প্লুটো ও রোমান পাতালজগৎ: মৃত্যুর পর আত্মার যাত্রা ও বিচারের বিশ্বাস
সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি
অন্ধকার নদী পেরিয়ে রোমান কল্পনার মৃতলোকের পথে।
নেপচুনের সমুদ্র পেরিয়ে মানুষ বন্দরে ফিরতে পারত, কিন্তু রোমান কল্পনায় আরেকটি জলপথ ছিল, যার ওপার থেকে সাধারণ মানুষ ফিরে আসত না। সেটি মৃতলোকের নদী। জীবনের যাত্রা শেষ হলে আত্মা কোথায় যায়, সেখানে কে শাসন করেন এবং মানুষের কাজের বিচার হয় কি না—এসব প্রশ্ন রোমান সাহিত্য ও ধর্মীয় জীবনে নানা উত্তর পেয়েছিল। সেই জগতের সবচেয়ে পরিচিত শাসক প্লুটো। তবে রোমানদের মৃত্যুর পর জীবন সম্পর্কে একটিমাত্র সর্বজনস্বীকৃত মতবাদ ছিল না; পৌরাণিক কাহিনি, পারিবারিক আচার ও দার্শনিক চিন্তা পাশাপাশি বিদ্যমান ছিল।
প্লুটোর পরিচয় গ্রিক হেডিসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তাঁর নামের উৎস গ্রিক ‘সম্পদ’ ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত, কারণ মাটির নিচে খনিজসম্পদ থাকে এবং উর্বর ভূমি থেকেই মানুষের জীবিকা আসে। রোমান ধর্মে পাতালসম্পদের শাসক ডিস পাতেরের সঙ্গে প্লুটোর সমীকরণ ঘটে। আবার অর্কুস নামেও মৃতলোক ও সংশ্লিষ্ট দৈবক্ষমতার উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব নামের ব্যবহার সব সাহিত্য ও উপাসনায় হুবহু অভিন্ন ছিল না। প্লুটোকে মৃত্যুর কারণ সৃষ্টিকারী একমাত্র দেবতা ভাবার বদলে মৃতদের রাজ্যের শাসক হিসেবে বোঝা বেশি যথাযথ।
প্লুটো আধুনিক জনপ্রিয় কল্পনার শয়তানের মতো অশুভ বিদ্রোহী নন। দেবভ্রাতাদের বিশ্বভাগের কাহিনিতে তাঁর অধিক্ষেত্র পাতাল, যেমন জুপিটারের আকাশ এবং নেপচুনের সমুদ্র। তাঁর রাজ্য অন্ধকার ও ভীতিকর হতে পারে, কিন্তু তা মহাবিশ্বের শৃঙ্খলার অংশ। জীবিত মানুষ সেখানে সহজে প্রবেশ করতে পারে না, মৃতদেরও ইচ্ছামতো বেরিয়ে আসার অনুমতি নেই। এই সীমার কঠোরতা তাঁর কর্তৃত্বের ভিত্তি। রোমান শিল্পে তাঁকে রাজদণ্ডধারী পরিণত শাসক হিসেবে দেখা যায়; প্রতিটি চিত্রে নিষ্ঠুর দৈত্যের অবয়ব থাকে না।
তাঁর পাশে ছিলেন প্রসেরপিনা, গ্রিক পার্সেফোনির সঙ্গে সমীকৃত দেবী। প্লুটোর হাতে তাঁর অপহরণ এবং মা সেরেসের অনুসন্ধানের গল্প মৃতলোককে উর্বরতা ও ঋতুচক্রের সঙ্গে যুক্ত করে। দেবীর পৃথিবী ও পাতালের মধ্যে অবস্থান ভাগ হওয়ার বিভিন্ন সংস্করণ প্রচলিত ছিল। এই কাহিনিতে মৃত্যু সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অন্ধকার নয়; মাটির নিচে হারিয়ে যাওয়া এবং আবার জীবনের প্রকাশের সম্পর্কও রয়েছে। তবে প্রসেরপিনার ফিরে আসাকে সব মৃত মানুষের পুনর্জন্মের নিশ্চয়তা বলে ধরা যাবে না। দেবীর বিশেষ অবস্থান সাধারণ আত্মার ভাগ্যের সমান নয়।
মৃতদের প্রতি রোমান আচারের কেন্দ্রে ছিল সৎকার ও স্মরণ। দাহ এবং সমাধিস্থ করা—উভয় প্রথাই বিভিন্ন সময়ে ও সমাজে ব্যবহৃত হয়েছে। পরিবারের দায়িত্ব ছিল মৃতকে যথাযথ বিদায় দেওয়া এবং তাঁর স্মৃতি ধরে রাখা। সাহিত্যিক কাহিনিতে সৎকারহীন আত্মা প্রায়ই অস্থির অবস্থায় থাকে কিংবা যাত্রার বাধার মুখে পড়ে। মৃতদেহের সৎকার এখানে শুধু স্বাস্থ্য বা সামাজিক নিয়ম নয়; জীবিত ও মৃতের সম্পর্ক সুশৃঙ্খল রাখার ধর্মীয় দায়িত্ব। এই গুরুত্ব বুঝলে পাতালনদীর তীরে অপেক্ষমাণ আত্মাদের দৃশ্যও স্পষ্ট হয়।
নদী পারাপারের সবচেয়ে পরিচিত চরিত্র ক্যারন। তিনি নৌকায় মৃতদের ওপারে নিয়ে যান। কোনো কাহিনিতে আকেরন, কোথাও স্টিক্সসহ বিভিন্ন পাতালনদীর নাম সামনে আসে; সব লেখক একই মানচিত্র অনুসরণ করেন না। নৌভাড়া দেওয়ার জন্য মৃতের সঙ্গে মুদ্রা রাখার প্রথা কিছু অঞ্চলে ও সমাধিতে দেখা যায়। কিন্তু প্রত্যেক রোমান মৃতের মুখে মুদ্রা রাখা হতো—এমন দাবি ভুল। ক্যারনের নৌকা সাহিত্যিক প্রতীক হিসেবে পরিচিত হলেও বাস্তব অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নিয়ম অঞ্চল, সময় এবং পরিবারের রীতিভেদে বদলাত।
নদীর পর মৃতলোকের প্রবেশপথে দাঁড়ায় সারবেরাস, সাধারণত তিনমাথাওয়ালা কুকুর হিসেবে পরিচিত। তাঁর কাজ বিশেষভাবে মৃতদের ফিরে যাওয়া ঠেকানোর সঙ্গে যুক্ত। এই প্রহরী জীবিত ও মৃতের সীমাকে প্রাণীর অবয়বে প্রকাশ করে। রোমান কাব্যে গ্রিক ঐতিহ্য থেকে গৃহীত এই চরিত্র কখনো ভয়ংকর, কখনো বিশেষ কৌশলে শান্ত করা যায়। এনিয়াসের পাতালযাত্রায় সিবিল তাকে ঘুমপাড়ানি উপাদানযুক্ত খাবার দিয়ে নিস্তেজ করেন। ফলে বীরের যাত্রা শুধু সাহসের পরীক্ষা নয়; সঠিক পথপ্রদর্শক ও উপায়ের প্রয়োজনও দেখায়।
মৃতের বিচার নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত পরিচিত রোমান সাহিত্যিক দৃশ্যগুলোর একটি ভার্জিলের এনিয়েডে রয়েছে। সেখানে মিনোস মৃতদের জীবন ও অভিযোগ বিচার করেন। টারটারাসের সঙ্গে রাদামান্থুসের কঠোর বিচার যুক্ত। এই ব্যক্তিত্বগুলো মূলত গ্রিক পৌরাণিক ঐতিহ্য থেকে এসেছে। প্লুটো রাজ্যের শাসক হলেও প্রতিটি আত্মার মামলা তিনি নিজে বসে বিচার করেন—এমন একক বিন্যাস সব কাহিনিতে নেই। মৃতলোকের কর্তৃত্ব বিভিন্ন চরিত্র ও অঞ্চলে ভাগ হয়ে সাহিত্যিক কাঠামো তৈরি করে।
এলিসিয়াম বা সুখময় অঞ্চলে যোগ্য আত্মাদের শান্ত ও আনন্দময় অবস্থান দেখানো হয়। এনিয়েডে সেখানে বীরত্ব, পবিত্রতা এবং মানুষের কল্যাণে অবদান রাখা ব্যক্তিদের উপস্থিতি রয়েছে। অন্যদিকে টারটারাস ভয়াবহ অপরাধীদের শাস্তির স্থান। দেবতাদের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য, বিশ্বাসভঙ্গ এবং গুরুতর অন্যায় সেখানে বিশেষ গুরুত্ব পায়। কিন্তু পাতালজগতকে শুধু ভালো মানুষের স্বর্গ এবং খারাপ মানুষের নরক—এই দুই ভাগে সীমাবদ্ধ করা যায় না। বিভিন্ন কাহিনিতে আরও অঞ্চল, অপেক্ষা ও জীবনাবসানের ধরন অনুযায়ী আলাদা অবস্থান রয়েছে।
এনিয়েডে অকালমৃত শিশু, অন্যায়ভাবে দণ্ডিত ব্যক্তি এবং প্রেমের যন্ত্রণায় জীবন হারানো আত্মাদেরও পৃথক দৃশ্য পাওয়া যায়। দিদোকে এনিয়াস দেখেন শোকের ক্ষেত্রের মধ্যে। তিনি নিজের departure-এর কারণ ব্যাখ্যা করতে চাইলেও দিদো মুখ ফিরিয়ে নেন। এই মুহূর্তে মৃতলোক বিচারব্যবস্থার মানচিত্রের চেয়ে স্মৃতি ও অমীমাংসিত সম্পর্কের জগৎ হয়ে ওঠে। মৃত্যু কাহিনিতে সব ক্ষোভ মুছে দেয় না; জীবনের অসমাপ্ত যন্ত্রণা আত্মাদের সাক্ষাতেও ফিরে আসে। রোমের ভবিষ্যতের পাশে ব্যক্তিগত ক্ষতির এই উপস্থিতি মহাকাব্যকে গভীর করে।
এনিয়াসের পাতালপ্রবেশ ঘটে কুমাইয়ের সিবিলের নির্দেশনায়। তাঁর যাত্রার জন্য সোনালি শাখা সংগ্রহ এবং মৃত সহযাত্রীর সৎকারসহ নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়। জীবিত অবস্থায় পাতালে নামা ব্যতিক্রমী ঘটনা; এনিয়াসের অভিযানকে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর পর যাত্রার হুবহু উদাহরণ বলা যায় না। তিনি পিতা আনকিসেসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। সেখানে ব্যক্তিগত শোক রোমের ভবিষ্যৎ দেখার সুযোগে রূপান্তরিত হয়। পিতার মুখে বংশধরদের পরিচয় শুনে তাঁর দীর্ঘ অভিযাত্রা নতুন অর্থ লাভ করে।
এই পর্বে লেথে নদীর জল পান করে বিস্মৃতি লাভ এবং আবার জন্মের জন্য প্রস্তুত আত্মাদের কথাও আসে। আনকিসেস আত্মার শুদ্ধিকরণ ও নতুন জীবনের ব্যাখ্যা দেন। এখানে পুনর্জন্মসংক্রান্ত দার্শনিক ধারণা মহাকাব্যের পৌরাণিক জগতের মধ্যে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু সব রোমান বিশ্বাস করত যে মৃত্যুর পর আত্মা লেথের জল পান করে পুনর্জন্ম নেবে—এমন বলা যায় না। ভার্জিলের নির্মাণ বিভিন্ন সাহিত্যিক ও দার্শনিক ঐতিহ্যের সমন্বয়। একটি প্রভাবশালী কাব্যের দৃশ্যকে গোটা জনগোষ্ঠীর বাধ্যতামূলক বিশ্বাস বানানো অনুচিত।
পারিবারিক উপাসনায় মৃতদের ম্যানেস নামে সম্মান করার প্রথা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সমাধিলিপিতে তাঁদের উদ্দেশে উৎসর্গের ভাষা দেখা যায়। প্যারেন্তালিয়া উৎসবে পরিবার পূর্বপুরুষদের স্মরণ করত, সমাধিতে নিবেদন রাখত এবং সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখত। আবার লেমুরিয়ায় অশান্ত মৃতআত্মা দূরে রাখার আচার ছিল। ম্যানেস, লেমুরেস এবং অন্যান্য আত্মার পরিচয় সব লেখায় কঠোরভাবে পৃথক নয়। তবু এসব প্রথা দেখায়, রোমানদের মৃতসম্পর্কিত ধর্ম শুধু দূরের পাতালরাজ্যের মানচিত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না; গৃহ ও পরিবারের জীবনেও তা উপস্থিত ছিল।
দার্শনিক মতেও ভিন্নতা ছিল। এপিকুরীয় চিন্তায় দেহের সঙ্গে আত্মার উপাদানও বিচ্ছিন্ন হয়; ফলে মৃত্যুর পরে অনুভূত শাস্তির ভয়কে অযৌক্তিক হিসেবে দেখা হয়। অন্য চিন্তাধারায় আত্মার স্থায়িত্ব বা বিশ্বব্যবস্থায় তার অবস্থান নিয়ে আলাদা আলোচনা ছিল। একই ব্যক্তি প্রচলিত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পালন করেও সাহিত্যিক পাতালকাহিনি আক্ষরিকভাবে গ্রহণ না করতে পারেন। তাই রোমান পরলোকবিশ্বাসকে একটি স্থির ধর্মগ্রন্থের নিয়মে বাঁধা যায় না। প্লুটোর রাজ্য, পূর্বপুরুষের স্মৃতি ও আত্মার দর্শন পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও অভিন্ন ছিল না।
রোমান পাতালজগতের কাহিনি শেষ পর্যন্ত মৃত্যু সম্পর্কে মানুষের কয়েকটি স্থায়ী উদ্বেগ প্রকাশ করে—যথাযথ বিদায়, অন্যায়ের বিচার, প্রিয়জনের সঙ্গে পুনর্মিলন এবং বিস্মৃত হয়ে যাওয়ার ভয়। প্লুটো সেই অদৃশ্য রাজ্যের কর্তৃত্ব দেন; ক্যারন সীমান্ত পার করান; সাহিত্য আত্মাদের বিভিন্ন পরিণতি কল্পনা করে। কিন্তু মৃতদের স্মরণ করার কাজটি থেকে যায় জীবিতদের হাতে। এনিয়াস পাতাল থেকে ফিরে ভবিষ্যতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, আর সাধারণ পরিবার নিবেদন ও স্মৃতির মাধ্যমে সম্পর্ক বজায় রাখে। মৃতলোকের অন্ধকার থেকে গল্প তাই আবার জীবনের দিকে ফিরে আসে—সেই পৃথিবীতে, যেখানে শস্যের জন্ম, ঋতুর পরিবর্তন এবং হারিয়ে যাওয়া কন্যাকে খুঁজতে থাকা এক মায়ের কাহিনি মৃত্যুর সঙ্গে জীবনের নতুন যোগসূত্র তৈরি করে।
বার্লিনের যুদ্ধ ও হিটলারের মৃত্যু: ১৯৪৫ সালে থার্ড রাইখের শেষ দিন
ডি-ডে ও দুই ফ্রন্টের যুদ্ধ: মিত্রশক্তি কীভাবে নাৎসি জার্মানিকে ঘিরে ফেলেছিল?
স্টালিনগ্রাদ থেকে কুর্স্ক: পূর্ব ফ্রন্টে নাৎসি জার্মানির বিপর্যয়ের ইতিহাস
সিআইএ ও কেজিবি: স্নায়ুযুদ্ধের গুপ্তচরবৃত্তি, গোপন অভিযান ও তথ্যযুদ্ধ
ভিয়েতনাম যুদ্ধ: কমিউনিজম ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র কেন দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়েছিল?
কিউবার বিপ্লব থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সংকট: পৃথিবী যখন পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে