নিয়ে ফিরত। ফলে পুরো আফ্রিকা ঘুরে এশিয়ায় পৌঁছানোর আগেই উপকূলীয় যোগাযোগ থেকে আয় করার সুযোগ ছিল। এই ধাপে ধাপে অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ: অভিযাত্রীরা শুরুতেই মহাদেশটির সঠিক আকৃতি বা যাত্রার সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্য জানতেন না।

পঞ্চদশ শতাব্দীর সমুদ্র অভিযান তাই কোনো একক বীরের হঠাৎ সিদ্ধান্ত ছিল না। বাণিজ্যিক লাভ, সোনার অনুসন্ধান, রাজশক্তির প্রতিযোগিতা, ধর্মীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সঞ্চিত নৌজ্ঞান একত্রে তাকে চালিত করেছিল। সামনে ছিল পানির সংকট, রোগ, ঝড় এবং ঘরে ফেরার অনিশ্চয়তা। তবু পর্তুগিজ জাহাজগুলো আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে এগোতে থাকে। সেই পথে কেপ বোজাদর অতিক্রম করা হয়ে উঠবে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা—পরিচিত সমুদ্রসীমার বাইরে এগিয়ে নিয়মিত যাতায়াত গড়ে তোলা কতটা সম্ভব, তার বাস্তব প্রমাণ।