টার্ডিগ্রেড কীভাবে মহাকাশেও বেঁচে থাকতে পারে? পৃথিবীর অন্যতম সহনশীল প্রাণীর অবিশ্বাস্য রহস্য

  • Author: Admin
  • August 13, 2026
টার্ডিগ্রেড কীভাবে মহাকাশেও বেঁচে থাকতে পারে? পৃথিবীর অন্যতম সহনশীল প্রাণীর অবিশ্বাস্য রহস্য
টার্ডিগ্রেড কীভাবে মহাকাশেও বেঁচে থাকতে পারে?

পৃথিবীর কোনো প্রাণীকে যদি হঠাৎ করে মহাকাশের প্রায় সম্পূর্ণ শূন্যতায় ফেলে দেওয়া হয়, তবে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। সেখানে শ্বাস নেওয়ার মতো বাতাস নেই, বায়ুচাপ নেই, তরল পানি স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে না, সূর্যের ক্ষতিকর বিকিরণ সরাসরি আঘাত করতে পারে এবং তাপমাত্রার পরিস্থিতিও অত্যন্ত প্রতিকূল। অথচ পৃথিবীতে এমন এক অতি ক্ষুদ্র প্রাণী রয়েছে, যার কিছু প্রজাতি বিশেষ অবস্থায় এই ভয়ংকর পরিবেশের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ সহ্য করে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। প্রাণীটির নাম টার্ডিগ্রেড, যাকে তার অদ্ভুত চেহারার কারণে অনেক সময় জলভালুক বলা হয়।

টার্ডিগ্রেড কোনো কাল্পনিক মহাকাশচারী প্রাণী নয়। এটি পৃথিবীরই একটি ক্ষুদ্র অমেরুদণ্ডী প্রাণী। অধিকাংশ টার্ডিগ্রেডের দৈর্ঘ্য এক মিলিমিটারেরও কম। তাদের দেহ ছোট, মোটা ও খণ্ডিত; রয়েছে চার জোড়া ছোট পা। অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখলে তাদের চলাফেরা অনেকটা ক্ষুদ্র কোনো ভালুকের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু বাহ্যিক চেহারার চেয়ে তাদের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিকূল পরিবেশে সাময়িকভাবে স্বাভাবিক জীবনপ্রক্রিয়া প্রায় স্থগিত করে দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা

টার্ডিগ্রেডকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া যায়। শ্যাওলা, লাইকেন, ভেজা মাটি, স্বাদুপানি, সামুদ্রিক পরিবেশ এমনকি অত্যন্ত শীতল অঞ্চল পর্যন্ত তাদের আবাস বিস্তৃত। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টার্ডিগ্রেড স্বাভাবিক অবস্থায় মহাকাশের মতো পরিবেশে জীবনযাপন করে না। তাদের সক্রিয় থাকতে সাধারণত শরীরের চারপাশে পানির একটি পাতলা স্তর প্রয়োজন। তারা খাবার গ্রহণ করে, বৃদ্ধি পায় এবং বংশবিস্তার করে পৃথিবীর তুলনামূলক স্বাভাবিক পরিবেশেই। তাদের কিংবদন্তিতুল্য সহনশীলতা প্রকাশ পায় মূলত তখন, যখন পরিবেশ এতটাই প্রতিকূল হয়ে ওঠে যে স্বাভাবিক জীবনপ্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।

টার্ডিগ্রেডের এই ক্ষমতা বোঝার জন্য ক্রিপ্টোবায়োসিস নামের বিশেষ জৈব অবস্থাটি বোঝা জরুরি। বাংলায় একে এমন একটি সুপ্তাবস্থা হিসেবে বোঝানো যায়, যেখানে প্রাণীটির বিপাকীয় কার্যকলাপ এতটাই কমে যায় যে বাইরে থেকে তাকে প্রায় নিষ্ক্রিয় মনে হয়। এটি সাধারণ ঘুম বা শীতনিদ্রার মতো নয়। বরং পরিবেশগত সংকটের মুখে শরীরের স্বাভাবিক রাসায়নিক কার্যক্রমকে চরম মাত্রায় কমিয়ে ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখার একটি বিশেষ কৌশল।

পানির অভাব দেখা দিলে অনেক টার্ডিগ্রেড শরীর সংকুচিত করে একটি বিশেষ আকৃতি ধারণ করে। এই অবস্থাকে সাধারণত টুন অবস্থা বলা হয়। প্রাণীটি পা গুটিয়ে নেয়, শরীর ছোট ও কুঁচকানো হয়ে আসে এবং শরীর থেকে বিপুল পরিমাণ পানি হারিয়ে যায়। দেখতে তখন জীবন্ত প্রাণীর চেয়ে শুকিয়ে যাওয়া ক্ষুদ্র দানার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু এই অবস্থাই তার অন্যতম শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।

পানি জীবনের জন্য অপরিহার্য হলেও কোষের ভেতরে পানি হারানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। কোষের ঝিল্লি, প্রোটিন এবং অন্যান্য সূক্ষ্ম জৈব কাঠামো পানিশূন্যতায় বিকৃত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। টার্ডিগ্রেডের কিছু প্রজাতি বিশেষ ধরনের অন্তর্নিহিতভাবে বিশৃঙ্খল প্রোটিন তৈরি করতে পারে, যা পানিশূন্য অবস্থায় কোষের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। পানি চলে যাওয়ার পর এসব প্রোটিন কোষের ভেতরের সংবেদনশীল কাঠামোর চারপাশে সুরক্ষামূলক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এই প্রক্রিয়াকে অনেকটা এমনভাবে কল্পনা করা যায়—একটি অত্যন্ত জটিল যন্ত্র চালু রেখে ঝড়ের মধ্যে রক্ষা করার পরিবর্তে সেটিকে নিরাপদভাবে বন্ধ করে তার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো স্থির করে রাখা হলো। পরিবেশ আবার অনুকূল হলে যন্ত্রটি পুনরায় চালু করা যায়। টার্ডিগ্রেডের ক্ষেত্রেও পানি ফিরে এলে কিছু প্রজাতির টুন অবস্থায় থাকা প্রাণী পুনরায় জল গ্রহণ করে ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। তারা মৃত্যুকে পরাজিত করে না; বরং প্রতিকূল সময়ে জীবনের স্বাভাবিক গতি সাময়িকভাবে প্রায় থামিয়ে রাখে।

মহাকাশে টিকে থাকার ক্ষেত্রে পানিশূন্যতা সহ্য করার এই ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহাশূন্যের শূন্যচাপ কোনো স্বাভাবিক সক্রিয় প্রাণীর জন্য মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু আগেই পানিশূন্য ও সুপ্ত অবস্থায় থাকা টার্ডিগ্রেডের শরীরে তরল পানির পরিমাণ অত্যন্ত কম থাকায় শূন্যচাপের কারণে সৃষ্ট কিছু ক্ষতিকর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত হতে পারে। অর্থাৎ টার্ডিগ্রেড মহাকাশে গিয়ে হঠাৎ কোনো জাদুকরী ঢাল তৈরি করে না; বরং মহাকাশে যাওয়ার আগেই তার শরীর এমন এক নিষ্ক্রিয় অবস্থায় প্রবেশ করতে পারে, যা প্রতিকূল পরিবেশের ক্ষতি সহ্য করার সম্ভাবনা বাড়ায়।

তবে মহাশূন্যের শূন্যতাই একমাত্র বিপদ নয়। আরেকটি বড় হুমকি হলো বিকিরণ। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও চৌম্বকক্ষেত্র আমাদের অনেক ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে রক্ষা করে। মহাকাশে এই প্রাকৃতিক সুরক্ষা অনেক কম। উচ্চশক্তির বিকিরণ জীবকোষের অণু ভেঙে দিতে পারে এবং বিশেষ করে বংশগত তথ্যবাহী অণুর ক্ষতি করতে পারে। যথেষ্ট ক্ষতি হলে কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

টার্ডিগ্রেডের কিছু প্রজাতির বিকিরণ সহ্য করার ক্ষমতা এখানেও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। এর একটি কারণ হতে পারে তাদের কার্যকর কোষীয় ক্ষতি মেরামত ব্যবস্থা। পানিশূন্যতার সময়ও কোষের বংশগত উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে দীর্ঘ বিবর্তনের পথে পানিশূন্যতা সহ্য করার জন্য গড়ে ওঠা প্রতিরক্ষা ও মেরামতব্যবস্থা বিকিরণের কারণে হওয়া কিছু ক্ষতি মোকাবিলাতেও সুবিধা দিতে পারে। অর্থাৎ মহাকাশের জন্য আলাদা করে বিবর্তিত না হয়েও পৃথিবীর কঠিন পরিবেশে অর্জিত ক্ষমতা মহাকাশে তাদের কাজে লাগতে পারে।

টার্ডিগ্রেড নিয়ে গবেষণায় বিশেষভাবে আলোচিত আরেকটি উপাদান হলো ডিসাপ নামের একটি ক্ষুদ্র বংশগত তথ্যবাহী অণু-সুরক্ষাকারী প্রোটিন। কিছু টার্ডিগ্রেডে পাওয়া এই প্রোটিন বংশগত উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিকিরণের কারণে সৃষ্ট কিছু ক্ষতি কমাতে সহায়তা করতে পারে। এটি কোনো অজেয় বর্ম নয় এবং সব টার্ডিগ্রেডের মধ্যেও একইভাবে উপস্থিত নয়। তবু এই প্রোটিন দেখিয়েছে, ক্ষুদ্র প্রাণীটির কোষীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কতটা বিশেষায়িত হতে পারে।

টার্ডিগ্রেডের আরেকটি বিখ্যাত ক্ষমতা হলো প্রচণ্ড ঠান্ডা সহ্য করা। কোষের মধ্যে পানি জমে বরফের স্ফটিক তৈরি হলে তা কোষের ঝিল্লি ও অভ্যন্তরীণ কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কিন্তু টার্ডিগ্রেড সুপ্ত ও পানিশূন্য অবস্থায় থাকলে শরীরে বরফ তৈরির জন্য উপলব্ধ পানির পরিমাণ অনেক কমে যায়। একই সঙ্গে তাদের কোষীয় সুরক্ষাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ অণুগুলোকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করতে পারে। ফলে স্বল্প সময়ের জন্য অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রার পরীক্ষায় কিছু টার্ডিগ্রেড বিস্ময়কর সহনশীলতা দেখিয়েছে।

তাপের ক্ষেত্রেও তাদের সহনশীলতা সাধারণ প্রাণীর তুলনায় অসাধারণ হতে পারে, কিন্তু এখানে একটি ভুল ধারণা এড়ানো জরুরি। টার্ডিগ্রেড সব তাপমাত্রায় অনির্দিষ্টকাল বেঁচে থাকতে পারে না। তাপমাত্রা কত, কতক্ষণ সেই তাপে রাখা হয়েছে, প্রাণীটি সক্রিয় নাকি টুন অবস্থায় রয়েছে এবং কোন প্রজাতির টার্ডিগ্রেড পরীক্ষা করা হচ্ছে—এসবের ওপর ফলাফল ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় থাকলে তারাও মারা যায়।

টার্ডিগ্রেড সত্যিই সরাসরি মহাকাশের পরিবেশে পরীক্ষিত হয়েছে। দুই হাজার সাত সালে ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণার একটি অভিযানে টার্ডিগ্রেডকে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছু নমুনাকে মহাশূন্যের শূন্যতা এবং কিছু নমুনাকে শূন্যতার পাশাপাশি সৌর বিকিরণের সংস্পর্শে রাখা হয়। পৃথিবীতে ফেরানোর পর দেখা যায়, মহাশূন্যের শূন্যতার প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে থাকা কিছু টার্ডিগ্রেড পুনরুজ্জীবিত হতে পেরেছিল। এটি ছিল প্রাণিজগতের সহনশীলতা সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ।

তবে এই পরীক্ষার ফলাফলকে “টার্ডিগ্রেড মহাকাশে অনায়াসে বাস করতে পারে” বলা ভুল হবে। সরাসরি সৌর বিকিরণের তীব্র সংস্পর্শে থাকা নমুনাগুলোর বেঁচে থাকার হার অনেক কম ছিল। অর্থাৎ মহাকাশের শূন্যতা সহ্য করতে পারা এবং মহাকাশে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। টার্ডিগ্রেড মহাকাশে হাঁটাহাঁটি, খাদ্য গ্রহণ বা স্বাভাবিক বংশবিস্তার করতে থাকা কোনো প্রাণী নয়। বিশেষ সুপ্ত অবস্থায় সীমিত সময়ের জন্য কিছু কঠিন পরিবেশ সহ্য করার ক্ষমতাই তাদের অসাধারণ করে তুলেছে।

আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—সব টার্ডিগ্রেড সমান শক্তিশালী নয়। টার্ডিগ্রেড আসলে একটি মাত্র প্রজাতির নাম নয়; এটি অসংখ্য প্রজাতি নিয়ে গঠিত একটি বৃহৎ প্রাণীগোষ্ঠী। বিভিন্ন প্রজাতির পানিশূন্যতা, তাপমাত্রা, চাপ ও বিকিরণ সহ্য করার ক্ষমতার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। এমনকি একই প্রজাতির ক্ষেত্রেও প্রাণীটির শারীরবৃত্তীয় অবস্থা, বয়স এবং পরিবেশের পরিবর্তনের গতি ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

টার্ডিগ্রেডের চরম সহনশীলতা সম্পর্কে প্রচলিত অনেক দাবিই তাই অতিরঞ্জিত। কখনো বলা হয় তারা ফুটন্ত পানিতে অনির্দিষ্টকাল বাঁচে, কখনো বলা হয় পরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় তাদের কিছুই হয় না, আবার কখনো বলা হয় তারা যেকোনো বিকিরণ সহ্য করতে পারে। বাস্তবে পরীক্ষাগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট প্রজাতি, নির্দিষ্ট অবস্থা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পরিচালিত হয়। কোনো চরম পরিবেশ কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টা সহ্য করা মানে সেই পরিবেশে বছরের পর বছর জীবিত থাকা নয়।

এখানেই টার্ডিগ্রেডের প্রকৃত বিস্ময় আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তাদের অসাধারণত্ব বোঝাতে অতিরঞ্জনের প্রয়োজন নেই। একটি প্রাণী যার দৈর্ঘ্য অনেক ক্ষেত্রে এক মিলিমিটারেরও কম, সেটি নিজের শরীর থেকে অধিকাংশ পানি হারিয়ে বিপাকীয় কার্যকলাপকে অত্যন্ত নিচু পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারে, পরে পানি ফিরে পেলে আবার সক্রিয় হতে পারে—এই ঘটনাই জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অসাধারণ।

বিজ্ঞানীদের কাছে টার্ডিগ্রেড গুরুত্বপূর্ণ শুধু কৌতূহলের কারণে নয়। তাদের কোষীয় সুরক্ষাব্যবস্থা বুঝতে পারলে ভবিষ্যতে জীববস্তু দীর্ঘদিন সংরক্ষণ, কোষ ও প্রোটিনকে পানিশূন্য অবস্থায় স্থিতিশীল রাখা, বিকিরণজনিত ক্ষতি বোঝা এবং মহাকাশ জীববিজ্ঞান নিয়ে নতুন ধারণা পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশযাত্রায় জীবন্ত কোষ, জৈব নমুনা বা গুরুত্বপূর্ণ জৈব উপাদান কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়—এই প্রশ্নে টার্ডিগ্রেডের জীববিদ্যা মূল্যবান সূত্র দিতে পারে।

তাদের নিয়ে গবেষণা পৃথিবীর বাইরে জীবনের সম্ভাবনা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। আমরা সাধারণত জীবনের উপযোগী পরিবেশ বলতে তরল পানি, সহনীয় তাপমাত্রা ও স্থিতিশীল পরিবেশ কল্পনা করি। সক্রিয় জীবনের জন্য এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু টার্ডিগ্রেড দেখায়, জীবনের সক্রিয় থাকা এবং জীবনের টিকে থাকা এক বিষয় নয়। কোনো পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদি সক্রিয় জীবনের জন্য অনুপযুক্ত হলেও বিশেষ ধরনের সুপ্ত জীব সেখানে সীমিত সময়ের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি পার করে দিতে পারে।

এ কারণে গ্রহের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে জীব ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনাতেও টার্ডিগ্রেডের নাম আসে। কোনো ক্ষুদ্র জীব বা সুপ্ত জৈব কাঠামো যদি পাথরের ভেতরে সুরক্ষিত অবস্থায় একটি গ্রহ থেকে মহাকাশে ছিটকে পড়ে এবং পরে অন্য কোনো গ্রহে পৌঁছায়, তবে যাত্রাপথের শূন্যতা, ঠান্ডা ও বিকিরণ সহ্য করা সম্ভব কি না—এটি জ্যোতির্জীববিজ্ঞানের একটি আকর্ষণীয় প্রশ্ন। টার্ডিগ্রেডের পরীক্ষা দেখায় যে অন্তত কিছু বহুকোষী প্রাণীর সহনশীলতা আমাদের আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। তবে এটি অন্য গ্রহে টার্ডিগ্রেড পৌঁছেছে বা মহাকাশে স্বাভাবিকভাবে প্রাণী ছড়িয়ে পড়ে—এমন কোনো প্রমাণ নয়।

টার্ডিগ্রেড আমাদের আরও একটি মৌলিক বিষয় শেখায়—সহনশীলতা মানেই শক্তিশালী দেহ নয়; কখনো কখনো বেঁচে থাকার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো সঠিক সময়ে প্রায় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া। হাতির বিশাল শরীর, বাঘের শক্তিশালী পেশি কিংবা ঈগলের তীক্ষ্ণ নখ টার্ডিগ্রেডের নেই। তার অস্ত্র হলো কোষীয় রসায়ন, পানিশূন্যতা সহ্য করার ক্ষমতা, গুরুত্বপূর্ণ অণুর সুরক্ষা এবং ক্ষতি মেরামতের সূক্ষ্ম ব্যবস্থা।

এই ক্ষুদ্র প্রাণীটির বিবর্তন মহাকাশে ঘটেনি। পৃথিবীর শ্যাওলা, পানির ক্ষুদ্র স্তর এবং বারবার শুকিয়ে যাওয়া পরিবেশেই তার অসাধারণ অভিযোজন গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেই অভিযোজন এত কার্যকর হয়েছে যে পৃথিবীতে তৈরি হওয়া প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তাকে এমন কিছু পরিস্থিতিও সহ্য করার ক্ষমতা দিয়েছে, যার মুখোমুখি তার পূর্বপুরুষদের বিবর্তনের সময় সম্ভবত কখনোই হতে হয়নি—মহাশূন্যের শূন্যতা তার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ।

তাই টার্ডিগ্রেডকে অমর প্রাণী বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। তারা মারা যায়, তাদের সহনশীলতার সীমা রয়েছে এবং সব প্রজাতি একই রকম প্রতিরোধী নয়। কিন্তু সীমাবদ্ধতাগুলো স্বীকার করার পরও সত্যটি বিস্ময়কর থেকে যায়। অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া প্রায় চোখেই পড়ে না এমন একটি প্রাণী নিজের জীবনপ্রক্রিয়াকে এমনভাবে পরিবর্তন করতে পারে যে পানিশূন্যতা, প্রচণ্ড ঠান্ডা, শূন্যচাপ এবং উল্লেখযোগ্য মাত্রার বিকিরণের মতো পরিস্থিতি অতিক্রম করে আবার সক্রিয় জীবনে ফিরতে পারে।

টার্ডিগ্রেডের রহস্য তাই অমরত্বের গল্প নয়; এটি জীবনের অভিযোজনক্ষমতার গল্প। পৃথিবীতে জীবন কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে কত বিচিত্র উপায়ে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার কৌশল তৈরি করেছে, টার্ডিগ্রেড তার অন্যতম চমকপ্রদ উদাহরণ। মহাকাশের নির্মম শূন্যতার সামনে এই ক্ষুদ্র জলভালুক আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবনের সীমা আমরা যতটা সংকীর্ণ বলে ভাবি, প্রকৃতি কখনো কখনো তার চেয়েও অনেক দূরে সেই সীমারেখা টেনে দিতে পারে।