বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

লেখক: খোকা বাবু

ধরন: রহস্য, ড্রামা

অধ্যায় ৩ : প্রথম খাম

পৃষ্ঠা 3 / 25

সন্ধ্যার পর খামটা খুলেছিল সোহান।
তৃতীয় তলার ঘরটায় তখন আলো কম, জানালার ধারে একটা পাতলা হলুদ রেখা পড়ে আছে। বাক্সটা খোলা। ছত্রিশটি খামের মধ্যে একটি খাম আলাদা হয়ে টেবিলের ওপর রাখা। খামের গায়ে শুধু ১ লেখা।

সোহান খামটা ধীরে ছিঁড়ল না।
আঙুল দিয়ে সিলের ধারটা আলগা করে ভেতরের কাগজ বের করল।

একটি হলুদ কাগজের ভাঁজ।
আর তার ভেতরে মায়ের হাতের লেখা একটা ছোট কাগজ।

মেহরিন কাছে এগিয়ে এল।
অর্ণব চেয়ারের পেছনে হাত রেখে দাঁড়াল।

সোহান পড়তে শুরু করল—

“সোহান, তুই ছোটবেলায় সবসময় জানালার পাশে বসে পড়তিস।
বলতি, সেখান থেকে আলো ভালো আসে।
তোর এই কথাটা আমি এখনো মনে রাখি।”

সোহান পড়া থামাল না।
কিন্তু তার চোখ একবার জানালার দিকে গেল।

“মেহরিন, তুই গান শুনতে শুনতে ঘুমাতি।
তোর জন্য আমি একবার একটা গানের খাতা কিনেছিলাম।
দিতে পারিনি।
এখনও খাতাটা ওই লকারে আছে।”

মেহরিনের মুখ একটুখানি শক্ত হলো।
সে কিছু বলল না।

“অর্ণব, তুই ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় আঁকিবুঁকি করতি।
আমি বকতাম।
তুই বলতি, বইগুলোও তো আমার বন্ধু।”

অর্ণব হালকা একটা শব্দ করল—হাসি কি না, বোঝা গেল না।
“আমরা তো দারুণ মানুষ ছিলাম,” সে বলল।

মেহরিন তার দিকে তাকাল।
অর্ণব আরেকটু হাসল, তারপর চুপ হয়ে গেল।

সোহান কাগজের নিচের অংশে গেল।

“তোমাদের জন্য আমি একটা ছোট লাইব্রেরি বানাতে চেয়েছিলাম।
জানালার পাশে একটা চেয়ার থাকবে।
ওখানে বসে কেউ পড়বে।
কেউ চা খাবে।
কেউ বাইরে তাকিয়ে থাকবে।”

এখানে এসে সোহান থামল।

মেহরিন ধীরে জিজ্ঞেস করল, “এই কথা আগে কখনো শুনেছ?”

সোহান মাথা নাড়ল না। মাথা ঝাঁকাল না।
শুধু বলল, “না।”

অর্ণব কাগজটার দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, “আমাদের মা এত কিছু ভাবত?”

কথাটা শেষ হতেই সে নিজেই চুপ হয়ে গেল।
তার চোখে অস্বস্তি ছিল।
সেই অস্বস্তি মুছে দিতে সে চেয়ারের হাতলে আঙুল ঘষল।

সোহান কাগজটার আরেকটু নিচে গেল।

“এটা ছোট জায়গা হবে।
কিন্তু আমার নিজের হবে।”

মেহরিনের মুখটা ধীরে নরম হলো।
সে যেন হঠাৎ কোনো পুরোনো শব্দ শুনে ফেলেছে, যা বহুদিন পরে আবার মনে পড়ছে।

সোহান খামের ভেতর আরেকটা জিনিস বের করল।
একটা সরু নকশার কাগজ।
ঘরের মতো করে আঁকা।
এক পাশে জানালা,
এক পাশে একটা চেয়ার,
আর নিচে অল্প কয়েকটা শব্দ।

“এটা ওই জায়গার নকশা,” সোহান বলল।

মেহরিন কাগজটা হাতে নিল।
আঙুলের ডগা দিয়ে রেখাগুলো ছুঁয়ে দেখল।
“মা বানাতে চেয়েছিল?”

এবার করিম চাচা দরজার কাছে থেকেই বললেন, “এই কাগজটা আগে দেখিনি।”

সোহান তাঁর দিকে তাকাল।
করিম চাচা আর কিছু বললেন না।

মেহরিন নকশাটা একবার দেখে আবার সোহানকে ফিরিয়ে দিল।
অর্ণব টেবিলের ওপর ঝুঁকে বলল, “তাহলে মা শুধু মা ছিল না।”

মেহরিন জবাব দিল না।
সে শুধু জানালার দিকে তাকাল।

সোহান চিঠির শেষ অংশে গেল।

“যে সব জিনিস আমি পেতে পারিনি, সেগুলো নিয়ে আফসোস করো না।
মানুষ অনেক কিছুই চায়।
সব পায় না।
কিন্তু কিছু ইচ্ছে রেখে যেতে হয়।”

সোহান তখন থামল।
আর পড়ল না।

খামের ভেতর আর কিছু ছিল না।

মেহরিন হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিতে নিতে বলল, “এটাই?”

অর্ণব বলল, “প্রথম খাম।”

সোহান ছোট করে মাথা নাড়ল।
“প্রথম খাম।”

মেহরিন কাগজটা ভাঁজ করল না।
অনেকক্ষণ ধরে শুধু নিজের নামটা খুঁজতে থাকল।
অথচ কোথাও তার নাম লেখা ছিল না।