বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সিরিয়ার আরব বসন্ত: দারার বিক্ষোভ থেকে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের সূচনা

সিরিজ: আরব বসন্ত

সিরিয়ার আরব বসন্ত: দারার বিক্ষোভ থেকে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের সূচনা
দারার বিক্ষোভ থেকে সিরিয়ার ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ

দারার দেয়ালে লেখা কয়েকটি সরকারবিরোধী স্লোগান এবং কিশোরদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ অচিরেই বাশার আল-আসাদের শাসনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিদ্রোহে রূপ নেবে—যার পরিণতি শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বদলে দেবে। ইয়েমেনে পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো বিপ্লবকে গ্রাস করেছিল, কিন্তু সিরিয়ায় রাষ্ট্রীয় দমন আন্দোলনকে এমন এক সামরিক সংঘাতে ঠেলে দেয়, যেখানে দেশীয় অসন্তোষের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিভাজন, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির হস্তক্ষেপ মিলিত হয়। ২০১১ সালে সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন তাই দ্রুত আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধে পরিণত হয়।

সিরিয়া ১৯৬৩ সাল থেকে বাথ পার্টির শাসনের অধীনে ছিল। ১৯৭০ সালে হাফেজ আল-আসাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা সুসংহত করেন এবং ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট হন। তাঁর শাসনে সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, বাথ পার্টি এবং আমলাতন্ত্রকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশে আসাদের আলাওয়ি সম্প্রদায়ের কর্মকর্তাদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। তবে শাসনটি কেবল সাম্প্রদায়িক আনুগত্যে টিকে ছিল না; সুন্নি ব্যবসায়ী, আমলা ও সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশও ক্ষমতাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

১৯৮২ সালে হামা শহরে মুসলিম ব্রাদারহুড নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহ দমনে সরকারি বাহিনীর ব্যাপক অভিযান সিরীয় সমাজে গভীর ভয়ের স্মৃতি তৈরি করেছিল। বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হন এবং শহরের বড় অংশ ধ্বংস হয়। এরপর প্রকাশ্য বিরোধিতা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। জরুরি আইন, নির্বিচার গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং বিস্তৃত গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে রাষ্ট্র নাগরিকদের রাজনৈতিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ শিখেছিল, সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার মূল্য হতে পারে কারাবাস, নির্যাতন কিংবা নিখোঁজ হয়ে যাওয়া।

২০০০ সালে হাফেজ আল-আসাদের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতায় আসেন। লন্ডনে চক্ষুচিকিৎসায় প্রশিক্ষণ নেওয়া তরুণ বাশারকে অনেকে আধুনিক ও সংস্কারপন্থী নেতা হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর ক্ষমতা গ্রহণের পর স্বল্প সময়ের জন্য রাজনৈতিক আলোচনা, নাগরিক সংগঠন ও মতপ্রকাশের কিছু সুযোগ তৈরি হয়, যা “দামেস্ক বসন্ত” নামে পরিচিত। কিন্তু সরকার দ্রুত সেই পরিসর বন্ধ করে দেয়। বিরোধী বুদ্ধিজীবী ও কর্মীরা গ্রেপ্তার হন এবং পুরোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা অক্ষত থাকে।

বাশারের আমলে অর্থনৈতিক উদারীকরণ শুরু হলেও এর সুফল প্রধানত শাসক পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও শহুরে উচ্চবিত্তদের কাছে পৌঁছায়। রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ও সরকারি চাকরির সুযোগ সংকুচিত হয়, অথচ দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বৃদ্ধি পায়। ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের কঠিন খরায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৃষক ও পশুপালকেরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েন। বহু পরিবার গ্রাম ছেড়ে শহরের প্রান্তে আশ্রয় নেয়। খরা একা বিদ্রোহ সৃষ্টি করেনি, কিন্তু দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও প্রশাসনিক অবহেলার বিদ্যমান সংকটকে আরও গভীর করেছিল।

তিউনিসিয়া ও মিসরে শাসক পতনের পর সিরিয়ার কর্মীরা অনলাইনে প্রতিবাদের আহ্বান জানালেও ফেব্রুয়ারির প্রাথমিক সমাবেশগুলো বড় আকার ধারণ করেনি। দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় ভয় তখনো কার্যকর ছিল। পরিস্থিতি বদলে যায় দক্ষিণের দারা শহরে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ বা মার্চের শুরুতে কয়েকজন স্কুলশিক্ষার্থী দেয়ালে সরকারবিরোধী স্লোগান লেখে। তাদের লেখার মধ্যে মিসর ও তিউনিসিয়ার বিপ্লব দ্বারা অনুপ্রাণিত এমন বার্তা ছিল, যার অর্থ—এবার তোমার পালা, ডাক্তার। “ডাক্তার” বলতে চক্ষুচিকিৎসক বাশার আল-আসাদকে বোঝানো হয়েছিল।

নিরাপত্তা বাহিনী প্রায় পনেরো কিশোরকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ ওঠে, আটক অবস্থায় তাদের মারধর ও নির্যাতন করা হয়েছে। অভিভাবক ও স্থানীয় নেতারা শিশুদের মুক্তির আবেদন জানালে কর্মকর্তারা তাঁদের সঙ্গে অপমানজনক আচরণ করেন। দারার প্রভাবশালী পরিবার ও গোত্রগুলোর কাছে এটি শুধু শিশু গ্রেপ্তারের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের অহংকার ও সাধারণ নাগরিকের মর্যাদার ওপর আঘাত। যে ভয় বহু বছর মানুষকে নীরব রেখেছিল, শিশুদের অপমান সেই ভয়ের চেয়ে বড় ক্ষোভ সৃষ্টি করল।

২০১১ সালের ১৮ মার্চ জুমার নামাজের পর দারায় বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা বন্দীদের মুক্তি, দুর্নীতির অবসান এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি জানায়। নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালালে কয়েকজন নিহত হন। নিহতদের জানাজা নতুন বিক্ষোভে পরিণত হয় এবং প্রতিটি মৃত্যুর পর আরও মানুষ রাজপথে নামে। আল-ওমারি মসজিদ আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সেখানে আহতদের চিকিৎসা, খাবার বিতরণ এবং অবস্থান কর্মসূচি চলতে থাকে।

২৩ মার্চ নিরাপত্তা বাহিনী আল-ওমারি মসজিদ ও আশপাশের বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। সরকার দাবি করে, সশস্ত্র গোষ্ঠী মসজিদে অস্ত্র জমা করেছে; আন্দোলনকারীরা সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। অভিযান ও মৃত্যুর সংবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। লাতাকিয়া, বানিয়াস, হোমস, হামা, ইদলিব, কামিশলি এবং দামেস্কের উপকণ্ঠে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রথমদিকে স্লোগানগুলো সংস্কার, স্বাধীনতা ও মর্যাদাকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু নিহতের সংখ্যা এবং গ্রেপ্তার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সরাসরি শাসনব্যবস্থার পতন দাবি করতে শুরু করে।

বাশার আল-আসাদ সরকার একদিকে কিছু ছাড়ের ঘোষণা দেয়, অন্যদিকে দমন অভিযান অব্যাহত রাখে। কয়েকজন কর্মকর্তা অপসারিত হন, কুর্দি জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয় এবং ১৯৬৩ সাল থেকে কার্যকর জরুরি আইন তুলে নেওয়া হয়। কিন্তু একই সময়ে সেনাবাহিনী ২৫ এপ্রিল ট্যাংকসহ দারায় প্রবেশ করে। শহরের বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালানো হয়। সংস্কারের ঘোষণা কার্যত বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, কারণ প্রতিটি রাজনৈতিক ছাড়ের সঙ্গে নতুন গ্রেপ্তার ও সামরিক অভিযান চলছিল।

দারার কিশোর হামজা আল-খতিবের মৃত্যু আন্দোলনকে আরও আবেগপূর্ণ করে তোলে। তাঁর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়ার পর ছবি ও বিবরণ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সরকার নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করলেও হামজা রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার প্রতীকে পরিণত হয়। প্রতিবাদকারীরা প্রতি শুক্রবার নতুন নামে সমাবেশ সংগঠিত করত। মসজিদ থেকে বের হওয়া মিছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আন্দোলন কেবল ধর্মীয় ছিল না; ছাত্র, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, কুর্দি কর্মী, ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী এবং সাধারণ পরিবার এতে অংশ নেয়।

সরকার আন্দোলনকে বিদেশি ষড়যন্ত্র, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িক বিদ্রোহ হিসেবে তুলে ধরে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে নিহত সেনা ও পুলিশের ছবি দেখিয়ে দাবি করা হয়, নিরাপত্তা বাহিনী সশস্ত্র হামলার শিকার হচ্ছে। বাস্তবে আন্দোলনের প্রথম মাসগুলো প্রধানত শান্তিপূর্ণ থাকলেও ধীরে ধীরে কিছু এলাকায় বিক্ষোভকারীরা আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে নিতে শুরু করে। সরকারি দমন, স্থানীয় প্রতিশোধ এবং সেনাবাহিনী থেকে অস্ত্রসহ পালিয়ে আসা সদস্যদের কারণে সহিংসতা বাড়ে।

২০১১ সালের জুনে তুরস্ক সীমান্তের কাছে জিসর আল-শুগুরে নিরাপত্তা সদস্যদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বড় সামরিক অভিযান চালানো হয়। ঘটনা নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের বিবরণ ভিন্ন ছিল। হাজারো মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে তুরস্কে আশ্রয় নেয়। একই সময়ে হোমস ক্রমশ বিদ্রোহের কেন্দ্রে পরিণত হয়। শহরটির বিভিন্ন মহল্লায় সরকারপন্থী, বিরোধী এবং ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও প্রতিশোধের চক্র তৈরি হতে থাকে। শাসকগোষ্ঠী আলাওয়ি ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বোঝাতে চেষ্টা করে যে সরকার পতন হলে তারা সুন্নি উগ্রপন্থীদের প্রতিশোধের শিকার হবে।

২০১১ সালের জুলাইয়ে পক্ষত্যাগী সেনা কর্মকর্তারা ফ্রি সিরিয়ান আর্মি গঠনের ঘোষণা দেন। তাদের লক্ষ্য ছিল বিক্ষোভকারীদের রক্ষা এবং আসাদ সরকারকে উৎখাত করা। কিন্তু এটি দীর্ঘদিন একক নেতৃত্বাধীন সুসংগঠিত সেনাবাহিনী হয়ে উঠতে পারেনি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্বাধীন বিদ্রোহী ব্রিগেড নিজেদের কমান্ড, অর্থায়ন ও স্থানীয় লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ করত। শান্তিপূর্ণ কর্মীদের রাজনৈতিক আন্দোলন এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সামরিক অভিযান পাশাপাশি চললেও ক্রমে অস্ত্রধারীরাই সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণ করতে শুরু করে।

আরব লীগ সিরিয়াকে সদস্যপদ থেকে স্থগিত করে এবং পর্যবেক্ষক পাঠানোর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়নি। রাশিয়া ও ইরান আসাদ সরকারকে রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দিতে থাকে। অন্যদিকে তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার এবং পশ্চিমা দেশগুলো বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠীকে নানাভাবে সমর্থন করে। স্থানীয় বিদ্রোহ দ্রুত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে পরিণত হয়। অস্ত্র, অর্থ এবং বিদেশি যোদ্ধার প্রবাহ বিরোধী শিবিরের বিভাজন ও সংঘাতের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়।

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকারি বাহিনী হোমসের বাবা আমর এলাকায় দীর্ঘ গোলাবর্ষণ চালায়। বিদ্রোহীরাও সামরিক ঘাঁটি, তল্লাশিচৌকি ও সরকারি বাহিনীর ওপর আক্রমণ বাড়ায়। এপ্রিলের জাতিসংঘ-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি দ্রুত ভেঙে পড়ে। জুলাইয়ে সংঘর্ষ দামেস্ক ও আলেপ্পোতে পৌঁছে যায়। বিদ্রোহীরা আলেপ্পোর পূর্বাঞ্চলের বড় অংশ দখল করলে দেশের বৃহত্তম শহর দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা তখন সংঘাতকে কার্যত গৃহযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেন।

সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বাহিনী ভারী কামান, যুদ্ধবিমান ও অবরোধ ব্যবহার করছিল; অন্যদিকে বিরোধী শিবির ক্রমে অসংখ্য স্থানীয়, ইসলামপন্থী ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীতে বিভক্ত হচ্ছিল। সময়ের সঙ্গে আল-কায়েদাসংশ্লিষ্ট সংগঠন এবং পরে ইসলামিক স্টেটের মতো শক্তি যুদ্ধের বিশৃঙ্খলা কাজে লাগায়। কুর্দি সংগঠনগুলো উত্তরাঞ্চলে নিজস্ব প্রশাসন ও সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলে। যে আন্দোলন নাগরিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে শুরু হয়েছিল, তা একাধিক যুদ্ধের সমষ্টিতে পরিণত হয়—সরকার বনাম বিদ্রোহী, বিদ্রোহী বনাম বিদ্রোহী, কুর্দি বনাম জিহাদি এবং আঞ্চলিক শক্তি বনাম তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী।

শহর অবরোধ, নির্বিচার গোলাবর্ষণ, বন্দিত্ব, নির্যাতন, রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীর নৃশংসতা সিরিয়ার সাধারণ মানুষকে অসহনীয় মূল্য দিতে বাধ্য করে। লাখো মানুষ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ও ইউরোপে আশ্রয় নেয়; আরও বহু মানুষ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হয়। প্রাচীন নগর, বাজার, হাসপাতাল, বিদ্যালয় ও আবাসিক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। দারার যেসব পরিবার কিশোর সন্তানদের মুক্তি চেয়েছিল, তারা কখনো কল্পনাও করেনি সেই প্রতিবাদ একদিন সমগ্র দেশকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে।

সিরিয়ার আন্দোলন গৃহযুদ্ধে রূপ নেওয়ার জন্য কোনো একক কারণ দায়ী ছিল না। রাষ্ট্রের নির্মম দমন, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পথ বন্ধ থাকা, সেনাবাহিনীর পক্ষত্যাগ, বিরোধীদের অস্ত্রধারণ, সাম্প্রদায়িক ভয়, বিদেশি অর্থ ও অস্ত্র এবং আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের অভাব—সবগুলো উপাদান পরস্পরকে শক্তিশালী করেছিল। প্রথম দিকে অর্থবহ সংস্কার ও সহিংসতা বন্ধ করার সুযোগ থাকলেও প্রতিটি পক্ষের সামরিক সমাধানের আকাঙ্ক্ষা সেই পথ ক্রমে বন্ধ করে দেয়।

তিউনিসিয়ায় আরব বসন্ত একজন স্বৈরশাসককে সরিয়ে নির্বাচনের পথ খুলেছিল, মিসরে সেনাবাহিনী ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে গিয়েছিল, লিবিয়া ও ইয়েমেনে রাষ্ট্র ভেঙে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, আর বাহরাইনে বিদেশি সহায়তায় রাজতন্ত্র আন্দোলন দমন করেছিল। সিরিয়া এই সব বিপদের সবচেয়ে ভয়াবহ সমন্বয় হয়ে ওঠে। দারার দেয়াললিখন থেকে শুরু হওয়া বিদ্রোহ দেখিয়ে দিল—জনগণের ন্যায্য দাবি যদি কেবল বন্দুক, কারাগার ও ট্যাংক দিয়ে মোকাবিলা করা হয়, তবে একটি রাজনৈতিক সংকট এমন যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার আগুন জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে পুরো অঞ্চলকে বদলে দেয়।


আপনার পছন্দ হতে পারে