বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বাংলার নবাব, মারাঠা ও আঞ্চলিক শক্তির উত্থান: কীভাবে ভেঙে পড়েছিল মুঘল কেন্দ্রীয় শাসন?

Series: মুঘল সাম্রাজ্য: উত্থান, ঐশ্বর্য ও পতনের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 27, 2026
বাংলার নবাব, মারাঠা ও আঞ্চলিক শক্তির উত্থান: কীভাবে ভেঙে পড়েছিল মুঘল কেন্দ্রীয় শাসন?
বাংলার নবাব, মারাঠা ও আঞ্চলিক শক্তির উত্থান

১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য একদিনে ভেঙে পড়েনি। দিল্লির সম্রাটের নাম তখনো মুদ্রায় ব্যবহৃত হতো, ফরমান জারি হতো, মনসব ও উপাধি দেওয়া হতো এবং ভারতীয় উপমহাদেশের বহু শাসক আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল সার্বভৌমত্ব স্বীকার করতেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষমতা ধীরে ধীরে দিল্লি থেকে সরে বাংলা, আওধ, হায়দরাবাদ, পুনে, ভরতপুর এবং পাঞ্জাবের মতো নতুন আঞ্চলিক কেন্দ্রে চলে যাচ্ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মুঘল পতনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল এই রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ—সাম্রাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যমান, কিন্তু তার প্রদেশগুলো ক্রমশ নিজেদের অর্থ, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের ওপর স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ অর্জন করছে।

আওরঙ্গজেব তাঁর জীবনের শেষ কয়েক দশক দাক্ষিণাত্যের দীর্ঘ যুদ্ধে কাটিয়েছিলেন। বিজাপুর ও গোলকোন্ডা দখলের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের ভূখণ্ড বৃদ্ধি পেলেও সেই বিশাল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে বিপুল অর্থ ও জনবল ব্যয় হয়। একই সময়ে মারাঠা প্রতিরোধ শেষ হয়নি। মুঘল রাষ্ট্র যত বড় হয়েছিল, প্রতিটি প্রদেশের ওপর কেন্দ্রের কার্যকর নজরদারি তত কঠিন হয়ে উঠেছিল। তাঁর মৃত্যুর পর দুর্বল উত্তরসূরি ও ধারাবাহিক উত্তরাধিকার যুদ্ধ এই সংকটকে দ্রুত গভীর করে।

১৭০৭ থেকে ১৭২০-এর দশকের মধ্যে একের পর এক মুঘল সম্রাট সিংহাসনে বসেন এবং অনেকেই দরবারের শক্তিশালী অভিজাত গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। বাহাদুর শাহ প্রথমের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার যুদ্ধ, জাহান্দার শাহের স্বল্পস্থায়ী শাসন, ফাররুখসিয়ারের উত্থান ও পতন এবং সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের ‘সম্রাট-নির্মাতা’ ভূমিকা দেখিয়ে দেয় যে মুঘল সম্রাট আর আগের মতো অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণকারী নন; বরং অনেক ক্ষেত্রে অভিজাত গোষ্ঠীরাই সম্রাটকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই দুর্বলতার সুযোগ প্রথমে সবচেয়ে দক্ষভাবে কাজে লাগান প্রাদেশিক গভর্নর ও উচ্চপদস্থ মুঘল কর্মকর্তারা। তাঁরা একেবারে বিদ্রোহ করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। বরং সম্রাটের নাম ও বৈধতা বজায় রেখে নিজেদের অঞ্চলের রাজস্ব, সামরিক নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিজের হাতে নিতে শুরু করেন। এভাবে তৈরি হয় আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল কিন্তু বাস্তবে স্বায়ত্তশাসিত প্রাদেশিক রাষ্ট্র

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ছিল বাংলা। মুঘল যুগে বাংলা ইতোমধ্যেই সাম্রাজ্যের অন্যতম ধনী সুবা। ধান, চিনি, রেশম, তুলাবস্ত্র, মসলিন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাংলাকে বিপুল রাজস্বের উৎসে পরিণত করেছিল। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে মুর্শিদ কুলি খান বাংলার রাজস্ব প্রশাসনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিতে পরিণত হন।

তিনি প্রথমে মুঘল সরকারের রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করলেও ধীরে ধীরে বাংলার আর্থিক প্রশাসন নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন। ঢাকা থেকে রাজস্ব প্রশাসনের কেন্দ্র স্থানান্তরিত হয়ে মকসুদাবাদে আসে, যা পরবর্তীকালে তাঁর নাম অনুসারে মুর্শিদাবাদ নামে পরিচিত হয়। এই পরিবর্তন শুধু রাজধানী স্থানান্তর নয়; বাংলার একটি নতুন আঞ্চলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠার প্রতীক ছিল।

মুর্শিদ কুলি খান অত্যন্ত কঠোরভাবে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা পুনর্গঠন করেন। জমিদারদের কাছ থেকে নির্ধারিত অর্থ আদায় নিশ্চিত করা, রাজস্ব নথি সুসংহত করা এবং কেন্দ্রের পাওনা পাঠানোর পাশাপাশি বাংলার প্রশাসনিক কাঠামোকে তাঁর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে আনা ছিল তাঁর নীতির মূল অংশ। দিল্লি তাঁকে মুঘল কর্মকর্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিত, কিন্তু বাস্তবে বাংলার শাসন ক্রমেই তাঁর এবং তাঁর উত্তরসূরিদের হাতে বংশানুক্রমিক চরিত্র গ্রহণ করে।

মুর্শিদ কুলি খানের মৃত্যুর পর শুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খান এবং পরে সরফরাজ খান ক্ষমতায় আসেন। এরপর ১৭৪০ সালে আলীবর্দী খান সরফরাজকে পরাজিত করে বাংলার নবাব হন। দিল্লির অনুমোদন আনুষ্ঠানিক বৈধতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও কে বাংলার শাসক হবেন, তা এখন মূলত বাংলার সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির দ্বারাই নির্ধারিত হচ্ছিল।

আলীবর্দীর আমলে বাংলার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ আসে মারাঠা বর্গিদের ধারাবাহিক আক্রমণে। ১৭৪০-এর দশকে মারাঠা বাহিনী বারবার বাংলা ও উড়িষ্যায় প্রবেশ করে। দ্রুত অশ্বারোহী দল গ্রাম ও জনপদে আক্রমণ, রাজস্ব সংগ্রহ ব্যাহত এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বাংলার লোকস্মৃতিতে ‘বর্গি’ শব্দটি এই ধ্বংসাত্মক অভিযানের স্মৃতির সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত আলীবর্দী খান মারাঠাদের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে বাধ্য হন। উড়িষ্যার ওপর মারাঠা প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং চৌথসংক্রান্ত দাবিও রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠে। এই ঘটনা দেখায় যে বাংলার নবাব দিল্লির মুঘল সম্রাটের বদলে নিজের সেনাবাহিনী ও কূটনীতির মাধ্যমে সাম্রাজ্যের বাইরের শক্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক পরিচালনা করছিলেন।

বাংলার মতোই দাক্ষিণাত্যে আরেকটি শক্তিশালী আঞ্চলিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে নিজাম-উল-মুলক আসফ জাহের নেতৃত্বে। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের অত্যন্ত অভিজ্ঞ অভিজাত এবং মুহাম্মদ শাহের আমলে উজিরও ছিলেন। কিন্তু দিল্লির দরবারি গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় বিরক্ত হয়ে তিনি দাক্ষিণাত্যে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।

১৭২৪ সালে শকরখেড়ার যুদ্ধের পর নিজাম-উল-মুলক কার্যত হায়দরাবাদকে স্বাধীন শক্তিকেন্দ্রে পরিণত করেন। তিনি মুঘল সম্রাটের আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেননি, কিন্তু নিজের প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও রাজস্বের ওপর বাস্তব স্বাধীনতা বজায় রাখেন। এর মধ্য দিয়ে আসফ জাহি রাজবংশের সূচনা হয়।

আওধেও একই ধরনের পরিবর্তন ঘটে। সাদাত খান বুরহান-উল-মুলক ১৭২২ সালে আওধের সুবাদার নিযুক্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে সেখানে শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রশাসন গড়ে তোলেন। গঙ্গা অববাহিকার উর্বর ভূমি ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের কারণে আওধ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ছিল। দিল্লি দুর্বল হওয়ায় এখানকার নবাবেরাও ক্রমশ স্বাধীনভাবে রাজস্ব, সেনাবাহিনী ও কূটনীতি পরিচালনা করতে থাকেন।

বাংলা, হায়দরাবাদ ও আওধের উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখায়—মুঘল সাম্রাজ্য ভাঙার সময় সব নতুন রাষ্ট্র মুঘলবিরোধী বিদ্রোহী শক্তি হিসেবে জন্ম নেয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই মুঘল কর্মকর্তাই কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজের প্রদেশকে প্রায় স্বাধীন রাজ্যে রূপান্তর করেন। তাঁরা মুঘল প্রশাসনের ভাষা, পদ, রাজস্বপদ্ধতি এবং রাজকীয় সংস্কৃতির অনেক অংশ বজায় রাখেন।

কিন্তু প্রাদেশিক নবাবদের পাশাপাশি এমন শক্তিও উঠছিল, যারা সরাসরি মুঘল ভূখণ্ডের ওপর নিজেদের সামরিক আধিপত্য বিস্তার করছিল। এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল মারাঠারা। শিবাজীর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র আওরঙ্গজেবের দীর্ঘ দাক্ষিণাত্য যুদ্ধেও ধ্বংস হয়নি। বরং তাঁর মৃত্যুর পর মারাঠা রাজনৈতিক ব্যবস্থা নতুন রূপে পুনর্গঠিত হয়।

শাহু ছত্রপতির আমলে পেশওয়া পদ ক্রমশ শক্তিশালী হয়। বালাজি বিশ্বনাথ মারাঠা রাষ্ট্রের আর্থিক ও রাজনৈতিক কাঠামো সুসংহত করেন এবং মুঘলদের কাছ থেকে দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন অঞ্চলে চৌথ ও সরদেশমুখী আদায়ের অধিকার স্বীকৃত করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এরপর বাজিরাও প্রথম মারাঠা সম্প্রসারণকে নতুন মাত্রা দেন। তাঁর দ্রুত অশ্বারোহী বাহিনী মালওয়া, গুজরাট ও বুন্দেলখণ্ডের দিকে অগ্রসর হয়। বাজিরাও বুঝেছিলেন যে দুর্বল মুঘল রাষ্ট্রের শক্তিশালী দুর্গ বা বড় শহর প্রতিটি ক্ষেত্রে সরাসরি দখল করার প্রয়োজন নেই; তার বদলে রাজস্বপথ, প্রাদেশিক রাজনীতি এবং সামরিক যোগাযোগের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেই দিল্লির কর্তৃত্ব দুর্বল করা যায়।

১৭৩৭ সালে মারাঠা বাহিনী দিল্লির কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া ছিল এই পরিবর্তনের নাটকীয় প্রমাণ। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর মাত্র ত্রিশ বছর পর যে মারাঠাদের তিনি দাক্ষিণাত্যে বিদ্রোহী হিসেবে দমন করতে চেষ্টা করেছিলেন, তারা এখন মুঘল রাজধানীর দরজায় সামরিক শক্তি প্রদর্শন করছে।

মারাঠা ক্ষমতাও একক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সিন্ধিয়া, হোলকার, গায়কোয়াড় ও ভোঁসলে পরিবারের মতো বিভিন্ন শক্তিশালী সামরিক পরিবার নিজেদের আঞ্চলিক ঘাঁটি গড়ে তোলে। ফলে মারাঠা কনফেডারেসি এমন একটি নমনীয় রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করে, যা একই সঙ্গে বহু অঞ্চলে বিস্তার করতে সক্ষম হয়।

রাজপুত রাজ্যগুলোর অবস্থানও বদলে যায়। আকবরের সময় থেকে আম্বর, মারওয়ার এবং অন্যান্য রাজপুত রাজ্য মুঘল সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অংশীদার ছিল। কিন্তু আওরঙ্গজেবের শেষভাগের সংঘর্ষ এবং কেন্দ্রের দুর্বলতার পর তারা নিজেদের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন আরও দৃঢ় করতে থাকে। জয়পুর, যোধপুর ও উদয়পুর দিল্লির নির্দেশের তুলনায় নিজেদের রাজবংশীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।

উত্তর ভারতের মথুরা-আগ্রা অঞ্চলে জাট শক্তির উত্থান একই প্রক্রিয়ার আরেকটি দিক। আওরঙ্গজেবের সময় থেকেই জাট বিদ্রোহ চলছিল। পরে চূড়ামন এবং বিশেষ করে বদন সিংহ ও সুরজমলের নেতৃত্বে ভরতপুরকে কেন্দ্র করে জাটরা সুসংগঠিত রাজ্য গড়ে তোলে।

মহারাজা সুরজমল অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি উত্তর ভারতের অন্যতম দক্ষ আঞ্চলিক শাসকে পরিণত হন। আগ্রা ও দিল্লির আশপাশে জাট শক্তির উপস্থিতি দেখিয়ে দেয় যে মুঘল রাজধানীর কাছের এলাকাতেও সম্রাটের প্রত্যক্ষ কর্তৃত্ব আর নিশ্চিত নয়।

পাঞ্জাবেও একই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছিল। গুরু গোবিন্দ সিংহের পর বান্দা সিংহ বাহাদুর মুঘল শাসনের বিরুদ্ধে বড় বিদ্রোহ গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কঠোরভাবে দমন করা হলেও শিখ সামরিক সংগঠন বিলুপ্ত হয়নি।

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি আফগান আক্রমণ এবং মুঘল দুর্বলতার মধ্যে শিখ মিসলগুলো ধীরে ধীরে পাঞ্জাবের বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তি অর্জন করে। পরবর্তী শতাব্দীতে এই বিচ্ছিন্ন মিসলগুলোর একটি অংশ রণজিৎ সিংহের নেতৃত্বে শক্তিশালী শিখ সাম্রাজ্যে একত্রিত হবে।

মুঘল কেন্দ্রীয় শাসনের পতনের পেছনে শুধু আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না; অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর সংকটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মনসবদারদের বেতন দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল জাগিরের চাপ বাড়ছিল। বহু প্রদেশে কাগজে নির্ধারিত রাজস্ব আর বাস্তবে সংগ্রহযোগ্য অর্থের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।

কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল হলে প্রাদেশিক সুবাদার, জমিদার এবং রাজস্ব কর্মকর্তা দিল্লিতে অর্থ পাঠানোর বদলে স্থানীয়ভাবে সেই সম্পদ ব্যবহার করতে শুরু করেন। এতে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়—কেন্দ্রের রাজস্ব কমে গেলে সেনাবাহিনী দুর্বল হয়, সেনাবাহিনী দুর্বল হলে প্রদেশ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়, আর প্রদেশ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে রাজস্ব আরও কমে যায়।

১৭৩৯ সালে নাদির শাহের আক্রমণ এই অবক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করে। করনালের যুদ্ধে মুঘল বাহিনী পরাজিত এবং দিল্লি লুণ্ঠিত হওয়ার পর সাম্রাজ্যের অজেয়তার ধারণা ধ্বংস হয়ে যায়। রাজকোষ থেকে বিপুল সম্পদ চলে যায় এবং ময়ূর সিংহাসন পর্যন্ত পারস্যে নিয়ে যাওয়া হয়।

নাদির শাহের আক্রমণের পর প্রাদেশিক শক্তিগুলোর কাছে দিল্লির দুর্বলতা আর অনুমান নয়—প্রমাণিত বাস্তবতা। ফলে সম্রাটের প্রতি আনুগত্য আরও বেশি প্রতীকী হয়ে ওঠে। কেন্দ্র এখন উপাধি ও বৈধতা দিতে পারে, কিন্তু প্রদেশকে বাধ্য করার সামরিক শক্তি ক্রমে হারায়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য ছিল। মুঘল কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র দুর্বল হলেও অনেক প্রদেশ অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়নি। বাংলা, আওধ ও হায়দরাবাদের মতো অঞ্চল বরং যথেষ্ট সমৃদ্ধ ছিল। ফলে ‘মুঘল পতন’কে সমগ্র ভারতীয় অর্থনীতির একই সঙ্গে পতন হিসেবে দেখা যায় না। বাস্তবে সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দিল্লি থেকে আঞ্চলিক রাজধানীগুলোতে স্থানান্তরিত হচ্ছিল।

মুর্শিদাবাদ, হায়দরাবাদ, লখনউ, পুনে ও ভরতপুর নতুন দরবার, বাণিজ্য এবং সামরিক পৃষ্ঠপোষকতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মুঘল রাজদরবারের শিল্পী, সৈনিক, লেখক এবং প্রশাসনিক কর্মচারীদের অনেকে নতুন আঞ্চলিক দরবারে কাজের সুযোগ খুঁজে পান। ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের বিচ্ছিন্নতা একই সঙ্গে নতুন আঞ্চলিক সংস্কৃতির বিকাশও ঘটায়।

এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোর জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি হয়। শক্তিশালী মুঘল কেন্দ্র থাকাকালে ইংরেজ, ডাচ ও ফরাসি কোম্পানিকে সাম্রাজ্যিক ও প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষের অনুমতির ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু একাধিক আঞ্চলিক রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা বিদেশি কোম্পানিগুলোকে এক শাসকের বিরুদ্ধে অন্য শাসকের সঙ্গে জোট করার সুযোগ দেয়।

বিশেষ করে বাংলার বিপুল সম্পদ ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়। মুর্শিদ কুলি খান ও আলীবর্দী খানের সময় কোম্পানি এখনো নবাবি কর্তৃত্বের অধীন বণিক শক্তি ছিল। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ বাংলার আঞ্চলিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই নতুন ধরনের উপনিবেশিক চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করাবে।

তাই মুঘল কেন্দ্রীয় শাসনের পতন কোনো শূন্যতা তৈরি করেনি যেখানে হঠাৎ বিশৃঙ্খলা ছাড়া কিছু ছিল না। বরং একটি বৃহৎ সাম্রাজ্যের জায়গায় বহু শক্তিশালী আঞ্চলিক রাষ্ট্র ও সামরিক কনফেডারেসি উঠে আসে। তারা মুঘল প্রশাসনের অনেক অংশ গ্রহণ করে, কিন্তু নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যবহার করে।

বাংলার নবাবরা মুঘল রাজস্ব ও প্রশাসনিক ঐতিহ্য বজায় রেখেও স্বাধীন কূটনীতি চালিয়েছেন। হায়দরাবাদের নিজাম মুঘল উপাধি বহন করেও নিজের রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। আওধের নবাবরা দিল্লির আনুগত্যের ভাষা রেখেও নিজেদের সেনাবাহিনী ও রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ করেছেন। মারাঠারা মুঘল ভূখণ্ড থেকে চৌথ আদায় করে নতুন রাজনৈতিক অর্থনীতি তৈরি করেছে।

এটাই মুঘল পতনের প্রকৃত চরিত্র—কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠান, রাজস্বপদ্ধতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনেক অংশ আঞ্চলিক শক্তির হাতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারত মুঘল-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যায়নি; বরং মুঘল সাম্রাজ্যের ভগ্নাংশের ওপর নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

দিল্লির সম্রাটের ক্ষমতা যত কমছিল, মুর্শিদাবাদের নবাব, হায়দরাবাদের নিজাম, আওধের নবাব, পুনের পেশওয়া, ভরতপুরের জাট এবং পাঞ্জাবের শিখ শক্তি তত বেশি নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছিল। এই পরিবর্তনের মধ্যে মুঘল সম্রাট পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাননি, কিন্তু তাঁর ভূমিকা বাস্তব শাসকের চেয়ে ক্রমশ বৈধতার প্রতীকে সীমিত হয়ে পড়ে।

বাংলার নবাব, মারাঠা ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির উত্থান তাই মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ফলও ছিল, আবার সেই পতনকে আরও দ্রুত করার কারণও ছিল। কেন্দ্র দুর্বল হওয়ায় তারা স্বাধীন হয়েছে; আর তারা রাজস্ব, সেনাবাহিনী ও ভূখণ্ড নিজেদের হাতে নেওয়ায় দিল্লি আরও দুর্বল হয়েছে। এই পারস্পরিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারত একক মুঘল সাম্রাজ্য থেকে বহু প্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক শক্তির রাজনৈতিক জগতে রূপান্তরিত হয়—যে ভাঙা ক্ষমতার মানচিত্রের মধ্যেই খুব শিগগির ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো নতুন সাম্রাজ্যিক খেলোয়াড় হিসেবে প্রবেশ করবে।


You may also like