বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

পেনা প্রাসাদ: পর্তুগালের পাহাড়চূড়ায় রঙিন রোমান্টিক স্থাপত্যের রূপকথার রাজপ্রাসাদ

সিরিজ: বিশ্বের কিংবদন্তি দুর্গ ও প্রাসাদ

পেনা প্রাসাদ: পর্তুগালের পাহাড়চূড়ায় রঙিন রোমান্টিক স্থাপত্যের রূপকথার রাজপ্রাসাদ
সিন্ত্রার পাহাড়ে রঙ, প্রকৃতি ও রাজকীয় কল্পনার মিলন

পর্তুগালের সিন্ত্রা পাহাড়ের ওপর পেনা প্রাসাদকে দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজ অরণ্যের মাঝখানে কেউ রঙিন স্বপ্ন বসিয়ে দিয়েছে। কোথাও উজ্জ্বল হলুদ দেয়াল, কোথাও লাল টাওয়ার, আবার কোথাও নীল-সাদা টালির অলংকরণ। খাড়া পাথরের ওপর গড়ে ওঠা ভবনের প্রতিটি অংশ একই রকম নয়; তার এই অসম বিন্যাসই আকর্ষণের বড় কারণ। পেনা প্রাসাদ উনিশ শতকের রোমান্টিক স্থাপত্যের এক অসাধারণ প্রকাশ, যেখানে ঐতিহাসিক স্মৃতি, ব্যক্তিগত কল্পনা এবং পাহাড়ি প্রকৃতিকে একসঙ্গে সাজানো হয়েছে।

এখানে ‘রোমান্টিক’ শব্দটি শুধু প্রেমময় পরিবেশ বোঝায় না। ইউরোপের রোমান্টিক শিল্পধারা অতীতের রহস্য, মধ্যযুগীয় স্থাপত্য, দূরদেশের সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির আবেগময় শক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছিল। কঠোর সমমিতি কিংবা একটি নির্দিষ্ট স্থাপত্যরীতির পরিবর্তে এই ধারায় বিস্ময় ও কল্পনার স্থান ছিল বড়। পেনার গম্বুজ, দুর্গসদৃশ প্রাচীর এবং অলংকৃত জানালার মধ্যে সেই ভাবনা দেখা যায়। একটি পাহাড়চূড়াকে নাটকীয় দৃশ্যে রূপান্তর করাই এখানে স্থাপত্যের অন্যতম উদ্দেশ্য—শুধু বড় রাজকীয় বাড়ি নির্মাণ নয়।

পেনার ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছেন দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ। সাক্সে-কোবুর্গ ও গোথা পরিবারের এই রাজপুত্র পর্তুগালের রানি দ্বিতীয় মারিয়াকে বিয়ে করে দেশটির রাজপরিবারের অংশ হন। শিল্প, সংগীত, উদ্ভিদ এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্যের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল গভীর। পেনায় তিনি সেই আগ্রহকে বাস্তব রূপ দেওয়ার সুযোগ পান। ১৮৩৮ সালে তিনি পাহাড়চূড়ার পরিত্যক্ত মঠ ও সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি কিনে নেন। প্রথমে পুরোনো ভবনকে গ্রীষ্মকালীন আবাসে রূপান্তরের পরিকল্পনা থাকলেও ধীরে ধীরে প্রকল্পটি বৃহত্তর প্রাসাদে পরিণত হয়।

তবে ফার্দিনান্দের আগেও পাহাড়টি ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করত। এখানে আওয়ার লেডি অব পেনার উপাসনালয় এবং পরে হিয়েরোনিমাইট সম্প্রদায়ের মঠ গড়ে উঠেছিল। রাজা প্রথম মানুয়েলের পৃষ্ঠপোষকতা সেই মঠের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে পেনার পরিচয় সম্পূর্ণ নতুন রাজকীয় নির্মাণ দিয়ে শুরু হয়নি। নির্জন পাহাড়ে উপাসনা, তীর্থযাত্রা এবং সন্ন্যাসজীবনের স্মৃতি আগে থেকেই উপস্থিত ছিল। নতুন প্রাসাদের মধ্যে পুরোনো ধর্মীয় ভবন সংরক্ষণ করার ফলে সেই অতীত ভবনের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থেকে যায়।

প্রাসাদ নির্মাণে ফার্দিনান্দের সহযোগী ছিলেন ব্যারন ভিলহেল্ম লুডভিগ ফন এশভেগে। তিনি খনিজবিদ ও খনি প্রকৌশলী ছিলেন; পর্তুগালের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কেও তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল। পাহাড়ের অসম পাথুরে ভূমি এবং বিদ্যমান মঠকে বিবেচনায় রেখে নতুন অংশ নির্মাণ করতে হয়। তাই পেনার বিন্যাস সমতল ভূমিতে আঁকা নিয়মিত প্রাসাদপরিকল্পনার মতো নয়। বিভিন্ন উচ্চতার ভবন, সিঁড়ি, বারান্দা ও পথ প্রাকৃতিক অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে গড়ে উঠেছে। এই সীমাবদ্ধতাই শেষ পর্যন্ত তার স্বতন্ত্র সৌন্দর্যের উপাদান হয়েছে।

পেনা মূলত পুরোনো মঠ ও নতুন রাজপ্রাসাদের মিলিত কাঠামো। পুরোনো অংশে ব্যক্তিগত আবাসনের প্রাধান্য ছিল; নতুন অংশে বৃহৎ আনুষ্ঠানিক কক্ষও রাখা হয়। ভবনের এই দুই স্তর তার চেহারা এবং ব্যবহার বুঝতে সাহায্য করে। একটি অংশ অতীতের ধর্মীয় জীবনের স্মৃতি বহন করে, অন্যটি উনিশ শতকের রাজকীয় প্রতিনিধিত্বের ভাষা প্রকাশ করে। পুরোনো ভবন সম্পূর্ণ মুছে না দিয়ে তাকে নতুন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করায় পেনায় ইতিহাসের ধারাবাহিকতা দৃশ্যমান হয়েছে।

স্থাপত্যে গথিক, মুরীয়, নবজাগরণধর্মী এবং মানুয়েলীয় প্রভাব মিলেছে। সূচালো খিলান মধ্যযুগীয় ইউরোপের কথা মনে করায়; কিছু গম্বুজ ও অলংকরণ আইবেরীয় উপদ্বীপের ইসলামি শিল্পঐতিহ্যের প্রতিধ্বনি বহন করে। মানুয়েলীয় রীতির জটিল খোদাই পর্তুগালের নিজস্ব ঐতিহাসিক পরিচয় তুলে ধরে। টোমারের কনভেন্ট অব ক্রাইস্টের বিখ্যাত জানালা থেকে অনুপ্রাণিত পেনার একটি জানালা এই পুনর্জাগরণের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিভিন্ন রীতি এখানে পাশাপাশি বসানো হলেও উদ্দেশ্য ছিল একটি কল্পনাময়, সুসংযুক্ত রাজকীয় পরিবেশ তৈরি করা।

প্রাসাদের রং সেই পরিবেশকে আরও নাটকীয় করেছে। লাল ও হলুদের বড় পৃষ্ঠ সবুজ গাছপালার বিপরীতে দাঁড়ায়; টালির সূক্ষ্ম নকশা কাছে গেলে আলাদা অভিজ্ঞতা দেয়। দূর থেকে ভবনের সামগ্রিক অবয়ব নজর কাড়ে, কাছে এসে দেখা যায় পাথরের কারুকাজ ও ছোট অলংকরণ। সূর্যালোক, মেঘ এবং কুয়াশার পরিবর্তনে একই দেয়ালের অনুভূতিও বদলে যায়। তাই পেনার সৌন্দর্য একটি স্থির দৃশ্য নয়। পাহাড়ের আবহাওয়া ও দর্শকের অবস্থান তার দৃশ্যমান চরিত্র গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।

ট্রাইটনের প্রবেশদ্বার পেনার সবচেয়ে বিস্ময়কর অলংকরণগুলোর একটি। অর্ধেক মানুষ ও অর্ধেক মাছের পৌরাণিক অবয়বটি একটি খোলসের ওপর বসে আছে। নিচের অংশে প্রবাল ও সামুদ্রিক উপাদান, ওপরের অংশে বৃক্ষ ও আঙুরলতার নকশা দেখা যায়। জলজ ও স্থলজ জগতের মিলন এই প্রবেশদ্বারের নকশায় প্রকাশিত হয়েছে। এটি নিছক অদ্ভুত প্রাণীর ভাস্কর্য নয়; পুরো দরজা ও জানালার অলংকরণকে একটি ভাবনায় যুক্ত করে। পেনার কল্পনাময় শিল্পভাষা এখানে বিশেষভাবে স্পষ্ট।

পুরোনো মঠের গির্জা থেকে রূপান্তরিত চ্যাপেলটি অন্য ধরনের সৌন্দর্য ধারণ করে। এখানে ষোড়শ শতকের বেদির শিল্পকর্ম সংরক্ষিত রয়েছে। ফরাসি বংশোদ্ভূত ভাস্কর নিকোলা দে শঁতেরেন ১৫২৯ থেকে ১৫৩২ সালের মধ্যে অ্যালাবাস্টার ও স্থানীয় চুনাপাথরে কাজটি তৈরি করেন। পরে ফার্দিনান্দ রঙিন কাচের জানালা যুক্ত করেন। ফলে একই কক্ষে ভিন্ন সময়ের শিল্প একত্র হয়েছে। রাজকীয় প্রাসাদের নতুন পরিচয়ের মধ্যেও মঠের ধর্মীয় অতীতকে দৃশ্যমান রাখা পেনার ইতিহাস বোঝার গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি।

বাইরের উজ্জ্বলতার বিপরীতে ভেতরের কক্ষগুলো রাজকীয় জীবনের ঘনিষ্ঠ চিত্র দেয়। অভ্যর্থনাকক্ষের নীল মখমল, সোনালি অলংকরণ, ব্রোঞ্জ এবং চীনামাটির সামগ্রী অতিথির ওপর প্রভাব তৈরির জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। আধুনিক সংরক্ষণে পুরোনো তালিকা, ক্রয়ের হিসাব এবং ঐতিহাসিক আলোকচিত্র ব্যবহার করে এই সাজসজ্জা পুনর্গঠন করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, অভ্যন্তরের বিলাসিতা আকস্মিক ছিল না। কক্ষের কাজ অনুযায়ী আসবাব, রং ও উপকরণ বেছে নেওয়া হতো, যাতে ব্যক্তিগত জীবন এবং আনুষ্ঠানিক আপ্যায়নের মধ্যে পার্থক্য বজায় থাকে।

পেনার উদ্যান প্রাসাদের সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় পঁচাশি হেক্টরের এই পরিসরে ফার্দিনান্দ বিভিন্ন অঞ্চলের গাছপালা এনে রোপণ করেন। আঁকাবাঁকা পথ, ফার্নসমৃদ্ধ উপত্যকা, পাথরের গঠন এবং নির্জন বিশ্রামস্থল একটির পর একটি দৃশ্য আবিষ্কারের সুযোগ দেয়। এখানে সব সৌন্দর্য প্রবেশমুখ থেকে দেখা যায় না। কোথাও ঘন গাছের আড়াল, কোথাও হঠাৎ খোলা পাহাড়ি দৃশ্য—এই পরিবর্তন পরিকল্পিত অভিজ্ঞতার অংশ। প্রকৃতিকে নিয়মিত সারিতে সাজানোর বদলে তার মধ্যে রহস্য ও অপ্রত্যাশিত সৌন্দর্য সৃষ্টি করা হয়েছে।

হ্রদের উপত্যকায় ছোট জলপ্রপাত দিয়ে সংযুক্ত পাঁচটি হ্রদ রয়েছে। জলচর পাখির আশ্রয়গুলোর নকশায় প্রাসাদ ও কাছের মুরীয় দুর্গের প্রতিধ্বনি দেখা যায়। আবার ছোট পাখির ঝরনার অষ্টভুজ মণ্ডপ, গম্বুজ ও অলংকৃত টালি উদ্যানের স্থাপত্যবৈচিত্র্য বাড়িয়েছে। খিলানের প্রাঙ্গণ থেকে সিন্ত্রার পাহাড় ও আটলান্টিকের বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। এই সব উপাদান দেখায়, পেনা শুধু একটি ভবন নয়; এটি স্থাপত্য, উদ্ভিদ, জল ও দূরের ভূদৃশ্য নিয়ে তৈরি সমন্বিত শিল্পপরিকল্পনা।

রাজপরিবারের পরবর্তী প্রজন্মও পেনা ব্যবহার করেছিল। রাজা প্রথম কার্লোস ও রানি আমেলিয়ার গ্রীষ্মকালীন অবস্থান প্রাসাদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯১০ সালের ৫ অক্টোবর প্রজাতন্ত্র ঘোষণার সংবাদ আমেলিয়া এই প্রাসাদেই পান; এরপর তিনি পরিবারে যোগ দিয়ে দেশত্যাগের পথে যাত্রা করেন। একই বছরে পেনা জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভের মর্যাদা পায়। ১৯৯৫ সালে স্বীকৃত সিন্ত্রার বিশ্ব ঐতিহ্য সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটি। পাহাড়চূড়ার রঙিন সৌন্দর্যের আড়ালে তাই সংরক্ষিত আছে ধর্মীয় স্মৃতি, শিল্পপ্রেমী রাজা এবং পর্তুগালের বদলে যাওয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার ইতিহাস।


আপনার পছন্দ হতে পারে