বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চীনা বিপ্লব ও কোরীয় যুদ্ধ: এশিয়ায় স্নায়ুযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী বিস্তার

সিরিজ: স্নায়ুযুদ্ধ: দুই পরাশক্তির বিশ্বসংঘাত

চীনা বিপ্লব ও কোরীয় যুদ্ধ: এশিয়ায় স্নায়ুযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী বিস্তার
এশিয়ায় স্নায়ুযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী বিস্তার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্নায়ুযুদ্ধের প্রথম উত্তেজনাগুলো প্রধানত ইউরোপকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। বার্লিন অবরোধ, মার্শাল পরিকল্পনা এবং ন্যাটোর প্রতিষ্ঠা দেখে মনে হচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রধান মঞ্চ হবে বিভক্ত ইউরোপ। কিন্তু ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্টদের বিজয় এবং পরের বছর কোরীয় যুদ্ধের সূচনা সেই ধারণা আমূল বদলে দেয়। এশিয়ায় কমিউনিজমের বিস্তার স্নায়ুযুদ্ধকে কূটনৈতিক চাপ ও অস্ত্র প্রতিযোগিতার পর্যায় থেকে সরিয়ে সরাসরি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নিয়ে যায়। কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভিন্ন মাত্রায় জড়িয়ে পড়লেও পরাশক্তিরা নিজেদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করে—এটিই পরবর্তী প্রক্সি যুদ্ধগুলোর একটি বিপজ্জনক নমুনা হয়ে ওঠে।

চীনে জাতীয়তাবাদী কুওমিনতাং এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির বিরোধের সূচনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক আগে। চিয়াং কাই-শেকের জাতীয়তাবাদী সরকার ও মাও সেতুংয়ের কমিউনিস্টদের মধ্যে ১৯২০-এর দশক থেকেই গৃহযুদ্ধ চলছিল। ১৯৩৭ সালে জাপানের পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর দুই পক্ষ সাময়িকভাবে একটি যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তুললেও তাদের পারস্পরিক অবিশ্বাস কখনো দূর হয়নি। জাপানবিরোধী যুদ্ধের সময় জাতীয়তাবাদী বাহিনী বড় বড় প্রচলিত যুদ্ধে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। অন্যদিকে কমিউনিস্টরা গ্রামীণ এলাকায় গেরিলা তৎপরতা, ভূমি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এবং স্থানীয় সংগঠনের মাধ্যমে নিজেদের জনসমর্থন ও সামরিক শক্তি বাড়ায়।

১৯৪৫ সালে জাপানের পরাজয়ের পর চীনা গৃহযুদ্ধ আবার শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র চিয়াং কাই-শেকের সরকারকে অস্ত্র, পরিবহন ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছিল এবং দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু জাতীয়তাবাদী সরকারের দুর্নীতি, মুদ্রাস্ফীতি, বাধ্যতামূলক সৈন্য সংগ্রহ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা তার জনপ্রিয়তা ক্ষয় করে। বিপরীতে কমিউনিস্টরা কৃষকদের ভূমির প্রতিশ্রুতি দেয়, গ্রামাঞ্চলে সুসংগঠিত ভিত্তি গড়ে তোলে এবং নিজেদের বাহিনীকে ক্রমে প্রচলিত সেনাবাহিনীতে রূপান্তর করে। মাঞ্চুরিয়ায় জাপানি অস্ত্রের একটি অংশ কমিউনিস্টদের হাতে আসে; সোভিয়েত উপস্থিতিও তাদের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। তবে কমিউনিস্ট বিজয়কে শুধু মস্কোর সহায়তার ফল বলা যায় না—জাতীয়তাবাদীদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও মাওয়ের গ্রামীণ কৌশল ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সালের লিয়াওশেন, হুয়াইহাই এবং পিংজিন অভিযানে কমিউনিস্ট বাহিনী জাতীয়তাবাদীদের সামরিক শক্তি ভেঙে দেয়। ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর মাও সেতুং বেইজিংয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। চিয়াং কাই-শেকের সরকার ও অবশিষ্ট বাহিনী তাইওয়ানে সরে যায় এবং সেখানে চীন প্রজাতন্ত্রের সরকার বজায় রাখে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় তাইপের সরকারকেই সমগ্র চীনের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে চীনা বিপ্লব শুধু একটি দেশের সরকার পরিবর্তন করেনি; মূল ভূখণ্ডের বিশাল জনগোষ্ঠী ও ভূখণ্ডকে সমাজতান্ত্রিক শিবিরে যুক্ত করে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়েছিল।

মার্কিন রাজনীতিতে ঘটনাটি ‘চীন হারানো’ নামে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে। প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের বিরোধীরা অভিযোগ করেন, তাঁর প্রশাসনের দুর্বলতা ও কমিউনিস্ট অনুপ্রবেশের কারণে চীন হাতছাড়া হয়েছে। বাস্তবে চীনের গৃহযুদ্ধের ফল সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের ছিল না; তবু এই পরাজয়ের ধারণা ওয়াশিংটনে গভীর প্রভাব ফেলে। ১৯৪৯ সালের আগস্টে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফল পারমাণবিক পরীক্ষা চালায় এবং ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাও ও স্ট্যালিন মৈত্রী, জোট ও পারস্পরিক সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। পূর্ব এশিয়ায় একটি বিশাল চীন-সোভিয়েত কমিউনিস্ট শিবির গড়ে উঠছে—এমন ভয় মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

একই সময়ে কোরীয় উপদ্বীপ আরেকটি বিস্ফোরণের দিকে এগোচ্ছিল। ১৯১০ সাল থেকে জাপানের উপনিবেশ থাকা কোরিয়া ১৯৪৫ সালে মুক্ত হলেও স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারেনি। জাপানি সেনাদের আত্মসমর্পণ গ্রহণের সুবিধার্থে উপদ্বীপটিকে সাময়িকভাবে ৩৮তম সমান্তরাল রেখা বরাবর ভাগ করা হয়। উত্তরে সোভিয়েত এবং দক্ষিণে মার্কিন বাহিনী অবস্থান নেয়। পরাশক্তিদের মধ্যে সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ায় ১৯৪৮ সালে দক্ষিণে সিংম্যান রির নেতৃত্বে কোরিয়া প্রজাতন্ত্র এবং উত্তরে কিম ইল-সুংয়ের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। দুই সরকারই নিজেদের পুরো কোরিয়ার বৈধ শাসক দাবি করত।

সীমান্তে সংঘর্ষ ও উভয় পক্ষের একীকরণের হুমকি চললেও উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্ব প্রথমে সোভিয়েত অনুমোদন ছাড়া পূর্ণ আক্রমণ চালাতে পারেনি। চীনা বিপ্লবের বিজয়, সোভিয়েত পারমাণবিক সক্ষমতা এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে অধিকাংশ মার্কিন সেনা প্রত্যাহার পরিস্থিতি বদলে দেয়। কিম ইল-সুং স্ট্যালিনকে বোঝান যে দ্রুত আক্রমণ চালালে দক্ষিণের সরকার ভেঙে পড়বে এবং জনগণের বিদ্রোহ উত্তরকে সহায়তা করবে। স্ট্যালিন শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনায় সম্মতি দেন, তবে সরাসরি সোভিয়েত সেনা পাঠানোর বদলে অস্ত্র, ট্যাংক, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মাওও উত্তর কোরিয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন, যদিও যুদ্ধের গতিপথ কত দ্রুত বৃহৎ আন্তর্জাতিক সংঘাতে পরিণত হবে তা সম্ভবত কেউই পুরোপুরি অনুমান করেননি।

১৯৫০ সালের ২৫ জুন উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনী ৩৮তম সমান্তরাল অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রমণ চালায়। সোভিয়েত নির্মিত টি-৩৪ ট্যাংক ও সুসংগঠিত বাহিনীর সামনে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা দ্রুত ভেঙে পড়ে। কয়েক দিনের মধ্যে সিউল দখল হয় এবং দক্ষিণ কোরীয় ও মার্কিন বাহিনী উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বে পুসান প্রতিরক্ষাবলয়ের মধ্যে সরে যেতে বাধ্য হয়। ট্রুম্যান প্রশাসন এটিকে বিচ্ছিন্ন কোরীয় গৃহযুদ্ধ হিসেবে নয়, সোভিয়েত-পরিচালিত বৈশ্বিক কমিউনিস্ট সম্প্রসারণের পরীক্ষা হিসেবে দেখে। ইউরোপে হিটলারের আগ্রাসন প্রতিরোধে ব্যর্থতার স্মৃতি থেকেও তারা মনে করেছিল, শুরুতেই বাধা না দিলে আরও দেশ আক্রান্ত হবে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়ার আক্রমণের নিন্দা করে এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার অনুমোদন দেয়। চীনের জাতিসংঘের আসন তাইওয়ানের জাতীয়তাবাদী সরকারের হাতে থাকার প্রতিবাদে সোভিয়েত প্রতিনিধি তখন নিরাপত্তা পরিষদ বর্জন করছিলেন; ফলে তিনি প্রস্তাবে ভেটো দিতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত জাতিসংঘ কমান্ডে ব্রিটেন, কানাডা, তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া এবং আরও অনেক দেশ সৈন্য ও সহায়তা পাঠায়। বাহিনীটি আন্তর্জাতিক পতাকার অধীনে যুদ্ধ করলেও এর সেনা, বিমান, সরঞ্জাম ও নেতৃত্বের প্রধান অংশ ছিল মার্কিন।

জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের পরিকল্পনায় ১৯৫০ সালের সেপ্টেম্বরে ইনচনে একটি ঝুঁকিপূর্ণ উভচর অবতরণ পরিচালিত হয়। উত্তর কোরিয়ার সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সিউল পুনর্দখল করা হয় এবং পুসান থেকে বেরিয়ে আসা জাতিসংঘ বাহিনীর চাপের মুখে উত্তর কোরীয় সেনারা দ্রুত পিছু হটে। এই পর্যায়ে দক্ষিণ কোরিয়াকে রক্ষা করার প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণ হয়েছিল। কিন্তু অভিযান থামানো হয়নি; বাহিনী ৩৮তম সমান্তরাল অতিক্রম করে উত্তর কোরিয়া দখল এবং উপদ্বীপকে সিউলের সরকারের অধীনে একীভূত করার দিকে এগিয়ে যায়। সীমিত প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ তখন শাসন পরিবর্তনের অভিযানে পরিণত হয়।

জাতিসংঘ বাহিনী চীনের সীমান্তবর্তী ইয়ালু নদীর দিকে অগ্রসর হলে বেইজিং বারবার সতর্ক করে যে নিজের সীমান্তে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী মেনে নেবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর তাইওয়ান প্রণালিতে অবস্থান করায় চীনা নেতৃত্ব ইতিমধ্যে নিজেদের ঘেরাওয়ের শিকার বলে মনে করছিল। মাও সেতুং আশঙ্কা করেন, উত্তর কোরিয়া পতন হলে মার্কিন বাহিনী সরাসরি চীনের শিল্পাঞ্চল মাঞ্চুরিয়ার সীমান্তে পৌঁছে যাবে। সোভিয়েত বিমান ও অস্ত্র সহায়তার প্রতিশ্রুতি এবং তীব্র অভ্যন্তরীণ বিতর্কের পর চীন ‘গণস্বেচ্ছাসেবক বাহিনী’ নামে লক্ষাধিক সেনা কোরিয়ায় পাঠায়।

১৯৫০ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে চীনা বাহিনী প্রথম আক্রমণ চালায় এবং পরে নভেম্বরের শেষ দিকে ব্যাপক পাল্টা আঘাত হানে। পাহাড়ি পথ ব্যবহার, রাতের অভিযান এবং আকস্মিক আক্রমণের মাধ্যমে তারা জাতিসংঘ বাহিনীকে দক্ষিণে ঠেলে দেয়। উত্তর-পূর্ব কোরিয়ার চোসিন জলাধারের তীব্র শীতের যুদ্ধে মার্কিন ও মিত্রবাহিনী প্রচণ্ড ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সুশৃঙ্খলভাবে সরে আসে। ১৯৫১ সালের জানুয়ারিতে সিউল আবার কমিউনিস্ট বাহিনীর দখলে যায়, যদিও পরে জাতিসংঘ বাহিনী শহরটি পুনরুদ্ধার করে। যুদ্ধের সম্মুখরেখা ধীরে ধীরে আবার ৩৮তম সমান্তরালের কাছাকাছি স্থিতিশীল হয়।

ম্যাকআর্থার চীনের ভেতরে বিমান হামলা, অবরোধ এবং জাতীয়তাবাদী চীনা বাহিনী ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন। তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্য প্রশাসনের সীমিত যুদ্ধনীতির সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। ট্রুম্যান আশঙ্কা করছিলেন, চীনে যুদ্ধ বিস্তৃত হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন হস্তক্ষেপ করতে পারে এবং সংঘাত পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বেসামরিক নেতৃত্বের কর্তৃত্ব অমান্য করায় ১৯৫১ সালের এপ্রিলে ট্রুম্যান ম্যাকআর্থারকে বরখাস্ত করেন। এই সিদ্ধান্ত দেখিয়ে দেয়, কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য আর পূর্ণ বিজয় নয়; বিশ্বযুদ্ধ এড়িয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার অস্তিত্ব রক্ষা করা।

১৯৫১ সালের মাঝামাঝি থেকে যুদ্ধ স্থবির হয়ে পড়ে। শান্তি আলোচনা চললেও যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবাসন, সীমারেখা এবং পর্যবেক্ষণব্যবস্থা নিয়ে বিরোধে তা দুই বছর ধরে আটকে থাকে। সম্মুখভাগে পাহাড় ও দুর্গ দখলের জন্য রক্তক্ষয়ী লড়াই চলতে থাকে; একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার শহর ও পরিবহনব্যবস্থায় ব্যাপক বিমান হামলা হয়। ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই পানমুনজমে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হয়। কোনো শান্তিচুক্তি হয়নি; একটি অসামরিক অঞ্চল দুই কোরিয়াকে পৃথক করে রাখে। ফলে যুদ্ধ থামলেও আনুষ্ঠানিকভাবে সংঘাতের সমাপ্তি ঘটেনি।

কোরীয় যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ সৈন্য ও বেসামরিক মানুষ নিহত, আহত বা নিখোঁজ হয়; শহর, গ্রাম ও অবকাঠামোর বিরাট অংশ ধ্বংস হয় এবং অসংখ্য পরিবার সীমান্তের দুই পাশে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক মানচিত্রও প্রায় আগের অবস্থানে ফিরে যায়—উত্তরে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র, দক্ষিণে যুক্তরাষ্ট্রসমর্থিত রাষ্ট্র। এত প্রাণহানি সত্ত্বেও কোনো পক্ষ পুরো কোরিয়া দখল করতে পারেনি। কিন্তু যুদ্ধের বৃহত্তর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী: যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ব্যয় বাড়ায়, ন্যাটো শক্তিশালী করে, পশ্চিম জার্মানির পুনরায় অস্ত্রসজ্জার পথ খুলে দেয় এবং জাপানকে পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মিত্রে পরিণত করে। তাইওয়ানও মার্কিন সুরক্ষার আওতায় আসে।

চীন এই যুদ্ধের মাধ্যমে বিপুল মূল্য দিয়েও নিজেকে একটি বড় সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং উত্তর কোরিয়াকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা তৈরি হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি স্থলযুদ্ধে না নেমে উত্তর কোরিয়া ও চীনকে অস্ত্র, পরামর্শ এবং গোপন বিমান সহায়তা দেয়। এখানেই স্নায়ুযুদ্ধের প্রক্সি সংঘাতের মূল ধরন স্পষ্ট হয়—স্থানীয় বিভাজন ও গৃহসংঘাতের ভেতরে পরাশক্তিগুলো অস্ত্র, অর্থ, মিত্র ও সীমিত সামরিক শক্তি দিয়ে নিজেদের বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালায়।

চীনা বিপ্লব ও কোরীয় যুদ্ধ প্রমাণ করেছিল যে স্নায়ুযুদ্ধ ইউরোপের সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না। চীনে কমিউনিস্ট বিজয় এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়, আর কোরিয়ায় সেই পরিবর্তন একটি আন্তর্জাতিক যুদ্ধে বিস্ফোরিত হয়। পরাশক্তিগুলো সরাসরি একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা না করলেও তাদের অস্ত্র, পরিকল্পনা ও মিত্রবাহিনী একই যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি হয়েছিল। এই সংঘাতের পর এশিয়া স্নায়ুযুদ্ধের কেন্দ্রীয় রণাঙ্গনে পরিণত হয় এবং ভিয়েতনামসহ পরবর্তী বহু যুদ্ধে কোরিয়ার সেই রক্তক্ষয়ী ছায়া ফিরে আসে।


আপনার পছন্দ হতে পারে