আমেরিকার গৃহযুদ্ধ ও দাসপ্রথার অবসান: লিংকনের মুক্তির ঘোষণা থেকে ত্রয়োদশ সংশোধনী
সিরিজ: দাসপ্রথা বিলুপ্তির ইতিহাস
যুদ্ধের ময়দান থেকে সংবিধানে স্বাধীনতার স্বীকৃতি
স্বাধীন মানুষকে সমাজ ও রাষ্ট্র কতখানি সমান অধিকার দেবে—আগের পর্বের শেষে এই প্রশ্ন সামনে এসেছিল। কিন্তু সেই প্রশ্নের জাতীয় মীমাংসার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করতে হয়েছিল রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধ। দাসপ্রথাবিরোধী বক্তৃতা, আত্মজীবনী ও গোপন উদ্ধারপথ জনমত বদলালেও দক্ষিণের বাগানব্যবস্থা তখনো শক্তিশালী ছিল। তাকে রক্ষা করছিল আইন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং মানুষের ওপর মালিকানার দাবি। শেষ পর্যন্ত দাসত্বের অবসান ঘটল যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিকামী মানুষের পদক্ষেপ, সরকারের পরিবর্তিত নীতি এবং সংবিধানের সংশোধনের মধ্য দিয়ে।
গৃহযুদ্ধের পেছনে অর্থনীতি, কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা ও আঞ্চলিক রাজনীতির বিরোধ ছিল। কিন্তু এসবের কেন্দ্রে ছিল দাসপ্রথা এবং নতুন ভূখণ্ডে তার সম্প্রসারণের প্রশ্ন। দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতৃত্ব দাসমালিকানার ব্যবস্থা রক্ষা করতে চেয়েছিল। তাই শুধু অঙ্গরাজ্যের অধিকারের সংঘাত বলে যুদ্ধকে ব্যাখ্যা করলে মূল বিষয় আড়াল হয়—কোন অধিকার রক্ষার দাবি তোলা হচ্ছিল? মানুষকে সম্পত্তি হিসেবে রাখা এবং সেই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা বিচ্ছিন্নতার কেন্দ্রীয় কারণ ছিল। যদিও যুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রত্যেক সৈনিকের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য এক ছিল না।
১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকনের নির্বাচনী বিজয় সংকটকে তীব্র করে। তিনি দাসপ্রথার সম্প্রসারণের বিরোধী ছিলেন, কিন্তু শুরুতেই বিদ্যমান প্রতিটি দাসরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় তাৎক্ষণিক বিলোপের কর্মসূচি নেননি। দক্ষিণের কয়েকটি অঙ্গরাজ্য বিচ্ছিন্ন হয়ে কনফেডারেসি গঠন করে। ১৮৬১ সালের ১২ এপ্রিল ফোর্ট সামটারে আক্রমণের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। লিংকনের সরকারের ঘোষিত প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ইউনিয়ন রক্ষা করা। দাসত্ব বজায় থাকা সীমান্ত অঙ্গরাজ্যগুলোকে ইউনিয়নের পাশে রাখাও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফলে যুদ্ধ শুরু হওয়া আর সর্বজনীন মুক্তির নীতি গ্রহণ একই ঘটনা ছিল না।
কিন্তু বন্দি মানুষেরা ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় স্থির থাকেননি। যুদ্ধের সুযোগে তাঁরা বাগান ছেড়ে ইউনিয়ন বাহিনীর অবস্থানের দিকে যেতে থাকেন। ১৮৬১ সালের মে মাসে ফোর্ট মনরোতে আশ্রয় নেওয়া তিন ব্যক্তিকে তাঁদের দাবিদার মালিকের কাছে ফেরত দিতে অস্বীকার করেন জেনারেল বেঞ্জামিন বাটলার। কনফেডারেটদের সামরিক কাজে তাঁদের শ্রম ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে তিনি তাঁদের যুদ্ধসম্পর্কিত বাজেয়াপ্ত সম্পদ হিসেবে বিবেচনার যুক্তি দেন। যুক্তিটি মানুষকে সম্পত্তি ভাবার ভাষায় বাঁধা থাকলেও প্রত্যর্পণ ঠেকানোর একটি পথ তৈরি করে।
এই আত্মমুক্তির যাত্রা ইউনিয়নের সামনে নতুন বাস্তবতা হাজির করে। পালিয়ে আসা মানুষ আশ্রয়, খাদ্য ও নিরাপত্তা চাইছিলেন; একই সঙ্গে তাঁরা শ্রম, স্থানীয় তথ্য এবং দক্ষিণের ভূগোল সম্পর্কে জ্ঞান দিতে পারতেন। তাঁদের প্রস্থান বাগান ও কনফেডারেট যুদ্ধপ্রস্তুতির শ্রমভিত্তিও দুর্বল করছিল। কংগ্রেসের বাজেয়াপ্তকরণসংক্রান্ত আইন এবং সামরিক সিদ্ধান্ত ক্রমে দাসমালিকদের দাবি সীমিত করতে থাকে। দাসত্বে আবদ্ধ মানুষের নিজের উদ্যোগ যুদ্ধকে মুক্তির দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তবে ইউনিয়নের শিবিরে পৌঁছালেই অনাহার, রোগ বা বৈষম্য থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো না।
লিংকনের নীতিও এই পরিস্থিতির মধ্যে বদলায়। দাসপ্রথা কনফেডারেসিকে শ্রম ও সম্পদ জোগাচ্ছিল; ফলে তার ওপর আঘাত যুদ্ধজয়ের কৌশল হয়ে ওঠে। পাশাপাশি বিলোপবাদী, কৃষ্ণাঙ্গ নেতা এবং কংগ্রেসের সদস্যদের চাপ বাড়ছিল। ১৮৬২ সালের জুলাইয়ে লিংকন মন্ত্রিসভায় মুক্তির ঘোষণার খসড়া আলোচনা করেন। কিন্তু সামরিক বিপর্যয়ের মধ্যে ঘোষণা দিলে সেটি অসহায় পদক্ষেপ মনে হতে পারে—এই উদ্বেগে অপেক্ষা করা হয়। সেপ্টেম্বরে অ্যান্টিটামের যুদ্ধের পর কনফেডারেট বাহিনী মেরিল্যান্ড থেকে সরে গেলে উদ্যোগটি প্রকাশের অনুকূল মুহূর্ত আসে।
১৮৬২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর লিংকন প্রাথমিক মুক্তির ঘোষণা জারি করেন। এতে জানানো হয়, পরের বছরের প্রথম দিনেও যেসব অঙ্গরাজ্য বা নির্ধারিত অঞ্চল বিদ্রোহে থাকবে, সেখানকার দাসত্বে আবদ্ধ মানুষকে স্বাধীন ঘোষণা করা হবে। এটি ছিল ভবিষ্যৎ কার্যকারিতার সতর্কবার্তা, তাৎক্ষণিক দেশব্যাপী মুক্তির আদেশ নয়। ঘোষণায় বিদ্রোহী অঞ্চলগুলোর জন্য ইউনিয়নে ফিরে আসার রাজনৈতিক সুযোগও ছিল। কিন্তু কনফেডারেসি সেই শর্তে যুদ্ধ থামায়নি। ফলে নতুন বছরের প্রথম দিন মুক্তিকে সরকারি যুদ্ধনীতির অংশ করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
১৮৬৩ সালের ১ জানুয়ারি চূড়ান্ত মুক্তির ঘোষণা জারি হয়। সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধকালীন ক্ষমতার ভিত্তিতে লিংকন নির্দিষ্ট বিদ্রোহী অঞ্চলের দাসত্বে আবদ্ধ মানুষকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। ইউনিয়নের অনুগত কেন্টাকি, ডেলাওয়্যার, মেরিল্যান্ড ও মিসৌরির মতো সীমান্ত অঙ্গরাজ্য এর আওতায় ছিল না। কনফেডারেসির কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলও বাদ ছিল। তাই এই দলিলকে সারা যুক্তরাষ্ট্রে এক দিনে দাসত্ব বিলোপের আইন বলা ভুল। এর কার্যকর বাস্তবায়ন অনেক স্থানে ইউনিয়ন বাহিনীর অগ্রগতি ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ওপর নির্ভর করছিল।
সীমাবদ্ধতা থাকলেও ঘোষণার গুরুত্ব গভীর ছিল। ইউনিয়ন রক্ষার সঙ্গে দাসমুক্তি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলো। সেনাবাহিনী দক্ষিণে এগোলে মুক্তির বাস্তব ক্ষেত্রও বিস্তৃত হতে পারত। ঘোষণায় কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের সামরিক বাহিনীতে গ্রহণের কথাও ছিল। ফলে যাঁদের জনগোষ্ঠীকে সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, তাঁরা রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীতে দাঁড়িয়ে সেই ব্যবস্থা ভাঙার সুযোগ পেলেন। স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি কাগজের ভাষা থেকে সামরিক শক্তি পেল; একই সঙ্গে মুক্তিকামী মানুষের অংশগ্রহণ ইউনিয়নের শক্তি বাড়াল।
যুদ্ধশেষে প্রায় এক লাখ আশি হাজার কৃষ্ণাঙ্গ সেনা ইউনিয়ন স্থলবাহিনীতে কাজ করেছিলেন; নৌবাহিনীতেও অনেকে যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে স্বাধীনভাবে জন্ম নেওয়া মানুষ এবং দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসা ব্যক্তিরা ছিলেন। ফ্রেডেরিক ডগলাস সেনা নিয়োগে উৎসাহ দেন এবং সমান আচরণের দাবি তোলেন। কৃষ্ণাঙ্গ সেনারা অসম বেতন, বর্ণবাদ এবং বন্দি হলে বিশেষ নিষ্ঠুরতার ঝুঁকির মুখে পড়তেন। তবু তাঁদের অংশগ্রহণ দেখায়, মুক্তিকামী মানুষেরা যুদ্ধের ফলের অপেক্ষায় থাকা দর্শক ছিলেন না; তাঁরা সেই ফল তৈরির শক্তি ছিলেন।
কিন্তু যুদ্ধকালীন ঘোষণা স্থায়ী সাংবিধানিক সমাধানের বিকল্প ছিল না। এর আওতার বাইরে থাকা অঞ্চলে দাসত্ব বহাল ছিল; যুদ্ধশেষে ঘোষণার ক্ষমতা নিয়ে বিরোধের আশঙ্কাও ছিল। তাই প্রয়োজন হয় দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞার। ১৮৬৪ সালের এপ্রিলে সিনেটে ত্রয়োদশ সংশোধনীর প্রস্তাব পাস হলেও প্রতিনিধি পরিষদে প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। লিংকন পরে এর পক্ষে আরও সক্রিয় হন। ১৮৬৫ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাবটি ১১৯–৫৬ ভোটে গৃহীত হয়। তবে কংগ্রেসের অনুমোদনই সংশোধনী কার্যকর হওয়ার শেষ ধাপ ছিল না।
এরপর প্রয়োজন ছিল অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্ধারিত সংখ্যক অনুমোদন। এর মধ্যেই যুদ্ধ সমাপ্তির দিকে এগোয়। এপ্রিলে রবার্ট ই. লির প্রধান বাহিনী আত্মসমর্পণ করে, যদিও অন্য কনফেডারেট বাহিনীর আত্মসমর্পণ পরে ঘটে। ১৫ এপ্রিল লিংকন আগের রাতের গুলিবিদ্ধ আঘাতে মারা যান। ফলে সংশোধনীর চূড়ান্ত অনুমোদন তিনি দেখে যেতে পারেননি। দক্ষিণে মুক্তির বাস্তবায়নও সর্বত্র এক গতিতে হয়নি। ১৯ জুন টেক্সাসের গ্যালভেস্টনে জেনারেল গর্ডন গ্রেঞ্জারের আদেশ স্বাধীনতার সরকারি ঘোষণা কার্যকর করার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; এই দিন থেকেই জুনটিন্থের স্মৃতি গড়ে ওঠে।
১৮৬৫ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যাপ্ত অঙ্গরাজ্যের অনুমোদনে ত্রয়োদশ সংশোধনী গৃহীত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার অধিক্ষেত্রাধীন এলাকায় দাসত্ব ও অনিচ্ছাকৃত দাসশ্রম নিষিদ্ধ হয়, তবে যথাযথভাবে অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তির শাস্তির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়। সংশোধনীর দ্বিতীয় অংশ কংগ্রেসকে উপযুক্ত আইন করে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ক্ষমতা দেয়। মুক্তির ঘোষণা নির্দিষ্ট যুদ্ধকালীন অঞ্চলে আঘাত করেছিল; ত্রয়োদশ সংশোধনী দাসত্ব নিষিদ্ধ করার দেশব্যাপী সাংবিধানিক ভিত্তি স্থাপন করল। এই পার্থক্যই দুটি দলিলের পৃথক ঐতিহাসিক ভূমিকা বোঝায়।
তবু মানুষকে সম্পত্তি হিসেবে রাখার অবসান মানেই জমি, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার নিশ্চিত হওয়া ছিল না। মুক্ত মানুষের পরিবার পুনর্গঠন, জীবিকা অর্জন এবং নিজেদের শ্রমের মূল্য নির্ধারণের সংগ্রাম চলতে থাকে। অপরাধের শাস্তিসংক্রান্ত ব্যতিক্রমও পরবর্তী জোরপূর্বক শ্রমের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। গৃহযুদ্ধ দাসত্বের আইনি ভিত্তি ধ্বংস করেছিল, কিন্তু বর্ণবাদী ক্ষমতার সব কাঠামো ভাঙেনি। ফলে ১৮৬৫ সালের বিজয়ের পর নতুন অধ্যায় শুরু হলো—স্বাধীনতাকে দৈনন্দিন জীবনের অধিকার, নিরাপত্তা ও সমান নাগরিকত্বে রূপ দেওয়ার সংগ্রাম।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাসপ্রথার বিলুপ্তি: ১৮৩৩ সালের আইন থেকে ১৮৩৮ সালের মুক্তি
ব্রিটেনে দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলন: উইলবারফোর্স, একুইয়ানো ও ১৮০৭ সালের আইন
অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরি: যেভাবে এক কিশোরী হলোকাস্টের বিশ্বজনীন প্রতীক হয়ে উঠল
মার্গারেট স্যাঙ্গার: জন্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলনের অগ্রদূত ও তাঁর বিতর্কিত উত্তরাধিকার
র্যাচেল কারসন ও সাইলেন্ট স্প্রিং: যে বই পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাস বদলে দিল