থ্রি গর্জেস বাঁধ: বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

থ্রি গর্জেস বাঁধ: বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিস্ময় ও বিতর্ক

সিরিজ: বিশ্বের বিস্ময়কর বাঁধ ও প্রকৌশল কীর্তি

থ্রি গর্জেস বাঁধ: বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিস্ময় ও বিতর্ক
ইয়াংজির বুকে বিদ্যুৎ, উন্নয়ন ও পরিবর্তনের ইতিহাস

চীনের ইয়াংজি নদীর ওপর থ্রি গর্জেস বাঁধ এমন একটি প্রকল্প, যার আকার বোঝাতে শুধু উচ্চতা বা দৈর্ঘ্য যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, দীর্ঘ জলাধার, জাহাজ চলাচলের বিশেষ ব্যবস্থা এবং বিপুল মানুষের পুনর্বাসন। হুবেই প্রদেশের ইচাংয়ের কাছে সানদৌপিংয়ে নির্মিত প্রকল্পটির স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২২,৫০০ মেগাওয়াট। এই মানদণ্ডে এটি বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎকেন্দ্র। তবে সবচেয়ে উঁচু বাঁধ কিংবা সবচেয়ে বড় জলাধার—সব রেকর্ড এর নয়। থ্রি গর্জেসের বিশেষত্ব মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপুল সামর্থ্য এবং বহুমুখী প্রভাবের মধ্যে।

“থ্রি গর্জেস” নামটি এসেছে ইয়াংজির ছুতাং, উ এবং শিলিং—এই তিন বিখ্যাত গিরিখাত থেকে। বহু শতাব্দী ধরে অঞ্চলটি চীনের সাহিত্য, চিত্রকলা ও নৌযাত্রার ইতিহাসে পরিচিত। নদীটি দেশের অভ্যন্তরভাগকে পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে, আবার ভয়াবহ বন্যার কারণও হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই সুন ইয়াত-সেন ইয়াংজির শক্তি কাজে লাগানোর ধারণা তুলে ধরেছিলেন। পরবর্তী দশকগুলোতে জরিপ ও পরিকল্পনা চললেও প্রযুক্তি, ব্যয়, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে সময় লাগে।

থ্রি গর্জেস নির্মাণের অন্যতম প্রধান যুক্তি ছিল বন্যার সর্বোচ্চ প্রবাহ কমানো। ইয়াংজির মধ্য ও নিম্ন অববাহিকায় ঘনবসতি, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ নগর রয়েছে। উজান থেকে বড় বন্যা এলে জলাধারে কিছু পানি সাময়িকভাবে ধরে রেখে ভাটিতে একসঙ্গে নেমে যাওয়া প্রবাহ কমানো সম্ভব। কিন্তু একটি বাঁধ পুরো অববাহিকার বন্যা দূর করতে পারে না। ভাটির উপনদী, স্থানীয় প্রবল বৃষ্টি, হ্রদ ও প্লাবনভূমির অবস্থা এবং অন্যান্য বাঁধের পরিচালনাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এর বন্যা নিয়ন্ত্রণকে একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বুঝতে হয়।

১৯৯২ সালে চীনের জাতীয় গণকংগ্রেস প্রকল্পটি অনুমোদন করে এবং ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিক নির্মাণ শুরু হয়। কাজ চলেছে ধাপে ধাপে, কারণ ইয়াংজির মতো ব্যস্ত ও শক্তিশালী নদীতে একসঙ্গে পুরো প্রবাহ বন্ধ করা সম্ভব ছিল না। অস্থায়ী প্রতিবন্ধক, বিকল্প প্রবাহপথ এবং পর্যায়ক্রমিক নির্মাণের সাহায্যে মূল কাঠামো তৈরি করা হয়। ২০০৩ সালে জলাধারে পানি সঞ্চয় ও বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। মূল বাঁধের নির্মাণ, বাকি জেনারেটর এবং নৌপরিবহন অবকাঠামো পরবর্তী সময়ে সম্পন্ন হয়; প্রধান উৎপাদন ইউনিটগুলোর পূর্ণ স্থাপন শেষ হয় ২০১২ সালে।

থ্রি গর্জেস একটি কংক্রিট গ্র্যাভিটি বাঁধ। নিজের বিপুল ওজন দিয়ে এটি পানির চাপ প্রতিরোধ করে। মূল নদীরোধী কাঠামো প্রায় ২.৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, আর সর্বোচ্চ কাঠামোগত উচ্চতা প্রায় ১৮১ মিটার। বাঁধের ওপরের অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত—এই উচ্চতা ও কাঠামোর নিজের উচ্চতা এক বিষয় নয়। বিশাল কংক্রিটের তাপ নিয়ন্ত্রণ, ভিত্তির শিলা প্রস্তুত করা, ফাটল ও চুইয়ে পড়া পানি পর্যবেক্ষণ এবং নির্মাণের মান বজায় রাখা ছিল প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জলাধারের পানি প্রবেশপথ দিয়ে টারবাইনে পৌঁছায়। উঁচু ও নিচু জলস্তরের পার্থক্য কাজে লাগিয়ে টারবাইন ঘোরে এবং জেনারেটর বিদ্যুৎ তৈরি করে। প্রকল্পে ৭০০ মেগাওয়াটের ৩২টি প্রধান ইউনিটের সঙ্গে দুটি ছোট ইউনিট মিলিয়ে মোট ক্ষমতা ২২,৫০০ মেগাওয়াট। এই ক্ষমতা সারা বছর একই হারে উৎপাদনের নিশ্চয়তা নয়। নদীর প্রবাহ, জলাধারের স্তর, বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের কারণে প্রকৃত উৎপাদন বদলায়। উৎপন্ন বিদ্যুৎ দূরবর্তী শিল্প ও নগরাঞ্চলে পাঠাতে বিশাল সঞ্চালনব্যবস্থাও দরকার হয়েছে।

ইয়াংজির নৌপরিবহনে বাঁধটি একই সঙ্গে বাধা ও নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। জলাধারে পানির গভীরতা বাড়ায় উজানের কিছু অংশে বড় জাহাজ চলাচল সহজ হয়েছে। কিন্তু বাঁধের দুই পাশের জলস্তরের পার্থক্য পেরোতে বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাঁচ ধাপের শিপ লকে জাহাজ এক কক্ষ থেকে পরের কক্ষে গিয়ে ধীরে ধীরে ওপরে ওঠে বা নিচে নামে। আলাদা জাহাজ উত্তোলনব্যবস্থায় পানিভরা প্রকোষ্ঠসহ জাহাজকে উল্লম্বভাবে সরানো যায়। এ ব্যবস্থা ২০১৬ সালে পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু করে। ফলে বাঁধটি শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, একটি জটিল পরিবহন অবকাঠামোও।

প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সামাজিক পরিবর্তন ছিল প্রায় ১৩ লাখ মানুষের স্থানান্তর। জলাধারের আওতায় পড়া শহর, গ্রাম, কৃষিজমি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সরাতে হয়েছে। অনেকের জন্য নতুন বাড়ি ও অবকাঠামো তৈরি করা হলেও পুনর্বাসন মানে শুধু নতুন ঠিকানা পাওয়া নয়। নদীতীরের জমির বদলে অন্য ধরনের জমি পাওয়া, পেশা পরিবর্তন, পুরোনো বাজার ও প্রতিবেশী সম্পর্ক হারানো—এসবও মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছে। কারও সুযোগ বেড়েছে, আবার কারও জীবিকা পুনর্গঠন কঠিন হয়েছে। তাই পুনর্বাসনের সাফল্য শুধু নির্মিত ঘরের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না।

ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নিয়েও বড় উদ্বেগ ছিল। জলাধার ভরার আগে বহু স্থানে জরিপ, খনন এবং নিদর্শন উদ্ধারের কাজ চলে; কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা স্থানান্তর করা হয়। তবু প্রতিটি নিদর্শন বা তার মূল পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। একটি মন্দির সরিয়ে নেওয়া গেলেও নদী, পাহাড়, জনপদ ও যাত্রাপথের সঙ্গে তার পুরোনো সম্পর্ক একইভাবে ফিরিয়ে আনা যায় না। থ্রি গর্জেসের সাংস্কৃতিক ক্ষতি তাই উদ্ধার করা বস্তু এবং স্থানান্তরিত স্থাপনার হিসাবের বাইরেও বিস্তৃত।

নদীর পলি পরিবহনেও গভীর পরিবর্তন এসেছে। জলাধারে প্রবাহ ধীর হওয়ায় পলির একটি অংশ সেখানে জমে, ফলে ভাটিতে পৌঁছানো পলির পরিমাণ কমে। এতে নদীতল ও তীরের ক্ষয়, বালুচর এবং দূরের বদ্বীপের পলি সরবরাহ প্রভাবিত হতে পারে। তবে ইয়াংজির সব পরিবর্তনের জন্য একমাত্র থ্রি গর্জেসকে দায়ী করা ঠিক নয়; উজানের অন্য বাঁধ, ভূমি ব্যবহার এবং বালি উত্তোলনেরও ভূমিকা রয়েছে। জলাধারের জলস্তর ওঠানামা পাহাড়ি ঢালের স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করতে পারে, তাই ভূমিধস পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ব্যবস্থাপনা জরুরি।

মাছের প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় প্রবাহের ঋতুচক্র, পানির তাপমাত্রা এবং নদীর সংযোগ বদলে যাওয়াও পরিবেশগত উদ্বেগের অংশ। অন্যদিকে বিপুল জলবিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উৎপাদনের একটি অংশ প্রতিস্থাপনের সুযোগ দেয়। এই সুবিধা মূল্যায়নের সময় নির্মাণ, পুনর্বাসন ও বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনও বিবেচনায় রাখতে হয়। থ্রি গর্জেসের অর্জন বাস্তব, তার ক্ষতিও বাস্তব। এই প্রকল্পের ইতিহাস দেখায়, বিশাল অবকাঠামোর সাফল্য পরিমাপ করতে বিদ্যুতের মেগাওয়াটের পাশাপাশি মানুষের জীবিকা এবং নদীর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনও গণনায় আনতে হয়।