বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বিড়াল কেন গরগর শব্দ করে? গরগর ধ্বনির পেছনের বিজ্ঞান, অনুভূতি ও রহস্য

বিড়াল কেন গরগর শব্দ করে? গরগর ধ্বনির পেছনের বিজ্ঞান, অনুভূতি ও রহস্য
বিড়ালের গরগর ধ্বনি শুধু আনন্দের প্রকাশ নয়

বিড়ালকে আদর করার সময় তার বুক বা গলার কাছ থেকে আসা মৃদু, একটানা গরগর শব্দ আমাদের কাছে খুব পরিচিত। অনেকেই ধরে নেন, বিড়াল গরগর করছে মানেই সে আনন্দে আছে। কথাটি অনেক ক্ষেত্রে সত্য হলেও পুরো সত্য নয়। কারণ বিড়াল শুধু আরাম, নিরাপত্তা বা আদর পাওয়ার সময়ই গরগর করে না। কোনো কোনো বিড়াল ভয় পেলে, তীব্র মানসিক চাপে থাকলে, অসুস্থ হলে, আঘাত পেলে, এমনকি প্রসবের সময়ও গরগর করতে পারে। ছোট বিড়ালছানা আবার জন্মের অল্প সময়ের মধ্যেই এই ধরনের কম্পন তৈরি করতে শুরু করে। ফলে গরগর ধ্বনিকে শুধু সুখের প্রকাশ হিসেবে দেখলে বিড়ালের এই অসাধারণ আচরণের বড় একটি অংশই অজানা থেকে যায়।

সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন হলো, বিড়াল আসলে এই শব্দ তৈরি করে কীভাবে। দীর্ঘদিন ধরে এর সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক ছিল। একসময় ধারণা করা হতো, বিড়ালের গলার বিশেষ কোনো অঙ্গ থেকে গরগর শব্দ তৈরি হয়। আবার কেউ মনে করতেন, রক্তপ্রবাহের বিশেষ ধরনের কম্পন কিংবা বুকের ভেতরের কোনো শারীরিক প্রক্রিয়া এর উৎস। আধুনিক গবেষণা বিড়ালের স্বরযন্ত্র এবং তার আশপাশের কাঠামোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে স্বরভাঁজের কম্পন এবং স্বরযন্ত্রের ভেতরের বিশেষ কলার বৈশিষ্ট্য গরগর ধ্বনি তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

বিড়ালের স্বরযন্ত্র গলার ভেতরে অবস্থিত। মানুষের মতো বিড়ালেরও স্বরভাঁজ রয়েছে। বাতাস এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বরভাঁজ কম্পিত হয়ে শব্দ তৈরি করতে পারে। গরগর করার ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যাপার হলো, বিড়াল সাধারণত শ্বাস নেওয়া এবং শ্বাস ছাড়া—দুই পর্যায়েই কম্পন ধরে রাখতে পারে। তাই শব্দটি মিউ মিউ ডাকের মতো বিচ্ছিন্ন না হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় একটানা শোনা যায়। আপনি খুব মনোযোগ দিয়ে গরগর করা বিড়ালের শব্দ শুনলে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার সঙ্গে এর ছন্দে সামান্য পরিবর্তনও বুঝতে পারেন।

এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বিড়ালের আবেগ, শারীরিক অবস্থা এবং পরিবেশ থেকে পাওয়া সংকেত তার স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে। আরামদায়ক স্পর্শ, পরিচিত মানুষের উপস্থিতি, মা ও ছানার পারস্পরিক যোগাযোগ কিংবা বিপরীতভাবে ব্যথা ও মানসিক চাপ—এসব অবস্থায় স্নায়ুতন্ত্র এমন শারীরিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে যার সঙ্গে গরগর ধ্বনি যুক্ত হয়। তবে একে কোনো একটি সহজ ‘গরগর কেন্দ্র’ চালু হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। আচরণ, শ্বাসপ্রশ্বাস, স্বরযন্ত্র এবং স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণের সম্মিলিত সম্পর্ক এখানে কাজ করে।

আরও আকর্ষণীয় বিষয় হলো, সাম্প্রতিক শারীরবৃত্তীয় গবেষণা ইঙ্গিত দিয়েছে যে বিড়ালের স্বরভাঁজের মধ্যে বিশেষ ধরনের তন্তুময় ও চর্বিযুক্ত কলা থাকতে পারে, যা তুলনামূলক কম কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করা সহজ করে। অর্থাৎ গরগর করার প্রতিটি কম্পন যে সম্পূর্ণভাবে পেশির দ্রুত সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমেই তৈরি হতে হবে, এমন পুরোনো ধারণা এখন আর একমাত্র ব্যাখ্যা নয়। স্বরযন্ত্রের নিজস্ব যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যও এই রহস্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। ফলে বিড়ালের গরগর ধ্বনি নিয়ে বিজ্ঞান এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেনি।

সাধারণ গৃহপালিত বিড়ালের গরগর ধ্বনিতে বেশ নিচু কম্পাঙ্কের কম্পন থাকে এবং প্রায়ই এর শক্তিশালী অংশ কয়েক দশ হার্টজের সীমায় দেখা যায়। মানুষের কানে এটি তীক্ষ্ণ আওয়াজ হিসেবে নয়, বরং গভীর ও মৃদু গুঞ্জনের মতো শোনায়। হাত দিয়ে গরগর করা বিড়ালের গলা, বুক বা শরীর স্পর্শ করলে শব্দের পাশাপাশি কম্পনও অনুভব করা যায়। অর্থাৎ এটি শুধু শ্রবণযোগ্য সংকেত নয়; স্পর্শের মাধ্যমেও অনুভব করা যায় এমন যোগাযোগের একটি রূপ।

বিড়ালছানার ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। জন্মের সময় ছানারা খুবই অসহায় থাকে। তাদের চোখ বন্ধ থাকে এবং চলাফেরার ক্ষমতাও সীমিত। জন্মের কয়েক দিনের মধ্যেই তারা গরগর ধরনের কম্পন সৃষ্টি করতে পারে। দুধ খাওয়ার সময় মা ও ছানার মধ্যে এই কম্পনভিত্তিক যোগাযোগ দেখা যায়। ছানা মায়ের শরীরের খুব কাছে থাকায় জোরে ডাকাডাকির পরিবর্তে মৃদু কম্পন যোগাযোগের কার্যকর উপায় হতে পারে। মা বিড়ালও দুধ খাওয়ানোর সময় গরগর করতে পারে। ফলে মা ও ছানার মধ্যে এটি নিরাপত্তা ও অবস্থানসংক্রান্ত এক ধরনের নীরব যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।

মানুষের সঙ্গে বসবাসকারী প্রাপ্তবয়স্ক বিড়ালের ক্ষেত্রেও গরগর শব্দ যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। পরিচিত মানুষের কোলে বসে থাকা, মাথায় বা গলায় আদর পাওয়া, নরম জায়গায় শুয়ে থাকা কিংবা খাবার পাওয়ার প্রত্যাশায় অনেক বিড়াল গরগর করে। এসব পরিস্থিতিতে শরীরের ভঙ্গি যদি শিথিল থাকে, চোখ আংশিক বন্ধ থাকে, কান স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে এবং বিড়াল স্বেচ্ছায় মানুষের কাছাকাছি থাকে, তাহলে গরগর ধ্বনিটি সাধারণত আরাম ও নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধরে নেওয়া যায়।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা তৈরি হয়। গরগর শব্দকে কখনোই একা বিড়ালের মানসিক অবস্থা নির্ণয়ের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। পশুচিকিৎসাকেন্দ্রে আতঙ্কিত বিড়ালও গরগর করতে পারে। আহত বিড়াল, অসুস্থ বিড়াল কিংবা তীব্র অস্বস্তিতে থাকা বিড়ালের মধ্যেও এটি দেখা যায়। প্রসবের সময় মা বিড়ালও গরগর করতে পারে। এমনকি জীবনের শেষ পর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ কিছু বিড়ালের মধ্যেও গরগর আচরণ দেখা যায়। তাই ‘গরগর করছে, অর্থাৎ ভালো আছে’—এই সিদ্ধান্ত কখনো কখনো বিপজ্জনকভাবে ভুল হতে পারে।

এখান থেকে গরগর করার আরেকটি সম্ভাব্য কাজের ধারণা আসে—নিজেকে শান্ত করা। মানুষ উদ্বিগ্ন হলে কেউ গভীর শ্বাস নেয়, কেউ নির্দিষ্ট ছন্দে হাঁটে, কেউ নিজের হাত ঘষে বা পরিচিত কোনো কাজ বারবার করে। এসব আচরণ স্নায়ুতন্ত্রকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করতে পারে। বিড়ালের গরগর করাও কোনো কোনো পরিস্থিতিতে একই ধরনের আত্মপ্রশমনমূলক আচরণ হতে পারে। নিরাপদ অবস্থায় গরগর করা যেমন আরামের ফল হতে পারে, তেমনি বিপদের সময় একই প্রক্রিয়া নিজের উত্তেজনা ও ভয় সামলানোর উপায় হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।

বিড়ালের গরগর ধ্বনির সঙ্গে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ বা শরীরের পুনরুদ্ধারের সম্পর্ক আছে কি না, সেটি আরও রহস্যময় প্রশ্ন। গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন যে গরগর ধ্বনির অনেক কম্পন এমন নিচু কম্পাঙ্কের সীমায় পড়ে, যেগুলো নিয়ে মানুষের চিকিৎসাবিজ্ঞানে যান্ত্রিক কম্পন, হাড়, পেশি ও কলার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে গবেষণা হয়েছে। এখান থেকেই জনপ্রিয় একটি ধারণা জন্মেছে—বিড়াল হয়তো নিজের তৈরি কম্পনের মাধ্যমে শরীরের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে কোনোভাবে সহায়তা করে।

তবে এই ধারণার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। বিড়ালের গরগর কম্পন সরাসরি ভাঙা হাড় জোড়া লাগায়, ক্ষত সারিয়ে দেয় কিংবা কোনো রোগ নিরাময় করে—এমন শক্ত প্রমাণ এখনো নেই। নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের যান্ত্রিক উদ্দীপনা জীবন্ত কলায় প্রভাব ফেলতে পারে, এটি এক বিষয়; আর স্বাভাবিক গরগর ধ্বনি বিড়ালের শরীরে চিকিৎসার মতো কার্যকর হয়, এটি সম্পূর্ণ আলাদা দাবি। দ্বিতীয় দাবিটি প্রমাণ করতে আরও নিয়ন্ত্রিত গবেষণা দরকার। তাই গরগর ধ্বনির সম্ভাব্য পুনরুদ্ধারমূলক ভূমিকা একটি আকর্ষণীয় বৈজ্ঞানিক অনুমান হলেও তাকে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

বিবর্তনের দিক থেকে বিষয়টি আরও আকর্ষণীয়। বিড়ালজাতীয় প্রাণীরা স্বভাবগতভাবে দীর্ঘ সময় বিশ্রাম নেয় এবং শিকারের সময় অল্প সময়ের জন্য প্রচণ্ড শক্তি ব্যয় করে। এমন জীবনযাত্রায় কম শক্তি ব্যয় করে শরীর ও স্নায়ুতন্ত্রকে স্থিতিশীল রাখার কোনো ব্যবস্থা উপকারী হতে পারে। গরগর করার সময় বিড়ালকে দৌড়াতে, শরীরের বড় পেশি ব্যবহার করতে বা প্রচুর শক্তি খরচ করতে হয় না। তাই বিজ্ঞানীরা প্রশ্ন তুলেছেন, দীর্ঘ বিশ্রামের সময় তৈরি হওয়া এই কম্পনের কোনো শারীরবৃত্তীয় সুবিধা বিবর্তনের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়ে থাকতে পারে কি না। প্রশ্নটি আকর্ষণীয় হলেও এর উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়।

সব বিড়ালজাতীয় প্রাণী আবার একইভাবে গরগর করে না। গৃহপালিত বিড়াল ছাড়াও বেশ কয়েকটি ছোট ও মাঝারি আকারের বিড়ালজাতীয় প্রাণীর মধ্যে গরগর ধরনের ধ্বনি পাওয়া যায়। অন্যদিকে সিংহ, বাঘ, জাগুয়ার ও চিতাবাঘের মতো বড় বিড়ালজাতীয় প্রাণীর স্বরযন্ত্রের গঠন এবং শব্দ তৈরির ক্ষমতা ভিন্ন। তাদের গর্জনের সঙ্গে স্বরযন্ত্র ও সংশ্লিষ্ট কাঠামোর বিশেষ অভিযোজন জড়িত। তবে ‘যে বিড়াল গরগর করে সে গর্জন করতে পারে না, আর যে গর্জন করে সে কখনো গরগর করতে পারে না’—এমন সরল বিভাজন বাস্তব জীববিজ্ঞানের তুলনায় অতিরিক্ত সহজীকরণ। বিভিন্ন প্রজাতির ধ্বনি উৎপাদনের ধরন এবং কোন আচরণকে প্রকৃত গরগর বলা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

গৃহপালিত বিড়াল মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গরগর ধ্বনিকে আশ্চর্যভাবে ব্যবহার করতে পারে। গবেষণায় এমন বিশেষ ধরনের গরগর ধ্বনি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে তুলনামূলক উচ্চ স্বরের ডাকের উপাদান মিশে থাকে। বিশেষ করে খাবার বা মনোযোগ চাওয়ার সময় কিছু বিড়াল এই ধরনের ধ্বনি করে। মানুষের কাছে এটি সাধারণ আরামদায়ক গরগরের তুলনায় বেশি জরুরি বা উপেক্ষা করা কঠিন বলে মনে হতে পারে। অর্থাৎ হাজার হাজার বছরের সহাবস্থানে কিছু বিড়াল মানুষের সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়াকে কাজে লাগানোর মতো যোগাযোগ কৌশল গড়ে তুলেছে বলে ধারণা করা হয়।

একটি বিড়ালের গরগর ধ্বনির অর্থ বুঝতে তাই তার পুরো শরীরের ভাষা পর্যবেক্ষণ করতে হয়। আরামে থাকা বিড়ালের পেশি সাধারণত শিথিল থাকে, চোখ কোমল বা আধবোজা থাকে, কান সামনের দিকে বা স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে এবং লেজে তীব্র উত্তেজনা দেখা যায় না। বিপরীতে গরগর করার পাশাপাশি যদি বিড়াল শরীর গুটিয়ে রাখে, খাবার বন্ধ করে দেয়, লুকিয়ে থাকে, দ্রুত বা কষ্ট করে শ্বাস নেয়, কান চেপে রাখে, স্পর্শ এড়ায়, অস্বাভাবিকভাবে নিশ্চল থাকে কিংবা আচরণ হঠাৎ বদলে যায়, তাহলে গরগর শব্দকে সুখের লক্ষণ ধরে নেওয়া উচিত নয়। এসব ক্ষেত্রে ব্যথা, অসুস্থতা বা মানসিক চাপের সম্ভাবনা বিবেচনা করা জরুরি।

আরও একটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো, সব বিড়ালের গরগর করার ধরন এক নয়। কোনো বিড়ালের শব্দ এত মৃদু যে কানে শোনার চেয়ে শরীরে হাত রাখলে বেশি বোঝা যায়। আবার কোনো বিড়ালের গরগর দূর থেকেও শোনা যায়। বয়স, শরীরের গঠন, স্বরযন্ত্রের বৈশিষ্ট্য, শ্বাসপ্রশ্বাস, আবেগ এবং ব্যক্তিগত আচরণগত পার্থক্যের কারণে এই বৈচিত্র্য হতে পারে। একই বিড়ালের গরগর ধ্বনিও পরিস্থিতিভেদে বদলে যেতে পারে।

মানুষের ওপর বিড়ালের গরগর শব্দের প্রভাবও উপেক্ষা করার মতো নয়। শান্ত পরিবেশে একটি আরামপ্রাপ্ত বিড়ালের নিয়মিত নিচু গুঞ্জন অনেক মানুষের কাছে প্রশান্তিদায়ক মনে হয়। বিড়ালকে আদর করা, তার উষ্ণ শরীরের সংস্পর্শ এবং পুনরাবৃত্তিমূলক গরগর কম্পন একসঙ্গে মানুষের মানসিক প্রশান্তির অনুভূতি তৈরি করতে পারে। তবে এখানেও গরগর শব্দকে কোনো রোগের চিকিৎসা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। মানুষ ও পোষা প্রাণীর ইতিবাচক সম্পর্ক মানসিক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু সেটি চিকিৎসার বিকল্প নয়।

বিড়ালের গরগর শব্দ তাই একটি মাত্র বার্তা বহন করে না। কখনো এটি বলতে পারে, ‘আমি নিরাপদ।’ কখনো ‘আমি তোমার কাছে থাকতে চাই।’ ছোট ছানার ক্ষেত্রে এর অর্থ হতে পারে, ‘আমি এখানে আছি।’ খাবার চাওয়া বিড়ালের ক্ষেত্রে এটি মনোযোগ আকর্ষণের কৌশল হতে পারে। আবার অসুস্থ বা আতঙ্কিত বিড়ালের ক্ষেত্রে একই কম্পন সম্ভবত নিজেকে স্থির রাখার প্রচেষ্টার অংশ। একই ধরনের শব্দ ভিন্ন পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে—আর এখানেই বিড়ালের আচরণগত জটিলতা।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, মানুষের এত পরিচিত এই ছোট্ট গরগর শব্দটির বিজ্ঞান এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়ে যায়নি। আমরা জানি স্বরযন্ত্র, স্বরভাঁজ, শ্বাসপ্রবাহ, স্নায়ুতন্ত্র এবং বিশেষ ধরনের কলা এর উৎপত্তিতে ভূমিকা রাখে। আমরা এটাও জানি যে এটি সুখের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও শুধু সুখের সংকেত নয়। মা ও ছানার যোগাযোগ, মানুষের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক, মানসিক চাপের সময় আত্মপ্রশমন এবং সম্ভবত কিছু শারীরবৃত্তীয় সুবিধার সঙ্গেও এর যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু ঠিক কোন প্রক্রিয়া কখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং এই কম্পনের শরীরগত সুবিধা সত্যিই কত দূর পর্যন্ত যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো গবেষণাধীন।

তাই পরেরবার কোনো বিড়াল আপনার পাশে শুয়ে গরগর করলে শুধু ‘সে খুশি’ ভেবে থেমে গেলে চলবে না। তার চোখ, কান, লেজ, শ্বাসপ্রশ্বাস, শরীরের ভঙ্গি এবং পরিস্থিতিও লক্ষ্য করুন। সেই মৃদু কম্পনের মধ্যে হয়তো আরাম, বিশ্বাস ও সামাজিক বন্ধনের সংকেত রয়েছে। আবার কোনো পরিস্থিতিতে সেটি হতে পারে উদ্বেগ বা অস্বস্তি সামলানোর নিজস্ব উপায়। কয়েক দশ হার্টজের একটি সাধারণ গুঞ্জনের আড়ালে লুকিয়ে আছে স্নায়ুবিজ্ঞান, শারীরবৃত্ত, বিবর্তন এবং প্রাণীর যোগাযোগের এক অসাধারণ জগৎ। আর সেই কারণেই বিড়ালের গরগর শব্দ আমাদের কাছে যতটা পরিচিত, বিজ্ঞানের কাছে এখনো ততটাই আকর্ষণীয় এক রহস্য।


আপনার পছন্দ হতে পারে