বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ইয়েমেনের আরব বসন্ত: সালেহর পতন থেকে রাজনৈতিক সংকট ও গৃহযুদ্ধ

সিরিজ: আরব বসন্ত

ইয়েমেনের আরব বসন্ত: সালেহর পতন থেকে রাজনৈতিক সংকট ও গৃহযুদ্ধ
গণবিপ্লবের আশা থেকে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ

মানামায় পার্ল রাউন্ডঅ্যাবাউটের আন্দোলন যখন কঠোরভাবে স্তব্ধ করা হচ্ছিল, তখন ইয়েমেনে গণবিক্ষোভ, সেনাবাহিনীর বিভক্তি ও গোত্রীয় সংঘাত প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর দীর্ঘ শাসনকে পতনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ইয়েমেনের বিপ্লবের পরিণতি তিউনিসিয়ার মতো গণতান্ত্রিক রূপান্তর কিংবা মিসরের মতো দ্রুত শাসক অপসারণে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এখানে ক্ষমতা হস্তান্তরের নামে পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার বড় অংশ অক্ষত রাখা হয়েছিল। সেই অসম্পূর্ণ পরিবর্তন, দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার, সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান এবং আঞ্চলিক শক্তির হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত দেশটিকে এক বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।

আলী আবদুল্লাহ সালেহ ১৯৭৮ সালে তৎকালীন উত্তর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৯০ সালে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন একীভূত হলে তিনি নতুন প্রজাতন্ত্রেরও প্রেসিডেন্ট হন। তাঁর শাসন টিকে ছিল সেনাবাহিনী, গোত্রীয় নেতৃত্ব, ব্যবসায়ী, ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে সুবিধা বণ্টনের জটিল ব্যবস্থার ওপর। সালেহ নিজেই একবার ইয়েমেন শাসনকে “সাপের মাথার ওপর নাচার” সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকে কখনো কাছে টেনে, কখনো পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে তিনি তিন দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকেন।

ইয়েমেন আরব বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি ছিল। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, যুব বেকারত্ব, দুর্নীতি, পানির তীব্র সংকট, জ্বালানি ও খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং দুর্বল রাষ্ট্রীয় সেবা মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। তেল উৎপাদন কমে আসছিল এবং সরকারের রাজস্ব সংকুচিত হচ্ছিল। দক্ষিণে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হচ্ছিল, উত্তরে জায়দি শিয়া হুতি আন্দোলনের সঙ্গে সরকার একাধিক যুদ্ধ করেছিল এবং আরব উপদ্বীপে আল-কায়েদা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় ছিল। ২০১১ সালের আগেই ইয়েমেন ছিল বহু স্তরের সংঘাত ও অসন্তোষে ঘেরা একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র।

সালেহের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় অভিযোগ ছিল ক্ষমতাকে পারিবারিক উত্তরাধিকারে পরিণত করার চেষ্টা। তাঁর ছেলে আহমেদ আলী রিপাবলিকান গার্ডের নেতৃত্বে ছিলেন, আর আত্মীয়রা নিরাপত্তা ও সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করেছিলেন। অনেক ইয়েমেনির ধারণা ছিল, সালেহ শেষ পর্যন্ত তাঁর ছেলেকে ক্ষমতায় বসাতে চাইছেন। একই সময়ে তিনি প্রেসিডেন্টের মেয়াদসীমা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিচ্ছিলেন। এই পরিস্থিতিতে তিউনিসিয়া ও মিসরের সফল গণবিক্ষোভ ইয়েমেনি তরুণদের সামনে দীর্ঘদিনের শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নতুন সাহস এনে দেয়।

২০১১ সালের জানুয়ারিতে রাজধানী সানা ও অন্যান্য শহরে ছোট ছোট প্রতিবাদ শুরু হয়। ২৭ জানুয়ারি হাজারো মানুষ সালেহের পদত্যাগ, বেকারত্ব ও দুর্নীতির অবসান এবং প্রকৃত রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে সমবেত হয়। সালেহ ঘোষণা করেন, তিনি ২০১৩ সালের পর আর ক্ষমতায় থাকবেন না এবং তাঁর ছেলেকেও উত্তরসূরি করবেন না। কিন্তু বহুবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাস থাকায় আন্দোলনকারীরা তাঁর কথায় বিশ্বাস করেনি। মিসরে মুবারকের পতনের পর “ইয়েমেনের ক্রোধের দিন” পালিত হয় এবং আন্দোলন দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

সানার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বিক্ষোভকারীরা তাঁবু স্থাপন করে এলাকাটির নাম দেয় চেঞ্জ স্কয়ার বা পরিবর্তন চত্বর। তায়েজ, এডেন, হোদেইদা, ইব ও অন্যান্য শহরেও একই ধরনের অবস্থান কর্মসূচি গড়ে ওঠে। শিক্ষার্থী, নারী, সাংবাদিক, আইনজীবী, শ্রমিক, উপজাতীয় সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরা এতে যোগ দেন। তাওয়াক্কোল কারমানের মতো নারী কর্মীরা আন্দোলনের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নারীর অধিকারের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন এবং পরে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে তরুণেরা দলীয় ও গোত্রীয় বিভাজন অতিক্রম করে একটি নাগরিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আশা প্রকাশ করেছিল। তাদের দাবি ছিল সালেহের পদত্যাগ, দুর্নীতির বিচার, আইনের শাসন এবং সমান নাগরিক অধিকার। কিন্তু শিগগিরই প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর জোট জয়েন্ট মিটিং পার্টিজ আন্দোলনে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। এর মধ্যে ইসলামপন্থী আল-ইসলাহ, সমাজতন্ত্রী এবং অন্যান্য দল ছিল। তরুণ আন্দোলনকারীরা আশঙ্কা করছিল, পুরোনো রাজনৈতিক অভিজাতরা তাদের বিপ্লবী শক্তিকে নিজেদের ক্ষমতার দর-কষাকষিতে ব্যবহার করতে পারে।

২০১১ সালের ১৮ মার্চ চেঞ্জ স্কয়ারে জুমার নামাজের পর বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়। ছাদে অবস্থান নেওয়া বন্দুকধারীদের হামলায় পঞ্চাশের বেশি মানুষ নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন। দিনটি “মর্যাদার শুক্রবার” নামে পরিচিত হয়। এই হত্যাকাণ্ড সালেহ সরকারের জন্য একটি বড় মোড় তৈরি করে। মন্ত্রী, কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা পদত্যাগ করতে শুরু করেন। সেনাবাহিনীর প্রভাবশালী কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী মোহসেন আল-আহমার সরকার ত্যাগ করে আন্দোলনকারীদের রক্ষার ঘোষণা দেন।

আলী মোহসেনের পক্ষত্যাগে সেনাবাহিনী কার্যত বিভক্ত হয়ে যায়। সালেহের ছেলে ও আত্মীয়দের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান গার্ড এবং বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী সরকারের অনুগত থাকে, আর প্রথম সাঁজোয়া ডিভিশনসহ কয়েকটি ইউনিট বিরোধীদের পাশে দাঁড়ায়। রাজধানীতে প্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক বাহিনী মুখোমুখি অবস্থান নেয়। একই সঙ্গে শক্তিশালী হাশিদ গোত্রীয় জোটের নেতা সাদিক আল-আহমারের অনুসারীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষ শুরু হয়। গণতান্ত্রিক সংস্কারের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের চারপাশে পুরোনো সামরিক ও গোত্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা দ্রুত জমাট বাঁধতে থাকে।

উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ সালেহের পদত্যাগ ও ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য একটি সমঝোতা প্রস্তাব করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সালেহ ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদরাব্বুহ মনসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন এবং বিনিময়ে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা বিচার থেকে দায়মুক্তি পাবেন। সালেহ একাধিকবার চুক্তিতে সম্মতির ইঙ্গিত দিয়ে শেষ মুহূর্তে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন। এই সময়ক্ষেপণ তাঁর পরিচিত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ ছিল—বিরোধীদের বিভক্ত করা, সমর্থকদের সংগঠিত করা এবং পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ খোঁজা।

৩ জুন সানার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কমপ্লেক্সের মসজিদে বিস্ফোরণে সালেহ গুরুতর আহত হন। তাঁর শরীর পুড়ে যায় এবং চিকিৎসার জন্য তাঁকে সৌদি আরবে নেওয়া হয়। হাদি সাময়িকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে শুরু করেন। অনেক বিক্ষোভকারী মনে করেছিল, সালেহ যুগের অবসান ঘটেছে। কিন্তু তিনি সেপ্টেম্বরে আকস্মিকভাবে দেশে ফিরে আসেন। তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর সানা ও অন্যান্য অঞ্চলে সংঘর্ষ আরও বেড়ে যায়। সরকারি বাহিনী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে এবং রাজধানীর বিভিন্ন অংশ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সালেহ অবশেষে ২০১১ সালের ২৩ নভেম্বর রিয়াদে ক্ষমতা হস্তান্তর চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তিনি হাদির কাছে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা তুলে দিতে সম্মত হন। বিনিময়ে ইয়েমেনের সংসদ তাঁকে ও তাঁর শাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিস্তৃত দায়মুক্তি দেয়। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে একক প্রার্থী হিসেবে হাদি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আনুষ্ঠানিকভাবে সালেহের ৩৩ বছরের শাসনের অবসান ঘটে, কিন্তু তিনি দেশ ছাড়েননি এবং তাঁর দল, সম্পদ, সামরিক যোগাযোগ ও অনুগত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রভাব বজায় রাখেন।

ক্ষমতা হস্তান্তরের এই ব্যবস্থা তাৎক্ষণিক সংঘর্ষ কিছুটা কমালেও বিপ্লবীদের প্রধান লক্ষ্য পূরণ করেনি। সালেহকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি, নিরাপত্তা বাহিনী পুরোপুরি পুনর্গঠিত হয়নি এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতাকাঠামোও ভাঙা হয়নি। শুধু রাষ্ট্রের শীর্ষে থাকা ব্যক্তি বদলেছিল; রাষ্ট্রের গভীরে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বী নেটওয়ার্কগুলো অক্ষত ছিল। হাদি ছিলেন দীর্ঘদিন সালেহের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর নিজস্ব শক্তিশালী রাজনৈতিক বা সামরিক ভিত্তি ছিল না। ফলে তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বী দল, সেনা কর্মকর্তা, গোত্র ও বিদেশি পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হয়।

২০১৩ সালে জাতীয় সংলাপ সম্মেলন শুরু হয়। এতে রাজনৈতিক দল, যুবক, নারী, হুতি, দক্ষিণি আন্দোলন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। লক্ষ্য ছিল নতুন সংবিধান, রাষ্ট্রীয় কাঠামো, দক্ষিণের প্রশ্ন এবং ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের সমাধান খোঁজা। সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুপারিশ দিলেও বাস্তবায়নের পরিষ্কার ব্যবস্থা ছিল না। ইয়েমেনকে ছয়টি অঞ্চলের একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রস্তাব হুতি ও দক্ষিণি গোষ্ঠীগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তারা মনে করেছিল, সীমারেখা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে তাদের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হুতি আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ। উত্তরের সাদা প্রদেশে জায়দি শিয়া ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পুনর্জাগরণ থেকে এর উত্থান ঘটে। সালেহ সরকার ২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে হুতিদের বিরুদ্ধে ছয় দফা যুদ্ধ চালিয়েছিল। কিন্তু ২০১১ সালের পর কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হুতিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করে। জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহার, দুর্নীতি ও হাদি সরকারের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তারা ২০১৪ সালে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল হুতি ও সালেহের গোপন জোট। দীর্ঘদিন পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও উভয় পক্ষ হাদি সরকার ও অভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বল করতে সহযোগিতা শুরু করে। সালেহের অনুগত সেনা ইউনিট ও প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক হুতিদের অগ্রযাত্রায় সহায়তা করে। পুরোনো শাসক নিজের উত্তরসূরি সরকারকে দুর্বল করতে একসময়ের শত্রুদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুতিরা সানা দখল করে এবং সরকারের ওপর শান্তি ও অংশীদারত্ব চুক্তি চাপিয়ে দেয়।

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে হুতিরা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ঘিরে ফেলে এবং হাদিকে কার্যত গৃহবন্দী করে। হাদি পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও পরে সানা থেকে পালিয়ে এডেনে যান, পদত্যাগ প্রত্যাহার করেন এবং নিজেকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দাবি করেন। হুতি-সালেহ বাহিনী দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হয়ে এডেনের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে সৌদি আরব পরিস্থিতিকে নিজের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাবের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখে। ইরান হুতিদের সমর্থন দিচ্ছে—এই আশঙ্কাও রিয়াদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২০১৫ সালের ২৬ মার্চ সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি আঞ্চলিক জোট ইয়েমেনে বিমান অভিযান শুরু করে। ঘোষিত লক্ষ্য ছিল হাদি সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা থামানো। কিন্তু সামরিক হস্তক্ষেপ যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করে। বিমান হামলা, স্থলযুদ্ধ, অবরোধ, অর্থনৈতিক পতন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ায় লাখো মানুষ খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে পড়ে। আল-কায়েদা ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীও ক্ষমতার শূন্যতা কাজে লাগায়। দেশটি বিভিন্ন স্থানীয়, জাতীয় ও আঞ্চলিক সংঘাতের জটিল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।

হুতি ও সালেহের জোটও স্থায়ী হয়নি। ২০১৭ সালের শেষ দিকে উভয় পক্ষের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য সংঘর্ষে রূপ নিলে সালেহ সৌদি জোটের সঙ্গে নতুন সমঝোতার ইঙ্গিত দেন। ৪ ডিসেম্বর তিনি হুতি যোদ্ধাদের হাতে নিহত হন। যে নেতা দীর্ঘদিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁরই গড়া জোট ও পাল্টা জোটের রাজনীতির মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন।

ইয়েমেনের অভিজ্ঞতা দেখায়, একজন শাসকের পদত্যাগ নিজে থেকে বিপ্লবকে সফল করে না। পুরোনো সামরিক কাঠামো ভাঙা, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গঠন, আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা না গেলে ক্ষমতা হস্তান্তর নতুন সংঘাতের বিরতি মাত্র হতে পারে। চেঞ্জ স্কয়ারে যে তরুণেরা একটি গণতান্ত্রিক ও নাগরিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল, তাদের আন্দোলনকে পুরোনো অভিজাত, সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদেশি শক্তির প্রতিযোগিতা গ্রাস করেছিল।

ইয়েমেনের সংকট যখন গৃহযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছিল, তখন আরব বসন্তের সবচেয়ে দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী ও আন্তর্জাতিকায়িত সংঘাতের সূচনা হচ্ছিল সিরিয়ায়। দারার দেয়ালে লেখা কয়েকটি সরকারবিরোধী স্লোগান এবং কিশোরদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ অচিরেই বাশার আল-আসাদের শাসনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিদ্রোহে রূপ নেবে—যার পরিণতি শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বদলে দেবে।


আপনার পছন্দ হতে পারে