বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আরব বসন্তের আঞ্চলিক ঢেউ: মরক্কো, আলজেরিয়া, জর্ডান ও ওমানে কী বদলেছিল?

সিরিজ: আরব বসন্ত

আরব বসন্তের আঞ্চলিক ঢেউ: মরক্কো, আলজেরিয়া, জর্ডান ও ওমানে কী বদলেছিল?
আরব বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ, সংস্কার ও দমননীতি

দারার দেয়াললিখন থেকে শুরু হওয়া সিরীয় বিদ্রোহ দেখিয়ে দিয়েছিল—জনগণের ন্যায্য দাবি যদি কেবল বন্দুক, কারাগার ও ট্যাংক দিয়ে মোকাবিলা করা হয়, তবে একটি রাজনৈতিক সংকট এমন যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার আগুন জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে পুরো অঞ্চলকে বদলে দেয়। কিন্তু আরব বসন্তের ঢেউ যে সব দেশে পৌঁছেছিল, সর্বত্র তার পরিণতি সিরিয়া, লিবিয়া বা ইয়েমেনের মতো হয়নি। কোথাও শাসক সীমিত সাংবিধানিক সংস্কার ও আর্থিক সুবিধা দিয়ে আন্দোলনের তীব্রতা কমিয়েছেন, কোথাও প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা বদলে রাজতন্ত্রকে অক্ষত রাখা হয়েছে, আবার কোথাও পুলিশি দমন ও বিপুল সরকারি ব্যয় একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। আরব বসন্ত তাই একটি অভিন্ন বিপ্লব ছিল না; এটি ছিল একই ধরনের ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া বহু ভিন্ন জাতীয় আন্দোলনের সমষ্টি।

তিউনিসিয়ায় বেন আলীর পতন এবং মিসরে হোসনি মুবারকের পদত্যাগের পর সমগ্র আরব অঞ্চলের মানুষ বুঝতে পারে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শাসকদের প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। বেকারত্ব, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি, দুর্নীতি, পুলিশি নির্যাতন, আবাসনসংকট এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব প্রায় সব দেশেই কোনো না কোনো মাত্রায় উপস্থিত ছিল। কিন্তু প্রতিটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সামর্থ্য, সামরিক কাঠামো, রাজপরিবারের বৈধতা, বিরোধীদের সংগঠন এবং বিদেশি মিত্র ভিন্ন হওয়ায় প্রতিবাদের ফলও ভিন্ন হয়।

মরক্কোতে ২০ ফেব্রুয়ারি আন্দোলন আরব বসন্তের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংস্কারপন্থী আন্দোলনগুলোর একটি হয়ে ওঠে। তরুণ কর্মী, বামপন্থী, ইসলামপন্থী, মানবাধিকারকর্মী এবং সাধারণ নাগরিকেরা রাবাত, কাসাব্লাঙ্কা, তাঞ্জিয়ারসহ বহু শহরে মিছিল করেন। তাঁদের প্রধান দাবি ছিল কার্যকর সাংবিধানিক রাজতন্ত্র, নির্বাচিত সরকারের অধিক ক্ষমতা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতির অবসান এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। অধিকাংশ বিক্ষোভকারী রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদকে অপসারণের দাবি করেনি; তারা চেয়েছিল রাজা শাসন না করে সাংবিধানিক সীমার মধ্যে অবস্থান করুন।

মরক্কোর রাজতন্ত্র দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। রাজা রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি সাংবিধানিক কমিশন গঠন করেন। ২০১১ সালের জুলাইয়ে গণভোটের মাধ্যমে নতুন সংবিধান অনুমোদিত হয়। এতে প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচনে সর্বাধিক আসন পাওয়া দল থেকে নিয়োগ, বারবার ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং কিছু নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। পরবর্তী নির্বাচনে ইসলামপন্থী জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বিজয়ী হয় এবং আবদেলইলাহ বেনকিরান প্রধানমন্ত্রী হন। তবে সেনাবাহিনী, নিরাপত্তা, ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও কৌশলগত নীতির ওপর রাজার নিয়ন্ত্রণ বহুলাংশে অক্ষত থাকে। ফলে সংস্কার বাস্তব হলেও তা ক্ষমতার মৌলিক স্থানান্তর ঘটায়নি।

আলজেরিয়ায় প্রতিবাদের পটভূমি ছিল আরও জটিল। দেশটি ১৯৯০-এর দশকের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের স্মৃতি বহন করছিল, যে সংঘাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা সমাজের একটি অংশকে নতুন অস্থিতিশীলতা সম্পর্কে সতর্ক করে রেখেছিল। ২০১১ সালের শুরুতে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকারত্ব, আবাসনসংকট ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঙ্গা এবং বিক্ষোভ শুরু হয়। বিরোধী দল, শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিক গোষ্ঠী রাজধানী আলজিয়ার্সে মিছিলের আহ্বান জানালেও সরকার বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করে সমাবেশ সীমিত রাখে।

প্রেসিডেন্ট আবদেলআজিজ বুতেফ্লিকার সরকার মূল্য কমানো, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং চাকরি ও আবাসনের প্রতিশ্রুতি দেয়। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৯ বছর ধরে কার্যকর থাকা জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হয়। রাজনৈতিক দল ও সংবাদমাধ্যমসংক্রান্ত কিছু আইন সংশোধনের উদ্যোগও নেওয়া হয়। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের মূল রাজনৈতিক কাঠামো বদলায়নি। তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে অর্জিত বিপুল আয় সরকারকে ভর্তুকি, বেতন ও আবাসন খাতে অর্থ ঢেলে জনঅসন্তোষ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়। আলজেরিয়া দেখিয়েছিল, অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও অতীত গৃহযুদ্ধের স্মৃতি বিপ্লবী আন্দোলনের গতি কমিয়ে দিতে পারে।

জর্ডানে বিক্ষোভ শুরু হয় খাদ্যমূল্য, বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। রাজধানী আম্মানসহ বিভিন্ন শহরে ইসলামিক অ্যাকশন ফ্রন্ট, বামপন্থী দল, পেশাজীবী, উপজাতীয় তরুণ ও সাধারণ নাগরিকেরা মিছিল করে। তাঁদের অনেকে এমন একটি ব্যবস্থার দাবি জানায়, যেখানে প্রধানমন্ত্রী রাজা কর্তৃক নিয়োগ না পেয়ে নির্বাচিত সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দায়িত্ব নেবেন। রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহর সরাসরি অপসারণের দাবি প্রথম দিকে সীমিত ছিল।

রাজা আন্দোলনের চাপ সামলাতে একাধিক প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা পরিবর্তন করেন। মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। সংবিধান সংশোধন করে সাংবিধানিক আদালত ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু সরকার গঠন, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে রাজার কর্তৃত্ব বহাল থাকে। নির্বাচনী এলাকার বিন্যাস নিয়েও অসন্তোষ থেকে যায়। মন্ত্রিসভা বদল রাজতন্ত্রের জন্য নিরাপত্তা-ভালভ হিসেবে কাজ করেছিল—জনরোষ প্রধানমন্ত্রীর দিকে পরিচালিত হলেও রাজা ক্ষমতার কেন্দ্রেই ছিলেন।

ওমানে প্রতিবাদ তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত হলেও তা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে। ২০১১ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে মাস্কাট, সালালাহ এবং বিশেষ করে শিল্প ও বন্দরনগরী সোহার শহরে বিক্ষোভ হয়। আন্দোলনকারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুলতান কাবুসকে অপসারণের দাবি করেনি। তাদের দাবি ছিল চাকরি, উচ্চ মজুরি, দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রীদের অপসারণ, জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাস এবং নির্বাচিত শুরা পরিষদের অধিক ক্ষমতা।

সোহার গ্লোব রাউন্ডঅ্যাবাউটে অবস্থান কর্মসূচি ও সড়ক অবরোধ শুরু হলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত হন। সুলতান কাবুস দ্রুত মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সদস্যকে অপসারণ করেন, নতুন সরকারি চাকরি সৃষ্টি, বেকার ভাতা এবং ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির ঘোষণা দেন। শুরা পরিষদকে আইন প্রস্তাব ও পর্যালোচনার কিছু অতিরিক্ত ক্ষমতাও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন সীমিত করা হয়। ওমানের প্রতিক্রিয়ায় আর্থিক ছাড়, প্রশাসনিক পরিবর্তন ও নিরাপত্তা দমন—তিনটি কৌশল একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছিল।

সৌদি আরবে বৃহৎ জাতীয় বিদ্রোহ গড়ে না উঠলেও শাসক পরিবার সম্ভাব্য অস্থিরতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। রাজা আবদুল্লাহ আবাসন, সরকারি চাকরি, বেতন, শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তায় বিপুল অর্থ ব্যয়ের ঘোষণা দেন। রাজনৈতিক দল ও স্বাধীন সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পূর্বাঞ্চলের শিয়া অধ্যুষিত কাতিফ ও আল-আওয়ামিয়ায় বৈষম্য, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি এবং বাহরাইনে সৌদি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। নিরাপত্তা বাহিনী এসব সমাবেশ দমন করে এবং বহু কর্মীকে গ্রেপ্তার করে।

সৌদি নারীরা গাড়ি চালানোর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে “উইমেন টু ড্রাইভ” আন্দোলন সংগঠিত করেন। কয়েকজন নারী প্রকাশ্যে গাড়ি চালিয়ে সেই দৃশ্য অনলাইনে প্রকাশ করেন। ২০১১ সালে নিষেধাজ্ঞা ওঠেনি, কিন্তু এই আন্দোলন সামাজিক অধিকারের প্রশ্নকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে আসে। রাজা নারীদের শুরা পরিষদে নিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ পৌর নির্বাচনে ভোট ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা করেন। এগুলো সীমিত পরিবর্তন হলেও নারীদের নাগরিক অধিকারের আন্দোলনের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কুয়েতে নির্বাচিত সংসদ ও রাজনৈতিক বিতর্কের তুলনামূলক দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও রাজপরিবারের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। ২০১১ সালে দুর্নীতি, প্রধানমন্ত্রীর জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ হয়। রাষ্ট্রহীন বিদুন জনগোষ্ঠী নাগরিকত্ব ও সমান অধিকারের দাবিতেও মিছিল করে। বিরোধীদের চাপ ও সংসদীয় সংকটের মুখে প্রধানমন্ত্রী নাসের আল-মোহাম্মদ আল-সাবাহ পদত্যাগ করেন এবং সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। তবে পরবর্তী সময়ে বিরোধী সমাবেশ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

ইরাকে বাগদাদের তাহরির স্কয়ারসহ বিভিন্ন শহরে দুর্নীতি, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট, বেকারত্ব এবং দুর্বল সরকারি সেবার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়। ২০১১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির “ক্রোধের দিন” বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটে। প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকি মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা উন্নত করার জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করেন এবং নিজের বেতন কমানোর ঘোষণা দেন। কিন্তু সাম্প্রদায়িক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সশস্ত্র গোষ্ঠী ও যুদ্ধ-পরবর্তী দুর্বল প্রতিষ্ঠান আন্দোলনকে জাতীয় রাজনৈতিক রূপান্তরে পরিণত হতে দেয়নি।

মৌরিতানিয়ায় বেকারত্ব, দাসত্বের উত্তরাধিকার, দুর্নীতি ও মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে তরুণেরা আন্দোলন করে। জিবুতিতে প্রেসিডেন্ট ইসমাইল ওমর গিলেহর দীর্ঘ শাসন এবং তৃতীয় মেয়াদে অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যা নিরাপত্তা বাহিনী দমন করে। সুদানে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি, রাজনৈতিক দমন ও ওমর আল-বশিরের শাসনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ও বিরোধীরা বিক্ষোভ করলেও ব্যাপক গ্রেপ্তার এবং সংগঠনের দুর্বলতার কারণে তা ২০১১ সালে সরকার পতন ঘটাতে পারেনি। তবে সেই অসন্তোষ বিলীন হয়নি; পরবর্তী বছরগুলোতে নতুন আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।

লেবাননে আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল কোনো একক স্বৈরশাসক নয়, বরং ধর্মীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা। তরুণেরা সাম্প্রদায়িক কোটা ও বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবসান দাবি করে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডেও রাজনৈতিক বিভাজন, দখলদারত্ব ও সামাজিক সমস্যার মধ্যে তরুণেরা ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে ঐক্যের দাবিতে সমাবেশ করে। এসব ক্ষেত্রে আরব বসন্তের ভাষা স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মিশে ভিন্ন ধরনের দাবি তৈরি করেছিল।

আরব রাজতন্ত্রগুলোর টিকে থাকার পেছনে শুধু দমননীতি কাজ করেনি। মরক্কো ও জর্ডানের রাজারা নিজেদের দৈনন্দিন সরকারের ঊর্ধ্বে জাতীয় ঐক্য ও ধর্মীয় বৈধতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের সরিয়ে জনরোষ প্রশমিত করার সুযোগ তাঁদের ছিল। উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো তেল ও গ্যাসের অর্থ দিয়ে চাকরি, ভর্তুকি ও নগদ সহায়তা বাড়াতে পেরেছিল। পাশাপাশি সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্র পরস্পরকে আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়েছে।

অন্যদিকে আন্দোলনগুলোর সীমাবদ্ধতাও ছিল। অনেক দেশে বিরোধীরা রাজতন্ত্র বিলোপ, সাংবিধানিক সংস্কার, ইসলামি শাসন, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক দাবির মধ্যে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি গড়তে পারেনি। সরকারগুলো এই বিভাজন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের কখনো বিদেশি এজেন্ট, কখনো ধর্মীয় উগ্রপন্থী এবং কখনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী হিসেবে তুলে ধরে। তিউনিসিয়া, মিসর, লিবিয়া ও সিরিয়ার অস্থিতিশীলতার দৃশ্যও পরে বহু সাধারণ নাগরিককে হঠাৎ বিপ্লবের ঝুঁকি সম্পর্কে আতঙ্কিত করে।

তবু যেসব দেশে সরকার পতন ঘটেনি, সেখানেও আরব বসন্ত ব্যর্থ বা প্রভাবহীন ছিল না। জরুরি আইন প্রত্যাহার, সংবিধান সংশোধন, মন্ত্রিসভা পরিবর্তন, মজুরি ও সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, নতুন রাজনৈতিক অধিকার এবং দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা—এসবই আন্দোলনের চাপের ফল। একই সঙ্গে শাসকেরা নজরদারি প্রযুক্তি, সমাবেশবিরোধী আইন, নাগরিকত্ব বাতিল, সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং লক্ষ্যভিত্তিক গ্রেপ্তারের কৌশল আরও উন্নত করে। অর্থাৎ আরব বসন্ত যেমন জনগণকে প্রতিবাদের নতুন ভাষা দিয়েছিল, তেমনি রাষ্ট্রগুলোকেও বিরোধিতা নিয়ন্ত্রণের নতুন পদ্ধতি শিখিয়েছিল।

এই আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে যে শুধু রাজপথে বিপুল মানুষ নামলেই রাজনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত হয় না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, সেনাবাহিনীর অবস্থান, শাসকের আর্থিক সম্পদ, বিরোধীদের ঐক্য এবং বিদেশি শক্তির ভূমিকা প্রতিটি দেশের ফল নির্ধারণ করেছে। আরব বসন্তের ঢেউ কোথাও শাসককে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, কোথাও সীমিত সংস্কারের দরজা খুলেছে, আবার কোথাও পুরোনো ক্ষমতাকে আরও সতর্ক, অভিযোজিত ও দমনমূলক করে তুলেছে—এবং এই ভিন্ন ফলাফলই পরবর্তী দশকে আরব রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করেছে।


আপনার পছন্দ হতে পারে