বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

লেখক: খোকা বাবু

ধরন: রহস্য, ড্রামা

অধ্যায় ১৫ : দুই ভাই

পৃষ্ঠা 15 / 25

কাদের অনেক দিন ধরেই সুবর্ণাকে চিনত।
পরিচয়টা বড় ছিল না। বইয়ের পাতার ফাঁক দিয়ে, ছোট ছোট কথায়, আর একই লাইব্রেরির নীরবতায় ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া এক সম্পর্ক। সে সম্পর্কের কোনো নাম ছিল না, কিন্তু অনুপস্থিতি টের পাওয়া যেত।

রাশেদ তখনও এই গল্পে ঢোকেনি।
ঢুকল এক সন্ধ্যায়, খুব স্বাভাবিকভাবে, নিজের চেনা হাসি নিয়ে।

“আজ লাইব্রেরিতে একজন মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো।”

কাদের বই থেকে চোখ তুলল।

“নাম?”

“সুবর্ণা।”

শব্দটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই কাদেরের হাত থেমে গেল।
বইয়ের পাতা আর উল্টাল না।

রাশেদ সেটা খেয়াল করল না।
সে নিজের আনন্দেই ছিল।

“ভালো নাম, না?” সে বলল।
“মেয়েটা বেশি কথা বলে না। কিন্তু কথার মধ্যে একটা শান্তি আছে।”

কাদের ধীরে বইটা বন্ধ করল।

“তুই চুপ হয়ে গেলি কেন?” রাশেদ হেসে বলল। “নামটা শুনে তোর কী হলো?”

কাদের কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

“তুই ওকে চিনিস?”

কাদের চোখ নামিয়ে খুব ধীরে বলল, “না... মনে হয় না।”

রাশেদ আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

কাদেরের “না... মনে হয় না”—দুটি শব্দ। অথচ তার ভেতর লুকিয়ে রইল অসংখ্য না-বলা কথা।

রাশেদ তখনও কিছুই বুঝতে পারেনি।
তার মুখে ছিল শুধু নতুন একজন মানুষকে আবিষ্কার করার সহজ আনন্দ।

এরপরও সে বারবার সুবর্ণার কথা তুলছিল।
কীভাবে তিনি বইয়ের তাকের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
কীভাবে একবার তাকিয়েছিলেন, হাসেননি, কিন্তু চোখে কিছু ছিল।
কীভাবে বলেছিলেন, “এই বইটা ভালো হতে পারে।”

কাদের শুনছিল।
একেবারে মন দিয়ে।

রাশেদ বলল, “যাওয়ার সময় আমার নাম ধরে বলল, ‘আবার দেখা হবে।’”

কাদেরের চোখ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।
সে কিছু বলল না।

রাশেদ হাসল।
“তোর কী হলো? আজ এমন চুপচাপ?”

কাদের খুব আস্তে বলল, “কিছু না।”

রাতে খাবারের সময় রাশেদ আবার বলল, “আজ সুবর্ণা বলল, আমি নাকি খুব সহজে মানুষের সঙ্গে মিশে যাই।”

কাদের মুখ তুলে তাকাল না।
“তাই তো?”

“হুঁ,” রাশেদ বলল। “ভালো নাকি খারাপ বুঝলাম না।”

কাদের খুব আস্তে বলল, “খারাপ না।”

রাশেদ তখন হেসে উঠল।
“তুইও মাঝে মাঝে ভালো কথা বলিস।”

কাদের হাসল না।
সে তখনই বুঝতে শুরু করছিল, একটি নাম দুই ভাইয়ের ভেতরে দুই রকম জায়গা নিতে পারে।
একজনের কাছে সেটি নতুন পরিচয়ের আনন্দ।
অন্যজনের কাছে—নীরবে জমে থাকা কষ্টের ধাক্কা।

রাশেদ কিন্তু শুধু সুবর্ণার কথাই বলত না।
সে ছিল এমনই, যে নিজের আনন্দ কাউকে না দিয়ে থাকতে পারত না।
একদিন কাদেরের জন্য গরম মুড়ি আর তেলেভাজা নিয়ে এলো, “তুই সারাদিন বই গিলিস। এইটা খেয়ে নে।”

কাদের অবাক হয়ে তাকাল।
“এগুলো কোথা থেকে?”

“বাজার থেকে,” রাশেদ বলল।
“তোর মতো মানুষ ক্ষুধা বুঝে না। আমাকেই বুঝতে হয়।”

আরেকদিন কাদের জ্বরে কাতরাচ্ছিল।
রাশেদ সারা দুপুর উঠোনের এপাশ-ওপাশ করে শেষে ওষুধ এনে দিল।
মায়ের আগে সে-ই খেয়াল করল, কাদেরের গলা শুকিয়ে গেছে।

“এবার একটু কম নাক উঁচু করে থাক,” সে বলল।
“ওষুধ খাস।”

কাদের তখনও কিছু বলতে পারেনি।
রাশেদ মায়ের সঙ্গে গল্প করে তাঁকে হাসাল।
বাড়ির ভার কমিয়ে দিল।

আর ছাদে বসে দুই ভাই অনেক রাত পর্যন্ত কথা বলত।
কখনো ভবিষ্যতের কথা।
কখনো রাশেদের দোকান খোলার স্বপ্ন।
কখনো কাদেরের নীরবতা নিয়ে রসিকতা।

“আমি একদিন বড় দোকান দেব,” রাশেদ বলত।
“আর তুই এসে আমার হিসাব দেখে দিবি।”

কাদের মাথা নেড়ে বলত, “আমি কেন?”

“কারণ তুই আমার ভাই।”

এই বাক্যটা সহজ ছিল।
কিন্তু কাদেরের মনে অনেকক্ষণ থেকে যেত।

একদিন হঠাৎ রাশেদ বলল, “কাদের?”

“হুঁ?”

“তুই থাকলে আমার সাহস বাড়ে।”

কাদের অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।

“কেন?”

রাশেদ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিল, “জানি না।
তুই থাকলেই মনে হয় কিছু হবে না।”

কাদের সেদিনও উত্তর দেয়নি।
কিন্তু সেই কথাটা আর কোনোদিন ভুলতে পারেনি।

এক সময় আবার সুবর্ণার কথা উঠল।

“সুবর্ণা আজ বলল, বইয়ের ভাঁজ ঠিক করা নয়, বই পড়াই আসল।”

কাদের তখনও চুপ।

রাশেদ পাশে তাকাল।
“তুই কী ভাবিস?”

কাদের কিছুক্ষণ পরে বলল, “ঠিকই বলেছে।”

রাশেদ মুচকি হেসে বলল, “তুইও মাঝে মাঝে ওর মতো কথা বলিস আজকাল।”

কাদের তাকাল না।
শুধু বলল, “না।”

রাশেদ তখনও খুশি।
“কাল আবার গেলে হয়তো দেখব।”

এই কথাটায় কাদেরের ভেতর একটা টান পড়ল।
সে বুঝল, রাশেদ এখন সেই জায়গায় ঢুকছে, যেখানে সে নিজে অনেকদিন ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল।

আর এই বোঝাপড়াটা সহজ ছিল না।

সে রাতে ডায়েরির একেবারে নিচে কাদের আরও একটি লাইন লিখেছিল—

আজ প্রথমবার ওর কথা শুনে আমার চুপ থাকাটা কঠিন হয়ে গেল।

লাইনটা লিখে সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল।
তারপর ডায়েরি বন্ধ করে দিয়েছিল।

কারণ সে জানত, কিছু নাম মানুষকে কাছে আনে না সবসময়।
কখনো কখনো একই নাম দুই ভাইয়ের মাঝখানে এমন এক নীরবতা রেখে যায়, যা আর কোনো কথায় ভাঙে না।