চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি
অধ্যায় ২ : তৃতীয় তলার দরজা
সকালটা ছিল ভেজা।
রাতের বৃষ্টি পুরোপুরি থামেনি, শুধু তার শব্দটা পাতলা হয়ে গেছে। বাড়ির ছাদ থেকে এখনো কোথাও কোথাও ফোঁটা পড়ছে। উঠোনে কাদা জমে আছে, আর জবা গাছটার পাতায় জলের ছোট ছোট দাগ রয়ে গেছে।
সোহান সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।
মেহরিন একটু পেছনে।
অর্ণব রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে, উপরে তাকিয়ে আছে।
করিম চাচা সবার সামনে। তাঁর হাতে পুরোনো চাবি-গুচ্ছ। চাবিগুলো নড়লেই হালকা ঝনঝন শব্দ হয়।
“এইটাই,” করিম চাচা বললেন, “আপনার আব্বা আমাকে দিয়েছিলেন।”
সোহান চাবির দিকে তাকাল। কিছু বলল না।
দ্বিতীয় তলার পর থেকেই বাড়ির শব্দ বদলে যায়।
নিচে মানুষের চলাফেরা ছিল, রান্নাঘরের শব্দ ছিল, দরজা খোলার শব্দ ছিল। ওপরে উঠতেই সব কমে এল। সিঁড়ির কাঠে পা পড়লে শব্দটা একটু বেশি শোনা যাচ্ছিল।
তৃতীয় তলার দরজার সামনে এসে করিম চাচা থামলেন।
দরজাটা কাঠের। গাঢ় রঙের। হাতলটায় মরচে। তালার চারপাশে ধুলো জমে আছে। অনেকদিন কেউ এখানে এসে দাঁড়ায়নি।
করিম চাচা চাবি ঢোকালেন।
প্রথমবার ঘুরল না।
দ্বিতীয়বারও না।
তৃতীয়বারে তালাটা খুলে গেল।
দরজা খুলতেই ভেতর থেকে ঠান্ডা একটা গন্ধ বেরিয়ে এল।
ধুলো, কাঠ, বন্ধ জানালা, আর একাকী থাকা জিনিসপত্রের গন্ধ।
ঘরটা কম আলোয় ভরা।
জানালার পর্দা টানা। একফাঁক দিয়ে পাতলা আলো পড়ছে। তাতে ধুলোর কণা ভাসছে।
সোহান প্রথমে তাকাল মাঝখানের কাঠের বাক্সটার দিকে।
তারপর চোখ গেল দেয়ালের পাশে রাখা একটা চেয়ারে।
মেহরিন ঘরের কোণে পড়ে থাকা পুরোনো বইগুলো দেখল।
অর্ণব জানালার দিকে গিয়ে দাঁড়াল।
চেয়ারটা খালি।
কাঠের।
হাতলে ক্ষয় আছে।
দেখে মনে হয় কেউ বসে উঠে গেছে, কিন্তু চেয়ারটা ফাঁকা থেকে গেছে।
মেহরিন চেয়ারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এখানে কেউ বসত?”
করিম চাচা বললেন, “হ্যাঁ।”
“কে?”
তিনি একটু থামলেন। “আপনার আব্বা।”
সোহান কিছু বলল না।
তার চোখ এখনো বাক্সটার ওপর।
অর্ণব বইগুলোর কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
একটা বইয়ের ওপর ধুলো কম, যেন মাঝেমধ্যে কেউ ছুঁয়েছে।
“বাবা কি পড়তেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
করিম চাচা বললেন, “রাতে।”
“এত উপরে উঠে?” অর্ণবের গলায় হালকা বিস্ময়।
“হ্যাঁ।”
মেহরিন জানালার ধুলো মুছল। বাইরে উঠোন দেখা যায়, আর জবা গাছটার ডগা।
করিম চাচা ধীরে বললেন, “আপনার আব্বা জবা গাছে পানি দিতে ভুলতে না বলতেন।”
সোহান তাঁর দিকে তাকাল। “আর কিছু?”
“আর কিছু না।”
এই ঘরে জিনিস অনেক, কিন্তু কথা কম।
সোহান বাক্সটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
বাক্সটা মাঝারি আকারের, পুরোনো কাঠের। ঢাকনার ওপর পাতলা ধুলো। তালা ছোট, পরিষ্কার। কেউ নিয়মিত দেখেছে, কিন্তু খুলে দেখেনি।
মেহরিন তার পাশে দাঁড়াল।
অর্ণবও কাছে এল।
কেউ কিছু বলল না।
সোহান চাবি নিল।
তালায় ঢুকিয়ে ঘুরাল।
একটি ছোট শব্দ হলো।
তারপর ঢাকনা একটু উঠল।
ভেতরে ধন নেই।
টাকা নেই।
গয়না নেই।
শুধু সারি সারি খাম।
সাদা খাম।
সিল করা।
প্রতিটির গায়ে সংখ্যা লেখা।
এক, দুই, তিন, চার—
গুনতে গিয়ে থেমে যেতে হয় না।
মোট ছত্রিশটি।
মেহরিনের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
অর্ণব একবার হেসে ফেলতে গিয়েও হাসি থামিয়ে দিল।
সোহান অনেকক্ষণ খামগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
অর্ণব প্রথমে হাত বাড়াল। একটা খাম তুলে নিল।
“বাবা আমাদের পরীক্ষার খাতা বানিয়ে রেখে গেছেন নাকি?” সে বলল।
সোহান তৎক্ষণাৎ বলল, “রেখে দে।”
অর্ণব তাকাল। “কেন?”
“জানি না,” সোহান বলল।
মেহরিন অল্পস্বরে বলল, “বাবা যদি ক্রম করে রেখে থাকেন?”
অর্ণব খামটা হাতে নেড়ে বলল, “একটা আগে খুললে কী হবে?”
“আমি জানতে চাই না,” মেহরিন বলল।
“আমিও,” সোহান বলল না।
সে শুধু বাক্সের দিকে তাকিয়ে থাকল।
করিম চাচা পাশে দাঁড়িয়ে।
তিনি কিছু বলছেন না।
অর্ণব খামটা আবার বাক্সের ওপর রাখল।
“ঠিক আছে। তবে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে কিছু হবে না।”
সোহান ধীরে একটা খাম তুলে নিল।
নম্বর ১।
তার আঙুলের নিচে কাগজের শক্তি টের পাওয়া গেল।
মেহরিন নিঃশ্বাস আটকে রাখল।
অর্ণব এক পা এগিয়ে এল।
ঠিক তখন নিচতলা থেকে করিম চাচার গলা ভেসে এল—
“চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে বাবা।”
সোহান খামটা হাতে রেখেই থেমে গেল।
তারপর ধীরে বাক্সে আবার রেখে দিল।
কেউ কিছু বলল না।
ঘরের ভেতর একটা অদ্ভুত অপেক্ষা রয়ে গেল।
বাক্সটা খোলা।
খামগুলো দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু প্রথম খামটা এখনো পড়ে আছে নিজের জায়গায়।
সোহান উঠে দাঁড়াল।
মেহরিন চুপ করে রইল।
অর্ণব এক মুহূর্তের জন্য বাক্সের দিকে তাকিয়ে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
বাইরে জবা গাছটার পাতায় আলো পড়ছে।
ঘরের ভেতর ধুলো ভাসছে।
আর খোলা বাক্সের মধ্যে ছত্রিশটি খাম চুপচাপ পড়ে আছে।