মহাকাশ প্রতিযোগিতা: স্পুটনিক থেকে চাঁদে মানুষ পাঠানোর স্নায়ুযুদ্ধের ইতিহাস
সিরিজ: স্নায়ুযুদ্ধ: দুই পরাশক্তির বিশ্বসংঘাত
স্পুটনিক থেকে চাঁদে মানুষের ঐতিহাসিক যাত্রা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু সেনাবাহিনী, পারমাণবিক বোমা কিংবা রাজনৈতিক জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। পৃথিবীর বাইরে মহাকাশও হয়ে উঠেছিল তাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের নতুন মঞ্চ। কোন দেশ প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠাবে, প্রথম মানুষকে কক্ষপথে নেবে কিংবা প্রথম চাঁদে পৌঁছাবে—এসব অভিযান আপাতদৃষ্টিতে বৈজ্ঞানিক হলেও প্রতিটির ভেতরে ছিল সামরিক সক্ষমতা, জাতীয় মর্যাদা ও আদর্শিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের আকাঙ্ক্ষা। মহাকাশ প্রতিযোগিতায় একটি রকেটের সাফল্য শুধু বিজ্ঞানীদের অর্জন ছিল না; তা পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রমাণ হিসেবে প্রচারিত হতো।
এই প্রতিযোগিতার প্রযুক্তিগত শিকড় ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মান রকেট কর্মসূচিতে। ভার্নার ফন ব্রাউনের নেতৃত্বে নাৎসি জার্মানি ভি-২ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছিল, যা মহাকাশের সীমান্তে উঠে শত শত কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারত। যুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন পেপারক্লিপ’-এর মাধ্যমে ফন ব্রাউনসহ বহু জার্মান বিজ্ঞানী, নকশা ও রকেটের যন্ত্রাংশ নিয়ে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নও জার্মান বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তি সংগ্রহ করে। উভয় পরাশক্তি বুঝেছিল, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং মহাকাশ উৎক্ষেপণযানের মূল প্রযুক্তি একই—শক্তিশালী রকেট যদি উপগ্রহকে কক্ষপথে তুলতে পারে, তবে সেটি পারমাণবিক অস্ত্রও অন্য মহাদেশে পৌঁছে দিতে পারে।
সোভিয়েত রকেট কর্মসূচির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন সের্গেই কোরোলেভ। স্ট্যালিনের শুদ্ধি অভিযানে বন্দিত্ব ও শ্রমশিবিরের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তিনি পরে সোভিয়েত মহাকাশ পরিকল্পনার প্রধান নকশাকার হন। নিরাপত্তার কারণে তাঁর পরিচয় জীবদ্দশায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়েছিল। কোরোলেভের নেতৃত্বে তৈরি আর-৭ ছিল বিশ্বের প্রথম সফল আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনের উদ্দেশ্যে তৈরি এই শক্তিশালী রকেটই ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর কাজাখস্তানের বাইকোনুর উৎক্ষেপণকেন্দ্র থেকে স্পুটনিক-১ উপগ্রহকে পৃথিবীর কক্ষপথে নিয়ে যায়।
স্পুটনিক ছিল প্রায় ৫৮ সেন্টিমিটার ব্যাসের একটি ধাতব গোলক, যার সঙ্গে চারটি দীর্ঘ অ্যান্টেনা যুক্ত ছিল। এটি শুধু সরল বেতার সংকেত পাঠাত, কিন্তু সেই ‘বিপ-বিপ’ শব্দ পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্রে প্রবল কম্পন সৃষ্টি করে। আকাশে কোনো দেশের সার্বভৌম সীমান্ত ছিল না; ফলে সোভিয়েত উপগ্রহ নিয়মিত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দিয়ে ঘুরতে থাকে। মার্কিন জনগণ হঠাৎ উপলব্ধি করে, যে রকেট উপগ্রহকে মাথার ওপর পাঠাতে পারে, সেটি পারমাণবিক বোমাও আমেরিকায় পৌঁছে দিতে সক্ষম। একটি ছোট গোলাকার উপগ্রহ সোভিয়েত প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের এমন প্রতীক হয়ে ওঠে, যা কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে অর্জন করা সম্ভব ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব উপগ্রহ উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কিন্তু স্পুটনিকের সাফল্য তাদের অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে। ১৯৫৭ সালের ডিসেম্বরে ভ্যানগার্ড রকেট উৎক্ষেপণের কয়েক সেকেন্ড পর বিস্ফোরিত হলে সেই ব্যর্থতা সরাসরি টেলিভিশনে দেখা যায়। সংবাদমাধ্যম রকেটটিকে ব্যঙ্গাত্মক নামে ডাকতে শুরু করে। অবশেষে ফন ব্রাউনের দলের জুপিটার-সি রকেট ১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি এক্সপ্লোরার-১ উপগ্রহকে কক্ষপথে স্থাপন করে। উপগ্রহটির যন্ত্রপাতি পৃথিবীর চারপাশের তেজস্ক্রিয় কণার অঞ্চল শনাক্ত করতে সাহায্য করে, যা পরে ভ্যান অ্যালেন বিকিরণ বলয় নামে পরিচিত হয়। ফলে আমেরিকার প্রথম সফল উপগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও এনে দেয়।
স্পুটনিক সংকট মার্কিন শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনে বড় পরিবর্তন ঘটায়। ১৯৫৮ সালে জাতীয় প্রতিরক্ষা শিক্ষা আইনের মাধ্যমে গণিত, বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও বিদেশি ভাষা শিক্ষায় বিপুল অর্থ বরাদ্দ করা হয়। একই বছর সামরিক গবেষণায় নতুন প্রযুক্তি তৈরির জন্য উন্নত গবেষণা প্রকল্প সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বেসামরিক মহাকাশ কর্মসূচি পরিচালনার জন্য নাসার জন্ম হয়। ছড়িয়ে থাকা মার্কিন প্রকল্পগুলোকে একত্র করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়। মহাকাশ প্রতিযোগিতা শ্রেণিকক্ষ থেকে গবেষণাগার পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মের বৈজ্ঞানিক শিক্ষাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশে পরিণত করেছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুত আরও সাফল্য অর্জন করে। ১৯৫৭ সালের নভেম্বরে স্পুটনিক-২ মহাকাশে প্রথম জীবিত প্রাণী হিসেবে লাইকা নামের একটি কুকুরকে বহন করে। তখন তাকে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা ছিল না এবং অতিরিক্ত তাপে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। অভিযানটি জীবিত প্রাণীর ওপর মহাকাশযাত্রার প্রভাব সম্পর্কে কিছু তথ্য দিলেও লাইকার মৃত্যু মহাকাশ অভিযানের নৈতিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ১৯৫৯ সালে লুনা-২ প্রথম মানবনির্মিত বস্তু হিসেবে চাঁদের পৃষ্ঠে পৌঁছায় এবং লুনা-৩ চাঁদের অদৃশ্য দূর পাশের প্রথম ছবি পাঠায়। প্রতিটি সাফল্য সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক ক্ষমতার বিজয় হিসেবে প্রচারিত হয়।
মানুষকে মহাকাশে পাঠানোর প্রতিযোগিতায়ও সোভিয়েতরা এগিয়ে যায়। ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল ইউরি গ্যাগারিন ভস্তক-১ মহাকাশযানে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করেন। তাঁর যাত্রা স্থায়ী হয়েছিল প্রায় ১০৮ মিনিট। পৃথিবীর প্রথম মহাকাশচারী হিসেবে হাস্যোজ্জ্বল গ্যাগারিন আন্তর্জাতিক নায়কে পরিণত হন। মাত্র ২৭ বছর বয়সী এক সোভিয়েত পাইলটের এই অর্জন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ধাক্কা সৃষ্টি করে। ১৯৬১ সালের মে মাসে অ্যালান শেপার্ড প্রথম মার্কিন নাগরিক হিসেবে মহাকাশে গেলেও তাঁর অভিযান ছিল স্বল্পস্থায়ী উপকক্ষীয় উড্ডয়ন; পূর্ণ কক্ষপথে পৌঁছান জন গ্লেন ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
গ্যাগারিনের সাফল্যের কয়েক সপ্তাহ পর প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ১৯৬১ সালের ২৫ মে কংগ্রেসে ঘোষণা করেন, দশক শেষ হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র একজন মানুষকে চাঁদে নামিয়ে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবে। লক্ষ্যটি বেছে নেওয়া হয়েছিল সতর্ক হিসাব করে। পৃথিবীর কাছাকাছি স্বল্পমেয়াদি অভিযানে সোভিয়েতরা এগিয়ে থাকলেও চাঁদে অবতরণের জন্য উভয় দেশকেই নতুন রকেট, মহাকাশযান, ন্যাভিগেশন, কম্পিউটার ও জীবনরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে হতো। এটি ছিল এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অর্থনীতি, শিল্পক্ষমতা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় কাজে লাগিয়ে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল।
চাঁদের আগে মানুষকে দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকা, মহাকাশযানের গতিপথ পরিবর্তন এবং দুটি যানের সংযোগ শেখা প্রয়োজন ছিল। মার্কিন মার্কারি প্রকল্পের পর জেমিনি কর্মসূচিতে এসব কৌশল পরীক্ষা করা হয়। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নও ধারাবাহিক প্রথম অর্জন অব্যাহত রাখে। ১৯৬৩ সালে ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা প্রথম নারী হিসেবে মহাকাশে যান। ১৯৬৫ সালে আলেক্সেই লিওনভ ভসখোদ-২ থেকে বেরিয়ে প্রথম মহাকাশ পদচারণা করেন। তবে তাঁর মহাকাশ পোশাক শূন্যতায় ফুলে যাওয়ায় যানে ফিরতে গুরুতর সমস্যা হয়েছিল। এই ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয়, প্রচারণার উজ্জ্বল সাফল্যের আড়ালে প্রতিটি অভিযান কতটা বিপজ্জনক ছিল।
দুই পক্ষই প্রাণহানি ও ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়। ১৯৬৭ সালে সয়ুজ-১ পৃথিবীতে ফেরার সময় প্যারাসুট ব্যর্থ হলে সোভিয়েত মহাকাশচারী ভ্লাদিমির কোমারভ নিহত হন। একই বছরে ভূমিতে একটি পরীক্ষার সময় অ্যাপোলো-১ মহাকাশযানের কেবিনে আগুন লেগে মার্কিন মহাকাশচারী গাস গ্রিসম, এড হোয়াইট ও রজার শ্যাফি মারা যান। অগ্নিকাণ্ডের পর অ্যাপোলো মহাকাশযানের নকশা, তার, দরজা ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা হয়। মহাকাশ প্রতিযোগিতার প্রতিটি বিজয়ের পেছনে ছিল পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি, গোপন ব্যর্থতা এবং মানুষের জীবনের বিরাট ঝুঁকি।
অ্যাপোলো কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ছিল স্যাটার্ন-৫ রকেট। ফন ব্রাউনের দলের তৈরি প্রায় ১১১ মিটার উঁচু এই রকেট মানুষ ও প্রয়োজনীয় মহাকাশযানকে চাঁদের পথে পাঠাতে পারত। ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরে অ্যাপোলো-৮-এর ফ্র্যাঙ্ক বোরম্যান, জেমস লাভেল ও উইলিয়াম অ্যান্ডার্স প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করেন। সেখান থেকে ধারণ করা চাঁদের দিগন্তের ওপর উদিত নীল পৃথিবীর ছবি মানবজাতিকে নিজের গ্রহকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। একই সঙ্গে অভিযানটি প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্র চাঁদে অবতরণের অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই অ্যাপোলো-১১ ফ্লোরিডা থেকে উৎক্ষেপিত হয়। নীল আর্মস্ট্রং, বাজ অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স চাঁদের পথে যাত্রা করেন। ২০ জুলাই আর্মস্ট্রং ও অলড্রিনের চন্দ্রযান ‘ঈগল’ চাঁদের প্রশান্তির সাগর অঞ্চলে অবতরণ করে; কলিন্স কমান্ড যানে চাঁদের কক্ষপথে অবস্থান করেন। অবতরণের সময় নির্ধারিত স্থানে বড় পাথর দেখা দেওয়ায় আর্মস্ট্রং হাতে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিরাপদ স্থান খুঁজে নেন। জ্বালানি প্রায় শেষ হয়ে আসার মুহূর্তে ঈগল অবতরণ করে। কয়েক ঘণ্টা পর আর্মস্ট্রং চাঁদের মাটিতে প্রথম পদক্ষেপ রাখেন, এরপর অলড্রিন তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। তাঁরা নমুনা সংগ্রহ, ছবি ধারণ ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্র স্থাপন করে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসেন।
বিশ্বজুড়ে কয়েক শ কোটি মানুষ এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি ছিল প্রযুক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি বিশাল প্রচারণামূলক বিজয়। যে দেশ স্পুটনিক ও গ্যাগারিনের কারণে পিছিয়ে পড়েছিল, সেই দেশই মানুষকে চাঁদে নামিয়ে প্রতিযোগিতার সবচেয়ে নাটকীয় লক্ষ্য অর্জন করে। তবে অ্যাপোলো কর্মসূচির ব্যয়ও ছিল বিপুল—সর্বোচ্চ সময়ে প্রায় চার লাখ মানুষ, হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ এতে যুক্ত ছিল। এই বিনিয়োগ ক্ষুদ্র কম্পিউটার, উপাদানবিজ্ঞান, যোগাযোগ, নির্দেশনাব্যবস্থা ও প্রকৌশল ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতি ত্বরান্বিত করে।
মহাকাশ কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ ভাষার আড়ালে সামরিক গুরুত্ব সব সময় উপস্থিত ছিল। উপগ্রহ দিয়ে শত্রুর ভূখণ্ড পর্যবেক্ষণ, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত, আবহাওয়া বিশ্লেষণ এবং দূরবর্তী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়। উৎক্ষেপণ রকেট ও আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিও ছিল ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাই একটি সফল মহাকাশ অভিযান প্রতিপক্ষকে পরোক্ষভাবে জানিয়ে দিত যে সংশ্লিষ্ট দেশের রকেট, নির্দেশনা, যোগাযোগ ও শিল্পব্যবস্থা উন্নত। মহাকাশে বিজ্ঞান এবং পৃথিবীতে সামরিক শক্তি একই প্রযুক্তির দুই ভিন্ন প্রকাশে পরিণত হয়েছিল।
চাঁদে যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যের পর প্রতিযোগিতার তীব্রতা ধীরে ধীরে কমে। সোভিয়েত এন-১ চন্দ্ররকেটের একাধিক পরীক্ষা ব্যর্থ হয় এবং কোনো সোভিয়েত নাগরিক চাঁদে পৌঁছাতে পারেননি। মস্কো পরে মহাকাশ স্টেশন ও দীর্ঘমেয়াদি কক্ষপথ অভিযানে গুরুত্ব দেয়। যুক্তরাষ্ট্রও ১৯৭২ সালে শেষ অ্যাপোলো চন্দ্রাভিযানের পর ব্যয়বহুল কর্মসূচি বন্ধ করে। ১৯৭৫ সালের অ্যাপোলো-সয়ুজ অভিযানে মার্কিন ও সোভিয়েত মহাকাশযান কক্ষপথে যুক্ত হয় এবং দুই দেশের মহাকাশচারীরা করমর্দন করেন। এটি প্রতিযোগিতার মাঝেও সীমিত সহযোগিতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
মহাকাশ প্রতিযোগিতা ছিল বিজ্ঞান, সামরিক কৌশল, প্রচারণা ও জাতীয় আত্মমর্যাদার এক অসাধারণ মিশ্রণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম উপগ্রহ, প্রথম মানুষ, প্রথম নারী ও প্রথম মহাকাশ পদচারণার কৃতিত্ব অর্জন করেছিল; যুক্তরাষ্ট্র চাঁদে মানুষ নামিয়ে সবচেয়ে স্মরণীয় লক্ষ্য পূরণ করে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিপুল অর্থব্যয়, গোপনীয়তা ও প্রাণহানি সৃষ্টি করলেও রকেটবিজ্ঞান, যোগাযোগ, কম্পিউটার, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ এবং পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে দ্রুত বদলে দেয়। স্নায়ুযুদ্ধ দুই পরাশক্তিকে আকাশের ওপারে মর্যাদা খুঁজতে ঠেলে দিয়েছিল, কিন্তু তাদের সেই প্রতিযোগিতার ফল শেষ পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে ওঠে।
চীনা বিপ্লব ও কোরীয় যুদ্ধ: এশিয়ায় স্নায়ুযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী বিস্তার
আরব বসন্তের আঞ্চলিক ঢেউ: মরক্কো, আলজেরিয়া, জর্ডান ও ওমানে কী বদলেছিল?
সিরিয়ার আরব বসন্ত: দারার বিক্ষোভ থেকে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের সূচনা
ইয়েমেনের আরব বসন্ত: সালেহর পতন থেকে রাজনৈতিক সংকট ও গৃহযুদ্ধ
বাহরাইনের পার্ল রাউন্ডঅ্যাবাউট আন্দোলন: শিয়া বিক্ষোভ, রাজতন্ত্রের দমন ও সৌদি হস্তক্ষেপ