বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

লেখক: খোকা বাবু

ধরন: রহস্য, ড্রামা

অধ্যায় ১৭ : অন্তর্ধান

পৃষ্ঠা 17 / 25

পরে সবাই বলেছিল, সেদিনের মতো স্বাভাবিক দিন তারা আর দেখেনি।

রাশেদ হারিয়ে যাওয়ার আগের দিন বাড়িটা বাইরে থেকে একেবারে ঠিকঠাকই ছিল।
বিয়ের প্রস্তুতি, নিমন্ত্রণের হিসাব, নতুন কাপড়, রান্নার তদারকি—সবই চলছিল। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার ভেতরেই যেন একটা অশুভ নীরবতা লুকিয়ে ছিল। কেউ তখন বুঝতে পারেনি।

সেদিন বিকেলে রাশেদ খুব কম কথা বলেছিল।
মা-র পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল।
তারপর কাদেরের কাছে এসে বলল, “কতক্ষণ ধরে পড়িস?”

কাদের চোখ না তুলে বলল, “এইতো।”

রাশেদ একটু হেসে বলল, “সবসময় তুই এমনই থাকিস।”

তারপর দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ ফিরে তাকাল।

“কাদের?”

“হুঁ?”

“ভালো থাকিস।”

কাদের ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“এত নাটক করিস কেন?”

রাশেদ তখন কাঁধ ঝাঁকিয়ে হেসে বলল, “জানি না। আজ বলতে ইচ্ছে হলো।”
তারপর সে শুধু হাসল।

সেই হাসিটা পরে সবার মনে থেকে যাবে।

তারপর সে বেরিয়ে গেল।

রাশেদের ঘরের আলমারির ওপর একটা খাম পড়ে ছিল।
কেউ তখন খেয়াল করেনি।

রাতের খাবারের সময়ও সে ফেরেনি।
মা প্রথমে ভাবলেন, হয়তো একটু দেরি হবে।
কিন্তু রাত বাড়তে লাগল, ফোন বেজে গেল, রাশেদ আর ফোন ধরল না।
বন্ধুর বাড়ি, আত্মীয়, চেনা লোক—সবাইকে ফোন করা হলো।
কোথাও কোনো খোঁজ মিলল না।

সেই রাতেই থানায় খবর দেওয়া হলো।

থানার বারান্দায় বসে কাদের খুব চুপচাপ ছিল।
মা বারবার বলছিলেন, “ও ফিরে আসবে।”
কিন্তু কণ্ঠে বিশ্বাস ছিল না।

সুবর্ণা তখনও আসেননি।
তিনি যখন এলেন, পরদিন দুপুর গড়িয়ে গেছে।
দরজায় দাঁড়িয়ে তিনি শুধু জিজ্ঞেস করলেন, “রাশেদ কোথায়?”

মা উত্তর দিতে পারলেন না।
শুধু মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

সুবর্ণা এক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন।
তারপর নিচু গলায় বললেন, “ও এমন করে চলে যাওয়ার মানুষ না।”

কেউ জবাব দিল না।

পাড়ার লোকজনও নানা কথা বলল।
কেউ বলল, “বিয়ের আগে ছেলেরা অনেক সময় মাথা গরম করে কোথাও চলে যায়।”
আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে বলল, “না না, রাশেদ ওই ছেলে না।”
কেউ ভাবল, হয়তো বন্ধুর বাড়িতে আছে।
কেউ চাপা গলায় বলল, “এত হঠাৎ করে কেউ এভাবে হারিয়ে যায় না।”

কিন্তু রাশেদ কোথায় গেল, কেউ জানল না।
শুধু প্রশ্নগুলো থেকে গেল।

থানার খাতায় নাম লেখা হলো।
খোঁজ চলল।
কিন্তু কোনো সুরাহা হলো না।

বাড়ির ভেতরে তখনও সেই খামটা পড়ে ছিল।
খোঁজাখুঁজির মধ্যেই মায়ের চোখে পড়ল।
ভেতরে ভাঁজ করা কাগজ।
অসমাপ্ত চিঠি।

মা খামটা হাতে ধরে বসে রইলেন।
তারপর কাগজটা খুলে দেখা গেল, লেখা মাঝপথে থেমে গেছে।

চিঠিতে লেখা ছিল—

মা,
যদি ফিরতে দেরি হয়, রাগ কোরো না।
আমি জানি না, যা করতে যাচ্ছি, সেটা ঠিক কি না।
কিন্তু...

এরপর আর কিছু নেই।

কাদের কাগজটার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, থেমে গেছে শুধু চিঠিটা নয়।
থেমে গেছে তাদের অপেক্ষাও, আগের মতো থাকার ভানও। 

মা কিছু বললেন না।
মুখ শক্ত হয়ে গেল।
তার চোখে জল ছিল, কিন্তু শব্দ ছিল না।

সুবর্ণা পরে আবার এলেন।
রাশেদের ঘরের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন, “ও এমন হঠাৎ করে চলে যাবে—আমি ভাবতে পারিনি।”

কেউ উত্তর দিল না।

দিন গড়িয়ে যেতে লাগল।
মা আরও চুপচাপ হয়ে গেলেন।
কাদের ডায়েরি খুলে বসল রাতের শেষে।

সেখানে সে লিখল—

রাশেদ আজও ফেরেনি।
এই বাড়িতে তার জুতো আছে, কিন্তু পায়ের শব্দ নেই।
চিঠিটা অসমাপ্ত।
আমাদের প্রশ্নগুলোও।

কিছুক্ষণ পরে আরেকটি লাইন লিখল—

বাকি সব প্রশ্নের মতো, সেই শব্দও আর কোনোদিন ফিরে এল না।

ডায়েরি বন্ধ করার পর কাদের অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

এই বাড়িতে এখন রাশেদের জুতো আছে।
কিন্তু পায়ের শব্দ নেই।