বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

লেখক: খোকা বাবু

ধরন: রহস্য, ড্রামা

অধ্যায় ৪ : বাবার নীরব ভালোবাসা

পৃষ্ঠা 4 / 25

সোহান ছোটবেলায় খুব কম কথা বলত।
কথা না বলার জন্য না—তার মনে হতো, অনেক কিছু বলার দরকার নেই। বাড়ির ভেতর যদি কেউ সবকিছু দেখে, তাহলে শব্দের দরকার কী?

আব্দুল কাদের সাহেব সেই মানুষ ছিলেন, যিনি কিছুই বলতেন না।
তবু তিনি সব জানতেন।

সোহানের শৈশবটা খুব জোরে জোরে কেটে যায়নি।
কোনো বড় আনন্দ ছিল না, বড় শাস্তিও ছিল না। ছিল শুধু এক ধরনের ধীর জীবন। সকালবেলা স্কুলে যাওয়া, বিকেলে উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা, সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বই খুলে বসা। আর এই সবকিছুর মাঝখানে বাবার নীরব উপস্থিতি। তিনি বারান্দায় বসতেন, খবরের কাগজ খুলতেন, চশমার কাঁচে ধুলো জমে থাকত। কখনো সোহানের দিকে তাকাতেন না বলেই মনে হতো। কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছিল, তাকিয়েছিলেন।

একদিন সোহান স্কুল থেকে ফিরে দেখল, তার সাইকেলের চাকা হাওয়া নেই।
সে বিরক্ত হয়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে বলল, “চাকা কে নামাল?”

কেউ জবাব দিল না।

বিকেলে করিম চাচা এসে বললেন, “আপনার আব্বা বলছিলেন, সাইকেলটা একটু দেখতে।”

সোহান কিছু বুঝল না।
রাতে বাবা ফিরে এসে শুধু বললেন, “চেনটা ঢিলা।”

সোহান অবাক হয়ে বলেছিল, “আপনি জানলেন কীভাবে?”

আব্দুল কাদের সাহেব মাথা তুলে বলেছিলেন, “দেখেছি।”

মাত্র এই একটি শব্দ।
কিন্তু সোহানের কাছে যেন সেটার ভেতরে অনেক কিছু ছিল।

আরেকবার সোহান পরীক্ষায় অঙ্কে কম নম্বর পেল।
সে নিজে খাতাটা লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল।
কিন্তু বাবা খাতা হাতে নিয়ে বললেন না, “এত কম কেন?”
শুধু বললেন, “অঙ্কটা আবার দেখ।”

সোহান রাগ করেছিল।
তখন তার মনে হয়েছিল, বাবা বোধহয় কোনো কথাই বোঝেন না।
কিন্তু রাতে ঘুমানোর আগে সে দেখল, বাবার টেবিলের ওপর তার অঙ্কের খাতাটা খোলা আছে। পাশে কাগজে কয়েকটা হিসাব লেখা।
বাবা তাকে ডেকে কিছু বললেন না।
পরদিন স্কুলে যাওয়ার আগে শুধু খাতাটা ফেরত দিয়ে বললেন, “এবার বুঝবি।”

সোহান সেদিন কিছুই বলল না।
বাবাকে ধন্যবাদও না।

বছর পেরিয়ে এখন মনে হয়, ওই একটা কথাই ছিল ধন্যবাদ।

মায়ের মৃত্যুর পর বাড়িটা কেমন যেন আরও চুপ হয়ে গিয়েছিল।
সোহান তখন খুব ছোট।
মেঝেতে মায়ের শাড়ির গন্ধ ছিল, আর রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ির পরিচিত শব্দ আর শোনা যেত না। বাবা তখন আরও বেশি নীরব হয়ে গেলেন। কিন্তু সোহান দেখতে পেত, রাতের বেলা তিনি অনেকক্ষণ ধরে মায়ের পুরোনো চেয়ারে বসে থাকেন। কিছু বলেন না। শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে থাকেন।

সোহান একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি এত বসে থাকো কেন?”

বাবা সেদিন একটু দেরি করে উত্তর দিয়েছিলেন।
“ঘরটা যেন একা না লাগে।”

সোহান বুঝতে পারেনি।
কিন্তু শব্দটা তার মনে থেকে গিয়েছিল।

বাবা কখনো সোহানকে জড়িয়ে ধরতেন না।
এমনকি মাথায় হাত রাখার অভ্যাসও ছিল না।
তবু সোহান লক্ষ্য করত, সে অসুস্থ হলে রাতে বাবার পায়ের শব্দ বারবার ঘরের বাইরে শোনা যায়।
তিনি দরজা খোলেন না।
শুধু থেমে দাঁড়িয়ে থাকেন।
তারপর চলে যান।

একবার সোহান জ্বর নিয়ে বিছানায় পড়ে ছিল।
মায়ের পুরোনো কম্বলটা গায়ে ছিল না, কারণ সেটা ধুতে দেওয়া হয়েছিল।
রাতের কোনো এক সময় সে টের পেল, তার গায়ে আরেকটা কম্বল উঠে গেছে।
সকালে জানতে পারল, সেটা বাবা নিজে এনে দিয়েছেন।

সোহান তখনো কিছু বলেনি।

বাবার ভালোবাসা এমনই ছিল।
বলার মতো না।
দেখানোর মতোও না।
কিন্তু যখন দরকার, ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়াত।

একবার সোহান স্কুল থেকে দেরি করে ফিরল।
বাড়ির গেটের কাছে দাঁড়াতেই দেখল, বাবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন।
কোনো কথা নেই।
শুধু মুখটা শক্ত।
সোহান ভয় পেয়ে গেল।
ভেবেছিল, নিশ্চয় বকবেন।

কিন্তু বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় ছিলি?”

সোহান নিচু গলায় বলল, “বন্ধুর বাসায়।”

বাবা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
শুধু বললেন, “পরের বার বলবি।”

সেদিন সোহান প্রথম বুঝেছিল, রাগ আর উদ্বেগ একই মুখে থাকতে পারে।

বাড়ির তৃতীয় তলা তখনো বন্ধ ছিল না, কিন্তু সেই ঘরে কখনো সোহান ঢুকতে পারত না।
ওখানে কী আছে, তা সে জানত না।
তবে বাবা মাঝে মাঝে উপরে উঠে যেতেন, আর নামতেন অনেক পরে।
সোহান ছোটবেলায় একদিন সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
বাবা তাকে দেখে বলেছিলেন, “ওপরে যাবি না।”

“কেন?”

“এখন না।”

সেই “এখন না” শব্দটার মধ্যে সোহান কোনো নিষেধের চেয়ে বেশি কিছু শুনেছিল।
এক ধরনের অপেক্ষা।

করিম চাচা পরে বলেছিলেন, “আপনার আব্বা ওই ঘরে বই নিয়ে যেতেন।”

সোহান জিজ্ঞেস করেছিল, “কী বই?”

করিম চাচা মাথা নেড়ে বলেছিলেন, “জানি না।”

এটাই ছিল বাবার প্রকৃতি।
তিনি কিছু রাখতেন নিজের জন্য।
কিন্তু রেখে দিতেন খুব সতর্ক হয়ে।
যেন কোনোদিন কেউ চাইলে খুঁজে পেতে পারে।

একদিন সোহান তৃতীয় তলার সিঁড়িতে উঠে পড়েছিল।
খুব আস্তে।
শুধু দেখতে চেয়েছিল।
তখনই পেছন থেকে বাবার কণ্ঠ শুনেছিল, “সোহান।”

সে ঘুরে দাঁড়ায়।

বাবা সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
চেহারায় রাগ ছিল না।
শুধু একটা কঠিন স্থিরতা।

“এখানে কেন?” তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন।

সোহান উত্তর দিতে পারেনি।

বাবা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন, “কিছু জিনিসকে ওদের জায়গায় থাকতে দে।”

সোহান নেমে এসেছিল।
আর জীবনে প্রথমবার মনে হয়েছিল, বাবা শুধু তাকে থামালেন না, বাঁচিয়েও দিলেন।

সেইসব দিনের কথা এখন মনে পড়লে সোহান বুঝতে পারে, বাবা আসলে কখনো দূরে ছিলেন না।
তিনি শুধু প্রকাশ করতেন না।
প্রকাশ না করেও সবকিছু দেখতেন।
কখন কার চোখে পানি, কখন কার মুখে রাগ, কখন কার নীরবতার ভেতরে কী শব্দ জমছে—সবই তিনি দেখতেন।

মেহরিন একদিন বলেছিল, “বাবা আমাদের চিনতেন না।”

সোহান তখন কিছু বলেনি।
আজ মনে হয়, বাবা হয়তো ঠিক চিনতেন না।
কিন্তু পর্যবেক্ষণ করতেন।
আর সেই পর্যবেক্ষণই ছিল তাঁর নিজের ভাষা।

তাঁর কাছে ভালোবাসা মানে বড় কথা নয়।
ভালোবাসা মানে ছিল, দরকারের সময় দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা।
ভালোবাসা মানে ছিল, কাউকে না ডেকে তার জন্য কম্বল এনে রাখা।
ভালোবাসা মানে ছিল, ছেলে স্কুল থেকে দেরি করলে বারান্দায় চুপ করে অপেক্ষা করা।
আরও অনেক কিছু না বলা।

সোহান খাম নম্বর ১-এর কথা ভাবল।
মায়ের স্বপ্নের কথা ভাবল।
তারপর বাবার পুরোনো চেয়ারটার কথা মনে পড়ল।
এই চেয়ার, এই বারান্দা, এই সিঁড়ি—সবই যেন বাবার নীরবতার অংশ।

সেদিন রাতে সোহান ঘরে ফিরে বাবার টেবিলের ওপর রাখা এক জোড়া চশমা দেখল।
চশমার কাঁচে ধুলো জমে আছে।
সে হাত বাড়িয়ে সেটা তুলে নিল।
এক মুহূর্তে মনে হলো, এই চশমা দিয়ে বাবার চোখ দিয়ে দেখা যায় না।
তবু এতদিন পরে মনে হলো, বাবা হয়তো এখান দিয়েই তাকাতেন—খুব শান্তভাবে, খুব নিঃশব্দে।

সোহান চশমাটা আবার টেবিলে রাখল।
কিছু জিনিস তোলা যায়।
কিছু জিনিস শুধু ছুঁয়ে রাখতে হয়।

আর কিছু ভালোবাসা থাকে, যা কখনো উচ্চারণে আসে না।
কিন্তু একদিন ছেলেরা বুঝতে শেখে—যে মানুষটা কিছুই বলেনি, তিনি আসলে সবচেয়ে বেশি বলে গেছেন।