বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হাঙ্গেরীয় বিদ্রোহ থেকে প্রাগ স্প্রিং: সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে ব্যর্থ প্রতিরোধ

সিরিজ: স্নায়ুযুদ্ধ: দুই পরাশক্তির বিশ্বসংঘাত

হাঙ্গেরীয় বিদ্রোহ থেকে প্রাগ স্প্রিং: সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে ব্যর্থ প্রতিরোধ
সোভিয়েত ট্যাংকের সামনে পূর্ব ইউরোপের স্বাধীনতার স্বপ্ন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে প্রতিষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক সরকারগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করলেও তাদের রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর সোভিয়েত ইউনিয়নের গভীর নিয়ন্ত্রণ ছিল। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া ও পূর্ব জার্মানিতে মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট দলগুলো বিরোধীদের সরিয়ে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করে। গোপন পুলিশ, রাজনৈতিক বিচার, সেনাবাহিনীর ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ এবং কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতি এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখত। কিন্তু শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী এবং এমনকি কমিউনিস্ট পার্টির সংস্কারপন্থীদের মধ্যেও স্বাধীনতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে যায়নি। ১৯৫৬ সালের হাঙ্গেরীয় বিদ্রোহ এবং ১৯৬৮ সালের প্রাগ স্প্রিং দেখিয়েছিল যে পূর্ব ইউরোপের মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল, কিন্তু সোভিয়েত সামরিক শক্তি সেই পরিবর্তনের সীমা নির্ধারণ করত।

সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে অসন্তোষ হাঙ্গেরি বা চেকোস্লোভাকিয়ায় প্রথম প্রকাশ পায়নি। ১৯৫৩ সালের জুনে পূর্ব জার্মানির নির্মাণশ্রমিকদের আন্দোলন দ্রুত সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে পরিণত হয়েছিল। সোভিয়েত ট্যাংক ও পূর্ব জার্মান নিরাপত্তা বাহিনী সেটি দমন করে। একই বছরের মার্চে স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর মস্কোতে ক্ষমতার লড়াই এবং দমননীতি কিছুটা শিথিল হওয়ায় পূর্ব ইউরোপে পরিবর্তনের আশা জন্মায়। ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিকিতা ক্রুশ্চেভ কমিউনিস্ট পার্টির গোপন অধিবেশনে স্ট্যালিনের ব্যক্তিপূজা, শুদ্ধি অভিযান ও অপরাধের সমালোচনা করেন। এই ‘ডি-স্ট্যালিনাইজেশন’ সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে এক বিপজ্জনক প্রশ্ন তুলেছিল—স্ট্যালিন যদি ভুল করে থাকেন, তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত পূর্ব ইউরোপীয় সরকার ও নীতিগুলো কতটা বৈধ?

হাঙ্গেরিতে স্ট্যালিনপন্থী নেতা মাতিয়াস রাকোশির শাসন ছিল বিশেষভাবে কঠোর। গোপন পুলিশ হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার, নির্যাতন বা শ্রমশিবিরে পাঠায়; দ্রুত শিল্পায়ন ও কৃষির সমবায়ীকরণ অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে সোভিয়েত হস্তক্ষেপ জাতীয় অপমান হিসেবেও অনুভূত হতো। ১৯৫৬ সালের জুনে পোল্যান্ডের পোজনান শহরে শ্রমিক বিক্ষোভ এবং পরে পোলিশ নেতা ভ্লাদিস্লাভ গোমুলকার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন হাঙ্গেরীয়দের উৎসাহিত করে। পোল্যান্ড সোভিয়েত জোটের মধ্যে থেকেও কিছু অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা অর্জন করতে পারলে হাঙ্গেরিও সংস্কার আদায় করতে পারবে—এমন আশা তৈরি হয়।

১৯৫৬ সালের ২৩ অক্টোবর বুদাপেস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পোল্যান্ডের প্রতি সংহতি জানিয়ে মিছিল শুরু করে। তাদের দাবির মধ্যে ছিল সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সংস্কার, বহুদলীয় নির্বাচন এবং জনপ্রিয় সংস্কারপন্থী কমিউনিস্ট ইমরে নাগিকে সরকারপ্রধান করা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার মানুষ মিছিলে যোগ দেয়। বিক্ষোভকারীরা বিশাল স্ট্যালিন মূর্তি ভেঙে ফেলে এবং জাতীয় পতাকার মাঝখান থেকে কমিউনিস্ট প্রতীক কেটে বাদ দেয়। সেই ছিদ্রযুক্ত পতাকাই বিদ্রোহের প্রধান প্রতীক হয়ে ওঠে। রাতে রাষ্ট্রীয় বেতারকেন্দ্রের সামনে নিরাপত্তা পুলিশ গুলি চালালে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সশস্ত্র সংঘর্ষে পরিণত হয়।

হাঙ্গেরীয় সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য বিদ্রোহীদের পাশে দাঁড়ায় এবং অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র জনগণের হাতে আসে। শ্রমিক পরিষদ ও স্থানীয় বিপ্লবী কমিটি গড়ে ওঠে। প্রথম সোভিয়েত হস্তক্ষেপ তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়লে কয়েক দিনের জন্য ট্যাংকগুলো বুদাপেস্ট থেকে সরে যেতে শুরু করে। ইমরে নাগি সরকারপ্রধান হন, গোপন পুলিশ বিলুপ্তির ঘোষণা দেন এবং রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্ত করার উদ্যোগ নেন। এই সাময়িক পশ্চাদপসরণ বিদ্রোহীদের মনে ধারণা সৃষ্টি করে যে সোভিয়েত নেতৃত্ব হয়তো হাঙ্গেরির সংস্কার মেনে নেবে। কিন্তু নাগির কর্মসূচি ধীরে ধীরে শুধু সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংস্কার থেকে জাতীয় স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যায়।

৩০ অক্টোবর নাগি বহুদলীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। ১ নভেম্বর তিনি হাঙ্গেরির নিরপেক্ষতা ঘোষণা করে ওয়ারশ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানান এবং জাতিসংঘের সহায়তা চান। মস্কোর কাছে এটি ছিল অগ্রহণযোগ্য। হাঙ্গেরি সোভিয়েত নিরাপত্তাবলয়ের কেন্দ্রে অবস্থিত ছিল; দেশটি জোট ত্যাগ করলে অন্য পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্রও একই পথ অনুসরণ করতে পারত। পশ্চিমা সামরিক জোটের দিকে হাঙ্গেরির সম্ভাব্য ঝুঁকে পড়া সোভিয়েত বাহিনীর অবস্থান ও পূর্ব ইউরোপে মস্কোর কর্তৃত্বকে দুর্বল করত। ক্রেমলিন সংস্কার সহ্য করতে পারত, কিন্তু সামরিক জোট ভেঙে বেরিয়ে যাওয়া এবং একদলীয় শাসনের অবসানকে পুরো ব্যবস্থার জন্য অস্তিত্বগত হুমকি মনে করেছিল।

১৯৫৬ সালের ৪ নভেম্বর বিপুল সোভিয়েত বাহিনী ‘অপারেশন হুইরলউইন্ড’ শুরু করে। ট্যাংক, কামান ও বিমানসহ বাহিনী বুদাপেস্ট এবং অন্যান্য শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। হাঙ্গেরীয় যোদ্ধারা সংকীর্ণ রাস্তা থেকে পেট্রলবোমা ও হালকা অস্ত্র দিয়ে প্রতিরোধ করলেও সোভিয়েত সামরিক শক্তির সঙ্গে তাদের কোনো তুলনা ছিল না। কয়েক দিনের মধ্যে সংগঠিত প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে, যদিও কিছু এলাকায় শ্রমিক ধর্মঘট ও বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ চলতে থাকে। প্রায় আড়াই হাজার হাঙ্গেরীয় ও কয়েক শ সোভিয়েত সেনা নিহত হয় এবং প্রায় দুই লাখ হাঙ্গেরীয় পশ্চিমে পালিয়ে যায়।

ইমরে নাগি যুগোস্লাভ দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। নিরাপদে চলে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিতে বেরিয়ে এলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে রোমানিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। গোপন বিচারের পর ১৯৫৮ সালে নাগিকে ফাঁসি দেওয়া হয়। সোভিয়েত সমর্থনে ইয়ানোশ কাদার নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রথম দিকে ব্যাপক গ্রেপ্তার ও প্রতিশোধ চালান। পরে তিনি সীমিত ভোগ্যপণ্য, উন্নত জীবনযাত্রা ও কিছু অর্থনৈতিক নমনীয়তার বিনিময়ে রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। হাঙ্গেরিতে এই ব্যবস্থা পরে তুলনামূলকভাবে শিথিল ‘গুলাশ কমিউনিজম’ নামে পরিচিত হয়। কিন্তু সোভিয়েত জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া কিংবা প্রকৃত বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রশ্ন নিষিদ্ধই থেকে যায়।

হাঙ্গেরীয়রা পশ্চিমা সহায়তার আশা করেছিল, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের বেতার সম্প্রচার ও ‘মুক্তি’র রাজনৈতিক ভাষা তাদের উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটো সামরিক হস্তক্ষেপ করেনি। হাঙ্গেরি সোভিয়েত প্রভাববলয়ের গভীরে ছিল এবং সেখানে পশ্চিমা সেনা পাঠাতে হলে সরাসরি সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হতো। উভয় পক্ষের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকায় সেই সংঘাত বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারত। একই সময়ে সুয়েজ সংকটে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েলের মিসর আক্রমণ পশ্চিমা মনোযোগ বিভক্ত করেছিল। মুক্তির প্রতিশ্রুতিময় বক্তব্য বাস্তবে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নেওয়ার অঙ্গীকার ছিল না।

বারো বছর পর চেকোস্লোভাকিয়ায় পরিবর্তনের চেষ্টা ভিন্ন রূপে শুরু হয়। এটি সশস্ত্র বিদ্রোহ নয়, বরং কমিউনিস্ট পার্টির ভেতর থেকে পরিচালিত সংস্কার ছিল। ১৯৬০-এর দশকে দেশটির অর্থনৈতিক স্থবিরতা, সেন্সরশিপ এবং নেতা আন্তোনিন নোভোতনির কঠোর শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়ে। স্লোভাক কমিউনিস্ট নেতা আলেকজান্ডার দুবচেক ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে দলের প্রথম সচিব হন। তিনি সমাজতন্ত্র বিলুপ্ত করতে চাননি; বরং নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়িয়ে ‘মানবিক মুখের সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

১৯৬৮ সালের এপ্রিলে ঘোষিত কর্মসূচিতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সেন্সরশিপ শিথিল, অর্থনৈতিক সংস্কার, রাজনৈতিক বিচার পুনর্বিবেচনা এবং স্লোভাকিয়াকে অধিক মর্যাদা দেওয়ার কথা বলা হয়। কয়েক মাসের মধ্যে সংবাদমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা, অতীতের দমননীতি নিয়ে আলোচনা এবং নতুন রাজনৈতিক সংগঠনের দাবি প্রকাশ পেতে থাকে। লেখক, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ এই উন্মুক্ত পরিবেশকে স্বাগত জানায়। প্রাগের রাস্তায় ট্যাংক ছিল না; ছিল বিতর্ক, সংবাদপত্র, সভা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ। তাই এই সময়টি ‘প্রাগ স্প্রিং’ নামে পরিচিত হয়।

দুবচেক বারবার জানান যে চেকোস্লোভাকিয়া ওয়ারশ চুক্তির সদস্য থাকবে এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাও বজায় রাখবে। তবু সোভিয়েত নেতৃত্ব আশঙ্কা করে, মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক সংগঠনের স্বাধীনতা একদলীয় শাসনকে ভেঙে দেবে এবং সংস্কার পোল্যান্ড, পূর্ব জার্মানি ও অন্য দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়বে। পোল্যান্ড ও পূর্ব জার্মানির কঠোরপন্থী নেতারাও মস্কোকে হস্তক্ষেপের জন্য চাপ দেন। একাধিক বৈঠক, সতর্কবার্তা ও সামরিক মহড়ার পরও প্রাগের সংস্কার বন্ধ না হলে ক্রেমলিন শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়।

১৯৬৮ সালের ২০ আগস্ট রাত থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া ও পূর্ব জার্মানির বাহিনীর অংশগ্রহণে চেকোস্লোভাকিয়া আক্রমণ করা হয়, যদিও পূর্ব জার্মান বাহিনীর সরাসরি প্রবেশ সীমিত রাখা হয়েছিল। কয়েক লাখ সেনা ও হাজার হাজার ট্যাংক দ্রুত বিমানবন্দর, বেতারকেন্দ্র, সরকারি ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দখল করে। চেকোস্লোভাক নেতৃত্ব সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ না করার নির্দেশ দেয়, কারণ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ জেতা অসম্ভব ছিল। নাগরিকেরা রাস্তার চিহ্ন সরিয়ে, সৈন্যদের সঙ্গে তর্ক করে, দেয়ালে প্রতিবাদ লিখে এবং গোপন স্থান থেকে বেতার সম্প্রচার চালিয়ে অহিংস প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

দুবচেকসহ নেতাদের মস্কোতে নিয়ে চাপের মুখে সংস্কার প্রত্যাহারের চুক্তিতে সম্মত করা হয়। ১৯৬৯ সালে ছাত্র ইয়ান পালাখ সোভিয়েত দখল ও মানুষের নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে আত্মাহুতি দিলে দেশজুড়ে গভীর শোক ও বিক্ষোভ দেখা দেয়। পরে গুস্তাভ হুসাক ক্ষমতায় এসে ‘স্বাভাবিকীকরণ’ নীতির মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বাতিল, সংস্কারপন্থীদের দল ও চাকরি থেকে বহিষ্কার এবং কঠোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। দুবচেককে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে শেষ পর্যন্ত বন বিভাগে সামান্য পদে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।

চেকোস্লোভাকিয়া আক্রমণের পর ব্রেজনেভ নীতি স্পষ্ট হয়—কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশের পরিবর্তন যদি পুরো সমাজতান্ত্রিক শিবিরের স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলে, তবে তার সার্বভৌমত্ব সীমিত এবং অন্য সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে। অর্থাৎ পূর্ব ইউরোপের কোনো দেশ নিজে থেকে রাজনৈতিক পথ বদলানোর পূর্ণ অধিকার রাখত না। কোন সংস্কার গ্রহণযোগ্য আর কোনটি বিপজ্জনক, তার শেষ সিদ্ধান্ত মস্কোর হাতে ছিল। এটি ওয়ারশ চুক্তিকে শুধু বাইরের আক্রমণের বিরুদ্ধে সামরিক জোট নয়, সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা রক্ষার যন্ত্রে পরিণত করে।

দুটি আন্দোলন ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাদের ব্যর্থতার কারণ ছিল একই কাঠামোর মধ্যে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপুল সামরিক শক্তি, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে সোভিয়েত সেনার উপস্থিতি, স্থানীয় সেনাবাহিনীর সীমিত স্বাধীনতা এবং ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা কার্যকর প্রতিরোধকে অসম্ভব করে তোলে। পশ্চিমা দেশগুলো নৈতিক নিন্দা জানালেও পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকিতে সামরিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত ছিল না। আন্দোলনগুলোরও শক্তিশালী বহিরাগত মিত্র, পর্যাপ্ত অস্ত্র বা দীর্ঘ যুদ্ধ চালানোর সংগঠন ছিল না। হাঙ্গেরির সশস্ত্র যোদ্ধা কিংবা প্রাগের অহিংস নাগরিক—কেউই হাজার হাজার ট্যাংকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে পারেনি।

হাঙ্গেরীয় বিদ্রোহ ও প্রাগ স্প্রিং সামরিকভাবে ব্যর্থ হলেও ঐতিহাসিকভাবে অর্থহীন ছিল না। তারা প্রমাণ করেছিল, পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক সরকারগুলোর স্থিতি শুধু জনসমর্থনের ওপর নয়, সোভিয়েত শক্তির ওপর নির্ভরশীল। ১৯৫৬ ও ১৯৬৮ সালে যে স্বাধীনতার দাবি ট্যাংক দিয়ে থামানো হয়েছিল, তা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে বেঁচে থাকে। ১৯৮৯ সালে যখন সোভিয়েত নেতৃত্ব আর বলপ্রয়োগে পূর্ব ইউরোপের সরকারগুলোকে রক্ষা করতে রাজি ছিল না, তখন সেই দীর্ঘদিনের চাপা আকাঙ্ক্ষাই গণআন্দোলনের মাধ্যমে একের পর এক কমিউনিস্ট শাসনের পতন ঘটায়। তাই বিদ্রোহগুলো তাৎক্ষণিকভাবে পরাজিত হলেও সোভিয়েত ব্যবস্থার নৈতিক দুর্বলতা এবং তার ভবিষ্যৎ পতনের সংকেত বহু আগেই প্রকাশ করে দিয়েছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে