লি হংঝাং ও প্রিন্স চিং: বক্সার প্রোটোকল স্বাক্ষরে চীনের দুই প্রধান আলোচকের ভূমিকা
Series: ক্রুসেড: ধর্ম, সাম্রাজ্য ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস
- Author: Admin
- August 19, 2026
বক্সার প্রোটোকল স্বাক্ষরে চীনের দুই প্রধান আলোচকের ভূমিকা
১৯০০ সালের আগস্টে আট জাতির জোট বেইজিং দখল করার পর চিং সাম্রাজ্যের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ছিল না; বরং পরাজয়ের মূল্য কতটা কমানো সম্ভব হবে, সেটিই হয়ে ওঠে প্রধান বিষয়। রাজধানী বিদেশি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে, সম্রাজ্ঞী বিধবা সিশি ও গুয়াংশু সম্রাট পশ্চিমে পালিয়ে গেছেন, উত্তর চীনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবস্থানগুলো ভেঙে পড়েছে এবং বিদেশি শক্তিগুলো কঠোর শাস্তির দাবি তুলছে। এই পরিস্থিতিতে চীনের পক্ষে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন দুই ভিন্ন পটভূমির কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি—লি হংঝাং এবং প্রিন্স চিং বা ইকুয়াং।
তাদের কাজ ছিল প্রায় অসম্ভব। তারা এমন কোনো শান্তি সম্মেলনে অংশ নিচ্ছিলেন না যেখানে দুই পক্ষের সামরিক শক্তি মোটামুটি সমান এবং উভয়েই আপস করতে বাধ্য। চীন ইতিমধ্যেই যুদ্ধে পরাজিত। বিদেশি বাহিনী তার রাজধানীতে অবস্থান করছে। ফলে লি হংঝাং ও প্রিন্স চিংয়ের প্রধান লক্ষ্য ছিল বিদেশি দাবিগুলো সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করা নয়; বরং যতটা সম্ভব শর্ত নরম করা, চিং রাজবংশকে টিকিয়ে রাখা এবং বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের পথ তৈরি করা।
দুই আলোচকের মধ্যে লি হংঝাং ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে অনেক বেশি পরিচিত। ১৮২৩ সালে জন্ম নেওয়া লি উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনায়কদের একজন। তাইপিং বিদ্রোহ দমন থেকে শুরু করে স্বশক্তিকরণ আন্দোলন, আধুনিক শিল্প, সামরিক বাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিদেশি কূটনীতি—প্রায় প্রতিটি বড় প্রশ্নে তার ভূমিকা ছিল।
লি বুঝেছিলেন যে পশ্চিমা সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় চিং সাম্রাজ্য পিছিয়ে আছে। তাই তিনি আধুনিক অস্ত্রাগার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নৌবাহিনী এবং পশ্চিমা প্রযুক্তি গ্রহণের পক্ষে কাজ করেছিলেন। কিন্তু তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় ট্র্যাজেডি ছিল—চীনের একের পর এক পরাজয়ের পর তাকেই বারবার বিদেশি শক্তির সঙ্গে কঠিন চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে হয়েছে।
১৮৯৪–১৮৯৫ সালের প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধে পরাজয়ের পর জাপানের সঙ্গে শিমোনোসেকি চুক্তির আলোচনায়ও লি হংঝাং চীনের প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন। সেখানে তিনি এমন কঠোর শর্তের মুখোমুখি হন, যার মধ্যে ছিল বিশাল ক্ষতিপূরণ এবং ভূখণ্ডগত ছাড়। আলোচনার সময় একজন জাপানি উগ্রপন্থীর গুলিতে তিনি আহতও হন।
ফলে ১৯০০ সালের সংকট যখন শুরু হয়, তখন বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে লি ছিলেন পরিচিত মুখ—একজন অভিজ্ঞ আলোচক, যিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা বুঝতেন এবং যার সঙ্গে সরাসরি দরকষাকষি করা সম্ভব।
বক্সার সংকটের সময় লি দক্ষিণ চীনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে ছিলেন। বেইজিং দরবার যখন বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের পথে এগোয়, তখন দক্ষিণ ও পূর্ব চীনের কয়েকজন শক্তিশালী প্রাদেশিক কর্মকর্তা সেই নীতির সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হননি। তারা বিদেশি শক্তির সঙ্গে সংঘর্ষকে নিজেদের অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া থেকে ঠেকাতে চেয়েছিলেন।
এই অবস্থান চিং সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক বিভক্তি প্রকাশ করলেও পরবর্তী শান্তি আলোচনায় লির জন্য একটি সুবিধা তৈরি করে। বিদেশিরা তাকে বক্সারপন্থী কট্টর দরবারি হিসেবে দেখত না। ফলে বিপর্যয়ের পর যখন একজন বিশ্বাসযোগ্য ও অভিজ্ঞ আলোচকের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন তার গুরুত্ব আবারও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে প্রিন্স চিং, যার ব্যক্তিগত নাম ছিল ইকুয়াং, ছিলেন চিং রাজপরিবারের সদস্য এবং বেইজিংয়ের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি লি হংঝাংয়ের মতো প্রাদেশিক সামরিক-প্রশাসনিক ক্ষমতার ভিত্তিতে উঠে আসেননি; তার শক্তি ছিল রাজদরবারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক প্রশাসনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
প্রিন্স চিং এর আগে জংলি ইয়ামেন, অর্থাৎ চিং সাম্রাজ্যের বিদেশবিষয়ক দপ্তরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ফলে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে যোগাযোগ, কূটনৈতিক প্রোটোকল এবং দরবারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল।
দুই ব্যক্তির ভূমিকা তাই একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। লি হংঝাং আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক; প্রিন্স চিং ছিলেন রাজদরবারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত রাজপরিবারের প্রতিনিধি। বিদেশিদের সঙ্গে একটি কার্যকর চুক্তি করতে যেমন লির অভিজ্ঞতা দরকার ছিল, তেমনি চিং সম্রাটের নামে সেই সমঝোতাকে বৈধ করার জন্য প্রিন্স চিংয়ের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৯০০ সালের আগস্টে বেইজিং পতনের পর রাজদরবার শিয়ানের দিকে চলে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। সম্রাজ্ঞী সিশি রাজধানীতে নেই, কিন্তু বিদেশি শক্তিগুলো বেইজিংয়ে বসেই চীনের সঙ্গে চূড়ান্ত বন্দোবস্ত করতে চাইছে। ফলে আলোচকদের একদিকে বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে দরকষাকষি করতে হচ্ছিল, অন্যদিকে দূরে অবস্থানরত রাজদরবারের অনুমোদনও নিশ্চিত করতে হচ্ছিল।
এটি যোগাযোগ ও রাজনৈতিক আস্থার বড় সমস্যা তৈরি করেছিল। কোনো শর্ত মেনে নিলে দরবারের রক্ষণশীল অংশ ক্ষুব্ধ হতে পারে; আবার বেশি কঠোর অবস্থান নিলে বিদেশি বাহিনী তাদের সামরিক দখল আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।
লি ও প্রিন্স চিং কার্যত দুই ধরনের চাপের মাঝখানে দাঁড়িয়েছিলেন—বাইরে বিজয়ী বিদেশি শক্তি, ভেতরে নিজের পরাজিত কিন্তু এখনও অত্যন্ত জটিল রাজদরবার।
বিদেশি পক্ষও একক শক্তি ছিল না। সামরিক অভিযানে আট জাতির জোট থাকলেও শান্তি বন্দোবস্তে মোট এগারো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা যুক্ত হয়। জার্মানি তার নিহত মন্ত্রী ক্লেমেন্স ফন কেটেলারের জন্য কঠোর প্রতিশোধ ও আনুষ্ঠানিক অনুশোচনা চাইছিল। রাশিয়ার মাঞ্চুরিয়ায় নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ ছিল। জাপান পূর্ব এশিয়ায় নিজের নতুন শক্তির অবস্থান প্রতিষ্ঠা করছিল। ব্রিটেন চীনের বাজার ও শক্তির ভারসাম্য নিয়ে চিন্তিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র চীনের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও উন্মুক্ত বাণিজ্যের নীতি সামনে রাখছিল।
ফলে লি হংঝাং ও প্রিন্স চিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ ছিল বিদেশি শক্তিগুলোর পারস্পরিক মতপার্থক্য কাজে লাগানো। তারা জানতেন, সব দেশ চীনকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে চায় না এবং ক্ষতিপূরণ বা শাস্তির মাত্রা নিয়েও তাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
তবে এই সুযোগের সীমা ছিল স্পষ্ট। বিদেশি শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়ালেও বক্সার সংকটের জন্য চীনকে শাস্তি দিতে হবে—এই মৌলিক প্রশ্নে তারা একমত ছিল।
১৯০০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বিদেশি শক্তিগুলো তাদের প্রধান দাবিগুলো সমন্বিত করে চীনের সামনে উপস্থাপন করে। এসব দাবির মধ্যে ছিল বিদেশিবিরোধী সহিংসতার জন্য দায়ী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের শাস্তি, জার্মান মন্ত্রী কেটেলার হত্যার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুশোচনা, বিপুল আর্থিক ক্ষতিপূরণ, দাগু দুর্গ ধ্বংস, অস্ত্র আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা এবং লেগেশন কোয়ার্টারের নিরাপত্তার জন্য বিদেশি সেনা রাখার অধিকার।
চীনা আলোচকদের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্নগুলোর একটি ছিল চিং রাজপরিবার ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের শাস্তি। বিদেশিরা নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চাইছিল। কিন্তু তাদের অনেকেই ছিলেন রাজপরিবারের সদস্য বা দরবারের প্রভাবশালী কর্মকর্তা।
এখানে লি ও প্রিন্স চিংকে অত্যন্ত সতর্কভাবে কাজ করতে হয়। বিদেশিদের দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করলে আলোচনা ভেঙে পড়তে পারে। আবার রাজপরিবারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিদেশি নির্দেশে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে চিং দরবারের মর্যাদা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আরও বিপর্যস্ত হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কিছু কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড বা আত্মহত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়, অন্যদের নির্বাসন ও পদচ্যুতির মতো শাস্তি দেওয়া হয়। প্রিন্স দুয়ানের মতো প্রভাবশালী বক্সারপন্থী ব্যক্তিকে রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নির্বাসিত করা হয়।
এখানে আলোচকদের সাফল্য ছিল শর্ত বাতিল করা নয়; বরং কিছু ক্ষেত্রে শাস্তির প্রকৃতি নিয়ে সমঝোতার সুযোগ বের করা। পরাজিত রাষ্ট্রের কূটনীতিতে এটাই ছিল বাস্তব সীমা।
ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন আরও কঠিন ছিল। বিদেশি সরকার, সামরিক বাহিনী, নাগরিক, ব্যবসা ও মিশনারি প্রতিষ্ঠানের দাবিগুলো একত্রিত হয়ে বিপুল অঙ্কে পৌঁছায়। শেষ পর্যন্ত চীনের ওপর ৪৫০ মিলিয়ন হাইকওয়ান টেল রুপার মূল ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়।
লি হংঝাং বিশেষভাবে বুঝতে পেরেছিলেন এই অঙ্ক চীনের অর্থব্যবস্থার জন্য কতটা বিপজ্জনক। চিং সরকার আগের যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ও বিদেশি ঋণের চাপেই ছিল। নতুন করে এত বিপুল অর্থ দেওয়া রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাকে কয়েক দশকের জন্য চাপে ফেলবে।
চীনা প্রতিনিধিরা ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ও পরিশোধপদ্ধতি নিয়ে দরকষাকষি করেন। কিন্তু বিদেশি দাবির সামগ্রিক অঙ্ক নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনার ক্ষমতা তাদের ছিল না। শেষ পর্যন্ত ৪৫০ মিলিয়ন টেলের ওপর বার্ষিক ৪ শতাংশ সুদসহ ৩৯ বছরে পরিশোধের ব্যবস্থা গৃহীত হয়।
এটি লি হংঝাংয়ের কূটনৈতিক জীবনের নির্মম বাস্তবতাকে আবার সামনে আনে। তিনি একজন আলোচক হিসেবে দক্ষ ছিলেন, কিন্তু কূটনীতি সামরিক শক্তির বিকল্প হতে পারে না। যুদ্ধক্ষেত্রে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ পরাজিত হলে সবচেয়ে দক্ষ আলোচকও বিজয়ীর প্রধান দাবিগুলো সহজে বাতিল করতে পারেন না।
লেগেশন কোয়ার্টার নিয়েও একই পরিস্থিতি দেখা যায়। বিদেশিরা ১৯০০ সালের ৫৫ দিনের অবরোধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বেইজিংয়ে নিজেদের দূতাবাস এলাকাকে সামরিকভাবে সুরক্ষিত করতে চায়। শেষ পর্যন্ত সেখানে বিদেশি প্রহরী রাখার এবং এলাকাটিকে বিশেষ সুরক্ষিত অঞ্চলে পরিণত করার অধিকার স্বীকৃত হয়।
আরও গুরুতর ছিল বেইজিং থেকে সমুদ্র পর্যন্ত যোগাযোগপথে বিদেশি সেনা রাখার ব্যবস্থা এবং দাগু দুর্গ ধ্বংস। এগুলো চীনের সামরিক সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছিল।
লি ও প্রিন্স চিং এসব শর্তের রাজনৈতিক মূল্য বুঝতেন। কিন্তু তাদের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল বিদেশি দখলকে অনির্দিষ্টকাল স্থায়ী হতে না দেওয়া এবং চিং দরবারের বেইজিংয়ে প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরি করা।
এখানেই তাদের ভূমিকার মূল্যায়ন জটিল হয়ে ওঠে। পরবর্তী জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে অসম চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তাদের অনেক সময় সহজেই “বিদেশিদের কাছে নতি স্বীকারকারী” হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। লি হংঝাং বিশেষভাবে এমন সমালোচনার শিকার হন, কারণ তার নাম শিমোনোসেকি চুক্তিসহ একাধিক অপমানজনক বন্দোবস্তের সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু এই মূল্যায়নে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—তাদের হাতে বাস্তবে কী বিকল্প ছিল?
১৯০০–১৯০১ সালে চীনের রাজধানী বিদেশি সামরিক নিয়ন্ত্রণে। চিং সেনাবাহিনী পরাজিত। রাজদরবার পালিয়ে গেছে। বিদেশি শক্তিগুলো চাইলে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে পারে। এই অবস্থায় আলোচক পরিবর্তন করলেই শক্তির ভারসাম্য বদলে যেত না।
লি হংঝাং ও প্রিন্স চিংয়ের কাজ তাই বিজয় অর্জন করা ছিল না। তাদের কাজ ছিল একটি বিপর্যয়কে এমন পর্যায়ে থামানো, যাতে চিং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বজায় থাকে এবং বিদেশি শক্তিগুলো পুরো সাম্রাজ্যকে সরাসরি ভাগ করে নেওয়ার পথে না যায়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের কূটনীতির একটি বড় ফল ছিল—চিং রাজবংশ ধ্বংস হয়নি। কঠোর শর্ত সত্ত্বেও চীনের কেন্দ্রীয় সরকার বহাল থাকে। বিদেশি শক্তিগুলো বেইজিংয়ে বিশেষ সামরিক অধিকার পেলেও পুরো চীনকে আনুষ্ঠানিক উপনিবেশে পরিণত করেনি।
এটি অবশ্য শুধু লি ও প্রিন্স চিংয়ের সাফল্য ছিল না। বিদেশি শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং চীনকে সম্পূর্ণ ভাগ করে দেওয়ার সম্ভাব্য বিপদও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবু চীনা আলোচকেরা এই আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মধ্যে যতটা সম্ভব রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন।
আলোচনার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় প্রিন্স চিংয়ের বিশেষ গুরুত্ব ছিল রাজদরবারের সঙ্গে যোগাযোগ ও রাজনৈতিক অনুমোদন নিশ্চিত করা। তিনি বিদেশি প্রতিনিধিদের কাছে এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি চিং রাজপরিবারের পক্ষ থেকে কথা বলতে পারেন এবং চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে দরবারকে প্রভাবিত করতে পারেন।
অন্যদিকে লি হংঝাংয়ের শক্তি ছিল বিশদ কূটনৈতিক দরকষাকষি, আন্তর্জাতিক শক্তির স্বার্থ বোঝা এবং চীনের আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা। একজন প্রতিনিধিত্ব করছিলেন সাম্রাজ্যিক বৈধতা, অন্যজন নিয়ে এসেছিলেন কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা।
অবশেষে ১৯০১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বেইজিংয়ে চূড়ান্ত প্রোটোকল স্বাক্ষরিত হয়। চীনের পক্ষে লি হংঝাং ও প্রিন্স চিং পূর্ণক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হিসেবে এতে স্বাক্ষর করেন। বিদেশি পক্ষে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রেট ব্রিটেন, ইতালি, জাপান, নেদারল্যান্ডস, রাশিয়া, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা যুক্ত ছিলেন।
চুক্তির মাধ্যমে বক্সার সংকটের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু চীনের জন্য এর মূল্য ছিল বিশাল—৪৫০ মিলিয়ন টেল ক্ষতিপূরণ, দীর্ঘমেয়াদি সুদ, কর্মকর্তাদের শাস্তি, বিদেশিবিরোধী সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, দাগু দুর্গ ধ্বংস, অস্ত্র আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা, লেগেশন কোয়ার্টারে বিদেশি সেনা এবং রাজধানী থেকে সমুদ্র পর্যন্ত কৌশলগত পথে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি।
লি হংঝাংয়ের জন্য এটিই ছিল জীবনের শেষ বড় রাজনৈতিক কাজ। প্রোটোকল স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে এবং ১৯০১ সালের ৭ নভেম্বর তিনি মারা যান। জীবনের শেষ পর্যায়েও তাকে এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হয়েছিল, যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে জাতীয় অপমানের প্রতীক হয়ে থাকবে।
তার উত্তরাধিকার তাই বিতর্কিত। একদিকে তিনি চীনের আধুনিকায়নের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা, শিল্প ও সামরিক সংস্কারের পৃষ্ঠপোষক এবং বাস্তববাদী কূটনীতিক। অন্যদিকে তার নাম একাধিক অসম ও অপমানজনক চুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
কিন্তু লি হংঝাংয়ের ট্র্যাজেডি সম্ভবত এখানেই—তিনি যে চুক্তিগুলো স্বাক্ষর করেছিলেন, সেগুলোর কঠোরতা অনেকাংশে তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতার চেয়ে চিং রাষ্ট্রের সামরিক দুর্বলতার প্রতিফলন। তিনি প্রায়ই এমন যুদ্ধের পর আলোচনার টেবিলে বসেছিলেন, যেগুলো তিনি নিজে শুরু করেননি কিন্তু যার পরাজয়ের মূল্য তাকে কূটনৈতিকভাবে সামলাতে হয়েছে।
প্রিন্স চিংয়ের রাজনৈতিক জীবন আরও দীর্ঘ হয়। বক্সার সংকটের পর তিনি চিং সরকারের উচ্চপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখেন এবং পররাষ্ট্র প্রশাসনের পুনর্গঠনেও ভূমিকা রাখেন। পুরোনো জংলি ইয়ামেনের পরিবর্তে আধুনিক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি নতুন কূটনৈতিক কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত হন।
তার ভূমিকার মধ্যেও একই দ্বৈততা দেখা যায়। একদিকে তিনি এমন একটি প্রোটোকলে স্বাক্ষর করেছেন যা চীনের সার্বভৌমত্ব সীমিত করেছে; অন্যদিকে তার সামনে মূল প্রশ্ন ছিল রাজবংশকে সম্পূর্ণ বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় চিং সরকারের কার্যকর অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
বক্সার প্রোটোকল স্বাক্ষরের পর সম্রাজ্ঞী সিশি ও গুয়াংশু সম্রাট শেষ পর্যন্ত বেইজিংয়ে ফিরে আসতে সক্ষম হন। রাজদরবার পুনরায় রাজধানীতে বসে এবং চিং সরকার নতুন নীতি বা শিনঝেং সংস্কার শুরু করে। সেনাবাহিনী, শিক্ষা, প্রশাসন ও রাষ্ট্রব্যবস্থা আধুনিক করার প্রচেষ্টা দ্রুততর হয়।
তবে প্রোটোকল যে রাজনৈতিক ক্ষত তৈরি করেছিল তা আর সহজে মুছে যায়নি। চীনা জনগণের একটি ক্রমবর্ধমান অংশের কাছে রাজবংশটি বিদেশি শক্তির সামনে দুর্বল ও আপসকামী বলে প্রতীয়মান হতে থাকে। বিপ্লবীরা এই অপমানকে চিংবিরোধী প্রচারে ব্যবহার করে।
১৯১১ সালের বিপ্লবের দিকে যাওয়া পথে বক্সার বিপর্যয় ও তার শান্তিচুক্তি তাই গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছিল।
লি হংঝাং ও প্রিন্স চিংয়ের ভূমিকা মূল্যায়ন করতে হলে তাই তাদের স্বাক্ষর করা কঠোর শর্তগুলোর তালিকা দেখাই যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে সেই মুহূর্তে চীন কোথায় দাঁড়িয়েছিল। তারা শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে বিদেশিদের সঙ্গে সুবিধা ভাগাভাগি করছিলেন না; তারা এমন একটি সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি ছিলেন যার রাজধানী ইতিমধ্যেই বিজয়ী বাহিনীর দখলে।
তাদের আলোচনার প্রকৃত প্রশ্ন ছিল “চীন কতটা লাভ করবে?” নয়, বরং “চীন আর কতটা হারানো থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবে?”
এই বাস্তবতাই ১৯০১ সালের শান্তি আলোচনার চরিত্র নির্ধারণ করে। লি হংঝাং তার দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং প্রিন্স চিং তার রাজদরবারি কর্তৃত্ব ব্যবহার করে বিদেশি শক্তির সঙ্গে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন, যা কঠোর ও অপমানজনক হলেও অন্তত যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাবে এবং চিং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বজায় রাখবে।
তাই লি হংঝাং ও প্রিন্স চিংকে শুধু “বক্সার প্রোটোকলে স্বাক্ষরকারী দুই ব্যক্তি” হিসেবে দেখলে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তারা ছিলেন পরাজিত চীনের সংকট-আলোচক—যাদের সামনে ভালো ও খারাপ চুক্তির মধ্যে নির্বাচন করার সুযোগ ছিল না; বরং নির্বাচন ছিল একটি অত্যন্ত কঠোর বন্দোবস্ত মেনে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা, নাকি আরও দীর্ঘ সামরিক দখল ও অনিশ্চিত বিভাজনের ঝুঁকি নেওয়া।
১৯০১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তাদের স্বাক্ষর সেই কঠিন বাস্তবতারই চূড়ান্ত প্রতীক হয়ে ওঠে। বক্সার প্রোটোকল চীনের অপমানের দলিল হলেও লি হংঝাং ও প্রিন্স চিংয়ের ভূমিকা একই সঙ্গে চিং সাম্রাজ্যের দুর্বলতা, বাস্তববাদী কূটনীতি এবং সামরিক পরাজয়ের পর সীমিত বিকল্পের ইতিহাস।
বক্সার প্রোটোকল থেকে ১৯১১ সালের বিপ্লব: অসম চুক্তি কীভাবে চিং রাজবংশের পতন ত্বরান্বিত করেছিল
বক্সার প্রোটোকলের পর চিং সংস্কার: অপমানজনক পরাজয় কীভাবে চীনকে আধুনিকায়নের পথে ঠেলে দেয়
চতুর্থ ক্রুসেড (১২০২–১২০৪): জেরুজালেমের বদলে খ্রিস্টান কনস্টান্টিনোপল কেন আক্রান্ত হয়েছিল?
রিচার্ড ও সালাহউদ্দিনের সন্ধি: যুদ্ধ করেও কেন জেরুজালেম জয় করতে পারেননি লায়নহার্ট?