জেরুজালেমের পতন ১২৪৪: কীভাবে ক্রুসেডাররা আবার হারিয়েছিল পবিত্র নগরীর নিয়ন্ত্রণ?
Series: ক্রুসেড: ধর্ম, সাম্রাজ্য ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস
- Author: Admin
- August 23, 2026
জেরুজালেমের পতন ১২৪৪
১২২৯ সালে ষষ্ঠ ক্রুসেডের সময় সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক কোনো বড় যুদ্ধ ছাড়াই কূটনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে জেরুজালেমকে আবার লাতিন খ্রিস্টান নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু সেই সাফল্যের ভেতরেই ভবিষ্যৎ পতনের বীজ ছিল। জেরুজালেম ফিরে পাওয়া হয়েছিল, কিন্তু শহরটিকে শক্তিশালী সামরিক দুর্গে পরিণত করা যায়নি। চারদিকে মুসলিম-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল, সীমিত লাতিন জনবল, রাজনৈতিক বিভক্তি এবং দুর্বল প্রতিরক্ষার মধ্যে শহরটি বাস্তবে অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল।
মাত্র পনেরো বছর পর, ১২৪৪ সালে, সেই ভঙ্গুরতা ভয়াবহভাবে প্রকাশ পায়। এবার জেরুজালেম দখল করতে সালাহউদ্দিনের মতো কোনো ঐক্যবদ্ধ মুসলিম সাম্রাজ্যের বিশাল সেনাবাহিনী আসেনি। শহরের পতনের কেন্দ্রে ছিল একদল বাস্তুচ্যুত, যুদ্ধক্লান্ত কিন্তু অত্যন্ত দক্ষ অশ্বারোহী যোদ্ধা—খাওয়ারেজমীয়রা।
খাওয়ারেজমীয়দের ইতিহাস মধ্য এশিয়ার এক বৃহৎ সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে জড়িত। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে খাওয়ারেজম শাহদের সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়া ও ইরানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু চেঙ্গিস খানের মঙ্গোল আক্রমণে ১২১৯ সালের পর সেই সাম্রাজ্য কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়।
রাজ্য হারানো বহু খাওয়ারেজমীয় যোদ্ধা পশ্চিম দিকে সরে আসে। তারা সংগঠিত রাষ্ট্রের নিয়মিত সেনা নয়, বরং বিভিন্ন অঞ্চলে ভাড়াটে, মিত্র বা আধা-স্বাধীন সামরিক গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করতে থাকে। দ্রুতগতির অশ্বারোহী যুদ্ধ, তীরন্দাজি এবং আক্রমণাত্মক লুণ্ঠনমূলক অভিযানে তারা বিশেষভাবে দক্ষ ছিল।
এদিকে জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ যে খুবই অনিশ্চিত ছিল, তা ১২২৯ সালের চুক্তির কাঠামো থেকেই স্পষ্ট। দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক ও মিশরের সুলতান আল-কামিলের মধ্যে হওয়া সমঝোতায় জেরুজালেম খ্রিস্টানদের হাতে এলেও হারাম আল-শরিফ, ডোম অব দ্য রক ও আল-আকসা মসজিদের ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের কাছেই ছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শহরের প্রতিরক্ষা পুরোপুরি পুনর্গঠনের সুযোগ ছিল সীমিত। আগের সংঘাতের সময় জেরুজালেমের দেয়ালের একটি অংশ ধ্বংস করা হয়েছিল। ফলে লাতিনরা শহরের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ পেলেও সামরিকভাবে এটি প্রথম ক্রুসেডের যুগের শক্তিশালী সুরক্ষিত রাজধানী ছিল না।
১২৩৯ সালে ফ্রেডেরিকের সঙ্গে আল-কামিলের করা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে থাকে। একই সময়ে আইয়ুবি পরিবারের বিভিন্ন শাখার মধ্যে ক্ষমতার সংঘাত আবার তীব্র হয়ে ওঠে। মিশর, দামেস্ক, কেরাক এবং সিরিয়ার অন্যান্য আইয়ুবি শাসকেরা একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়েছিলেন।
এই বিভক্তির সুযোগ ক্রুসেডাররাও নেওয়ার চেষ্টা করে। তারা কখনো একটি মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে অন্য মুসলিম শাসকের সঙ্গে জোট করত। ফলে ত্রয়োদশ শতাব্দীর লেভান্তের রাজনৈতিক বাস্তবতা সরল “খ্রিস্টান বনাম মুসলিম” কাঠামোর চেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল।
১২৪০-এর দশকের শুরুতে এই জোটরাজনীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে কিছু সিরীয় মুসলিম শাসক ক্রুসেডারদের সঙ্গে মিশরের বিরুদ্ধে সহযোগিতা করতে শুরু করেন। দামেস্ক ও অন্যান্য অঞ্চলের শাসকদের কাছে মিশরের আইয়ুবি শক্তি অনেক সময় ফ্রাঙ্কদের চেয়েও তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক হুমকি ছিল।
মিশরে তখন ক্ষমতা শক্তিশালী করছিলেন আল-সালিহ আইয়ুব। তিনি আইয়ুবি পরিবারের অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলা করতে চেয়েছিলেন এবং সিরিয়ায় নিজের প্রভাব বিস্তার করতে আগ্রহী ছিলেন। এই লক্ষ্যেই তিনি খাওয়ারেজমীয় যোদ্ধাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং তাদের সামরিক শক্তি ব্যবহার করেন।
খাওয়ারেজমীয়রা তখন এমন একটি বাহিনী, যাদের নিজস্ব স্থায়ী রাষ্ট্র নেই কিন্তু যুদ্ধক্ষমতা অত্যন্ত বেশি। তারা নিয়মিত আইয়ুবি সেনাবাহিনীর মতো কঠোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে ছিল না। এই বাহিনীকে কোনো অঞ্চলের দিকে পাঠানো মানে শুধু সামরিক আক্রমণ নয়, লুণ্ঠন ও ব্যাপক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিও তৈরি করা।
১২৪৪ সালের গ্রীষ্মে খাওয়ারেজমীয় বাহিনী প্যালেস্টাইনের দিকে অগ্রসর হয়। তাদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন দাবি রয়েছে, কিন্তু তারা যে দ্রুত এবং শক্তিশালী অশ্বারোহী বাহিনী ছিল, তা স্পষ্ট।
জেরুজালেম তখন তাদের পথে এক অত্যন্ত দুর্বল লক্ষ্য।
শহরের ভেতরে বড় কোনো লাতিন সেনাবাহিনী অবস্থান করছিল না। ক্রুসেডারদের সামরিক শক্তির মূল অংশ ছিল উপকূলীয় শহর ও দুর্গগুলোতে। জেরুজালেমের ধর্মীয় গুরুত্ব বিশাল হলেও সামরিকভাবে তা ক্রুসেডার রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুরক্ষিত কেন্দ্র ছিল না।
খাওয়ারেজমীয়রা শহরের কাছে এসে আক্রমণ শুরু করলে প্রতিরক্ষাকারীরা দ্রুত বুঝতে পারে তারা দীর্ঘ অবরোধ সহ্য করতে পারবে না। কিছু বিবরণ অনুযায়ী খ্রিস্টান অধিবাসীদের একটি বড় অংশ শহর ছেড়ে উপকূলের দিকে পালানোর চেষ্টা করে।
প্রথম পর্যায়ে এমন গুজবও ছড়ায় যে খাওয়ারেজমীয়রা হয়তো শহর ছেড়ে চলে গেছে। ফলে কিছু শরণার্থী আবার জেরুজালেমে ফিরে আসতে শুরু করে। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বিপর্যয়কর হয়ে ওঠে।
১২৪৪ সালের জুলাই-আগস্ট নাগাদ জেরুজালেম খাওয়ারেজমীয়দের হাতে সম্পূর্ণভাবে পড়ে যায়।
শহরে ব্যাপক লুণ্ঠন ও সহিংসতা ঘটে। খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও রক্ষা পায়নি। চার্চ অব দ্য হোলি সেপালকার ক্ষতিগ্রস্ত ও লুণ্ঠিত হয়, এবং সেখানে থাকা কিছু ধর্মীয় ব্যক্তিকে হত্যা করা হয় বলে মধ্যযুগীয় সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
শহরের লাতিন খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। বহু মানুষ পালিয়ে উপকূলীয় ক্রুসেডার অঞ্চলগুলোর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু পথে আক্রমণের শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এই ঘটনাকে ১১৮৭ সালের সালাহউদ্দিনের জেরুজালেম বিজয়ের সঙ্গে তুলনা করলে বড় পার্থক্য দেখা যায়। সালাহউদ্দিন শহরটি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে গ্রহণ করেছিলেন এবং মুক্তিপণের ভিত্তিতে অধিকাংশ খ্রিস্টান বাসিন্দাকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। ১২৪৪ সালের দখল ছিল অনেক বেশি বিশৃঙ্খল ও ধ্বংসাত্মক।
কারণ খাওয়ারেজমীয় বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল জেরুজালেমকে দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক রাজধানী হিসেবে শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালনা করা নয়। তারা ছিল বাস্তুচ্যুত সামরিক শক্তি, যাদের কাছে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও রাজনৈতিক জোট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—খাওয়ারেজমীয়দের ১২৪৪ সালের আক্রমণকে সরলভাবে “মুসলিমরা আবার জেরুজালেম জয় করল” বলা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে। তারা মিশরের আল-সালিহ আইয়ুবের বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত ছিল, কিন্তু নিজেদের স্বতন্ত্র সামরিক স্বার্থও অনুসরণ করছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই সময় কিছু মুসলিম সিরীয় শাসকই ক্রুসেডারদের মিত্র ছিল। অর্থাৎ জেরুজালেমের পতনের পর যে বড় যুদ্ধ আসছিল, সেখানে একদিকে শুধু খ্রিস্টান এবং অন্যদিকে শুধু মুসলিম—এমন বিভাজন ছিল না।
জেরুজালেম হারানোর পর ক্রুসেডার নেতৃত্ব দ্রুত প্রতিশোধ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার চেষ্টা করে। তারা দামেস্ক, হোমস এবং অন্যান্য সিরীয় মুসলিম শক্তির সঙ্গে জোট তৈরি করে, যারা আল-সালিহ আইয়ুব ও তাঁর খাওয়ারেজমীয় মিত্রদের বিরোধী ছিল।
এটি ক্রুসেডের ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বাভাবিক জোটগুলোর একটি। লাতিন ক্রুসেডার নাইটদের পাশাপাশি মুসলিম সিরীয় বাহিনী একই সেনাবাহিনীতে দাঁড়ায়, তাদের বিপরীতে ছিল মিশরের আইয়ুবি বাহিনী ও খাওয়ারেজমীয় যোদ্ধারা।
দুই পক্ষের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে ১২৪৪ সালের অক্টোবর মাসে গাজার উত্তর-পূর্বে লা ফোরবি বা হারবিয়ার যুদ্ধে।
এই যুদ্ধ জেরুজালেমের পতনের চেয়েও সামরিকভাবে বেশি বিধ্বংসী প্রমাণিত হয়।
ক্রুসেডারদের সঙ্গে ছিল টেম্পলার, হসপিটালার এবং টিউটনিক নাইটদের উল্লেখযোগ্য বাহিনী। পাশাপাশি সিরীয় মুসলিম মিত্ররাও ছিল। কাগজে-কলমে এটি একটি শক্তিশালী জোট ছিল।
কিন্তু মিশরীয় সেনাপতি রুকন আল-দিন বাইবার্স—যিনি পরবর্তী বিখ্যাত মামলুক সুলতান বাইবার্সের সঙ্গে নামের কারণে কখনো বিভ্রান্ত হন—মিশরীয় ও খাওয়ারেজমীয় বাহিনী পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
যুদ্ধ কয়েক দিন ধরে চলে। শেষ পর্যন্ত খাওয়ারেজমীয়দের তীব্র আক্রমণ এবং মিশরীয় বাহিনীর চাপ জোটবাহিনীর যুদ্ধবিন্যাস ভেঙে দেয়।
লা ফোরবির যুদ্ধ ক্রুসেডারদের জন্য হাত্তিনের পর সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক বিপর্যয়গুলোর একটি হয়ে ওঠে।
হাজার হাজার সৈন্য নিহত বা বন্দি হয়। নাইটস টেম্পলার ও হসপিটালারের বহু যোদ্ধা হারিয়ে যায় এবং ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলোর সামরিক জনশক্তি আবার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই পরাজয়ের ফলে জেরুজালেম দ্রুত পুনর্দখলের সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যায়। ক্রুসেডাররা আর এমন বড় বাহিনী সংগঠিত করতে পারছিল না, যা সহজে অভ্যন্তরীণ প্যালেস্টাইনে প্রবেশ করে শহরটি ধরে রাখতে পারে।
১২৪৪ সালের পর জেরুজালেম আর কখনো দীর্ঘস্থায়ীভাবে ক্রুসেডারদের রাজধানী হয়ে ওঠেনি। এটিই ঘটনাটির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক তাৎপর্য।
প্রথমবার ১০৯৯ সালে ক্রুসেডাররা শহর দখল করে প্রায় ৮৮ বছর ধরে রেখেছিল। ১১৮৭ সালে সালাহউদ্দিন সেটি পুনর্দখল করেন। ১২২৯ সালে ফ্রেডেরিক দ্বিতীয় আলোচনার মাধ্যমে আবার শহরটি লাভ করেন। কিন্তু দ্বিতীয় লাতিন নিয়ন্ত্রণ ছিল অনেক বেশি দুর্বল এবং স্থায়ী হয় মাত্র প্রায় পনেরো বছর।
এর কারণ শুধু খাওয়ারেজমীয় আক্রমণ নয়। লাতিন ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক কেন্দ্র তখন অনেকটাই উপকূলীয় অঞ্চলে সরে গিয়েছিল। একর ছিল তাদের প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক কেন্দ্র। ইউরোপ থেকে সাহায্য আসত সমুদ্রপথে। ফলে জেরুজালেমের ধর্মীয় মূল্য অপরিসীম হলেও বাস্তব সামরিক ব্যবস্থায় উপকূলীয় শহরগুলো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১২৪৪ সালের পতন পশ্চিম ইউরোপেও নতুন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। জেরুজালেম আবার হারানো এবং লা ফোরবির বিপর্যয়ের সংবাদ পশ্চিমা খ্রিস্টান সমাজে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে।
এই সংকটের প্রতিক্রিয়ায় নতুন ক্রুসেডের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে উঠে আসেন ফ্রান্সের রাজা নবম লুই, যিনি পরে সেন্ট লুই নামে পরিচিত হবেন। তাঁর নেতৃত্বেই ১২৪৮ সালে শুরু হবে সপ্তম ক্রুসেড।
কিন্তু লুইও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন—জেরুজালেম সরাসরি দখলের চেয়ে মিশরের শক্তি ভেঙে দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাঁর অভিযান আবার দামিয়েত্তা ও নীলনদীয় মিশরকে লক্ষ্য করবে।
এটি দেখায় পঞ্চম ক্রুসেডের ব্যর্থতার পরও মিশর-কেন্দ্রিক কৌশল পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়নি। কারণ পশ্চিমা নেতারা বুঝতে পারছিলেন, প্যালেস্টাইনের ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণের জন্য মিশরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
জেরুজালেমের ১২৪৪ সালের পতন আরেকটি বড় পরিবর্তনের পূর্বাভাসও বহন করছিল। আইয়ুবি বিশ্বের ভেতরের ক্ষমতার লড়াই থেকে খুব শিগগিরই মামলুক সামরিক শক্তির উত্থান ঘটবে। পরবর্তী কয়েক দশকে মামলুকরা ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলোর জন্য সালাহউদ্দিনের পর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতিপক্ষে পরিণত হবে।
বিশেষ করে ভবিষ্যৎ সুলতান বাইবার্স একের পর এক ক্রুসেডার দুর্গ ও শহর দখল করবেন। শেষ পর্যন্ত ১২৯১ সালে একরের পতনের মাধ্যমে লেভান্তের প্রধান লাতিন ক্রুসেডার রাষ্ট্রব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটবে।
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল ১২৪৪।
কারণ জেরুজালেমের পতন প্রমাণ করে যে ফ্রেডেরিক দ্বিতীয়ের কূটনৈতিক বিজয় শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি ছাড়া টেকসই ছিল না। একটি চুক্তির মাধ্যমে পবিত্র নগরী অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু সেই চুক্তি শেষ হয়ে গেলে শহর রক্ষা করার মতো দৃঢ় ব্যবস্থা ছিল না।
একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যের জোটরাজনীতির জটিলতাও প্রকাশ করে। ক্রুসেডাররা একদল মুসলিম শাসকের সঙ্গে মিলে অন্য মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল, আর মিশরীয় শাসক আবার মধ্য এশিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত খাওয়ারেজমীয় যোদ্ধাদের ব্যবহার করছিল।
ধর্মীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থ বহুবার ধর্মীয় সীমানাকে অতিক্রম করেছিল।
চিলড্রেনস ক্রুসেডের মতো কিংবদন্তিময় আন্দোলন বা প্রথম ক্রুসেডের সরল ধর্মীয় ভাষার তুলনায় ত্রয়োদশ শতাব্দীর লেভান্ত ছিল অনেক বেশি পরিণত ও জটিল রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে বাণিজ্য, রাজবংশীয় দ্বন্দ্ব, ভাড়াটে সৈন্য, সামরিক ধর্মীয় সংঘ এবং সাময়িক আন্তঃধর্মীয় জোট একসঙ্গে কাজ করছিল।
জেরুজালেম সেই জটিলতার মাঝখানে এক অসাধারণ প্রতীক ছিল। শহরটি ধর্মীয়ভাবে অমূল্য, কিন্তু সামরিকভাবে ক্রমেই কঠিন ও ব্যয়বহুল সম্পদে পরিণত হচ্ছিল।
১২৪৪ সালে খাওয়ারেজমীয়দের আক্রমণ তাই শুধু একটি শহরের পতন নয়। এটি প্রথম ক্রুসেডের পর থেকে চলা জেরুজালেমকেন্দ্রিক লাতিন রাজনৈতিক স্বপ্নের দ্বিতীয় এবং কার্যত শেষ বড় পতন।
পরবর্তী ক্রুসেডাররা অবশ্যই জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের কথা বলতে থাকবে। বিভিন্ন কূটনৈতিক পরিকল্পনা, সামরিক অভিযান এবং ইউরোপীয় রাজাদের শপথে পবিত্র নগরী গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। কিন্তু ১২৪৪ সালের পর লাতিনরা আর জেরুজালেমে স্থায়ী রাজনৈতিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
এই কারণেই ১২৪৪ সালের ঘটনাকে ১১৮৭ সালের পতনের সাধারণ পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা উচিত নয়। সালাহউদ্দিনের বিজয় ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐক্য ও সিদ্ধান্তমূলক সামরিক কৌশলের ফল; ১২৪৪ সালের পতন ছিল আইয়ুবি গৃহসংঘাত, ক্রুসেডারদের দুর্বল প্রতিরক্ষা, খাওয়ারেজমীয় বাস্তুচ্যুতি এবং অস্থির জোটরাজনীতির বিস্ফোরণ।
শেষ পর্যন্ত যে শহর দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক তলোয়ার ছাড়াই ফিরে পেয়েছিলেন, সেটিই মাত্র পনেরো বছর পর এমন এক বাহিনীর হাতে হারিয়ে গেল, যারা ইউরোপীয় ক্রুসেডার ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত শক্তিগুলোর বাইরের এক নতুন অস্থিতিশীলতার প্রতীক ছিল।
জেরুজালেমের ১২৪৪ সালের পতনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই—কূটনীতিতে কোনো পবিত্র নগরী ফিরে পাওয়া সম্ভব, কিন্তু তাকে ধরে রাখতে হলে চুক্তির বাইরেও প্রয়োজন স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তি, প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য। ক্রুসেডারদের হাতে সেই ভিত্তি আর ছিল না। ফলে খাওয়ারেজমীয় অশ্বারোহীরা যখন শহরের সামনে উপস্থিত হয়, তখন বহু শতাব্দীর ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র জেরুজালেম আবারও কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়।
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের পতন: উত্তরাধিকার সংকট ও দুর্বল সম্রাটদের যুগ
আওরঙ্গজেবের ধর্মনীতি ও বিদ্রোহ: জিজিয়া, রাজপুত, শিখ, জাট ও মারাঠা প্রতিরোধের ইতিহাস
শিবাজী ও মুঘল সাম্রাজ্য: আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে মারাঠা শক্তির উত্থানের ইতিহাস
আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য অভিযান: বিজাপুর, গোলকোন্ডা ও মারাঠাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধ
প্রথম এলিজাবেথ: যে রানির শাসনে ইংল্যান্ড হয়ে উঠেছিল বিশ্বশক্তি