বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অ্যাডলফ হিটলার ও নাৎসি পার্টির উত্থান: বিয়ার হল পুটশ থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে

সিরিজ: নাৎসি জার্মানির উত্থান ও পতন

অ্যাডলফ হিটলার ও নাৎসি পার্টির উত্থান: বিয়ার হল পুটশ থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে
ব্যর্থ অভ্যুত্থান থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে

১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অ্যাডলফ হিটলার যখন মিউনিখে জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টির একটি সভায় উপস্থিত হন, তখন দলটি ছিল অতি ক্ষুদ্র, অপরিচিত এবং রাজনৈতিকভাবে প্রায় গুরুত্বহীন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান সেনাবাহিনীর একটি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ইউনিটের হয়ে হিটলার সভাটি দেখতে গিয়েছিলেন। সেখানে এক বক্তার বক্তব্যের প্রতিবাদে তিনি যে তীব্র বক্তৃতা দেন, তা দলের প্রতিষ্ঠাতা আন্তন ড্রেক্সলারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অল্পদিনের মধ্যেই হিটলার দলটিতে যোগ দেন। পরবর্তী চৌদ্দ বছরে এই ছোট সংগঠনটিই তার নেতৃত্বে জার্মানির বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। এই উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; যুদ্ধোত্তর ক্ষোভ, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, গণতান্ত্রিক দুর্বলতা, সুপরিকল্পিত প্রচার এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত এর পথ তৈরি করেছিল।

যুদ্ধশেষে জার্মানি ছিল ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তায় বিভক্ত। সাম্রাজ্যের পতন, ভার্সাই চুক্তির কঠোর শর্ত, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, কমিউনিস্ট বিপ্লবের ভয় এবং যুদ্ধফেরত সৈনিকদের হতাশা চরম জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোর বিকাশে সহায়তা করে। হিটলার এই পরিবেশে নিজের বক্তৃতার ক্ষমতাকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেন। তিনি জার্মানির পরাজয়ের জন্য গণতান্ত্রিক রাজনীতিবিদ, মার্ক্সবাদী ও ইহুদিদের অন্যায়ভাবে দায়ী করতেন এবং একটি শক্তিশালী, জাতিগতভাবে তথাকথিত “বিশুদ্ধ” জার্মান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন। তার বক্তব্য বাস্তব সমস্যার যুক্তিসংগত বিশ্লেষণ ছিল না; বরং ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, জাতিগত বিদ্বেষ ও জাতীয় অপমানের অনুভূতির বিপজ্জনক সমন্বয় ছিল।

১৯২০ সালে দলটির নাম পরিবর্তন করে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি রাখা হয়, যা সংক্ষেপে নাৎসি পার্টি নামে পরিচিত হয়। একই বছর দলটি ২৫ দফা কর্মসূচি প্রকাশ করে। এতে ভার্সাই চুক্তি বাতিল, সব জার্মানভাষী জনগোষ্ঠীকে এক রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত এবং শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবির সঙ্গে প্রকাশ্য ইহুদিবিদ্বেষ যুক্ত ছিল। “সমাজতান্ত্রিক” শব্দটি নামের মধ্যে থাকলেও দলটি শ্রেণিভিত্তিক আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রের বিরোধী ছিল। নাৎসিরা জাতিগতভাবে সংজ্ঞায়িত একটি তথাকথিত জাতীয় সম্প্রদায়ের কথা বলত, যেখানে তাদের দৃষ্টিতে অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষদের কোনো স্থান ছিল না।

হিটলার খুব দ্রুত দলের প্রধান বক্তা ও প্রচারের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন। ১৯২১ সালে তিনি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং নিজের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেন। একই সময়ে গড়ে ওঠে দলের আধা-সামরিক বাহিনী এসএ, যাদের বাদামি শার্টের কারণে সহজে শনাক্ত করা যেত। এসএ সদস্যরা নাৎসি সভা পাহারা দিত, প্রতিপক্ষের সভা ভেঙে দিত এবং রাস্তায় কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক কর্মীদের সঙ্গে সহিংস সংঘর্ষে জড়াত। নাৎসি রাজনীতির শুরু থেকেই বক্তৃতা, প্রদর্শন, ভয় দেখানো এবং সংগঠিত সহিংসতা পাশাপাশি চলেছিল।

১৯২৩ সালে জার্মানির পরিস্থিতি আবার বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে ওঠে। ফ্রান্স ও বেলজিয়াম রুর শিল্পাঞ্চল দখল করার পর সরকারের শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধনীতি এবং অনিয়ন্ত্রিত মুদ্রা ছাপানোর ফলে অতিমুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছায়। মানুষের সঞ্চয় মূল্যহীন হয়ে পড়ে, খাদ্যের দাম ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরিবর্তিত হয় এবং ভাইমার সরকারের প্রতি আস্থা ভেঙে যায়। ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনির ক্ষমতা দখলের সাফল্য দেখে হিটলার ধারণা করেন, বাভারিয়া থেকে শুরু করে বার্লিনের সরকার উৎখাত করার সময় এসে গেছে।

১৯২৩ সালের ৮ নভেম্বর হিটলার ও সশস্ত্র এসএ সদস্যরা মিউনিখের বিয়ারব্রয়কেলার নামের একটি বিয়ার হলে প্রবেশ করেন। সেখানে বাভারিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তারা একটি রাজনৈতিক সভায় উপস্থিত ছিলেন। হিটলার গুলি ছুড়ে সভা বন্ধ করেন এবং ঘোষণা করেন যে জাতীয় বিপ্লব শুরু হয়েছে। সাবেক সেনাপ্রধান এরিখ লুডেনডর্ফের মর্যাদা ব্যবহার করে তিনি বাভারিয়ার নেতাদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু রাতের মধ্যেই কর্মকর্তারা নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করেন এবং পুলিশ অভ্যুত্থান দমনের প্রস্তুতি নেয়।

পরদিন হিটলার, লুডেনডর্ফ এবং তাদের অনুসারীরা মিউনিখের কেন্দ্রের দিকে মিছিল শুরু করেন। পুলিশ তাদের পথ রোধ করলে গুলিবিনিময় হয়। চার পুলিশ সদস্য ও ষোলোজন নাৎসি সমর্থক নিহত হন। হিটলার ঘটনাস্থল থেকে পালালেও পরে গ্রেপ্তার হন। ইতিহাসে ঘটনাটি বিয়ার হল পুটশ নামে পরিচিত। সামরিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের নিশ্চিত সমর্থন ছাড়া পরিচালিত এই অভ্যুত্থান ছিল দুর্বল পরিকল্পনা, বিভ্রান্তি ও অবাস্তব আত্মবিশ্বাসের ফল। তাৎক্ষণিকভাবে এটি সম্পূর্ণ ব্যর্থতা হলেও হিটলার শিগগিরই সেই ব্যর্থতাকে রাজনৈতিক প্রচারে রূপান্তর করেন।

১৯২৪ সালের রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় হিটলার বিচারকক্ষকে নিজের বক্তব্য প্রচারের মঞ্চ বানান। সহানুভূতিশীল রক্ষণশীল বিচারকদের সামনে তিনি নিজেকে অপরাধীর বদলে দেশপ্রেমিক হিসেবে উপস্থাপন করেন। পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও তিনি প্রায় নয় মাস পর মুক্তি পান। ল্যান্ডসবার্গ কারাগারে থাকার সময় তিনি রুডলফ হেসের সহায়তায় মাইন কাম্ফ রচনা করেন। বইটিতে তার চরম জাতীয়তাবাদ, ইহুদিবিদ্বেষ, গণতন্ত্রবিরোধিতা, কমিউনিজমবিরোধিতা এবং পূর্ব ইউরোপে জার্মানির জন্য “জীবনধারণের স্থান” দখলের ধারণা প্রকাশ পায়। পরবর্তী হত্যাযজ্ঞ ও সম্প্রসারণবাদী যুদ্ধের বহু মতাদর্শিক সংকেত সেখানে স্পষ্ট ছিল।

ব্যর্থ পুটশ থেকে হিটলার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করেন—ক্ষমতা দখলের জন্য কেবল রাস্তায় সশস্ত্র বিদ্রোহ যথেষ্ট নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে হলে প্রথমে সেই ব্যবস্থার নির্বাচন, আইন ও প্রতিষ্ঠানকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে হবে। কারাগার থেকে মুক্তির পর তিনি নিষিদ্ধ নাৎসি পার্টিকে পুনর্গঠন করেন। জার্মানিকে আঞ্চলিক সাংগঠনিক এলাকায় ভাগ করা হয়, স্থানীয় নেতা নিয়োগ করা হয় এবং সদস্য সংগ্রহ, অর্থায়ন ও প্রচারব্যবস্থাকে কেন্দ্রীভূত করা হয়। হিটলারের ব্যক্তিকে ঘিরে আনুগত্যের সংস্কৃতিও পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়।

দলের ভেতরে গ্রেগর স্ট্রাসারের মতো নেতারা শ্রমিকমুখী অর্থনৈতিক বক্তব্যকে গুরুত্ব দিতে চাইলেও হিটলার দলের বর্ণবাদী জাতীয়তাবাদ ও নিজের একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৬ সালের বামবার্গ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ন্ত্রণে আনেন। এসএর পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে এসএস গড়ে ওঠে, যা পরে হাইনরিখ হিমলারের নেতৃত্বে ভয়াবহ দমন ও গণহত্যার প্রধান প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তরুণ, নারী, শ্রমিক, শিক্ষক ও পেশাজীবীদের জন্য পৃথক সংগঠন সৃষ্টি করে নাৎসিরা সমাজের বিভিন্ন স্তরে নিজেদের উপস্থিতি বিস্তৃত করে।

তা সত্ত্বেও ১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি নাৎসিদের নির্বাচনী সাফল্য সীমিত ছিল। অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়া, বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নতির কারণে উগ্র রাজনীতির আকর্ষণ কমে যায়। ১৯২৮ সালের রাইখস্টাগ নির্বাচনে নাৎসি পার্টি মাত্র ২.৬ শতাংশ ভোট এবং ১২টি আসন পায়। এ ফলাফল দেখায় যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পরিবেশে হিটলারের উগ্র বার্তা অধিকাংশ জার্মানকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। নাৎসি উত্থানের নির্ধারক সুযোগ আসে ১৯২৯ সালের মহামন্দার পর

মার্কিন ঋণ প্রত্যাহার, ব্যাংকসংকট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং ব্যাপক বেকারত্ব জার্মান সমাজকে আবার বিপর্যস্ত করে। জোট সরকারগুলো বেকারত্ব, সামাজিক ব্যয় ও বাজেট নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সংসদীয় শাসনের বদলে রাষ্ট্রপতি পল ফন হিন্ডেনবুর্গের জরুরি আদেশের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। নাৎসিরা এই অচলাবস্থাকে গণতন্ত্রের ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে। তারা একই সঙ্গে বেকারদের কাজ, কৃষকদের ন্যায্য মূল্য, ব্যবসায়ীদের কমিউনিজম থেকে সুরক্ষা এবং জাতীয়তাবাদীদের ভার্সাই চুক্তি বাতিলের প্রতিশ্রুতি দেয়। ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট এই বার্তার কারণে ভিন্ন স্বার্থের মানুষ নিজেদের প্রত্যাশা নাৎসি প্রতিশ্রুতির মধ্যে দেখতে পেত।

জোসেফ গোয়েবলসের নেতৃত্বে প্রচারব্যবস্থা হিটলারকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকা জাতীয় উদ্ধারকর্তা হিসেবে নির্মাণ করে। পোস্টার, চলচ্চিত্র, সংবাদপত্র, বিশাল সমাবেশ, শোভাযাত্রা এবং বিমানযোগে দেশজুড়ে প্রচারণার মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এসএ রাস্তায় প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে থাকে। নাৎসিরা মানুষের ক্রোধের কারণ হিসেবে ইহুদি, কমিউনিস্ট ও ভাইমার রাজনীতিবিদদের মিথ্যাভাবে চিহ্নিত করে। তাদের সাফল্য শুধু হিটলারের বক্তৃতার ফল ছিল না; একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠন, শক্তিশালী প্রচারযন্ত্র এবং সহিংস আধা-সামরিক উপস্থিতি এর পেছনে কাজ করেছিল।

১৯৩০ সালের নির্বাচনে নাৎসিরা ১৮.৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ১০৭টি আসন লাভ করে। ১৯৩২ সালের জুলাইয়ে তারা ৩৭.৩ শতাংশ ভোট ও ২৩০টি আসন নিয়ে রাইখস্টাগের বৃহত্তম দল হয়, যদিও কখনোই স্বাধীনভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। নভেম্বরের নির্বাচনে তাদের ভোট ও আসন কমে গেলেও রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটেনি। হিটলারকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে—এই ভুল বিশ্বাসে সাবেক চ্যান্সেলর ফ্রানৎস ফন পাপেনসহ কয়েকজন রক্ষণশীল অভিজাত হিন্ডেনবুর্গকে তাকে সরকারপ্রধান করতে রাজি করান। ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন।

হিটলারের ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানো তাই সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের সরল ফল ছিল না। মহামন্দা নাৎসিদের গণসমর্থন বাড়িয়েছিল, রাজনৈতিক সহিংসতা বিরোধীদের দুর্বল করেছিল, প্রচার হিটলারের একটি কৃত্রিম ভাবমূর্তি তৈরি করেছিল এবং রক্ষণশীল অভিজাতদের ষড়যন্ত্র তাকে চ্যান্সেলরের পদে বসিয়েছিল। বিয়ার হল পুটশের ব্যর্থ বিদ্রোহী হিটলার শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের পথ ধরেই রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রবেশ করেন—কিন্তু সেই ক্ষমতা ব্যবহার করেন গণতন্ত্রকেই ধ্বংস করার জন্য। জার্মানির এই ইতিহাস দেখায়, গভীর সংকটের সময় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে এবং রাজনৈতিক নেতারা উগ্রবাদকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইলে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কত দ্রুত স্বৈরতন্ত্রের দিকে চলে যেতে পারে।


আপনার পছন্দ হতে পারে