বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

লেখক: খোকা বাবু

ধরন: রহস্য, ড্রামা

অধ্যায় ১৮ : ভাঙা জীবন

পৃষ্ঠা 18 / 25

রাশেদ নেই।
এই দুটি শব্দই ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতর থেকে অন্য সব শব্দকে সরিয়ে দিল। 

প্রথম কয়েকদিন কেউ ঠিকমতো কিছুই বুঝতে পারছিল না।
মা বারবার বলছিলেন, “ও ফিরবে।”
কাদের জানালার পাশে বসে থাকত।
বাড়ির লোকজন যে যেদিকে পারত খোঁজ করতে বেরিয়ে যেত।
সুবর্ণা প্রতিদিনই একবার করে আসতেন—কখনো দরজার কাছে, কখনো ভিতরে ঢুকে, কখনো শুধু জানালার ধারে দাঁড়িয়ে।
তার হাতে থাকত রাশেদের নাম লেখা একটা ছোট তালিকা, যেটায় কোথায় কোথায় খোঁজ করা হয়েছে, তার হিসাব রাখতেন।

প্রথমদিকে তিনি খুব নিয়মিত আসতেন।
তারপর সপ্তাহে একবার।
তারপর মাসে একবার।
তারপর আর প্রায় আসতেন না।

কাদের একদিন পুরোনো লাইব্রেরির দিকে গিয়েছিল।
কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে না, শুধু পা চলে গিয়েছিল বলে।
ভেতরে ঢুকতেই দেখল, সুবর্ণা জানালার পাশে বসে আছেন।
সেই একই টেবিল।
সেই একই নীরবতা।
কিন্তু মুখটা আগের মতো নেই।

কাদের অনেকক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে দরজার কাছে গেল।

দরজা খুলে সুবর্ণা তাকালেন।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ।

কাদের বলল, “এটা...”

তার হাতে একটি বই।
রাশেদের বই।
একটা পুরোনো গল্পের বই, যেটা রাশেদ হয়তো ফেরত দিতে ভুলে গিয়েছিল, অথবা ইচ্ছে করেই রেখে দিয়েছিল।

কাদের বইটা বাড়িয়ে দিল।

“রাশেদের।”

সুবর্ণা বইটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
হাত বাড়ালেন না।

“থাক।”

কাদের কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
“নেবেন না?”

সুবর্ণা চোখ না তুলে বললেন, “না।”

“কেন?”

একটু চুপ।
তারপর খুব আস্তে—

“এখন আর ও বই খুঁজবে না।”

কাদেরের মুখে কোনো উত্তর এলো না।

সুবর্ণা বইটার ওপর হাত দিলেন না।
শুধু তাকিয়ে রইলেন, যেন বইটা নয়, তার ভেতরে কিছু একটা দেখে ফেলেছেন।
কাদের তখন বুঝতে পারল, এই লাইব্রেরিতে আর কেবল বই থাকে না।
এখানে অপেক্ষাও জমে থাকে।

বাইরে বেরিয়ে কাদের আরেকবার পেছন ফিরে তাকাল।
সুবর্ণা তখনও জানালার পাশে বসে আছেন।
কিন্তু তাঁর সামনে খোলা বই নেই।
শুধু ফাঁকা টেবিল।

এরপরও কাদের কিছুদিন তাঁকে খুঁজেছিল।
কখনো একই পথে।
কখনো খবর পাঠিয়ে।
কখনো শুধু দাঁড়িয়ে থেকে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুবর্ণার আসা কমে গেল।
তার উপস্থিতি আর আগের মতো রইল না।

কেউ বলল, “ছেড়ে দাও।”
কেউ বলল, “নিজেকে বাঁচাও।”
কেউ শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

কাদের কিছুই বলল না।

সে শুধু জানত, রাশেদের না-থাকা সুবর্ণাকে ধীরে ধীরে অন্য এক শূন্যতায় নিয়ে গেছে।
আর সেই শূন্যতা ভরা যায় না।
শুধু চুপ করে দেখা যায়।

রাতে কাদের ডায়েরি খুলল।
লেখাটা ছোট।
কিন্তু থেমে থেমে।

সুবর্ণা আজ আর এল না।
আমি জানি না, ওর না-আসা কতদিনে অভ্যাস হবে।
হয়তো এটাই একদিন স্বাভাবিক হয়ে যাবে। 

একদিন আরেকটি লাইন লিখল—

রাশেদের বইটা ও নিল না।

তার নিচে খুব ছোট করে আরেকটি বাক্য—

আমারও আর কিছু বলার ছিল না।

দিন গড়িয়ে যেতে লাগল।
সুবর্ণা আর আগের মতো আসতেন না।
কাদেরও আগের মতো খুঁজতে যেত না।
কারণ কিছু খোঁজ শেষ পর্যন্ত মানুষকে ভাঙতে শেখায়।

রাতের শেষ দিকে কাদের আবার ডায়েরি খুলল।
একটা লাইন লিখল।

কিছু ভালোবাসা শেষ হয় না।
শুধু এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়, যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না।

তারপর সে ডায়েরি বন্ধ করল।

অনেক রাত পর্যন্ত ঘরের আলো জ্বলছিল।
কিন্তু সে আর একটি শব্দও লিখল না।