চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি
অধ্যায় ১৬ : যে সিদ্ধান্ত কেউ জানত না
সেই বিকেলটা খুব আলাদা ছিল না।
তৃতীয় তলার ঘরে জানালার আলো পড়ছিল, টেবিলের ওপর খোলা ডায়েরি, আর পাশে রাশেদের ছবিটা। কিন্তু ঘরের ভেতরে যে নীরবতা ছিল, সেটা আগের দিনের মতো নয়। এখন নীরবতার ভেতরে কিছু ধরে রাখা হয়েছে। কিছু জানা গেছে। আর কিছু জানার পর সবকিছু অন্যরকম দেখাতে শুরু করেছে।
সোহানই প্রথম পাতাটা খুলল।
রাশেদের নাম ছিল।
সুবর্ণার নাম ছিল।
আর এই দুটো নাম একসাথে পড়তেই অর্ণব একটু সোজা হয়ে বসল।
কাদেরের লেখা খুব ছোট।
কিন্তু এদিনের নোটগুলো অন্যরকম।
আজ সুবর্ণা আর রাশেদ একসঙ্গে হাঁটল।
আমি দূর থেকে দেখলাম।
মেহরিন কাগজটার দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল।
সোহান আরেকটি লাইন পড়ল।
ওরা হাসছিল।
আমি বুঝলাম, কিছু মানুষ এমনভাবে কাছাকাছি আসে, যাদের জন্য দূরত্ব রাখা আর সম্ভব থাকে না।
অর্ণব ধীরে বলল, “এখানে প্রথমবার সরাসরি বলা হলো।”
কিন্তু সোহান পাতাটা বন্ধ করল না।
আরেক পৃষ্ঠায় লেখা—
রাশেদ ওর দিকে যেভাবে তাকাল, সেটা আমি আগে দেখিনি।
আর সুবর্ণা...
সুবর্ণা যেন তাকিয়ে থাকতেই শিখে গেছে।
মেহরিন কাগজের ওপরে আঙুল রেখে বলল, “বাবা আগে থেকেই বুঝে গিয়েছিলেন?”
কেউ উত্তর দিল না।
কাগজের লেখাগুলো একটু একটু করে খুলতে লাগল।
রাশেদ আজ বলল, ওর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে।
সুবর্ণা বলল, রাশেদ মানুষকে সহজ করে।
আমি শুনলাম। কিছু বললাম না।
এই শেষ লাইনটার পরে ঘরে একটা চাপা স্তব্ধতা নেমে এল।
সোহান ডায়েরির আরেক পাতায় গেল।
সেখানে লেখা—
আজ প্রথমবার বুঝলাম, আমি যেটাকে নীরবে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম, ওরা সেটা স্বাভাবিকভাবে বেঁচে নিচ্ছে।
অর্ণব চোখ তুলে তাকাল।
“মানে?”
সোহান খুব আস্তে বলল, “বাবা এখানে নিজেকে আলাদা করছেন।”
মেহরিন কিছু বলল না।
কিন্তু তার চোখে একধরনের ধাক্কা দেখা গেল।
পাতা আরও এগোল।
রাশেদ আজ আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই সুবর্ণাকে পছন্দ করিস?’
আমি হেসে বললাম, ‘না।’
মিথ্যে না।
কিন্তু পুরো সত্যও না।
সোহান পড়া থামিয়ে দিল।
মেহরিন কাগজটার দিকে ঝুঁকে পড়ল।
কাদেরের এই লেখাটা যেন ঘরের ভেতরের সব শব্দ এক জায়গায় এনে ফেলল।
অর্ণব ধীরে বলল, “তাহলে... বাবা?”
সোহান পরের লাইন পড়ল।
সুবর্ণাকে আমি অনেকদিন ধরেই জানি।
কিন্তু যেদিন রাশেদ ওর নাম বলল, সেদিন বুঝলাম—আমি যাকে জানি, ওকে হয়তো আলাদা করে দেখতে শুরু করেছে।
একটু পরে আরেক লাইন—
কেউ কাউকে দোষ দিচ্ছে না।
তবু আমার বুকের ভেতর কিছু একটা নরম হয়ে যাচ্ছে না।
মেহরিন কাগজের ভাঁজে চোখ রেখে খুব আস্তে বলল, “তিনি কষ্ট পাচ্ছিলেন।”
সোহান মাথা নাড়ল।
আরেক পৃষ্ঠা।
রাশেদ আজ খুব খুশি ছিল।
সুবর্ণা ওর সঙ্গে বসেছিল।
আমি দূরে ছিলাম।
দূরে থাকা কষ্টের হলে, আমি আজ সেটা শিখলাম।
অর্ণব টেবিলের কিনারায় হাত রাখল।
“কেন কিছু বললেন না?”
সোহান পাতা উল্টাল।
কথা বললে হয়তো ওরা থেমে যেত।
আমি সেটা চাইনি।
কথাটা পড়ে কারও মুখে শব্দ এলো না।
মেহরিন জানালার বাইরে তাকাল।
“তাহলে এটাই ছিল?”
“না,” সোহান বলল।
সে আরও উল্টাল।
এবার লেখাটা একটু ভারী, একটু চাপা।
সুবর্ণা জানে না, আমি ওকে কীভাবে দেখি।
রাশেদও জানে না।
আর আমি জানি—এই না-জানাগুলো অনেক সময় মানুষের ভাগ্য বদলে দেয়।
এই লাইনটা পড়ে মেহরিন এক মুহূর্তের জন্য একদম চুপ হয়ে গেল।
অর্ণবও না।
কেউ কোনো প্রশ্ন করল না।
কারণ এখন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে—কাদেরের নীরবতা হঠাৎ আসেনি।
এটা একটা সিদ্ধান্ত।
একটা সঞ্চিত থামা।
একটা ভালোবাসাকে ধরে রেখে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তুতি।
সোহান শেষের দিকের পাতায় গেল।
রাশেদ আজ বলল, ওর সঙ্গে আমি যেন দেখা করি।
আমি করিনি।
ওরা একসাথে থাকলে ভালো লাগে।
এ কথাটা আমি লিখতে পারলাম, বললাম না।
এর নিচে, আরেকটি ছোট, তীক্ষ্ণ লাইন—
আজ সিদ্ধান্ত নিলাম, সুবর্ণাকে আর আমার ভালোবাসার কথা কোনোদিন বলব না।
রাশেদ যেন কখনো আমার চোখে এই কথাটা না পড়ে।
আমি শুধু ওর বড় ভাই হয়েই থাকব।
মেহরিন ধীরে মাথা তুলল।
অর্ণবের মুখ শক্ত হয়ে গেছে।
সোহানও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
এটাই ছিল সেই মুহূর্ত।
সিদ্ধান্তটা।
কথায় না, পাতায়।
একজন মানুষ নিজের চাওয়াকে সোজাসুজি নাম দিয়ে পাশে সরিয়ে রাখছে।
মেহরিন খুব আস্তে বলল, “বাবা নিজে সরে গিয়েছিলেন।”
সোহান মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
অর্ণব ধীরে বলল, “ছোট ভাইয়ের জন্য?”
সোহান আরেকটি লাইন পড়ল।
রাশেদকে আমি অসম্ভব ভালোবাসি।
আর ঠিক সেই কারণেই, আমি যা চাই, তা চাইতে পারি না।
এই লাইনের পরে ঘরে কোনো শব্দ থাকল না।
শুধু কাগজের পাতার হালকা কাঁপুনি।
মেহরিনের গলায় এবার একটু ভাঙন।
“তাহলে বাবা...”
সোহান শেষ পাতার দিকে গেল।
সেখানে লেখা ছিল সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে কঠিন বাক্যগুলো।
আজ প্রথমবার বুঝলাম, ভালোবাসা মানে সব সময় পাওয়া না।
কখনো কখনো ভালোবাসা মানে সরে দাঁড়ানো।
আর কাউকে হারাতে না চেয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলা।
সোহান পাতাটা বন্ধ করল।
ঘরের ভেতর কেউ নড়ল না।
অর্ণবের চোখ টেবিলের ওপর রাখা রাশেদের ছবিতে।
মেহরিনের চোখ খোলা ডায়েরির ওপর।
সোহান যেন বুঝতে পারছিল, কাদেরের নীরবতা এখন আর রহস্য নয়।
এটা ছিল একধরনের সিদ্ধান্ত।
নিজের চাওয়াকে নীরব করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত।
আর সেখান থেকেই শুরু হয়েছে সেই দীর্ঘ, ধীর, ভেতরে ভেতরে ক্ষয় হয়ে যাওয়া জীবন, যার শেষ পরিণতি এখনো তাদের সামনে অপেক্ষা করছে।
সোহান খুব আস্তে বলল, “তাহলে বাবা চুপ ছিলেন কারণ তিনি হারতে ভয় পেতেন না।
তিনি চুপ ছিলেন কারণ তিনি কাউকে হারাতে চাননি।”
কেউ উত্তর দিল না।
শুধু টেবিলের ওপর রাশেদের ছবি আর খোলা ডায়েরি পাশাপাশি পড়ে রইল।
একদিকে এমন একজন মানুষ, যে আলোয় ছিল।
অন্যদিকে এমন একজন, যে আলোটা অন্যের জন্য তুলে ধরে নিজে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে গেছে।
সেই রাতেই কাদের নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
আশ্চর্যের বিষয়, সেই সিদ্ধান্তের কথা সে আর কোনোদিন কাউকে বলেনি।