বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

লেখক: খোকা বাবু

ধরন: রহস্য, ড্রামা

অধ্যায় ২০ : অপেক্ষার মানুষ

পৃষ্ঠা 20 / 25

চন্দনপুর থেকে ফেরার পরও তিনজনের মধ্যে খুব বেশি কথা হয়নি।

সোহানের পকেটে তখনও সেই ছোট কাগজটা ভাঁজ করা ছিল।
চন্দনপুর।
স্টেশন।
সুবর্ণা।
এই তিনটি শব্দ যেন আলাদা আলাদা না থেকে এখন একসঙ্গে জুড়ে গেছে।

পরদিন তারা আবার গেল।

সরাসরি স্টেশনে নয়, আগের বৃদ্ধার বাড়িতেই।
কারণ তারা বুঝেছিল, সেই বাড়ির ভেতর এখনো কিছু কথা রয়ে গেছে, যা প্রথমবার বলা হয়নি।

বৃদ্ধা দরজা খুলে তাদের দেখে অবাক হলেন না।
বরং এমনভাবে তাকালেন, যেন জানতেন তারা আবার আসবে।

“আবার?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

সোহান মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ। কিছু কথা বাকি ছিল।”

বৃদ্ধা এবার ভেতরে ডেকে বসালেন।
চুলায় পানি বসানো ছিল।
জানালার ধারে আলো এসে পড়ছে।
সেই খালি চেয়ারটা আগের জায়গাতেই।

কেউ কিছু বলার আগে বৃদ্ধা নিজেই বললেন, “ও একা থাকত।”

মেহরিন ধীরে তাকাল।
বৃদ্ধা কাপের ভেতর পানি ঢালছিলেন।

“অনেক বছর,” তিনি বললেন।
“একাই।”

সোহান চুপ করে রইল।
অর্ণবও কিছু বলল না।

বৃদ্ধা বললেন, “শুরুতে মানুষ আসত।
খোঁজ নিত।
তারপর কমে গেল।
শেষ দিকে কেউ খুব একটা আসত না।”

মেহরিন নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি ছিলেন?”

বৃদ্ধা একটু হেসে ফেললেন।
হাসিটা ক্লান্ত।

“আমি তো পাশের বাড়ি,” তিনি বললেন।
“থাকা না, দেখেছি।”

এই উত্তরটাতেই সুবর্ণার শেষ জীবনের আকার দেখা যেতে শুরু করল।
একজন মানুষ, যাকে খুব কাছ থেকে কেউ ধরতে পারেনি।
শুধু পাশের বাড়ির কেউ তাকে দেখেছে—যাওয়া, ফেরা, দরজা খোলা, দরজা বন্ধ।

সোহান বলল, “তিনি বিয়ে করেননি কেন?”

বৃদ্ধা হাত থামালেন।
কাপের ভেতর চামচ নাড়ার শব্দও থেমে গেল।

“সবাই করতেই হবে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

অর্ণব একটু সোজা হয়ে বসল।
প্রশ্নটা উত্তর নয়, তবু তার ভেতরে উত্তর আছে।

বৃদ্ধা পরে নিজেই বললেন, “চেষ্টা ছিল।
কথাও উঠেছিল।
কিন্তু হয়নি।”

“কেন?” মেহরিন জিজ্ঞেস করল।

বৃদ্ধা এবার জানালার বাইরে তাকালেন।
“কারও কারও জীবন এগোয় না।
চলতে থাকে।
কিন্তু এগোয় না।”

এই কথাটার পর আরেকটু নীরবতা এলো।
সোহান বুঝল, বৃদ্ধা কথা বলছেন না শুধু।
তিনি বহু বছরের দেখা একটা মানুষকে শব্দে ধরার চেষ্টা করছেন।

“তিনি কি কারও জন্য অপেক্ষা করতেন?” সোহান খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল।

বৃদ্ধা এবার সরাসরি তার দিকে তাকালেন।

“হুঁ।”

এই এক শব্দের ভেতর এতটা নিশ্চিততা ছিল যে, কেউ সঙ্গে সঙ্গে আর কিছু বলল না।

মেহরিন জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে বুঝতেন?”

বৃদ্ধা চুপ করে থেকে বললেন, “বছরে একদিন ও বেরিয়ে যেত।
শাড়ি বদলাত।
চুল গুছাত।
দুপুরের আগেই বের হতো।
ফিরত সন্ধ্যার পরে।”

অর্ণব খুব নিচু গলায় বলল, “স্টেশনে?”

বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।

“ফিরে এসে কথা বলত না,” তিনি বললেন।
“কিন্তু মুখটা বদলে যেত।
যেন কিছুই পায়নি, তবু কিছু একটা রেখে এসেছে।”

সোহানের বুকের ভেতর চাপা একটা টান লাগল।

মেহরিন ধীরে বলল, “তিনি কি কখনো বলেছেন, কার জন্য অপেক্ষা করেন?”

বৃদ্ধা একটু ভেবে বললেন, “নাম বলেনি।”

তারপর, খুব নিচু গলায় যোগ করলেন,
“তবে একবার বলেছিল—কিছু মানুষকে মৃত বলা যায় না, যদি তারা একদিন ফিরে আসতে পারে।”

ঘরের ভেতর হঠাৎ সবকিছু আরও স্থির হয়ে গেল।

অর্ণব মুখ তুলে তাকাল।
সোহান চেয়ারের হাতল ধরে রইল।
মেহরিন একদম নড়ল না।

বৃদ্ধা বললেন, “আমি তখন কিছু জিজ্ঞেস করিনি।”

“কেন?” মেহরিন জিজ্ঞেস করল।

বৃদ্ধা মৃদু মাথা নাড়লেন।
“কারণ কেউ যদি এত বছর ধরে অপেক্ষা করে, তার কারণ জিজ্ঞেস করতে হয় না।”

সোহান অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তার জীবনে কি পরে আর কেউ এসেছিল?”

এই প্রশ্নে বৃদ্ধা প্রথমবার একটু থামলেন।

তিনি জানালার বাইরে তাকালেন।
তারপর বললেন, “একদিন একজন এসেছিল।”

অর্ণব আর মেহরিন একসঙ্গে তাকাল।

বৃদ্ধা ধীরে বললেন, “খুব বেশি সময়ের জন্য না।
এক বিকেলে।”

“এখানে?” সোহান জিজ্ঞেস করল।

“না,” বৃদ্ধা বললেন।
“স্টেশন থেকে ফেরার পথে।
ওই রাস্তার মোড়ে।”

তিনি হাত তুলে জানালার বাইরে একটা দিক দেখালেন, যেন দৃশ্যটা এখনো সেখানেই আছে।

“ওরা দাঁড়িয়ে কথা বলছিল?” মেহরিন জিজ্ঞেস করল।

বৃদ্ধা একটু ভেবে বললেন, “বেশি না।
দেখেছি, দুজনেই দাঁড়িয়ে ছিল।
মাথা নিচু।
মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিল।”

সোহান চুপ করে শুনছিল।

“তারপর?” সে জিজ্ঞেস করল।

“তারপর তিনি চলে গেলেন,” বৃদ্ধা বললেন।

এইটুকুই।
এর বেশি না।

কিন্তু কথার ভেতর এত কিছু ছিল, যে আর জোর করে টানতে হল না।
মেহরিনের কণ্ঠ একটু শুকিয়ে এল।
“তারপর?”

বৃদ্ধা বললেন, “তারপর সুবর্ণা তিনদিন দরজা খোলেনি।”

কেউ কিছু বলল না।

“সেদিন রাতে ওর ঘরের আলো অনেক রাত পর্যন্ত জ্বলছিল,” বৃদ্ধা আবার বললেন।

সোহানের হঠাৎ মনে হলো, এই ঘরের সব মানুষ যেন রাত জেগেই বেঁচে ছিল।
কেউ লিখেছে।
কেউ অপেক্ষা করেছে।
কেউ ফিরে আসেনি।

অর্ণব ধীরে বলল, “তিনি কি এখনও ভাবতেন... ওই মানুষটা ফিরবে?”

বৃদ্ধা এবার কোনো কাব্যিক কথা বললেন না।
শুধু বললেন, “হ্যাঁ।”

এই “হ্যাঁ”টুকুই যথেষ্ট ছিল।

বাইরে তখন বিকেলের আলো নরম হয়ে এসেছে।
জানালার ধারে ধুলো ভাসছে।
আর চেয়ারটা খালি।

মেহরিন উঠে দাঁড়াতে গিয়েও থেমে গেল।
“উনি কি কিছু রেখে গেছেন?”

বৃদ্ধা এই প্রশ্নে এবার প্রথমবার একটু কাঁপলেন।
তারপর খুব ধীরে চুলার পাশের কাঠের তাকের দিকে গেলেন।

ওখানে একটা টিনের বাক্স ছিল।
বহুদিনের।
ঢাকনায় জং ধরা।

তিনি বাক্স খুললেন।
ভেতর থেকে কাপড়ের নিচে রাখা একটা খাম বের করলেন।

খামটা সাদা ছিল একসময়।
এখন মলিন।
উপরে কোনো নাম নেই।

বৃদ্ধা খামটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “এটা রেখে গিয়েছিল।”

সোহান এগিয়ে এল।
“কার জন্য?”

বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।
“কাউকে নাম করে না।”

মেহরিন ফিসফিস করে বলল, “তবু রেখে গিয়েছিলেন?”

“হুঁ,” বৃদ্ধা বললেন।
“বলেছিল, কেউ যদি কোনোদিন পুরোনো কথা খুঁজতে আসে, তখন দিতে।”

অর্ণব এবার সত্যিই সোজা হয়ে বসল।
“আর আপনি এতদিন রাখলেন?”

বৃদ্ধা বললেন, “ওর কথার বাইরে যাইনি।”

কথাটা শোনার পর ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো।

সোহান খামটা হাতে নিল।
খাম খুব হালকা।
কিন্তু হাতে নিতেই মনে হলো, বহু বছরের অপেক্ষা কাগজের ভেতরে ঢুকে আছে।

বৃদ্ধা বললেন, “এখানে খুলবেন না।”

সোহান তাকাল।
“কেন?”

বৃদ্ধা বললেন, “কিছু লেখা ঘরের বাইরে পড়া ভালো।”

এই কথাটার ভেতর এমন এক সংযম ছিল, যে কেউ আর তর্ক করল না।

বেরিয়ে আসার সময় তিনজনের কেউই কথা বলল না।

স্টেশনপাড়ার ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে যখন তারা মূল রাস্তায় উঠল, তখন মেহরিন ধীরে বলল, “তিনি সত্যিই অপেক্ষা করেছিলেন।”

অর্ণব উত্তর দিল না।

সোহান খামটা শক্ত করে ধরে ছিল।
তার মনে হচ্ছিল, এই খামের ভেতরে হয়তো উত্তর নেই।
কিন্তু এমন কিছু আছে, যা উত্তরের আরও কাছে নিয়ে যাবে।

সামনে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে পুরোনো স্টেশন।
হাতে সুবর্ণার রেখে যাওয়া খাম।
আর বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি সত্য—যার দরজায় তারা অবশেষে এসে দাঁড়িয়েছে।