ব্ল্যাক ডেথের সমাপ্তি ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব: প্লেগের……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ব্ল্যাক ডেথের সমাপ্তি ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব: প্লেগের প্রত্যাবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের বিকাশ

সিরিজ: ব্ল্যাক ডেথ: ইউরোপের ভয়াবহ মহামারি

ব্ল্যাক ডেথের সমাপ্তি ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব: প্লেগের প্রত্যাবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের বিকাশ
প্লেগের পুনরাবৃত্তি থেকে সংগঠিত জনস্বাস্থ্য রক্ষার দীর্ঘ যাত্রা।

১৩৫৩ সালের দিকে ইউরোপজুড়ে ব্ল্যাক ডেথের প্রথম বিশাল বিস্তারপর্ব স্তিমিত হয়ে আসে। অনেক জনপদে বাজার খুলতে থাকে, জমিতে চাষ ফেরে এবং প্রশাসনিক কাজ আবার চলতে শুরু করে। কিন্তু মানুষ যে বিপর্যয় কাটিয়ে উঠছিল, তার জীবাণু অদৃশ্য হয়ে যায়নি। পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে প্লেগ বারবার ফিরে এসে শহর ও গ্রামকে বিপর্যস্ত করে। ব্ল্যাক ডেথের প্রথম ঢেউয়ের সমাপ্তি এবং ইউরোপ থেকে প্লেগের পশ্চাদপসরণ আলাদা ঘটনা। এই পার্থক্য বুঝলেই মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিকাশের ইতিহাস পরিষ্কার হয়।

প্রথম বিস্তারপর্ব কেন কমে এসেছিল, তার একক নিশ্চিত ব্যাখ্যা নেই। আক্রান্ত জনপদে সংক্রমণের সুযোগ পরিবর্তিত হওয়া, মানুষের চলাচল কমা, মৌসুমি পরিবেশ এবং প্রাণী ও পরজীবীর সংক্রমণচক্রে পরিবর্তন ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু মানুষ বেঁচে গেলেও তাদের উপস্থিতি থেকে পুরো সমাজ স্থায়ী সুরক্ষা পেয়েছিল বলা যায় না। সব সম্ভাব্য আক্রান্ত মানুষ মারা যাওয়ায় প্লেগ শেষ হয়েছিল—এমন সরল ব্যাখ্যাও ভুল। বিভিন্ন এলাকায় রোগ ভিন্ন সময়ে প্রবেশ করেছে, তীব্র হয়েছে এবং কমেছে; ইউরোপের জন্য এক দিনের সমাপ্তি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

১৩৬১–১৩৬২ সালে ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে আবার বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। কিছু বিবরণে শিশু ও তরুণদের মৃত্যুর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী দশকগুলোতেও নতুন ঢেউ ফিরে আসে। তবে প্রত্যেক ঢেউয়ের রোগীর বয়স, মৃত্যুহার বা বিস্তারের পরিধি এক ছিল না। কোনো শহর এক প্রাদুর্ভাবে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হলেও অন্যবার তুলনামূলকভাবে রক্ষা পেতে পারত। ফলে মধ্যযুগের শেষভাগে প্লেগকে একবারের দুর্ঘটনা হিসেবে নয়, বারবার ফিরে আসতে পারে এমন সামাজিক বিপদ হিসেবে দেখতে শেখে নগরসমাজ।

এই পুনরাবৃত্তিই জনসংখ্যা পুনরুদ্ধারকে কঠিন করে তোলে। একটি পরিবার নতুন সন্তান নিয়ে বা অভিবাসনের মাধ্যমে ক্ষতি কিছুটা পূরণ করার আগেই আরেকটি ঢেউ আসতে পারত। যুদ্ধ, অন্যান্য রোগ এবং খাদ্যসংকটও মৃত্যুর চাপ বাড়াত। জন্মহার বাড়লেই তাই দ্রুত আগের জনসংখ্যায় ফেরা সম্ভব হয়নি। কোনো এলাকার জনসংখ্যা স্থিতিশীল হওয়া, বৃদ্ধি শুরু হওয়া এবং মহামারির আগের সংখ্যায় পৌঁছানোও তিনটি পৃথক পর্যায়। পুনরুদ্ধার বলতে কোন পর্যায় বোঝানো হচ্ছে, তা না বললে সময়ের হিসাব বিভ্রান্তিকর হয়।

ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার দীর্ঘ নিম্নগতি ও স্থবিরতার পর ষোড়শ শতকে বৃদ্ধির ধারা স্পষ্ট হয়। লন্ডনের জনসংখ্যাও মহামারির আগের অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় নিয়েছিল। কিন্তু ইংল্যান্ডের অভিজ্ঞতাকে গোটা ইউরোপের অভিন্ন সময়সূচি ভাবা যায় না। কোনো অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে আগে বৃদ্ধি শুরু হয়, অন্যত্র নতুন বিপর্যয় তা পিছিয়ে দেয়। নগরে অভিবাসন গুরুত্বপূর্ণ ছিল: শহরের বাসিন্দা বাড়লেও আশপাশের গ্রামের সংখ্যা একই হারে বাড়ছিল না। স্থানীয় পুনরুদ্ধার কখনো বৃহত্তর অঞ্চলের মানুষের স্থানান্তরের ফলও হতে পারত।

জনসংখ্যা কম থাকা অবস্থায় জমি, শ্রম ও সম্পত্তির সম্পর্ক বদলে যায়। বেঁচে থাকা কিছু মানুষ উত্তরাধিকারসূত্রে বেশি সম্পদ পান; শ্রমিকসংকট অনেক ক্ষেত্রে ভালো পারিশ্রমিকের সুযোগ তৈরি করে। অন্যদিকে পরিবারহীন শিশু, উপার্জন হারানো মানুষ এবং ছোট ব্যবসার মালিকেরা বিপদে পড়েন। কোনো কোনো অঞ্চলে জমির ব্যবহার বদলায় এবং ব্যক্তিগত অধীনতার সম্পর্ক দুর্বল হয়। তবে মহামারির পর সব মানুষের জীবন উন্নত হয়েছিল—এমন সিদ্ধান্ত টেকে না। লাভ ও ক্ষতির বণ্টন নির্ভর করেছিল সামাজিক অবস্থান, অধিকার এবং স্থানীয় ক্ষমতার ওপর।

প্লেগের প্রত্যাবর্তন চিকিৎসার বাইরেও প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রয়োজন সামনে আনে। অসুস্থ ব্যক্তির পরিচর্যার পাশাপাশি শহরে রোগ প্রবেশের পথ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু হয়। ১৩৭৭ সালে রাগুসা, বর্তমান দুব্রোভনিক, আক্রান্ত অঞ্চল থেকে আসা আগন্তুকদের জন্য ৩০ দিনের পৃথকবাসের বিধান করে। এর উদ্দেশ্য ছিল অপেক্ষার মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পায় কি না দেখা এবং নগরের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত রাখা। জীবাণু শনাক্ত হওয়ার বহু আগেই পর্যবেক্ষণ ও চলাচল নিয়ন্ত্রণকে প্রতিরোধের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানে ৪০ দিনের অপেক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত হয়; সেখান থেকে কোয়ারেন্টাইন নামটি আসে। ভেনিসে ১৪২৩ সালে দ্বীপভিত্তিক স্থায়ী প্লেগ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পরে অসুস্থ মানুষ এবং সন্দেহভাজন আগন্তুকদের জন্য পৃথক স্থাপনার ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠানে খাদ্য, আশ্রয়, পাহারা, চিকিৎসা ও দাফনের দায়িত্ব সংগঠিত করতে হতো। ফলে মহামারি মোকাবিলা সাময়িক আতঙ্কের প্রতিক্রিয়া থেকে ধীরে ধীরে নিয়ম, কর্মী ও অর্থায়ননির্ভর প্রশাসনিক কাজে পরিণত হয়।

স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দপ্তর ও কর্মকর্তা এই ব্যবস্থাকে স্থায়িত্ব দেন। বন্দরে জাহাজের আগমনের খবর নেওয়া, যাত্রাপথ পরীক্ষা, পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ এবং মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ তাঁদের কাজের অংশ হয়ে ওঠে। কোথাও যাত্রাস্থানের স্বাস্থ্যপরিস্থিতি জানাতে সনদ ব্যবহার করা হতো। তবে কাগজপত্র থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো না। রোগ গোপন করা, ভুল তথ্য এবং বাণিজ্যিক চাপ ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারত। জনস্বাস্থ্য রক্ষার সঙ্গে ব্যবসা চালু রাখার দ্বন্দ্ব তাই শুরু থেকেই ছিল।

এই ব্যবস্থাগুলো মানবিক প্রশ্নও তৈরি করেছিল। পৃথক রাখা মানুষের খাবার ও আয়ের ব্যবস্থা না থাকলে নিয়ম মানা কঠিন হতো। বাড়িতে আটকে রাখার সিদ্ধান্ত রোগী ও পরিবারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারত। দরিদ্র মানুষ ও বহিরাগতদের প্রতি বৈষম্যও দেখা দিত। জনস্বাস্থ্যের ইতিহাস কেবল ভালো নিয়ম তৈরির ইতিহাস নয়; সেই নিয়ম কার ওপর কী বোঝা চাপিয়েছে, তার ইতিহাসও। কার্যকর প্রশাসনের জন্য নজরদারির পাশাপাশি বাস্তব সহায়তার প্রয়োজন ছিল, যদিও সব কর্তৃপক্ষ তা দিতে পারেনি।

নতুন প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও ইউরোপে বড় মহামারি থামেনি। সপ্তদশ শতকের ইতালীয় শহরগুলো এবং ১৬৬৫ সালের লন্ডন আবার বিপর্যস্ত হয়। লন্ডনের ক্ষেত্রে একটি বহুল প্রচলিত গল্প হলো, ১৬৬৬ সালের মহাঅগ্নিকাণ্ড ইঁদুর ও পিসু ধ্বংস করে প্লেগ শেষ করেছিল। কিন্তু আগুনের আগেই মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছিল, আগুনের পরও প্লেগে মৃত্যু নথিবদ্ধ হয়েছে এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সব এলাকা পুড়েও যায়নি। আগুনকে প্লেগের নিশ্চিত সমাধান হিসেবে দেখানো ঐতিহাসিকভাবে সমর্থিত নয়।

১৭২০–১৭২২ সালের মার্সেই ও প্রোভঁসের প্রাদুর্ভাবও দেখায়, উন্নত বন্দরনিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও সংক্রমণ প্রবেশ করতে পারত। এরপরও ইউরোপে প্লেগের ইতিহাস শেষ হয়নি। ১৭৭০–১৭৭১ সালে মস্কোসহ রুশ অঞ্চলে ভয়াবহ মহামারি ঘটে; দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের কিছু এলাকায় আরও পরে রোগ দেখা যায়। পশ্চিম ইউরোপের বড় নগরে প্লেগ কমে যাওয়াকে সমগ্র মহাদেশের একই সময়ের সমাপ্তি বলা যায় না। আঞ্চলিক ইতিহাসের পার্থক্য এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরোপে প্লেগ কেন ক্রমে কমে গেল, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। কোয়ারেন্টাইন, আক্রান্ত এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যপ্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টা কিছু প্রাদুর্ভাব সীমিত রাখতে সাহায্য করেছিল। পাশাপাশি বাণিজ্যপথ, বাসস্থান এবং প্রাণী ও পরজীবীর পরিবেশগত পরিবর্তনের সম্ভাব্য ভূমিকা আলোচিত হয়। কিন্তু ইঁদুরের একটি প্রজাতি অন্যটিকে সরিয়ে দিয়েছিল বা মানুষ সম্পূর্ণ রোগপ্রতিরোধী হয়ে গিয়েছিল—এমন একক ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন সময়ে একাধিক পরিবর্তন একসঙ্গে কাজ করেছে বলে বিবেচনা করা বেশি সতর্ক।

আধুনিক বিজ্ঞানের বড় পরিবর্তন আসে উনিশ শতকের শেষভাগে। ১৮৯৪ সালে হংকংয়ে প্লেগের জীবাণু শনাক্ত করার গবেষণা এবং পরবর্তী সময়ে পিসুর ভূমিকা বোঝার অগ্রগতি রোগ প্রতিরোধকে নতুন ভিত্তি দেয়। তখন তৃতীয় প্লেগ মহামারি বিশ্ববাণিজ্যের পথ ধরে ছড়াচ্ছিল। ফলে ইউরোপের পুরোনো নগরমহামারি কমে গেলেও রোগটি বিশ্ব থেকে নির্মূল হয়নি। আজও প্লেগের প্রাকৃতিক সংক্রমণকেন্দ্র রয়েছে, যদিও দ্রুত রোগনির্ণয় ও অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়েছে।

ব্ল্যাক ডেথ সরাসরি আজকের সম্পূর্ণ জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করেনি। পরবর্তী শতকগুলোর জল ও পয়োনিষ্কাশন সংস্কার, রোগের পরিসংখ্যান, জীবাণুবিজ্ঞান এবং চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানও সেই বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্লেগের পুনরাবৃত্তি স্থায়ী স্বাস্থ্যদপ্তর, রোগের খবর আদান-প্রদান এবং জনগণের চলাচল নিয়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব বাড়িয়েছিল। এই দীর্ঘ ইতিহাসের প্রধান পরিবর্তন ছিল, মহামারি মোকাবিলাকে শুধু ব্যক্তিগত চিকিৎসার বিষয় না রেখে সমাজের সংগঠিত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা। রোগের প্রথম ঢেউ স্তিমিত হওয়ার পরও সেই দায়িত্ব শেখার প্রক্রিয়া কয়েক শতাব্দী ধরে চলেছে।