বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

গর্ভাবস্থায় ফল খাওয়ার নিয়ম: পুষ্টি, নিরাপত্তা ও জরুরি সতর্কতা

গর্ভাবস্থায় ফল খাওয়ার নিয়ম: পুষ্টি, নিরাপত্তা ও জরুরি সতর্কতা
পরিষ্কার ফল, পরিমিত পরিমাণ, বৈচিত্র্যময় পুষ্টি।

গর্ভাবস্থায় ফল নিয়ে পরামর্শের অভাব নেই। কেউ বেশি ফল খেতে বলেন, কেউ আবার নির্দিষ্ট ফল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন। এসব কথার মধ্যে পুষ্টিবিজ্ঞানের তথ্য, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও প্রচলিত বিশ্বাস একসঙ্গে মিশে থাকে। বাস্তবে অধিকাংশ পরিচিত ফল সঠিকভাবে পরিষ্কার করে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যায়। জরুরি হলো ফলের ধরন, পরিমাণ, প্রস্তুতির পরিচ্ছন্নতা এবং মায়ের স্বাস্থ্য বিবেচনা করা।

ফল থেকে আঁশ, পানি, বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়। পেয়ারা, কমলা ও আমলকীতে ভিটামিন সি থাকে, যা উদ্ভিজ্জ খাবারের লৌহ শোষণে সাহায্য করে। কলাসহ বিভিন্ন ফল পটাশিয়াম সরবরাহ করে। ফলের আঁশ পর্যাপ্ত পানি ও চলাফেরার সঙ্গে মিলিয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়তা করতে পারে।

তবে ফল সম্পূর্ণ খাবারের বিকল্প নয়। শুধু ফল খেয়ে ভাত, রুটি, ডাল, ডিম, মাছ বা দুধের প্রয়োজন পূরণ করা যায় না। এতে আমিষ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে। একইভাবে ফল খাওয়া চিকিৎসকের নির্দেশিত ফলিক অ্যাসিড, লৌহ বা অন্য সম্পূরকের বিকল্প নয়।

দামি আমদানি করা ফলই বেশি উপকারী—এমন ধারণাও ঠিক নয়। পরিচ্ছন্ন ও ভালো মানের মৌসুমি পেয়ারা, কলা, কমলা বা অন্যান্য স্থানীয় ফল দিয়েও বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকা তৈরি করা সম্ভব।

কোন ফল কতটা এবং কখন খাবেন?

একটি বিশেষ ফলকে গর্ভাবস্থার জন্য শ্রেষ্ঠ বলা কঠিন। ভিন্ন ফলে ভিন্ন পুষ্টি থাকে। তাই প্রতিদিন একই ফল বেশি খাওয়ার বদলে কয়েক ধরনের ফল ঘুরিয়ে খাওয়া ভালো। তবে নতুন কোনো ফলে আগে অ্যালার্জি হয়ে থাকলে সেটি এড়াতে হবে।

সাধারণ স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে দিনে অন্তত পাঁচ অংশ ফল ও সবজি মিলিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর অর্থ পাঁচ অংশ ফল খেতে হবে নয়। সবজিও এই হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাজা ফলের একটি সাধারণ অংশ প্রায় ৮০ গ্রাম; বাস্তবে ফলের আকার অনুযায়ী পরিমাণ বদলে যায়।

একসঙ্গে অনেকটা না খেয়ে ভাগ করে খান

মাঝারি একটি আপেল বা কমলা, ছোট একটি কলা কিংবা ছোট বাটিতে কাটা ফল একবারের পরিবেশন হতে পারে। বড় বাটিতে আম, আঙুর ও তরমুজ একসঙ্গে নিলে স্বাস্থ্যকর খাবার হলেও মোট শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়। দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প করে খেলে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।

ফল অবশ্যই খালি পেটে খেতে হবে বা খাবারের পরে খেলে পেটে পচে যাবে—এমন নিয়মের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। যাঁর যে সময়ে স্বস্তি হয়, তিনি তখন খেতে পারেন। তবে বমিভাব থাকলে অল্প পরিমাণে খাওয়া সুবিধাজনক হতে পারে।

টক ফল কারও বুকজ্বালা বাড়ালে পরিমাণ কমানো বা অন্য ফল বেছে নেওয়া যায়। সব গর্ভবতী নারীকে টক ফল বাদ দিতে হবে না। আবার কোনো ফল খেয়ে অস্বস্তি হলেই সেটি গর্ভের শিশুর ক্ষতি করছে—এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়।

ফল ধোয়া, কাটা ও সংরক্ষণে কী সতর্কতা দরকার?

গর্ভাবস্থায় ফলের নিরাপত্তার বড় বিষয় হলো জীবাণু। ফলের গায়ে মাটি, দূষিত পানি বা অপরিষ্কার হাত থেকে জীবাণু আসতে পারে। না ধোয়া ফল ও সবজির মাধ্যমে টক্সোপ্লাজমা পরজীবীর সংক্রমণের ঝুঁকিও থাকে, যা গর্ভের শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

ফল প্রস্তুতের আগে হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন। এরপর নিরাপদ প্রবাহমান পানিতে ফল ভালোভাবে ধুয়ে আলতো ঘষুন। দৃঢ় খোসাযুক্ত ফল পরিষ্কার ব্রাশ দিয়ে ঘষা যায়। ফলের ওপর সাবান, বাসন ধোয়ার তরল বা জীবাণুনাশক ব্যবহার করবেন না। শুধু পানিতে ধোয়ার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যায়, যদিও সব জীবাণু সম্পূর্ণ দূর হওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

খোসা ছাড়িয়ে খাওয়ার ফলও কাটার আগে ধোয়া দরকার। তরমুজ বা বাঙ্গির বাইরের অংশ অপরিষ্কার থাকলে ছুরি দিয়ে কাটার সময় জীবাণু ভেতরে চলে যেতে পারে। কাঁচা মাছ বা মাংস কাটার পাটাতন ও ছুরি ভালোভাবে পরিষ্কার না করে ফল কাটবেন না।

কাটা ফল দ্রুত ঠান্ডায় রাখুন

পথের পাশে খোলা রাখা কাটা ফল, অপরিষ্কার ছুরি দিয়ে প্রস্তুত ফল কিংবা অনিরাপদ পানি দিয়ে ধোয়া ফল এড়ানো ভালো। বাড়িতে কাটা ফল ঢাকনাযুক্ত পরিষ্কার পাত্রে রেখে দ্রুত শীতলীকরণ করুন। ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় দীর্ঘক্ষণ ফেলে রাখবেন না, বিশেষ করে বাংলাদেশের গরম আবহাওয়ায়।

পচা বা ছত্রাকযুক্ত নরম ফল খাবেন না। শুধু দুর্গন্ধ নেই বলেই দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকা কাটা ফল নিরাপদ ধরে নেওয়া যায় না। ফল কেনার সময় সতেজতা ও সংরক্ষণের পরিবেশও দেখুন।

গোটা ফল, ফলের রস ও শুকনা ফলের পার্থক্য

গোটা ফল চিবিয়ে খেতে হয় এবং এতে আঁশ থাকে। বিপরীতে রস তৈরি করে ছেঁকে নিলে আঁশের বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। অল্প সময়ে কয়েকটি ফলের সমপরিমাণ রস পান করা সহজ হওয়ায় শর্করা গ্রহণও বেড়ে যেতে পারে। তাই নিয়মিত ফল খাওয়ার জন্য গোটা ফলকে অগ্রাধিকার দেওয়া ভালো।

তাজা রস মানেই জীবাণুমুক্ত নয়

দোকানে সদ্য তৈরি রস নিরাপদ কি না, তা শুধু স্বাদ দেখে বোঝা যায় না। ফল, পানি, বরফ, যন্ত্র বা হাত থেকে দূষণ হতে পারে। গর্ভাবস্থায় ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংসের জন্য যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত নয় এমন ফলের রস এড়ানো উচিত। প্যাকেটজাত রস কিনলে জীবাণু কমানোর তাপপ্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হয়েছে কি না এবং সংরক্ষণের নির্দেশনা দেখুন।

রস পান করলেও সাধারণ নির্দেশনায় দৈনিক মোট ফলের রস ও মিশ্রিত ফলের পানীয় ১৫০ মিলিলিটারের মধ্যে রাখা হয়। এটি খেতেই হবে—এমন নয়; গোটা ফল অধিক উপযোগী। চিনি না মেশালেও রসে ফলের নিজস্ব চিনি থাকে।

খেজুর, কিশমিশ ও অন্য শুকনা ফলে পানি কম থাকায় অল্প পরিমাণে তুলনামূলক বেশি শর্করা ও শক্তি থাকে। তাই বড় মুঠো করে বারবার খাওয়ার বদলে ছোট পরিমাণ নিন। চিনির সিরায় সংরক্ষিত ফল এবং মিষ্টি ফলের পানীয়কে তাজা ফলের সমতুল্য ভাববেন না।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকলে ফল খাবেন কীভাবে?

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলে ফল পুরোপুরি বন্ধ করা সাধারণত প্রয়োজন হয় না। তবে ফলের শর্করা দৈনিক খাবারের হিসাবে রাখতে হয়। কোন ফল কতটা খাওয়া যাবে, তা রক্তের শর্করার ফলাফল, ওষুধ এবং সামগ্রিক খাদ্যপরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে।

একবারে একটি ছোট পরিবেশন নিয়ে দিনের বিভিন্ন সময়ে ভাগ করে খাওয়া সুবিধাজনক হতে পারে। চিনি ছাড়া দই বা উপযুক্ত আমিষসমৃদ্ধ নাশতার সঙ্গে ফল নেওয়া যায়। তবে এতে বেশি ফলের শর্করা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় না; পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ তখনো জরুরি।

আম, কলা বা আঙুর মিষ্টি বলে সবার জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। আবার পেয়ারা বা আপেল তুলনামূলক সুবিধাজনক মনে হলেও যত খুশি খাওয়া যায় না। নিজের রক্তের শর্করার প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী পরিকল্পনা বদলানোই গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসক নির্ধারিত সময়ে শর্করা মেপে ফলাফল দেখান। ফলের রস ও বেশি শুকনা ফল সাধারণত নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তুলতে পারে। শুধু ফল বন্ধ করে চিকিৎসা বা প্রয়োজনীয় ওষুধ এড়ানো উচিত নয়।

পেঁপে, আনারস ও প্রচলিত বিশ্বাস সম্পর্কে কী জানা দরকার?

আনারস খেলে অবধারিতভাবে গর্ভপাত হবে—এমন দাবির নির্ভরযোগ্য মানবভিত্তিক প্রমাণ নেই। স্বাভাবিক খাদ্যপরিমাণে আনারস খাওয়া এবং এর কোনো উপাদানের ঘনীভূত সম্পূরক গ্রহণ এক বিষয় নয়। আনারসে অস্বস্তি বা বুকজ্বালা হলে নিজের সহনশীলতা অনুযায়ী পরিমাণ কমান।

পেঁপের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পাকা ফল ও কাঁচা বা আধাপাকা ফল আলাদা করে দেখা দরকার। কাঁচা পেঁপের আঠা নিয়ে প্রাণী ও পরীক্ষাগারের গবেষণায় জরায়ুর সংকোচনের উদ্বেগ পাওয়া গেছে। তবে সেই ফলাফল সরাসরি মানুষের গর্ভাবস্থায় একইভাবে প্রযোজ্য বলা যায় না। সতর্কতার জন্য কাঁচা বা আধাপাকা পেঁপে এবং পেঁপের আঠা বা ঘনীভূত নির্যাস এড়ানো যুক্তিযুক্ত। সম্পূর্ণ পাকা পেঁপে খেলেই গর্ভপাত হয়—এমন দাবি প্রতিষ্ঠিত নয়।

কোনো ফল শিশুর গায়ের রং নির্ধারণ করে না। ডালিম রক্তশূন্যতার চিকিৎসার বিকল্প নয়, আর বিশেষ ফল খেয়ে প্রসব শুরু করার চেষ্টা করাও উচিত নয়।

ফল খাওয়ার পরে জ্বর, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি বা ডায়রিয়া হলে চিকিৎসা নিন। গর্ভাবস্থায় ফলের উপকার পেতে সবচেয়ে জরুরি হলো বৈচিত্র্য, পরিমিত পরিমাণ, পরিচ্ছন্ন প্রস্তুতি এবং নিজের স্বাস্থ্য অনুযায়ী খাদ্যপরিকল্পনা।