মাহাবালিপুরম বাতিঘর: প্রাচীন সামুদ্রিক ঐতিহ্য ও… | এসো-জানি

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মাহাবালিপুরম বাতিঘর: প্রাচীন সামুদ্রিক ঐতিহ্য ও আধুনিক আলোকস্তম্ভের ইতিহাস

সিরিজ: ইতিহাসের কিংবদন্তি বাতিঘর

মাহাবালিপুরম বাতিঘর: প্রাচীন সামুদ্রিক ঐতিহ্য ও আধুনিক আলোকস্তম্ভের ইতিহাস
মাহাবালিপুরম বাতিঘর

বঙ্গোপসাগরের তীরে পাথুরে উঁচু ভূমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে মাহাবালিপুরমের বাতিঘর। আশপাশে পল্লব যুগের মন্দির, পাথর কেটে তৈরি গুহা এবং প্রাচীন ভাস্কর্য। এই পরিবেশে গোলাকার পাথরের আলোকস্তম্ভটিকে দেখলে মনে হতে পারে, সেটিও বহু প্রাচীন কোনো স্থাপনা। অথচ বর্তমান বাতিঘরটি নির্মিত হয়েছে ঔপনিবেশিক আমলে। এর কাছেই রয়েছে ওলক্কানেশ্বর মন্দির, যার ছাদ একসময় আধুনিক নৌসংকেত প্রদর্শনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল। মাহাবালিপুরমের বিশেষত্ব হলো, এখানে প্রাচীন সমুদ্রবন্দরের ঐতিহ্য, ধর্মীয় স্থাপত্য এবং বাতিঘর প্রযুক্তির ইতিহাস একই ভূদৃশ্যে মিলিত হয়েছে।

মাহাবালিপুরমের আরেক নাম মামল্লপুরম। ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে, তামিলনাড়ুর করোমণ্ডল উপকূলের এই জনপদ পল্লব শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী হিসেবে পরিচিত ছিল। সপ্তম ও অষ্টম শতকে এখানে যে অসাধারণ স্থাপত্য গড়ে ওঠে, তা রাজশক্তি ও শিল্পচর্চার পাশাপাশি একটি সমুদ্রসংযুক্ত সমাজের পরিচয়ও বহন করে। সমুদ্র তখন শুধু প্রাকৃতিক সীমানা ছিল না; পণ্য, মানুষ, বিশ্বাস ও শিল্পভাবনার চলাচলের পথ ছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের যোগাযোগ বুঝতেও এই উপকূলের ইতিহাস বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাচীন নাবিকদের কাছে উপকূল চিনতে পারা ছিল নিরাপদ যাত্রার অপরিহার্য অংশ। দিনের বেলায় উঁচু পাহাড়, স্বতন্ত্র আকৃতির শিলাস্তূপ কিংবা দূর থেকে দৃশ্যমান মন্দির দেখে অবস্থান আন্দাজ করা যেত। মাহাবালিপুরমের পাথুরে উচ্চতা ও মন্দিরসমূহও এমন দৃশ্যমান চিহ্ন হিসেবে কাজে আসত। ইউরোপীয় নাবিকদের কাছে স্থানটি পরিচিত হয়েছিল সেভেন প্যাগোডাস নামে। পরবর্তী সময়ে এখানকার বাতিঘরের পরিচয়েও সেই নাম ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এই নামকে ধরে দৃশ্যমান সাতটি অক্ষত মন্দিরের নিশ্চিত তালিকা তৈরি করা যথাযথ নয়।

রাত নামলে উপকূলের পরিচিত অবয়ব অন্ধকারে মিলিয়ে যেত। তখন উঁচু স্থানে জ্বালানো আগুন দূরের নৌযানকে স্থলের উপস্থিতি জানাতে পারত। মাহাবালিপুরমের প্রাচীন নৌপথ নির্দেশনার বর্ণনায় উঁচু পাথরের ওপর কাঠের আগুন জ্বালানোর উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু কখন এই ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল, কত নিয়মিত চলত কিংবা কোন নির্দিষ্ট স্থাপনার ওপর আগুন জ্বলত—এসব বিষয়ে সব বিবরণ সমান নিশ্চিত নয়। প্রাচীন অগ্নিসংকেতের ঐতিহ্য এবং নির্দিষ্ট তারিখে প্রতিষ্ঠিত আধুনিক বাতিঘরকে আলাদা করে বোঝা জরুরি।

এই পার্থক্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য ওলক্কানেশ্বর মন্দিরের ক্ষেত্রে। মহিষাসুরমর্দিনী গুহামন্দিরের ওপরের পাথুরে উচ্চতায় অবস্থিত এই ছোট মন্দির পল্লব স্থাপত্যের অংশ। এর অবস্থান সমুদ্রের দিকে বিস্তৃত দৃশ্য দেখার সুযোগ দেয়। উঁচু জায়গায় থাকা এমন একটি স্থাপনা নৌসংকেতের জন্য সুবিধাজনক ছিল। কিন্তু মন্দিরটি প্রাচীন বলেই এটিকে নির্মাণের দিন থেকে অবিচ্ছিন্নভাবে চালু থাকা বাতিঘর বলা যায় না। ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে এর ইতিহাস এবং পরবর্তী নৌসংকেতকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার দুটি পৃথক বিষয়।

এখানে নথিভুক্ত আধুনিক আলোর সূচনা ঘটে ১৮৮৭ সালের মে মাসে। তখন ওলক্কানেশ্বর মন্দিরের ছাদে কাচঘেরা আলোককক্ষ ও বিশেষ আলোকযন্ত্রের মধ্যে সলতের প্রদীপ স্থাপন করা হয়। এতে চতুর্থ শ্রেণির আলোকসংকেন্দ্রক ব্যবহৃত হয়েছিল। এই শ্রেণিবিভাগ মূলত যন্ত্রের আকার ও আলোকবিন্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত; এটি আলো ভালো না খারাপ, তার সাধারণ মূল্যায়ন নয়। প্রদীপের চারদিকে ছড়িয়ে যাওয়া আলোর একটি অংশকে নির্দিষ্টভাবে কাজে লাগিয়ে সমুদ্র থেকে দৃশ্যমান সংকেত তৈরি করাই ছিল ব্যবস্থাটির উদ্দেশ্য।

মন্দিরের ছাদে প্রদীপ বসানো নিছক একটি সুবিধাজনক স্থান বেছে নেওয়ার ঘটনা ছিল না। এর জন্য ছাদে আলোককক্ষ ধারণের উপযোগী ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। পুরোনো স্থাপনার ওপর নতুন প্রযুক্তি বসানোর সময় তার ভাস্কর্য ও গঠন রক্ষা করার প্রশ্নও সামনে আসে। একই সঙ্গে এই উপকূলে ত্রিপাসোর নামে পরিচিত অগভীর পাথুরে বিপদের বিষয়ে জাহাজকে সতর্ক করার প্রয়োজন ছিল। ফলে আলোটি শুধু জনপদের অবস্থান জানানোর জন্য নয়, কাছাকাছি সমুদ্রপথে সাবধানতার সংকেত হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল পৃথক একটি স্থায়ী টাওয়ার নির্মাণ। ১৯০০ সালে বর্তমান পাথরের বাতিঘরটি নির্মিত হয় এবং ১৯০১ সালের মার্চে এর আলো কার্যকর করা হয়। এই দুটি সাল আলাদা করে মনে রাখা দরকার। কোনো বাতিঘরের কাঠামো শেষ হওয়া এবং সেখানে নৌচলাচলের জন্য আনুষ্ঠানিক আলো চালু হওয়া একই ঘটনা নয়। মাহাবালিপুরমের ক্ষেত্রেও নির্মাণের সালকে আলোর কার্যক্রম শুরুর সাল হিসেবে উল্লেখ করলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ অস্পষ্ট হয়ে যায়।

বর্তমান গোলাকার টাওয়ারটির উচ্চতা প্রায় ২৬ মিটার। এটি উঁচু পাথুরে ভূমির ওপর তৈরি হওয়ায় আলোককক্ষের অবস্থান আরও সুবিধাজনক হয়েছে। এখানে টাওয়ারের নিজস্ব উচ্চতা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আলোর উচ্চতা এক বিষয় নয়। সাধারণভাবে বাতিঘর যত উঁচুতে আলো প্রদর্শন করতে পারে, পৃথিবীর বক্রতার কারণে তত দূর থেকে তা দেখার সম্ভাবনা তৈরি হয়। অবশ্য বাস্তবে দৃশ্যমানতা নির্ভর করে আবহাওয়া, বাতাসে জলকণা, আলোর ক্ষমতা এবং পর্যবেক্ষকের অবস্থানের ওপরও।

মাহাবালিপুরমের টাওয়ারকে আলাদা করে চেনায় তার প্রাকৃতিক পাথরের বহিরাবরণ। অনেক পরিচিত বাতিঘরের মতো এতে উজ্জ্বল রঙের ডোরা নেই। আশপাশের শিলাস্তূপ ও প্রাচীন স্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এর বাইরের পৃষ্ঠ রং না করেই রাখা হয়েছিল। নির্মাণের জন্য উপযুক্ত রঙের পাথর অন্য স্থান থেকে আনা হয়, যাতে স্থানীয় ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রাকৃতিক শিলার ক্ষতি না হয়। এখানে প্রকৌশলের সঙ্গে আশপাশের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশের সৌন্দর্য রক্ষার চিন্তাও যুক্ত ছিল।

বাতিঘরের কার্যকারিতা অবশ্য শুধু টাওয়ারের ওপর নির্ভর করে না। ভেতরের আলোকযন্ত্র, কাচ এবং আলো ঘোরানোর ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাহাবালিপুরমের প্রযুক্তিগত ইতিহাসে দ্বিতীয় শ্রেণির ঘূর্ণায়মান আলোকসংকেন্দ্রকের উল্লেখ রয়েছে। এমন যন্ত্র আলোকে নির্দিষ্ট দিকে কেন্দ্রীভূত করে ঘুরিয়ে প্রদর্শন করতে পারে। সমুদ্রে নাবিকের কাছে আলোর উপস্থিতির পাশাপাশি তার প্রকাশের ছন্দও কাজে লাগে। বিভিন্ন বাতিঘরের সংকেত আলাদা করে চিনতে পারা অবস্থান নির্ধারণে সহায়তা করে; তাই আলো জ্বলা মানেই কেবল অবিরাম উজ্জ্বল থাকা নয়।

এই ব্যবস্থার পেছনে বাতিঘরকর্মীদের নিয়মিত শ্রম ছিল অপরিহার্য। জ্বালানি সরবরাহ, প্রদীপ পরীক্ষা, কাচ পরিষ্কার এবং যান্ত্রিক অংশ সচল রাখার কাজ অবহেলা করা যেত না। লবণাক্ত বাতাস ও আর্দ্র উপকূলীয় পরিবেশে রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব আরও বাড়ে। একটি ছোট ত্রুটি আলো দুর্বল করতে বা সংকেত ব্যাহত করতে পারে। মাহাবালিপুরমে বাতিঘরকর্মীদের দায়িত্বের সঙ্গে একসময় আশপাশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর দেখাশোনাও যুক্ত ছিল। ফলে এখানে নৌনিরাপত্তার কর্মস্থল স্থানীয় ঐতিহ্য রক্ষার ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে যায়।

সময়ের সঙ্গে আলোর উৎস পরিবর্তিত হয়েছে। পেট্রোলিয়ামবাষ্পনির্ভর ব্যবস্থার পরিবর্তে ১৯৯৪ সালে বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহৃত হয়। পরবর্তী সময়ে আরও উন্নত আলোর ব্যবস্থা আসে এবং ২০২০ সালের আগস্টে প্রধান আলোর উৎস হিসেবে এলইডি বাতির সমষ্টি বসানো হয়। এই পরিবর্তনের তাৎপর্য হলো, পুরোনো পাথরের টাওয়ার রেখেও ভেতরের প্রযুক্তি উন্নত করা সম্ভব হয়েছে। বাইরে থেকে স্থাপনাটি অতীতের চেহারা ধরে রাখলেও তার কাজ চালানোর উপায় সময়ের সঙ্গে বদলেছে।

এই বিবর্তন বোঝাতে মাহাবালিপুরমের বাতিঘর ও সামুদ্রিক ঐতিহ্যসংক্রান্ত সংগ্রহশালাগুলো বিশেষ ভূমিকা রাখে। ২০১৪ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়া এসব প্রদর্শনীতে পুরোনো প্রদীপ, আলোকযন্ত্র, যান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং নৌচলাচলের বিভিন্ন উপকরণ তুলে ধরা হয়। মানচিত্রের পাশাপাশি দিকনির্ণায়ক যন্ত্র, দূরবীক্ষণ কিংবা জাহাজের নমুনা দেখলে সমুদ্রযাত্রার বাস্তব চ্যালেঞ্জ বোঝা সহজ হয়। তখন বাতিঘর আর নিছক সুন্দর একটি টাওয়ার থাকে না; বৃহত্তর নৌপরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তার পরিচয় স্পষ্ট হয়।

মাহাবালিপুরমের প্রাচীন স্মারকসমষ্টি ১৯৮৪ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়। তবে সেই স্বীকৃতিকে আধুনিক বাতিঘরটি পল্লব আমলে নির্মিত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা ভুল। এখানে পাশাপাশি দাঁড়ানো স্থাপনাগুলোর বয়স ও উদ্দেশ্য আলাদা। এই বাতিঘরের প্রকৃত ঐতিহাসিক মূল্য তার অতিরঞ্জিত প্রাচীনত্বে নয়, একই উপকূলে নৌপথ চেনার পদ্ধতির দীর্ঘ পরিবর্তনে। পাথরের দৃশ্যমান চিহ্ন, মন্দিরের ছাদের প্রদীপ এবং আধুনিক আলোকযন্ত্র—প্রতিটি ধাপই জানায়, সমুদ্রপথে নিরাপদে চলার জন্য মানুষ কীভাবে পরিচিত ভূদৃশ্যকে নতুনভাবে ব্যবহার করেছে।