বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

লেখক: খোকা বাবু

ধরন: রহস্য, ড্রামা

অধ্যায় ১৯ : পুরোনো ঠিকানা

পৃষ্ঠা 19 / 25

পুরোনো বইটা সোহান আগেও দেখেছিল, কিন্তু আজই প্রথম ভেতর থেকে কিছু বেরোল।

বইটা ছিল আব্দুল কাদেরের আলমারির শেষ তাকের ভেতর।
মলাট ভাঙা, পাতাগুলো হলদে, আর মাঝের দিকে এক জায়গায় ভাঁজ পড়ে ছিল। সোহান বইটা উল্টাতেই দুটো পাতার মধ্যে আটকানো একটা ছোট কাগজ বেরিয়ে এল।

একটা ঠিকানা।

কাগজে লেখা ছিল, খুব ছোট করে—

চন্দনপুর

সোহান কাগজটা টেবিলের ওপর রাখল।
মেহরিন প্রথমে কিছু বলল না।
অর্ণব কাগজটার দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, “এটা এখানেই ছিল?”

সোহান মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”

করিম চাচা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি কাগজটার দিকে একবার তাকালেন।
তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই।
বরং এমন একটা চেনা ক্লান্তি, যেন ঠিকানাটা দেখেই কিছু মনে পড়ে গেছে, কিন্তু বলবেন না।

মেহরিন ধীরে বলল, “এটা কার?”

করিম চাচা একটু থামলেন।
তারপর বললেন, “যেতে পারেন।”

সোহান তাকাল।
“মানে?”

“চন্দনপুরে,” করিম চাচা বললেন।
“ওখানে কেউ ছিল।”

কথাটা খুব বেশি না।
কিন্তু যথেষ্ট।

বিকেলের আগেই তারা বেরিয়ে পড়ল।

শহর ছেড়ে বাইরে যেতে যেতে রাস্তা সরু হয়ে এলো।
বাড়িঘরের ভিড় কমল।
দোকানের সাইনবোর্ড ফ্যাকাশে হল।
তারপর একসময় এমন এক এলাকা, যেখানে নদীর গন্ধ বাতাসে মিশে থাকে।
পুরোনো স্টেশনের কাছে রাস্তা আরও নির্জন।

চন্দনপুর শহরের মতো নয়।
এখানে শব্দ কম।
এখানে মানুষ কম কথা বলে।
আর পুরোনো জিনিসগুলো এখনো কেন যেন টিকে আছে।

যার বাড়ির খোঁজে তারা এসেছে, তিনি একজন বৃদ্ধা।

বাড়িটা স্টেশনপাড়ার ভেতর।
দেয়ালে লাল শ্যাওলার দাগ।
সামনের উঠোনে শুকনো পাতা।
দরজার সামনে বসার জন্য একটা ভাঙা বেঞ্চ।

বৃদ্ধা দরজা খুললেন নিজেই।
চোখে চশমা, হাতে একটা কাপড়।
তিনজনকে দেখে থমকে গেলেন।

“কাকে চান?” তাঁর গলা ভারী, কিন্তু দুর্বল নয়।

সোহান একটু এগিয়ে বলল, “সুবর্ণাকে চিনতেন?”

বৃদ্ধা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না।
কিছুক্ষণ তিনজনের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “কেন খুঁজছেন ওকে?”

অর্ণব একটু সরে দাঁড়াল।
প্রশ্নটা সহজ নয়।
তবে উত্তরও ততটা সহজ নয়।

সোহান বলল, “কিছু পুরোনো কথা জানতে চাই।”

বৃদ্ধা এবারও ভেতরে ডাকলেন না।
শুধু দরজায় দাঁড়িয়ে রইলেন।

“ভিতরে আসুন,” তিনি শেষ পর্যন্ত বললেন।

ঘরের ভেতর চুলার গন্ধ।
একটা কাঠের টেবিল।
দেয়ালে পুরোনো ঘড়ি।
আর জানালার পাশে একটা চেয়ার—সেই চেয়ারটায় কেউ বহুদিন বসেনি।

বৃদ্ধা বসতে বললেন না।
নিজেই চুলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন।

মেহরিন ধীরে বলল, “আপনি ওকে চেনেন?”

বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।
“চিনি।”

এরপর আরেকটু চুপ করে থেকে বললেন, “অনেক বছর এখানে ছিল।”

সোহান তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
“এখানে?”

“হুঁ।”

অর্ণব চারপাশে তাকাল।
“একাই?”

বৃদ্ধা একটু থামলেন।
তারপর বললেন, “প্রায় একা।”

সেই “প্রায়” শব্দটায় অনেক কিছু লুকিয়ে ছিল।
কিন্তু কেউ এখনই টেনে আনল না।

মেহরিন ধীরে বলল, “বিয়ে করেছিলেন?”

বৃদ্ধা চোখ তুলে তাকালেন।
“না।”

সোহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “কারও সঙ্গে খুব মিশতেন?”

বৃদ্ধা কাঁধ নাড়লেন।
“খুব না।”

এবার তিনি নিজেই বললেন,
“চুপচাপ থাকত।
কিন্তু চোখে মনে রাখার মতো কিছু ছিল।”

এই এক লাইনেই ঘরের ভেতরটা বদলে গেল।
সুবর্ণা যেন আগের ছবির মতো আর শুধু একটা নাম থাকলেন না।
তিনি হঠাৎ করেই একজন বাস্তব মানুষ হয়ে উঠলেন।
এখন তাঁর দীর্ঘদিনের একাকিত্বও যেন চোখে পড়ে।
একটা পুরোনো ঘর আছে, যেখানে তিনি ছিলেন।

সোহান ধীরে বলল, “উনি কোথাও যেতেন?”

বৃদ্ধা যেন প্রশ্নটা শুনে কিছুক্ষণ ভাবলেন।
তারপর বললেন, “বছরে একদিন।”

মেহরিন জিজ্ঞেস করল, “কোথায়?”

বৃদ্ধা জানালার বাইরে তাকালেন।

“স্টেশনে।”

কথাটা বলেই তিনি চুপ হয়ে গেলেন।

অর্ণব একটু অবাক হয়ে বলল, “কেন?”

বৃদ্ধা উত্তর দিলেন না।

তাঁর মুখে তখন এমন একটা চেনা ক্লান্তি, যেন বহুদিন ধরে একটা কথা না-বলে বসে আছেন।

মেহরিন আবার বলল, “কারও জন্য কি?”

বৃদ্ধা এবারও সরাসরি জবাব দিলেন না।
শুধু জানালার পাশে থাকা চেয়ারটার দিকে তাকালেন।

তারপর খুব আস্তে বললেন,

“মানুষ কখনো কখনো সুখে থাকে না।
তবু থেকে যায়।”

কথাটা ঘরের ভেতর দীর্ঘক্ষণ রয়ে গেল।
কারও মুখে আর প্রশ্ন এল না।

সোহান বুঝল, বৃদ্ধা এমনভাবে কথা বলছেন যেন যা বলা দরকার, তার থেকে বেশি কিছু বললে শব্দের ওজন নষ্ট হয়ে যাবে।

বেরোনোর আগে সোহান কাগজটা আবার হাতে নিল।
ঠিকানা।
চন্দনপুর।

বৃদ্ধা দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন।
তার চোখে এখন আর অস্বস্তি নেই।
শুধু এমন এক ক্লান্তি, যা বহু বছর ধরে কিছু না-বলা কথার সঙ্গে বসে আছে।

“ওকে কি এখনো খুঁজছেন?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

সোহান একটু থামল।
তারপর বলল, “হ্যাঁ।”

বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।
“তাহলে স্টেশনে যান।”

বাইরে বেরিয়ে তিনজন কিছুক্ষণ চুপ করে হাঁটল।

রাস্তায় ফিরে আসতে আসতে মেহরিন বলল, “সুবর্ণা বহু বছর এখানে ছিলেন।”

অর্ণব মাথা নাড়ল।
“আর স্টেশনে যেতেন।”

সোহান কাগজটা ভাঁজ করল।
তার মনে হচ্ছিল, এই পুরোনো ঠিকানা আর একটা ঠিকানা নয়।
এটা নতুন করে রহস্য শুরু করার জন্য রাখা কোনো দরজা।

সোহান কাগজটা পকেটে রাখল।
এখন তাদের সামনে শুধু একটা পুরোনো স্টেশন নয়।
বহু বছরের চাপা সত্যও অপেক্ষা করে আছে।