বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

থার্মোপাইলির গিরিপথ: লিওনিডাস কেন এখানেই পারস্যকে ঠেকাতে চেয়েছিলেন?

সিরিজ: থার্মোপাইলির যুদ্ধ: পারস্য আক্রমণ ও গ্রিক প্রতিরোধ

থার্মোপাইলির গিরিপথ: লিওনিডাস কেন এখানেই পারস্যকে ঠেকাতে চেয়েছিলেন?
পাহাড় ও সমুদ্রের মাঝখানে পারস্যকে ঠেকানোর গ্রিক প্রস্তুতি।

জার্ক্সিসের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে থার্মোপাইলির পথে এগিয়ে আসছিলেন স্পার্টার রাজা লিওনিডাস ও তাঁর নেতৃত্বাধীন গ্রিক যোদ্ধারা। তাঁদের সামনে প্রশ্ন ছিল, কীভাবে অল্প সৈন্য নিয়ে পারস্যের বিপুল বাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। খোলা সমতলে যুদ্ধ করলে শত্রুর সংখ্যাধিক্য, অশ্বারোহী বাহিনী এবং ঘিরে আক্রমণের সুযোগ গ্রিকদের বিপদে ফেলত। তাই এমন অবস্থান দরকার ছিল, যেখানে একসঙ্গে সীমিতসংখ্যক শত্রুই সামনে আসতে পারবে। থার্মোপাইলি বেছে নেওয়ার কেন্দ্রীয় যুক্তি ছিল ভূগোলকে সামরিক শক্তিতে পরিণত করা। পাহাড় ও সমুদ্রের মাঝখানের সংকীর্ণ পথটি পারস্যের বিশাল বাহিনীকে ছোট যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছিল।

এর আগে গ্রিক মিত্ররা থেসালির টেম্পে উপত্যকায় প্রতিরক্ষা গড়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেই অবস্থানের সমস্যা দ্রুত বোঝা যায়। বিকল্প পথ ধরে পারস্যের বাহিনী প্রতিরক্ষাকারীদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে পারত। উত্তরাঞ্চলের স্থানীয় সহযোগিতাও নিশ্চিত ছিল না। ফলে টেম্পে থেকে সরে এসে আরও দক্ষিণে একটি শক্ত অবস্থান খুঁজতে হয়। থার্মোপাইলি ছিল মধ্য গ্রিসের দিকে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় প্রবেশপথ। সেখানে প্রতিরোধ গড়লে দক্ষিণের নগররাষ্ট্রগুলোকে প্রস্তুতির সময় দেওয়া এবং শত্রুর অগ্রযাত্রা বিলম্বিত করা সম্ভব হতে পারত। এটি ছিল আক্রমণের মুখে পরিকল্পিতভাবে প্রতিরক্ষার স্থান বদলানোর সিদ্ধান্ত।

থার্মোপাইলির অর্থ ‘উষ্ণ দ্বার’; নামটি এসেছে এলাকার উষ্ণ প্রস্রবণ এবং সংকীর্ণ প্রবেশপথ থেকে। তবে আজকের ভূদৃশ্য দেখে প্রাচীন যুদ্ধক্ষেত্র বোঝা কঠিন। নদীর পলি জমা ও উপকূলের পরিবর্তনে সমুদ্র অনেক দূরে সরে গেছে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ সালে মালিয়ান উপসাগরের জল ও জলাভূমি পাহাড়ের অনেক কাছাকাছি ছিল। মাঝখানের চলাচলযোগ্য ভূমিতে একাধিক সংকোচন বা ‘দ্বার’ ছিল। যে অঞ্চল এখন প্রশস্ত সমতল বলে মনে হয়, প্রাচীনকালে সেখানে পাহাড় ও উপকূল মিলিয়ে চলাচলের সুযোগ অনেক সীমিত ছিল। পুরো পথের প্রস্থ সর্বত্র সমান ছিল না; সেটিকে একটানা অতি সরু ফাটল হিসেবে কল্পনা করাও ভুল।

এই ভূগোল গ্রিক ভারী পদাতিকদের যুদ্ধপদ্ধতির উপযোগী ছিল। তাঁদের বলা হতো হপলাইট। বড় গোলাকার ঢাল, বর্শা এবং বিভিন্ন মাত্রার দেহরক্ষা নিয়ে তাঁরা ঘন সারিতে লড়তেন। পাশাপাশি থাকা ঢাল ও সমন্বিত বর্শার সারি সম্মুখভাগে শক্ত বাধা তৈরি করত। এই বিন্যাসকে ফ্যালানক্স বলা হয়। খোলা জায়গায় তার পাশ ও পেছন আক্রান্ত হতে পারত; সংকীর্ণ পথে সেই ঝুঁকি কমত। শত্রুকে সামনে থেকে এগোতে বাধ্য করা গেলে গ্রিকরা নিজেদের সংগঠন ও অস্ত্রের সুবিধা ব্যবহার করতে পারত। তবে এমন প্রতিরক্ষা টিকিয়ে রাখতে সারি অক্ষুণ্ণ রাখা এবং যোদ্ধাদের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা অপরিহার্য ছিল।

পারস্যের বড় বাহিনীর শক্তি ছিল বিভিন্ন ধরনের সৈন্যকে কাজে লাগানোর ক্ষমতা। ধনুর্ধর, পদাতিক ও অশ্বারোহীদের সমন্বয় বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারত। থার্মোপাইলিতে সেই বৈচিত্র্যের সব সুবিধা ব্যবহার করা কঠিন ছিল। অশ্বারোহীরা সহজে পাশ ঘুরে আক্রমণ করতে পারত না; বিপুল পদাতিকও একসঙ্গে প্রতিরক্ষার সামনে পৌঁছাতে পারত না। পিছনের হাজারো সৈন্যের উপস্থিতি সামনের সংঘর্ষে তাৎক্ষণিক সহায়তা দিত না। সংখ্যাধিক্য তখনই সবচেয়ে কার্যকর, যখন যুদ্ধক্ষেত্র সেই সংখ্যা ব্যবহার করার জায়গা দেয়। লিওনিডাসের পরিকল্পনা ছিল সেই জায়গা সীমিত করে দেওয়া, যদিও পারস্যের ধনুর্ধর ও পর্যায়ক্রমিক আক্রমণের বিপদ থেকে যাচ্ছিল।

প্রতিরক্ষার জন্য গ্রিকরা পুরোনো ফোকীয় প্রাচীরও ব্যবহার করে। ফোকিসের অধিবাসীরা আগে থেসালীয় আক্রমণ ঠেকাতে পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে এই বাধা তৈরি করেছিল। লিওনিডাসের বাহিনী সেটি মেরামত করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। প্রাচীরটি কোনো বিশাল দুর্গ ছিল না; এর গুরুত্ব ছিল চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরক্ষার জন্য একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র তৈরি করা। সৈন্যরা পরিস্থিতি অনুযায়ী সামনে এগিয়ে লড়াই করতে এবং আবার অবস্থানের কাছে ফিরতে পারত। পুরোনো স্থানীয় প্রতিরক্ষা এবার বৃহত্তর গ্রিক অভিযানের কাজে লাগছিল। ভূগোলের সঙ্গে মানুষের তৈরি বাধা যুক্ত হয়ে পথটিকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।

এই বাহিনীকে শুধু ‘তিনশ স্পার্টান’ বলে বর্ণনা করলে প্রস্তুতির প্রকৃত চিত্র হারিয়ে যায়। লিওনিডাসের সঙ্গে তিনশ স্পার্টান নাগরিক যোদ্ধা থাকলেও বিভিন্ন নগর ও অঞ্চলের আরও কয়েক হাজার সৈন্য সেখানে এসেছিল। থেসপিয়া, থিবস, করিন্থ, আর্কাডিয়া, ফোকিস ও লোক্রিসের যোদ্ধাদের অংশগ্রহণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মোট সংখ্যা নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা আছে, তবে প্রাথমিক বাহিনী সাধারণত প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার বলে ধরা হয়। থার্মোপাইলির প্রতিরক্ষা ছিল বহু গ্রিক সম্প্রদায়ের যৌথ উদ্যোগ। স্থানীয় সৈন্যরা ভূখণ্ড সম্পর্কে জ্ঞান দিত, অন্য মিত্ররা জনবল যোগাত; স্পার্টানদের সামরিক খ্যাতি এই বৃহত্তর সহযোগিতার একটি অংশ ছিল।

লিওনিডাস ছিলেন স্পার্টার দুই রাজার একজন। তাঁর নেতৃত্ব নির্বাচন স্পার্টার স্থলযুদ্ধের মর্যাদা এবং গ্রিক মিত্রজোটে তার অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু স্পার্টা শুরুতেই পূর্ণ বাহিনী পাঠায়নি। প্রাচীন বিবরণে কার্নেইয়া ধর্মীয় উৎসব এবং একই সময়ের অলিম্পিক উৎসবের প্রসঙ্গ এসেছে। ধর্মীয় বিধি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বৃহৎ সমাবেশের সময়কে প্রভাবিত করেছিল। প্রথম বাহিনীর পরে আরও সৈন্য পাঠানোর প্রত্যাশা ছিল। তাই শুরু থেকেই পুরো অভিযানকে নিশ্চিত মৃত্যুর উদ্দেশ্যে পাঠানো একটি দল হিসেবে দেখা যথাযথ নয়। লিওনিডাস প্রথমে এমন প্রতিরক্ষা গড়ছিলেন, যা ধরে রাখা ও শক্তিশালী করা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছিল।

তিনশ স্পার্টান নির্বাচনের ক্ষেত্রে জীবিত পুত্র থাকা যোদ্ধাদের নেওয়ার কথা হেরোডোটাস উল্লেখ করেছেন। এই বিবরণ ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে পরিবার ও নাগরিক বংশধারা রক্ষার গুরুত্ব বোঝায়। তবে তাঁদের সঙ্গে থাকা সব সহায়ক লোকের সংখ্যা বা ভূমিকা সমান স্পষ্ট নয়। স্পার্টার সামরিক সমাজে নাগরিক যোদ্ধাদের পেছনে নির্ভরশীল শ্রম ও সহায়তার ব্যবস্থাও ছিল। লিওনিডাসের নেতৃত্বাধীন নাগরিক দলকে চিনতে হলে এই বৃহত্তর সমাজের কথাও মনে রাখতে হয়। তাঁদের শৃঙ্খলা গুরুত্বপূর্ণ হলেও যুদ্ধের সাফল্য নির্ভর করছিল মিত্রদের সহযোগিতা, অবস্থানের নিরাপত্তা এবং অন্য যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতির ওপর।

সেই অন্য যুদ্ধক্ষেত্র ছিল আর্টেমিসিয়াম। ইউবোয়া দ্বীপের উত্তর প্রান্তের কাছে গ্রিক নৌবহর অবস্থান নিয়েছিল পারস্যের জাহাজগুলোর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে। থার্মোপাইলির স্থলপ্রতিরক্ষা ও আর্টেমিসিয়ামের নৌপ্রতিরক্ষা একই পরিকল্পনার দুটি পরস্পরনির্ভর অংশ। পারস্যের নৌবহর বাধাহীনভাবে দক্ষিণে পৌঁছালে সৈন্য নামিয়ে স্থলবাহিনীর প্রতিরক্ষাকে বিপন্ন করতে পারত। আবার গিরিপথের পতন হলে নৌবহরের অবস্থান ধরে রাখাও কঠিন হতো। সমুদ্রপথ খোলা রেখে শুধু স্থলপথ বন্ধ করলে প্রতিরক্ষা নিরাপদ থাকত না। তাই গ্রিক পরিকল্পনা বোঝার জন্য দুই অবস্থানকে একসঙ্গে দেখা জরুরি।

থার্মোপাইলি ধরে রাখা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রতিরক্ষা যদি সরাসরি পেলোপনেসের প্রবেশমুখে গুটিয়ে নেওয়া হতো, এথেন্সসহ আরও উত্তরের মিত্ররা অরক্ষিত হয়ে পড়ত। এতে জোটের আস্থা ভাঙার আশঙ্কা ছিল। থার্মোপাইলিতে অবস্থান নেওয়া বোঝাচ্ছিল যে সহযোগিতা কেবল স্পার্টার নিজস্ব অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য নয়। তবু মিত্রদের মধ্যে মতভেদ ছিল; বিপদের মুখে কোথায় সরে যাওয়া উচিত, তা নিয়ে সবাই একমত ছিল না। লিওনিডাসকে সামরিক অবস্থান রক্ষার পাশাপাশি ভিন্ন স্বার্থের যোদ্ধাদের একত্র রাখতেও হচ্ছিল। একটি শক্ত গিরিপথ রাজনৈতিক ঐক্যের অভাব পুরোপুরি দূর করতে পারত না।

সবচেয়ে গুরুতর দুর্বলতা ছিল পাহাড়ের ওপর দিয়ে যাওয়া আনোপাইয়া পথ। সেটি ব্যবহার করলে শত্রু মূল প্রতিরক্ষার পেছনে পৌঁছাতে পারত। লিওনিডাস এই বিকল্প পথের কথা জানতেন এবং প্রায় এক হাজার ফোকীয় সৈন্যকে পাহারায় রাখেন। অর্থাৎ ঝুঁকিটি উপেক্ষা করা হয়নি; নিরাপত্তার পরিকল্পনায় সেটিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রাকৃতিক বাধা কোনো অবস্থানকে সম্পূর্ণ অভেদ্য করে তোলে না। সরু গিরিপথের সুবিধা বজায় রাখতে ওপরের পথও বন্ধ রাখা দরকার ছিল। পাহাড়ে প্রহরা, নিচে মেরামত করা প্রাচীর এবং সামনে ঢাল-বর্শার সারি নিয়ে গ্রিকরা অপেক্ষা করছিল। দূরে জার্ক্সিসের বাহিনী এসে দাঁড়ালে পরিকল্পনার বাস্তব পরীক্ষা শুরু হওয়ার মুহূর্ত ঘনিয়ে এল।


আপনার পছন্দ হতে পারে