বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মাথাব্যথার সাধারণ কারণ ও বিপদের লক্ষণ: কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

মাথাব্যথার সাধারণ কারণ ও বিপদের লক্ষণ: কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
মাথাব্যথার ধরন ও সঙ্গে থাকা লক্ষণ বুঝেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিন।

মাথাব্যথা খুব পরিচিত সমস্যা হলেও প্রতিবার একই কারণে হয় না। কারও দুপুরে খাবার বাদ দেওয়ার পর ব্যথা শুরু হয়, কারও দীর্ঘ সময় কাজের পর মাথায় চাপ লাগে, আবার কারও আলো ও শব্দ অসহ্য হয়ে বমিভাব দেখা দেয়। কারণ বুঝতে শুধু কোথায় ব্যথা হচ্ছে দেখলে চলবে না; কীভাবে শুরু হয়েছে, কতক্ষণ থাকছে এবং সঙ্গে কী লক্ষণ রয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক মাথাব্যথা নিজেই একটি স্বতন্ত্র রোগ বা সমস্যা। চাপধরনের মাথাব্যথা ও মাইগ্রেন এর উদাহরণ। অন্যদিকে সংক্রমণ, মাথায় আঘাত বা অন্য অসুস্থতার কারণেও মাথাব্যথা হতে পারে। চিকিৎসকের মূল্যায়নে এই পার্থক্য করা জরুরি।

ব্যথার তীব্রতা একমাত্র মাপকাঠি নয়

মাইগ্রেন খুব তীব্র হলেও সব সময় বিপজ্জনক রোগের ইঙ্গিত দেয় না। আবার তুলনামূলক কম ব্যথার সঙ্গে নতুন দুর্বলতা বা দৃষ্টির সমস্যা থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা দরকার হতে পারে।

বিশেষভাবে খেয়াল করুন ব্যথাটি আপনার পরিচিত ধরন থেকে বদলেছে কি না। আগে মাসে একবার হতো, এখন প্রায় প্রতিদিন হচ্ছে—এমন পরিবর্তন চিকিৎসককে জানানো উচিত। নতুন ধরনের ব্যথাকে পুরোনো সমস্যার নাম দিয়ে উপেক্ষা করবেন না।

দৈনন্দিন অভ্যাস ও চাপধরনের মাথাব্যথা

পর্যাপ্ত তরল না খাওয়া, খাবার বাদ দেওয়া, ঘুমের অনিয়ম, মানসিক চাপ এবং দীর্ঘক্ষণ অস্বস্তিকর ভঙ্গিতে বসে থাকা মাথাব্যথা উসকে দিতে পারে। পর্দার দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে চোখে চাপ পড়া বা দৃষ্টির সমস্যাও অস্বস্তির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

চাপধরনের মাথাব্যথায় সাধারণত মাথার দুই পাশে চাপ বা শক্ত ফিতা বাঁধার মতো অনুভূতি হয়। ঘাড় বা মাথার পেশিতে স্পর্শকাতরতাও থাকতে পারে। ব্যথা সাধারণত মৃদু থেকে মাঝারি হয় এবং স্বাভাবিক হাঁটাচলায় খুব বেশি বাড়ে না।

বাস্তব উদাহরণে কারণ খুঁজুন

সকালের খাবার বাদ দিয়ে কয়েক ঘণ্টা কাজ করার পর ব্যথা হলে খাবার ও পানির অভ্যাস দেখুন। রাত জেগে কাজের পর হলে ঘুমের সময়সূচি গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি ঘটনার ভিত্তিতে কারণ নিশ্চিত করবেন না; একই পরিস্থিতিতে বারবার হচ্ছে কি না লক্ষ করুন।

অতিরিক্ত চা-কফি কারও মাথাব্যথা উসকে দেয়। নিয়মিত বেশি গ্রহণের পর হঠাৎ বন্ধ করলেও ব্যথা হতে পারে। প্রয়োজন হলে ধীরে পরিমাণ কমান।

সর্দি-জ্বরের সময়ও মাথাব্যথা হতে পারে। কিন্তু শুধু কপালে ব্যথা হলেই নাকের আশপাশের গহ্বরের সংক্রমণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সঙ্গে নাকের উপসর্গ, জ্বর ও সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হয়।

মাইগ্রেন ও অন্যান্য স্বতন্ত্র মাথাব্যথা চিনবেন কীভাবে?

মাইগ্রেনে প্রায়ই মাথার এক পাশে ধুকপুক করা ব্যথা হয়, তবে দুই পাশেও হতে পারে। দৈনন্দিন নড়াচড়ায় ব্যথা বাড়তে পারে। বমিভাব, বমি এবং আলো বা শব্দে অতিরিক্ত অস্বস্তি পরিচিত লক্ষণ। একটি আক্রমণ সাধারণত চার ঘণ্টা থেকে তিন দিন পর্যন্ত থাকতে পারে।

ব্যথার আগে দৃষ্টি বা অনুভূতির পরিবর্তন

কিছু মানুষের মাইগ্রেনের আগে চোখে ঝলকানি বা আঁকাবাঁকা রেখা দেখা, ঝিনঝিনি কিংবা অন্য সাময়িক স্নায়বিক উপসর্গ হয়। এই পূর্বলক্ষণ সবার থাকে না।

প্রথমবার এমন উপসর্গ হলে নিজে থেকে মাইগ্রেন ধরে নেবেন না। বিশেষ করে হঠাৎ কথা জড়িয়ে যাওয়া, এক পাশ দুর্বল হওয়া বা দৃষ্টি হারানো জরুরি মূল্যায়নের বিষয়।

এক চোখের আশপাশে তীব্র আক্রমণ

গুচ্ছধরনের মাথাব্যথা তুলনামূলক বিরল। এতে এক চোখের আশপাশে অত্যন্ত তীব্র ব্যথা, একই পাশে চোখ দিয়ে পানি পড়া বা নাক বন্ধ হওয়া এবং অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে বারবার আক্রমণ হয়।

এ ধরনের ব্যথায় সাধারণ ব্যথানাশক যথেষ্ট নাও হতে পারে। সঠিক রোগনির্ণয় ও বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োজন। মাথাব্যথার সব ধরনে একই ওষুধ কার্যকর নয়।

নিরাপদ করণীয় ও ব্যথানাশকের অতিব্যবহার

পরিচিত মৃদু মাথাব্যথায়, বিপদের লক্ষণ না থাকলে, পানি পান, সময়মতো খাবার, কিছুক্ষণ বিশ্রাম এবং পর্দা থেকে বিরতি উপকারী হতে পারে। ঘাড়-কাঁধ আরামদায়ক অবস্থায় রাখুন। মাইগ্রেনে শান্ত, অল্প আলোযুক্ত ঘরে বিশ্রাম কিছু মানুষের উপসর্গ কমায়।

নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখুন। ব্যথা হয়েছে বলে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ঘুমানো কারও ক্ষেত্রে উল্টো সমস্যা বাড়াতে পারে। নিয়মিত চলাফেরা ও মানসিক চাপ সামলানোর অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।

ওষুধ খেয়ে বারবার ব্যথা ফেরার চক্র

ঘন ঘন ব্যথানাশক নিলে ওষুধের অতিব্যবহারজনিত মাথাব্যথা তৈরি হতে পারে। তিন মাস বা বেশি সময় ধরে মাসে অন্তত পনেরো দিন সাধারণ ব্যথানাশক, অথবা নির্দিষ্ট কিছু মাইগ্রেনের ও মিশ্র ব্যথানাশক অন্তত দশ দিন নেওয়া হলে এই সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়।

এখানে দিনে কয়টি বড়ি খেলেন তার পাশাপাশি মাসে কত দিন ওষুধ নিলেন, সেটিও জরুরি। সপ্তাহে দুই দিনের বেশি নিয়মিত ব্যথানাশক দরকার হলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরিকল্পনা করুন।

গর্ভাবস্থা, কিডনি বা যকৃতের রোগ, পাকস্থলীর আলসার কিংবা অন্য ওষুধ গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজে থেকে ওষুধ বেছে নেবেন না। নিয়মিত শক্তিশালী ব্যথানাশক ব্যবহার করলে বন্ধ করার পদ্ধতিও চিকিৎসকের সঙ্গে ঠিক করুন।

কোন লক্ষণে জরুরি চিকিৎসা দরকার?

কিছু পরিস্থিতিতে মাথাব্যথা কমে কি না দেখার জন্য অপেক্ষা করা নিরাপদ নয়। নিচের লক্ষণ থাকলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান:

  • হঠাৎ শুরু হয়ে কয়েক মুহূর্তে অত্যন্ত তীব্র ব্যথা হওয়া।
  • মুখ বা শরীরের এক পাশ দুর্বল হওয়া, কথা জড়ানো বা হাঁটতে অসুবিধা।
  • খিঁচুনি, বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক তন্দ্রা বা চেতনা কমে যাওয়া।
  • তীব্র মাথাব্যথার সঙ্গে জ্বর ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া।
  • হঠাৎ দৃষ্টি হারানো বা তীব্র চোখব্যথার সঙ্গে চোখ লাল হওয়া।
  • মাথায় আঘাতের পর বাড়তে থাকা ব্যথা, বারবার বমি বা তন্দ্রা।

এ অবস্থায় নিজে গাড়ি চালাবেন না। সম্ভব হলে কাউকে সঙ্গে নিন এবং চলমান ওষুধের তথ্য নিয়ে যান।

গর্ভাবস্থা ও প্রসবের পর বিশেষ সতর্কতা

গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের পর নতুন, তীব্র কিংবা স্থায়ী মাথাব্যথা দ্রুত মূল্যায়ন করা দরকার। দৃষ্টির সমস্যা বা অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকলে আরও গুরুত্ব দিন।

ক্যানসার, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা অথবা রক্ত পাতলা করার ওষুধ গ্রহণের সঙ্গে নতুন মাথাব্যথা হলেও চিকিৎসা নিতে দেরি করবেন না। এসব পরিস্থিতিতে অন্য কারণ খুঁজে দেখা জরুরি হতে পারে।

কখন চিকিৎসকের সাক্ষাৎ নেবেন এবং কী তথ্য রাখবেন?

বারবার মাথাব্যথা হলে, স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হলে বা ঘরোয়া ব্যবস্থায় না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ব্যথার সংখ্যা, তীব্রতা বা ধরন বদলালেও মূল্যায়ন দরকার।

কাশি, হাঁচি, ব্যায়াম বা ঝুঁকে পড়ার সঙ্গে নতুন ব্যথা শুরু হলে দ্রুত পরামর্শ নিন। পঞ্চাশ বছরের পর নতুন মাথাব্যথার সঙ্গে চিবানোর সময় চোয়ালে ব্যথা, মাথার ত্বকে স্পর্শকাতরতা বা দৃষ্টির পরিবর্তন থাকলেও জরুরি মূল্যায়ন প্রয়োজন।

শিশুর মাথাব্যথা ঘুম ভাঙিয়ে দিলে, ক্রমে বাড়লে বা বমির সঙ্গে হলে অবহেলা করবেন না।

মাথাব্যথার দিনলিপি রাখুন

তারিখ, স্থায়িত্ব, তীব্রতা, সঙ্গে থাকা লক্ষণ, ঘুম, খাবার এবং ওষুধ নেওয়ার দিন লিখুন। মাসিকের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে সেটিও উল্লেখ করুন। চিকিৎসককে সব ওষুধ ও পূর্ববর্তী রোগের তথ্য জানান।

সব মাথাব্যথায় মস্তিষ্কের ছবি পরীক্ষা দরকার হয় না। ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষার ভিত্তিতে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন। লক্ষ্য হবে ব্যথার কারণ বোঝা, বিপদের লক্ষণ শনাক্ত করা এবং অকারণে বারবার ওষুধ নেওয়ার চক্র এড়ানো।