বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

রোবট কি সত্যিই মানুষের চাকরি নিয়ে নেবে? স্বয়ংক্রিয়তার ভবিষ্যৎ ও বদলে যাওয়া কর্মজগত

  • Author: Admin
  • August 15, 2026
রোবট কি সত্যিই মানুষের চাকরি নিয়ে নেবে? স্বয়ংক্রিয়তার ভবিষ্যৎ ও বদলে যাওয়া কর্মজগত
রোবট কি সত্যিই মানুষের চাকরি নিয়ে নেবে?

রোবট মানুষের চাকরি নিয়ে নেবে—প্রযুক্তি নিয়ে ভবিষ্যতের আলোচনা শুরু হলেই এই আশঙ্কাটি প্রায় অবধারিতভাবে সামনে আসে। বিশাল কারখানায় সারিবদ্ধ যান্ত্রিক বাহু যখন মানুষের স্পর্শ ছাড়াই গাড়ির যন্ত্রাংশ জোড়া লাগায়, গুদামে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র যখন পণ্য বাছাই ও স্থানান্তর করে, কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের হিসাব, নথি যাচাই ও গ্রাহকের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর যখন কম্পিউটার নিজেই দিতে শুরু করে, তখন মনে হওয়া স্বাভাবিক যে মানুষের প্রয়োজন বুঝি ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। রোবট ও স্বয়ংক্রিয়তা একই সঙ্গে কিছু কাজ বিলুপ্ত করছে, অনেক কাজের ধরন পাল্টাচ্ছে এবং এমন নতুন কাজ সৃষ্টি করছে যেগুলোর অস্তিত্ব কয়েক দশক আগেও ছিল না। তাই মূল প্রশ্ন শুধু কত চাকরি হারাবে তা নয়; বরং মানুষের কাজের কোন অংশ যন্ত্রের হাতে যাবে এবং নতুন ব্যবস্থায় মানুষের ভূমিকা কী হবে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

স্বয়ংক্রিয়তা নতুন কোনো ঘটনা নয়। মানুষ বহু শতাব্দী ধরেই শারীরিক শ্রম কমাতে যন্ত্র ব্যবহার করছে। কৃষিকাজে লাঙল থেকে যান্ত্রিক ফসল কাটার যন্ত্র, কাপড় তৈরিতে হাতের তাঁত থেকে বৃহৎ যন্ত্রচালিত কারখানা, হিসাবরক্ষণে হাতে লেখা খাতা থেকে কম্পিউটার—প্রতিটি পর্যায়েই প্রযুক্তি মানুষের কিছু কাজ নিজের দখলে নিয়েছে। শিল্পবিপ্লবের সময়ও আশঙ্কা ছিল যন্ত্র মানুষের কর্মসংস্থান ধ্বংস করবে। বাস্তবে বহু পুরোনো পেশা সংকুচিত হয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে শিল্পকারখানা, পরিবহন, প্রকৌশল, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, বিপণন, ব্যবস্থাপনা এবং পরে তথ্যপ্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে বিপুল নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

বর্তমান পরিবর্তনটি অবশ্য আগের অনেক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের তুলনায় আলাদা। আগে যন্ত্র প্রধানত মানুষের শারীরিক শক্তির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত সফটওয়্যার মানুষের কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক কাজও সম্পাদন করতে পারছে। লেখা থেকে তথ্য বের করা, বিপুল নথির মধ্যে মিল খোঁজা, ছবি বিশ্লেষণ, কথোপকথন চালানো, তথ্য শ্রেণিবিন্যাস, ভাষা রূপান্তর, প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি কিংবা নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে সিদ্ধান্তের সুপারিশ—এসব কাজের অনেক অংশ এখন যন্ত্রের মাধ্যমে করা সম্ভব। ফলে স্বয়ংক্রিয়তার প্রভাব শুধু কারখানার শ্রমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; কার্যালয়ের কর্মীরাও এর আওতায় চলে আসছেন।

তবে এখানে চাকরি এবং কাজ—এই দুটি বিষয়ের পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষের একটি চাকরির মধ্যে সাধারণত অনেক ধরনের কাজ থাকে। ধরা যাক, একজন হিসাবরক্ষক তথ্য সংগ্রহ করেন, সংখ্যা যাচাই করেন, নির্দিষ্ট হিসাব করেন, অসঙ্গতি খুঁজে বের করেন, প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন, সহকর্মীর সঙ্গে আলোচনা করেন এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করেন। সফটওয়্যার হয়তো প্রথম কয়েকটি কাজ অত্যন্ত দ্রুত করতে পারবে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে পুরো পেশাটিই সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যাবে। বরং কর্মীর সময়ের ব্যবহার বদলে যেতে পারে। ভবিষ্যতের স্বয়ংক্রিয়তার বড় অংশ সম্পূর্ণ চাকরি প্রতিস্থাপনের চেয়ে চাকরির ভেতরের নির্দিষ্ট কাজ প্রতিস্থাপন করবে।

কারখানা এই পরিবর্তন বোঝার সবচেয়ে পরিষ্কার উদাহরণ। একই ধরনের বস্তু বারবার তোলা, নির্দিষ্ট স্থানে বসানো, ঝালাই করা, রং করা কিংবা নির্দিষ্ট মাত্রায় কাটা—এ ধরনের কাজ রোবটের জন্য আদর্শ। কারণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত, কাজের ধাপ পুনরাবৃত্তিমূলক এবং প্রতিটি গতিবিধি আগে থেকে নির্ধারণ করা যায়। একটি যান্ত্রিক বাহু ক্লান্ত হয় না, মনোযোগ হারায় না এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ পেলে দীর্ঘ সময় একই নির্ভুলতায় কাজ করতে পারে। ফলে গাড়ি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, ধাতব পণ্য এবং অন্যান্য বৃহৎ উৎপাদনশিল্পে স্বয়ংক্রিয়তার বিস্তার খুবই স্বাভাবিক।

কিন্তু একই রোবটকে যদি একটি অপরিচিত বাড়িতে পাঠিয়ে বলা হয় রান্নাঘরের সব জিনিস গুছিয়ে দিতে, তখন সমস্যাটি অনেক কঠিন হয়ে যায়। কোন কাপ কোথায় থাকবে, ভঙ্গুর জিনিস কীভাবে ধরতে হবে, মেঝেতে হঠাৎ কোনো শিশু চলে এলে কী করতে হবে, অগোছালো পরিবেশে কোন বস্তুটি কোন দিকে সরানো নিরাপদ—এ ধরনের পরিস্থিতিতে ক্রমাগত উপলব্ধি, বিচার এবং অভিযোজন প্রয়োজন। বাস্তব পৃথিবীর অনিশ্চয়তা রোবটের জন্য এখনো একটি বড় বাধা। মানুষের কাছে সাধারণ মনে হওয়া বহু শারীরিক কাজ যন্ত্রের জন্য আশ্চর্যজনকভাবে কঠিন।

গুদাম ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অবশ্য স্বয়ংক্রিয়তা দ্রুত এগোচ্ছে। পণ্য বহন, নির্দিষ্ট তাক শনাক্ত করা, বাক্স স্থানান্তর, পণ্য বাছাই এবং মজুতের হিসাব রাখার মতো কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে করা সহজ হচ্ছে। এর ফলে একই গুদাম আগের তুলনায় কম সময়ে অনেক বেশি পণ্য পরিচালনা করতে পারে। কিন্তু এখানেও মানুষ পুরোপুরি অদৃশ্য হচ্ছে না। যন্ত্রের ত্রুটি নির্ণয়, ব্যতিক্রমী পণ্য পরিচালনা, নিরাপত্তা তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুরো ব্যবস্থার সমন্বয়ের জন্য মানুষের প্রয়োজন থাকে। ফলে কম দক্ষতার পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ কমলেও প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন কাজ বাড়তে পারে।

গ্রাহকসেবাও বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আগে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাধারণ তথ্য জানতে মানুষের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন হতো। এখন স্বয়ংক্রিয় কথোপকথন ব্যবস্থা দিনের যেকোনো সময় সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা জটিল হলে পরিস্থিতি ভিন্ন। ভুল লেনদেন, ক্ষুব্ধ গ্রাহক, ব্যতিক্রমী অভিযোগ কিংবা এমন সিদ্ধান্ত যেখানে প্রতিষ্ঠানের নিয়মের পাশাপাশি মানবিক বিবেচনাও জরুরি—এসব ক্ষেত্রে দক্ষ মানুষের ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের গ্রাহকসেবা তাই সম্ভবত সম্পূর্ণ মানবনির্ভর বা সম্পূর্ণ যন্ত্রনির্ভর হবে না; বরং সাধারণ কাজ যন্ত্র করবে এবং জটিল পরিস্থিতি মানুষের কাছে পাঠাবে।

ব্যাংক, বিমা, হিসাবরক্ষণ এবং প্রশাসনিক কাজেও একই ধারা দেখা যায়। তথ্য এক নথি থেকে অন্য নথিতে স্থানান্তর, নির্দিষ্ট নিয়মে আবেদন যাচাই, একই ধরনের প্রতিবেদন তৈরি, বিল প্রক্রিয়াকরণ কিংবা তথ্য শ্রেণিবিন্যাস—এসব কাজ স্বয়ংক্রিয় করা তুলনামূলক সহজ। ফলে শুধু কারখানার শ্রমিক নয়, নিয়মভিত্তিক দাপ্তরিক কাজে যুক্ত মানুষেরাও পরিবর্তনের মুখোমুখি। বিশেষ করে যে কাজগুলোতে প্রতিদিন একই ধরনের তথ্য একই নিয়ম অনুসরণ করে প্রক্রিয়া করতে হয়, সেগুলোর স্বয়ংক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

অন্যদিকে চিকিৎসাসেবায় প্রযুক্তির ভূমিকা আরও সূক্ষ্ম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল চিকিৎসা-তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, নির্দিষ্ট ধরনের ছবিতে অস্বাভাবিকতার সম্ভাব্য অঞ্চল শনাক্ত করতে পারে এবং চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে। অস্ত্রোপচারেও অত্যন্ত সূক্ষ্ম যান্ত্রিক ব্যবস্থা চিকিৎসকের হাতের গতিবিধিকে আরও নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। কিন্তু রোগীর ইতিহাসের অস্পষ্টতা বোঝা, বিভিন্ন ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য করা, রোগীর সঙ্গে বিশ্বাস তৈরি করা এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মানুষের চিকিৎসাজ্ঞান ও বিচারবোধ অপরিহার্য। এখানে যন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকা হতে পারে চিকিৎসককে প্রতিস্থাপন নয়, চিকিৎসকের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

মানুষের কাজের ভবিষ্যৎ বুঝতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থনীতি। কোনো কাজ প্রযুক্তিগতভাবে স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব হলেই যে প্রতিষ্ঠান সেটি করবে, এমন নয়। যন্ত্র কেনার মূল্য, স্থাপন, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং ত্রুটির খরচ বিবেচনা করতে হয়। কোনো অঞ্চলে মানবশ্রম তুলনামূলক সস্তা এবং কাজটি দ্রুত পরিবর্তিত হলে সেখানে রোবট বসানো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নাও হতে পারে। বিপরীতে শ্রমের খরচ বেশি, কর্মী পাওয়া কঠিন অথবা কাজটি বিপজ্জনক হলে স্বয়ংক্রিয়তা দ্রুত লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। তাই একই প্রযুক্তি পৃথিবীর সব দেশে একই গতিতে চাকরি বদলাবে না।

বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে সেই কাজগুলো যেগুলো পুনরাবৃত্তিমূলক, পূর্বানুমানযোগ্য এবং স্পষ্ট নিয়মে বিভক্ত করা যায়। কারখানায় একই যন্ত্রাংশ বসানো, তথ্য প্রবেশ করানো, সাধারণ নথি সাজানো, নির্দিষ্ট ধরনের হিসাব করা, গুদামে পণ্য সরানো কিংবা সাধারণ গ্রাহক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এর উদাহরণ। একটি কাজ যত বেশি একইভাবে পুনরাবৃত্তি হয়, সেটিকে যন্ত্রের জন্য নির্দেশনায় রূপান্তর করা তত সহজ।

কিন্তু মানুষের একটি বড় সুবিধা হলো আমরা শুধু নির্দেশ অনুসরণ করি না; প্রয়োজন হলে পরিস্থিতির অর্থও বুঝতে চেষ্টা করি। একজন দক্ষ শিক্ষক একই বিষয় দুই শিক্ষার্থীকে দুইভাবে বোঝাতে পারেন। একজন নার্স রোগীর মুখভঙ্গি দেখে এমন সমস্যার আভাস পেতে পারেন যা কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যায় ধরা পড়েনি। একজন অভিজ্ঞ কারিগর শব্দ শুনে যন্ত্রের অস্বাভাবিকতা অনুমান করতে পারেন। একজন ব্যবস্থাপক একই তথ্যের ভিত্তিতে কর্মীদের মানসিক অবস্থা, বাজারের পরিস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন। এই প্রাসঙ্গিক বিচার, সামাজিক উপলব্ধি এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা মানুষের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি জটিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লেখা, ছবি, নকশা কিংবা ধারণার খসড়া তৈরি করতে সক্ষম হওয়ায় অনেকেই মনে করেন সৃজনশীল পেশাও দ্রুত হারিয়ে যাবে। বাস্তবে প্রযুক্তি সৃজনশীল কাজের উৎপাদনপ্রক্রিয়াকে অবশ্যই বদলে দিচ্ছে। আগে একটি প্রাথমিক নকশা তৈরিতে যে সময় লাগত, এখন অনেক ক্ষেত্রে তার বিভিন্ন সম্ভাব্য রূপ দ্রুত দেখা যায়। কিন্তু কোন ধারণাটি উপযুক্ত, কোনটি মানুষের আবেগের সঙ্গে যুক্ত হবে, কোন বার্তা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কোন ফলাফল ব্যবহার করা উচিত—এই নির্বাচনের দায়িত্ব এখনো মানুষের বিচারবোধের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভবত ঘটবে মানুষ বনাম রোবট প্রতিযোগিতায় নয়, বরং প্রযুক্তি ব্যবহারকারী মানুষ বনাম প্রযুক্তি ব্যবহার না করা মানুষ—এই ব্যবধানে। একজন কর্মী যদি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে কয়েক ঘণ্টার কাজ কয়েক মিনিটে শেষ করতে পারেন, তাহলে তার উৎপাদনশীলতা দ্রুত বাড়তে পারে। ফলে প্রতিষ্ঠান সব সময় কর্মী বাদ দেওয়ার পরিবর্তে একই কর্মী দিয়ে বেশি কাজ করাতে, উন্নত সেবা দিতে বা নতুন বাজারে প্রবেশ করতে পারে। তখন প্রযুক্তি চাকরি ধ্বংসের যন্ত্রের পাশাপাশি মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমেও কাজ করে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ অমূলক। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের লাভ ও ক্ষতি একই মানুষের ওপর পড়ে না। একটি নতুন প্রযুক্তি সামগ্রিক অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়ালেও কোনো নির্দিষ্ট কর্মীর চাকরি হারিয়ে যেতে পারে। নতুন যে কাজ তৈরি হচ্ছে, তার জন্য হয়তো অন্য ধরনের শিক্ষা প্রয়োজন এবং সেটি অন্য শহর বা অঞ্চলে থাকতে পারে। একজন কর্মী বিশ বছর ধরে যে দক্ষতা ব্যবহার করেছেন, নতুন চাকরির জন্য সেটি যথেষ্ট নাও হতে পারে। অতএব আসল সংকট অনেক ক্ষেত্রে চাকরির মোট সংখ্যা নয়, পুরোনো দক্ষতা থেকে নতুন দক্ষতায় যাওয়ার ব্যবধান।

এই পরিবর্তনের কারণে শিক্ষাব্যবস্থাকেও নতুনভাবে ভাবতে হবে। শুধু নির্দিষ্ট তথ্য মুখস্থ করা বা একই পদ্ধতিতে কাজ করার দক্ষতা ভবিষ্যতে যথেষ্ট নাও হতে পারে। সমস্যা বিশ্লেষণ, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার, তথ্যের সত্যতা যাচাই, যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত, যোগাযোগ, দলগত কাজ এবং নতুন দক্ষতা দ্রুত শেখার ক্ষমতা ক্রমেই মূল্যবান হয়ে উঠবে। প্রযুক্তিগত পেশায় যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ, সফটওয়্যার পরিচালনা, তথ্য বিশ্লেষণ, রোবট রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তদারকির চাহিদাও বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে নতুন ধরনের পেশা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র তৈরি হলেই সেটির নকশা, স্থাপন, পরীক্ষা, পরিচালনা, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নয়নের জন্য মানুষ দরকার হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা বিস্তৃত হলে তথ্যের মান যাচাই, ফলাফলের নির্ভুলতা পরীক্ষা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের ব্যবহারের উপযোগী প্রক্রিয়া তৈরির কাজও বাড়ে। ইতিহাসে নতুন প্রযুক্তি প্রায়ই এমন পেশা সৃষ্টি করেছে যার নাম আগের প্রজন্মের কাছে অপরিচিত ছিল। ভবিষ্যতেও একই ঘটনা ঘটার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

তবে প্রযুক্তি থেকে সৃষ্ট নতুন কাজের সংখ্যা বাড়লেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। একজন কারখানার কর্মী চাকরি হারানোর পর সরাসরি রোবট নির্মাতা প্রকৌশলী হয়ে যেতে পারেন না। এখানে প্রশিক্ষণ, সময়, অর্থ এবং শিক্ষার সুযোগ দরকার। ফলে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো এমন ব্যবস্থা তৈরি করা যাতে মানুষ কর্মজীবনের মাঝামাঝিও নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারে। একবার শিক্ষা শেষ করে সারাজীবন একই দক্ষতায় কাজ করার ধারণা ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম শ্রমমূল্য অনেক দেশের উৎপাদনশিল্পে একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ছিল। কিন্তু রোবটের খরচ কমতে থাকলে উৎপাদনের সিদ্ধান্তে শ্রমমূল্যের গুরুত্ব কিছু ক্ষেত্রে কমে যেতে পারে। কোনো উন্নত দেশের প্রতিষ্ঠান যদি নিজ দেশের কাছাকাছি অত্যন্ত স্বয়ংক্রিয় কারখানায় কম শ্রমিক ব্যবহার করে উৎপাদন করতে পারে, তাহলে শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির জন্য চাপ তৈরি হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় শিক্ষা, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি এবং উচ্চমূল্যের উৎপাদনের গুরুত্ব আরও বাড়বে।

রোবটের প্রসারে নিরাপত্তার দিকটিও উপেক্ষা করা যায় না। খনি, রাসায়নিক কারখানা, অত্যন্ত উত্তপ্ত পরিবেশ, বিপজ্জনক পদার্থ পরিচালনা কিংবা দুর্যোগপূর্ণ স্থানে অনুসন্ধানের মতো কাজে মানুষের পরিবর্তে যন্ত্র ব্যবহার করা গেলে প্রাণহানির ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এমন ক্ষেত্রে কোনো কাজ মানুষের হাত থেকে চলে যাওয়াকে শুধু কর্মসংস্থান হারানো হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; এটি মানুষের জীবনকে বিপজ্জনক কাজ থেকে মুক্ত করার প্রক্রিয়াও হতে পারে।

কর্মঘণ্টার ভবিষ্যৎও স্বয়ংক্রিয়তার সঙ্গে জড়িত। যদি একই পরিমাণ পণ্য বা সেবা উৎপাদনে মানুষের শ্রমের প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, তাহলে তাত্ত্বিকভাবে মানুষ কম সময় কাজ করেও উচ্চ উৎপাদনশীলতার সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটবে না। প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি অতিরিক্ত সম্পদ কীভাবে বণ্টিত হবে, কর্মীর মজুরি কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং উৎপাদনশীলতার লাভ কারা পাবে—এসব অর্থনৈতিক ও সামাজিক সিদ্ধান্তের ওপর ফলাফল নির্ভর করবে। একই প্রযুক্তি এক সমাজে কর্মীর জীবন সহজ করতে পারে, অন্য সমাজে আয়ের বৈষম্য বাড়াতে পারে।

আরেকটি ভুল ধারণা হলো মানুষের মতো দেখতে রোবটই চাকরির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান রোবটের চেয়ে অদৃশ্য সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কার্যালয়ে একটি রোবট এসে কর্মীর চেয়ারে বসবে না; বরং সফটওয়্যার এমন দশটি কাজের আটটি করে ফেলবে যেগুলো আগে কর্মীরা হাতে করতেন। তখন একই পরিমাণ কাজের জন্য কম মানুষ প্রয়োজন হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান পরিবর্তন বুঝতে শুধু কারখানার যান্ত্রিক রোবটের দিকে তাকালে পুরো চিত্র দেখা যাবে না।

তবু এমন বহু ক্ষেত্র থাকবে যেখানে মানুষের উপস্থিতি নিজেই সেবার একটি অংশ। শিশু পরিচর্যা, প্রবীণদের যত্ন, মানসিক সহায়তা, নেতৃত্ব, আলোচনা, জটিল শিক্ষা, সামাজিক সেবা এবং ব্যক্তিগত পরামর্শে মানুষ শুধু একটি কাজ সম্পন্ন করে না; সে বিশ্বাস, সহানুভূতি ও সম্পর্ক তৈরি করে। প্রযুক্তি এসব পেশাকে সহায়তা করতে পারে, প্রশাসনিক চাপ কমাতে পারে এবং তথ্য সরবরাহ করতে পারে, কিন্তু মানুষের সম্পর্কের মূল্যকে পুরোপুরি যান্ত্রিক করা অনেক কঠিন।

শেষ পর্যন্ত তাই রোবট মানুষের সব চাকরি নিয়ে নেবে—এমন ভবিষ্যৎকে অনিবার্য ধরে নেওয়ার যথেষ্ট ভিত্তি নেই। আবার প্রযুক্তি কর্মজগৎকে খুব সামান্য বদলাবে—এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। পরিবর্তন ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং সামনে এর গতি আরও বাড়তে পারে। কিছু পেশা সংকুচিত হবে, কিছু পেশার ভেতরের অধিকাংশ কাজ স্বয়ংক্রিয় হবে, কিছু কাজ মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের যৌথ ব্যবস্থায় রূপ নেবে এবং সম্পূর্ণ নতুন পেশার জন্ম হবে।

ভবিষ্যতের সবচেয়ে মূল্যবান কর্মী সম্ভবত সেই ব্যক্তি নন যিনি যন্ত্রের চেয়ে দ্রুত একই পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করতে পারেন। বরং এগিয়ে থাকবেন তিনি, যিনি বুঝতে পারবেন কোন কাজটি যন্ত্রকে দেওয়া উচিত, যন্ত্রের ফলাফল কোথায় যাচাই করতে হবে এবং মানুষের বিচারবোধ কোথায় অপরিহার্য। প্রযুক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পাশাপাশি সেটিকে নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে শেখাই আগামী কর্মজগতের অন্যতম প্রধান দক্ষতা হয়ে উঠতে পারে।

রোবটের ভবিষ্যৎ তাই কেবল যন্ত্রের গল্প নয়; এটি মানুষের অভিযোজনের গল্পও। অতীতের প্রযুক্তিগত বিপ্লবগুলো যেমন মানুষের কাজের অর্থ বদলে দিয়েছে, বর্তমান স্বয়ংক্রিয়তার ঢেউও তেমনই আমাদের কাজের সংজ্ঞা নতুন করে লিখছে। প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত “রোবট কি মানুষের চাকরি নেবে?”—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যখন যন্ত্র আমাদের বর্তমান কাজের বড় একটি অংশ করতে পারবে, তখন মানুষ নিজের সময়, দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং বিচারবোধকে কোন নতুন কাজে ব্যবহার করবে? সম্ভবত ভবিষ্যতের কর্মজগতের প্রকৃত উত্তর লুকিয়ে আছে সেখানেই।