ব্ল্যাক ডেথের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: শ্রমিকসংকট……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ব্ল্যাক ডেথের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: শ্রমিকসংকট, কৃষকবিদ্রোহ ও সামন্ততন্ত্র

সিরিজ: ব্ল্যাক ডেথ: ইউরোপের ভয়াবহ মহামারি

ব্ল্যাক ডেথের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: শ্রমিকসংকট, কৃষকবিদ্রোহ ও সামন্ততন্ত্র
জনসংখ্যার বিপর্যয়ে বদলে যায় শ্রম, জমি ও ক্ষমতার সম্পর্ক।

ব্ল্যাক ডেথের পর ইউরোপের বহু জমির মালিকের সামনে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা দেখা দেয়: জমি আছে, কিন্তু চাষ করার মানুষ কম। কোথাও ফসল কাটার শ্রমিক পাওয়া কঠিন, কোথাও মৃত প্রজার জমির উত্তরাধিকারী অনুপস্থিত। যে সমাজে সাধারণ মানুষের শ্রম সহজলভ্য বলে ধরে নেওয়া হতো, সেখানে বেঁচে থাকা শ্রমিকেরা বেশি পারিশ্রমিক ও ভালো শর্ত চাইতে শুরু করেন। জনসংখ্যার বিপর্যয় শ্রম, জমি ও ক্ষমতার পুরোনো সম্পর্ককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে এই পরিবর্তন এক দিনে ঘটেনি, এবং ইউরোপের সব অঞ্চলে একই ফলও তৈরি করেনি।

১৩৪৭–১৩৫৩ সালের মহামারিতে ইউরোপের বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যান। মোট মৃত্যুর হিসাব নিয়ে মতভেদ থাকলেও জনসংখ্যাগত আঘাতের ব্যাপকতা নিয়ে সন্দেহ নেই। এরপরও প্লেগের নতুন ঢেউ ফিরে আসে, ফলে জনসংখ্যা দ্রুত আগের অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি। পরিবারে উপার্জনক্ষম মানুষ হারানো, এতিম শিশুর দায়িত্ব এবং ব্যবসার উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। যাঁরা বেঁচেছিলেন, তাঁদের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুযোগের পাশাপাশি গভীর ব্যক্তিগত ক্ষতি ও নিরাপত্তাহীনতাও ছিল। পরবর্তী সমৃদ্ধির আলোচনা দিয়ে সেই অভিজ্ঞতা আড়াল করা যায় না।

মহামারির আগে ইউরোপের বহু অঞ্চলে জমির তুলনায় শ্রমিক বেশি ছিল। ছোট জমিতে জীবিকা নির্বাহ করা কৃষকদের অনেকে মালিকের জমিতেও কাজ করতেন। জনসংখ্যা কমে যাওয়ার পর এই অনুপাত বদলে যায়। একই পরিমাণ জমির জন্য এখন কম মানুষের শ্রম পাওয়া যাচ্ছিল। ফলে জমির মালিকদের মধ্যে শ্রমিক ধরে রাখার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। কেউ বেশি মজুরি দিতে বাধ্য হন, কেউ প্রজাকে সুবিধাজনক শর্তে জমি দেন। তবে বাজারের এই চাপের বিরুদ্ধে প্রথা, আইন এবং স্থানীয় ক্ষমতাও সক্রিয় ছিল।

শ্রমিকসংকট কৃষিক্ষেত্রের পাশাপাশি নির্মাণকাজ, পরিবহন ও কারুশিল্পেও অনুভূত হয়। দক্ষ শ্রমিক মারা গেলে তাঁর জায়গা পূরণ করা সহজ ছিল না। কোনো শ্রমিক অন্য এলাকায় বেশি পারিশ্রমিক পেলে সেখানে চলে যাওয়ার সুযোগ খুঁজতে পারতেন। এই চলাচল নিয়োগকর্তার উদ্বেগ বাড়ায়। শ্রমিকের দরকষাকষির শক্তি বেড়েছিল মূলত তাঁর বিকল্প কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধির কারণে। কিন্তু সবাই চলাচল করতে পারতেন না; পারিবারিক দায়িত্ব, আইনগত বাধা এবং স্থানীয় সম্পর্ক অনেককে সীমাবদ্ধ রাখত।

মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও একটি জরুরি পার্থক্য আছে। হাতে পাওয়া অর্থ বাড়লেই জীবনযাত্রার উন্নতি হয় না, যদি খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দামও বেড়ে যায়। মহামারির পরপর উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যাঘাতে কিছু এলাকায় মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল। পরে বিভিন্ন অঞ্চলে মজুরির তুলনায় দ্রব্যমূল্যের পরিবর্তন শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায়। ব্ল্যাক ডেথের পরপরই সব শ্রমিক ধনী হয়ে গিয়েছিলেন—এ ধারণা ভুল। দৈনিক মজুরির শ্রমিক, বার্ষিক চুক্তির কর্মী এবং খাদ্যসহ পারিশ্রমিক পাওয়া মানুষের অভিজ্ঞতাও আলাদা ছিল।

ইংল্যান্ডের শাসকগোষ্ঠী এই পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। তৃতীয় এডওয়ার্ডের শাসনামলে ১৩৪৯ সালের শ্রমিক অধ্যাদেশ এবং ১৩৫১ সালের শ্রমিক আইন জারি হয়। এগুলোর উদ্দেশ্য ছিল মজুরি মহামারির আগের হারের কাছাকাছি রাখা, সক্ষম বেকার মানুষকে কাজে যুক্ত করা এবং শ্রমিকের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা। ফসল কাটার সময় কাজের লোকের অভাব বিশেষ উদ্বেগের বিষয় ছিল। যে শ্রম এখন বেশি মূল্য দাবি করছিল, রাষ্ট্র আইন দিয়ে তার পুরোনো মূল্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল।

এই আইনকে সম্পূর্ণ অকার্যকর বললেও ভুল হবে। আদালত, জরিমানা ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তা প্রয়োগ করা হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছিল। আবার নিয়োগকর্তারাও শ্রমিকের প্রয়োজনে বেশি অর্থ বা অন্য সুবিধা দিতে পারতেন। ফলে বাস্তবে আইন, স্থানীয় সমঝোতা ও শ্রমবাজারের টানাপোড়েন পাশাপাশি চলেছে। শ্রমিকেরা নিজেদের নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছিলেন, আর কর্তৃপক্ষ পুরোনো সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার চেষ্টা করছিল। এই বিরোধ পরবর্তী কয়েক দশকের রাজনৈতিক ক্ষোভের একটি উৎস হয়ে ওঠে।

জমির ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আসে। কোনো মালিক নিজের তত্ত্বাবধানে চাষ করানোর বদলে জমি ভাড়া দিতে আগ্রহী হন। কোথাও খাজনার শর্ত সহজ হয়, কোথাও প্রজার ওপর নির্ধারিত শ্রমদায়ের বদলে অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা বাড়ে। কম লাভজনক বা দুর্বল জমি চাষের বাইরে চলে যেতে পারে। উপযুক্ত অঞ্চলে কিছু জমি পশুপালনের কাজে ব্যবহৃত হয়, যেখানে শস্যচাষের তুলনায় কম শ্রম লাগতে পারে। তবে সব অনাবাদি জমি মহামারির ফল ছিল না; বাজার, মাটি, জলবায়ু ও আগের কৃষিগত পরিবর্তনও ভূমিকা রেখেছিল।

শহরের অর্থনীতিতেও বিপরীত প্রবণতা দেখা যায়। জনসংখ্যা কমায় ক্রেতা কমেছে, আবার কিছু পেশায় কর্মীর অভাব বেড়েছে। উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদ পাওয়া মানুষ উন্নত খাবার, পোশাক বা বাসস্থানের জন্য বেশি ব্যয় করতে পারতেন। অন্যদিকে ছোট ব্যবসা পরিবারের সদস্য হারিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো কোনো কারিগর নতুন সুযোগ পেয়েছেন, কিন্তু সংগঠিত পেশাজীবী গোষ্ঠী প্রবেশের নিয়ম ধরে রেখেছিল। ফলে অর্থনৈতিক পরিবর্তন মানে সবার জন্য উন্মুক্ত সুযোগ নয়; পুরোনো সুবিধা ও নতুন প্রতিযোগিতা একই সঙ্গে কাজ করছিল।

নারীদের ক্ষেত্রেও ফলাফল মিশ্র ছিল। কিছু বিধবা জমি বা ব্যবসার দায়িত্ব পান, কিছু নারী শ্রমিকের কাজ ও উপার্জনের সুযোগ বাড়ে। কিন্তু সব পেশায় মজুরি সমানভাবে বাড়েনি এবং নারী-পুরুষের পারিশ্রমিকের ব্যবধানও থেকে যায়। পারিবারিক আইন, সম্পত্তির অধিকার ও পেশাগত বিধিনিষেধ সুযোগকে সীমিত করত। তাই মহামারি নারীদের সর্বজনীন স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল বলা যায় না। কোন অঞ্চলে, কোন পেশায় এবং কী ধরনের চুক্তিতে কাজ করা হচ্ছিল, তা না জানলে নারীদের অভিজ্ঞতা বোঝা অসম্পূর্ণ থাকে।

এই সামাজিক টানাপোড়েনের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ ইংল্যান্ডের ১৩৮১ সালের কৃষকবিদ্রোহ। মহামারির প্রথম ঢেউয়ের প্রায় তিন দশক পরে সংঘটিত এই আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল মাথাপিছু কর আদায় এবং তার কঠোর প্রয়োগ। তবে পেছনে জমেছিল শ্রম নিয়ন্ত্রণ, ভূমিদাসত্ব ও স্থানীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ। এসেক্স ও কেন্ট থেকে আন্দোলন বিস্তৃত হয়; ওয়াট টাইলার এবং জন বল পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ব্ল্যাক ডেথ বিদ্রোহের পরিস্থিতি বদলেছিল, কিন্তু একাই বিদ্রোহ ঘটায়নি। যুদ্ধের ব্যয় ও করনীতিও কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছিল।

বিদ্রোহীরা ভূমিদাসত্বের অবসানসহ বিভিন্ন দাবি তোলে এবং লন্ডনে প্রবেশ করে। আন্দোলনে শুধু গ্রামের কৃষক নন, নগরের শ্রমজীবী ও অন্যান্য মানুষও অংশ নিয়েছিলেন। দ্বিতীয় রিচার্ডের সঙ্গে আলোচনায় কিছু প্রতিশ্রুতি এলেও পরে বিদ্রোহ দমন করা হয় এবং প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করা হয়। ফলে ১৩৮১ সালেই ভূমিদাসত্ব উঠে গিয়েছিল বলা ভুল। তবে আন্দোলন দেখায়, পুরোনো অধীনতা এখন আরও প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। পরবর্তী পরিবর্তন দীর্ঘ দরকষাকষি, আইনগত বিরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে ঘটে।

সামন্ততন্ত্র শব্দটিও সতর্কভাবে ব্যবহার করা দরকার। ভূমির ওপর প্রভুর অধিকার, প্রজার খাজনা, বাধ্যতামূলক শ্রম এবং ব্যক্তিগত অধীনতা এক বিষয় নয়। ভূমিদাসের চলাচল বা বিবাহে প্রভুর অনুমতির প্রয়োজন থাকতে পারত; অন্যদিকে স্বাধীন প্রজাও জমির জন্য খাজনা দিতেন। ভূমিদাসত্ব দুর্বল হওয়া মানেই অভিজাতের সব ক্ষমতা বা জমির মালিকানা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। ইংল্যান্ডসহ পশ্চিম ইউরোপের কিছু অঞ্চলে ব্যক্তিগত অধীনতা ক্রমে কমলেও বৃহৎ জমির মালিকেরা প্রভাবশালী থেকে যান।

পূর্ব ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতা আবার ভিন্ন ছিল। পরবর্তী শতকগুলোতে কিছু অঞ্চলে কৃষকের ওপর বাধ্যতামূলক শ্রম ও চলাচলের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়, যাকে প্রায়ই দ্বিতীয় ভূমিদাসত্ব বলা হয়। অভিজাতদের রাজনৈতিক ক্ষমতা, রপ্তানিমুখী কৃষি এবং নগরের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ এই পার্থক্যে ভূমিকা রাখে। এটিকে ১৩৪৮ সালের তাৎক্ষণিক ফল বলা যায় না। জনসংখ্যা কমলে কৃষক স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্ত হন না; নতুন পরিস্থিতিতে কার হাতে আইন ও বলপ্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে, সেটিও নির্ধারক।

ব্ল্যাক ডেথের অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার তাই ছিল অসম ও সংঘাতপূর্ণ। কিছু শ্রমিক ভালো পারিশ্রমিক পেয়েছেন, কিছু কৃষক সুবিধাজনক শর্তে জমি পেয়েছেন, আবার অনেকে পরিবার, জীবিকা ও নিরাপত্তা হারিয়েছেন। রাষ্ট্র শ্রম নিয়ন্ত্রণে আরও সক্রিয় হয়েছে, আর প্রজারা নিজেদের দাবি তোলার নতুন শক্তি অনুভব করেছেন। মহামারি একাই সামন্ততন্ত্রের অবসান বা আধুনিক অর্থনীতির জন্ম দেয়নি। এটি আগে থেকে চলমান পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে শ্রম ও জমির মূল্য বদলেছিল; সেই পরিবর্তনের সামাজিক ফল নির্ধারিত হয়েছে মানুষের প্রতিরোধ, সমঝোতা এবং ক্ষমতার ব্যবহারে।