হিরোশিমা-নাগাসাকি বিতর্ক ও উত্তরাধিকার: কীভাবে শুরু হয়েছিল পারমাণবিক অস্ত্রের যুগ?
সিরিজ: হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলা
হিরোশিমা থেকে বৈশ্বিক পারমাণবিক যুগ
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমা এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে শুধু দুটি জাপানি শহর ধ্বংস হয়নি; যুদ্ধ, রাষ্ট্রশক্তি ও মানবসভ্যতার নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাও বদলে যায়। কয়েক দিনের মধ্যে জাপান আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটি প্রশ্ন জন্ম নেয়, যার সর্বজনস্বীকৃত উত্তর আজও পাওয়া যায়নি—পারমাণবিক বোমা ব্যবহার কি যুদ্ধ শেষ করার জন্য সামরিকভাবে প্রয়োজনীয় ছিল, নাকি তা ছিল এড়ানো সম্ভব এমন এক ভয়াবহ গণবিধ্বংস?
বোমা ব্যবহারের সমর্থকদের প্রধান যুক্তি হলো, এর ফলে জাপানকে দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব হয় এবং মূল ভূখণ্ডে মিত্রবাহিনীর পরিকল্পিত আক্রমণ এড়ানো যায়। ইও জিমা ও ওকিনাওয়ার যুদ্ধে জাপানি প্রতিরোধের তীব্রতা মার্কিন নেতৃত্বকে উদ্বিগ্ন করেছিল। জাপানি সেনাদের বড় অংশ আত্মসমর্পণের বদলে মৃত্যু পর্যন্ত লড়েছিল এবং কামিকাজে আক্রমণে মার্কিন নৌবহরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। মূল দ্বীপপুঞ্জে লাখ লাখ সেনা, আত্মঘাতী বিমান ও নৌযান এবং সাধারণ নাগরিকদের প্রতিরোধে ব্যবহারের প্রস্তুতি চলছিল। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা আশঙ্কা করেছিলেন, স্থল আক্রমণ দীর্ঘ হলে উভয় পক্ষের বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হবে।
এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী হিরোশিমা ও নাগাসাকির ধ্বংস জাপানি নেতৃত্বকে বুঝিয়ে দেয় যে প্রচলিত প্রতিরক্ষা দিয়ে নতুন অস্ত্র ঠেকানো সম্ভব নয়। একটি মাত্র বিমান একটি শহর ধ্বংস করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র আরও বোমা ব্যবহার করতে পারে—এই ভয় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সামরিক যুক্তিকে দুর্বল করে দেয়। সম্রাট হিরোহিতো আত্মসমর্পণের পক্ষে মত দেওয়ার সময় নতুন ও অত্যন্ত নিষ্ঠুর বোমার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তাই সমর্থকেরা বলেন, ভয়াবহ হলেও বোমাগুলো দীর্ঘতর যুদ্ধ, অবরোধ, দুর্ভিক্ষ, অগ্নিবোমা হামলা এবং স্থল আক্রমণে সম্ভাব্য আরও বড় মৃত্যুর সংখ্যা এড়িয়েছিল।
কিন্তু এই যুক্তির বিরোধীরা কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন তোলেন। ১৯৪৫ সালের গ্রীষ্মে জাপানের নৌ ও বিমানশক্তি প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, অর্থনীতি অবরোধে বিপর্যস্ত ছিল এবং সরকার যুদ্ধ শেষ করার উপায় খুঁজছিল। যদিও জাপান তখনো পটসডামের শর্ত মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না, সম্রাটের প্রতিষ্ঠান রক্ষার নিশ্চয়তা দিলে আত্মসমর্পণ ত্বরান্বিত হতে পারত বলে অনেকে মনে করেন। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সম্রাটকে সম্পূর্ণ অপসারণ না করে প্রতীকী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে থাকতে দেয়। সমালোচকদের প্রশ্ন হলো, এই অবস্থানটি আগে স্পষ্ট করা হলে কি পারমাণবিক হামলা এড়ানো যেত?
সম্ভাব্য স্থল আক্রমণে কত মানুষ মারা যেত, তা নিয়েও বিতর্ক আছে। যুদ্ধের পরে কয়েক লাখ থেকে দশ লাখ পর্যন্ত মার্কিন প্রাণহানির অনুমান বহুল প্রচারিত হয়। কিন্তু বোমা ব্যবহারের আগের সব সামরিক হিসাব একই সংখ্যা দেয়নি; বিভিন্ন পরিকল্পনায় হতাহত, নিহত এবং অভিযানটির সময়সীমা নিয়ে ভিন্ন অনুমান ছিল। ভবিষ্যতে ঠিক কতজন মারা যেত, তা নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়। ফলে বাস্তবে নিহত হিরোশিমা ও নাগাসাকির বেসামরিক মানুষকে একটি অনিশ্চিত বিকল্প ইতিহাসে সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যার সঙ্গে তুলনা করাও নৈতিকভাবে জটিল।
আরেকটি বড় বিতর্ক হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধে প্রবেশ। হিরোশিমার হামলার পরও জাপানের সামরিক নেতৃত্ব অবিলম্বে আত্মসমর্পণে রাজি হয়নি। কিন্তু ৮ আগস্ট সোভিয়েত যুদ্ধ ঘোষণার পর মাঞ্চুরিয়ায় আক্রমণ শুরু হলে জাপানের শেষ কূটনৈতিক পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে। যে মস্কোকে শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা হচ্ছিল, সেটি শত্রুতে পরিণত হয়। জাপান তখন দক্ষিণে যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তরে সোভিয়েত ইউনিয়নের আক্রমণের মুখে পড়ে। তাই কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন, হিরোশিমার চেয়ে সোভিয়েত আক্রমণ জাপানি নেতৃত্বের কৌশলগত চিন্তায় অধিক তাৎক্ষণিক পরিবর্তন এনেছিল।
নাগাসাকিতে দ্বিতীয় বোমা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। হিরোশিমার ধ্বংস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য টোকিওতে পৌঁছাতে এবং নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছিল। এর মাত্র তিন দিন পর, সোভিয়েত আক্রমণ শুরু হওয়ার একই দিনে, নাগাসাকিতে ফ্যাট ম্যান বিস্ফোরিত হয়। সমালোচকেরা বলেন, জাপানকে হিরোশিমা ও সোভিয়েত প্রবেশের পূর্ণ প্রভাব বোঝার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে সমর্থকেরা বলেন, দ্রুত দ্বিতীয় হামলা যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বোমা ব্যবহারের সক্ষমতা প্রদর্শন করে এবং প্রথম বিস্ফোরণকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করার সুযোগ নষ্ট করে দেয়।
বোমার শক্তি জনমানবহীন এলাকায় প্রদর্শনের প্রস্তাবও উঠেছিল। জাপানি প্রতিনিধিদের সামনে একটি নির্জন দ্বীপ বা মরুভূমিতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মসমর্পণের শেষ সুযোগ দেওয়া যেতে পারত। কিন্তু মার্কিন কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা ছিল, পরীক্ষাটি ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে এবং জাপানি প্রতিরোধ আরও শক্ত হবে। তখন ব্যবহারযোগ্য বোমার সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত ছিল। নির্ধারিত স্থানে জাপানি পর্যবেক্ষকদের নেওয়া, আগাম সতর্কতা দেওয়া এবং প্রদর্শনের পর তারা আত্মসমর্পণ করবে কি না—সবই অনিশ্চিত ছিল। তবু সমালোচকদের মতে, বেসামরিক নগরীতে সরাসরি ব্যবহারের আগে এই বিকল্প অন্তত চেষ্টা করা উচিত ছিল।
লক্ষ্য নির্বাচনও নৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে সামরিক সদর দপ্তর, অস্ত্র কারখানা, বন্দর ও শিল্পস্থাপনা থাকলেও সেগুলো ছিল জনবহুল নগরী। বোমার লক্ষ্য কোনো বিচ্ছিন্ন সামরিক ঘাঁটি ছিল না; পরিকল্পনাতেই বিস্তৃত নগরাঞ্চলের ওপর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সর্বোচ্চ মানসিক অভিঘাত তৈরির উদ্দেশ্য ছিল। নিহতদের অধিকাংশ ছিলেন সাধারণ মানুষ—শিশু, নারী, বৃদ্ধ, শ্রমিক, চিকিৎসাকর্মী এবং কোরীয় বাধ্যতামূলক শ্রমিক। সামরিক লক্ষ্য ও বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে একই ধ্বংসবৃত্তের মধ্যে রাখা পারমাণবিক হামলার নৈতিক বৈধতাকে আজও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আইনগত মূল্যায়নও সরল নয়। ১৯৪৫ সালে পারমাণবিক অস্ত্রকে নির্দিষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি ছিল না। শহরের ওপর ব্যাপক প্রচলিত বোমাবর্ষণও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও জাপানসহ একাধিক পক্ষ চালিয়েছিল। টোকিও, ড্রেসডেন ও অন্যান্য শহরে অগ্নিবোমায় বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ নিহত হন। তবু যুদ্ধের মৌলিক নীতি—সামরিক লক্ষ্য ও বেসামরিক মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রণা এড়ানো এবং সামরিক সুবিধার তুলনায় অতিরিক্ত ক্ষতি না ঘটানো—পারমাণবিক হামলার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। পরবর্তী আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এই নীতিগুলোকে আরও স্পষ্ট করেছে।
পারমাণবিক বোমার আরেকটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে—সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে মার্কিন শক্তি প্রদর্শন। ট্রিনিটি পরীক্ষার সফলতার পর প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান পটসডাম সম্মেলনে তুলনামূলক আত্মবিশ্বাসী অবস্থান গ্রহণ করেন। যুক্তরাষ্ট্র জানত, যুদ্ধোত্তর ইউরোপ ও এশিয়ায় সোভিয়েত প্রভাব একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন হবে। কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন, জাপানের বিরুদ্ধে বোমা ব্যবহার একই সঙ্গে মস্কোকে নতুন মার্কিন সামরিক সক্ষমতার বার্তা দিয়েছিল। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা, স্থল আক্রমণ এড়ানো এবং সোভিয়েতদের ভয় দেখানো—এসব উদ্দেশ্য পরস্পরবিরোধী না হয়ে একই সিদ্ধান্তে একসঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারে।
বোমা হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র অল্প সময়ের জন্য পারমাণবিক অস্ত্রের একচ্ছত্র অধিকারী ছিল। কিন্তু এই আধিপত্য স্থায়ী হয়নি। ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। এরপর শুরু হয় আরও শক্তিশালী অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫২ সালে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫৩ সালে তাপপারমাণবিক বা হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষা করে। এগুলোর ধ্বংসক্ষমতা হিরোশিমা ও নাগাসাকির বোমার তুলনায় শত বা হাজার গুণ বেশি হতে পারত। অল্প সময়ের মধ্যে পারমাণবিক বোমা একটি যুদ্ধ শেষ করার অস্ত্র থেকে সমগ্র মানবসভ্যতা ধ্বংস করতে সক্ষম বৈশ্বিক অস্ত্রভান্ডারের ভিত্তিতে পরিণত হয়।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বিমান, স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক ডুবোজাহাজে বিপুল অস্ত্র মোতায়েন করে। এর ওপর গড়ে ওঠে পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংসের ধারণা। যুক্তি ছিল, কোনো পক্ষ প্রথম হামলা চালালেও প্রতিপক্ষ পাল্টা আঘাত করে তাকে ধ্বংস করতে পারবে; তাই কেউ যুদ্ধ শুরু করবে না। এই পারমাণবিক প্রতিরোধনীতি সরাসরি বৃহৎ শক্তির যুদ্ধ ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু ভুল সংকেত, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, ভুল হিসাব বা রাজনৈতিক উন্মত্ততায় বিপর্যয় ঘটার ঝুঁকি কখনো দূর হয়নি। ১৯৬২ সালের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট দেখিয়েছিল, পৃথিবী কত দ্রুত পারমাণবিক যুদ্ধের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে।
বায়ুমণ্ডল, সমুদ্র ও মরুভূমিতে শত শত পরীক্ষার ফলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ পৃথিবীর নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। পরীক্ষাস্থলের কাছাকাছি বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠী, সেনাসদস্য ও সাধারণ নাগরিক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েন। পারমাণবিক অস্ত্রের উত্তরাধিকার তাই শুধু হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, কাজাখস্তান, নেভাদা, আলজেরিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন অঞ্চলও এর মূল্য দিয়েছে। অস্ত্র প্রতিযোগিতার পাশাপাশি পরীক্ষাবিরোধী ও নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
১৯৬৮ সালের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের সংখ্যা সীমিত রাখা, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তিতে সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্য স্থির করে। পরে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি, পরীক্ষানিষেধ উদ্যোগ এবং যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত অস্ত্রভান্ডার হ্রাসের মাধ্যমে মোট অস্ত্রসংখ্যা কমানো হয়। কিন্তু পৃথিবী পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত হয়নি। বরং নতুন রাষ্ট্র এই সক্ষমতা অর্জন করেছে, আর পুরোনো অস্ত্রের জায়গায় আরও নির্ভুল ও আধুনিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে হিরোশিমা ও নাগাসাকির সতর্কবার্তা এখনো রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক।
এই দীর্ঘ উত্তরাধিকারের কেন্দ্রে রয়েছেন হিবাকুশারা। তাঁরা দগ্ধ ক্ষত, তেজস্ক্রিয়তাজনিত রোগ, স্বজন হারানোর বেদনা ও সামাজিক বৈষম্য বহন করেও বিশ্বকে নিজেদের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। তাঁদের সাক্ষ্য পারমাণবিক যুদ্ধকে কেবল মানচিত্র, বোমার ক্ষমতা বা কৌশলগত ভারসাম্যের ভাষায় দেখার বিরুদ্ধে মানবিক প্রতিবাদ। কাগজের সারস, শান্তির ঘণ্টা, হিরোশিমার গম্বুজ এবং নাগাসাকির স্মৃতিসৌধ তাই শুধু অতীতের নিদর্শন নয়; এগুলো পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার ঘিরে তৈরি শক্তিশালী নৈতিক নিষেধের প্রতীক।
১৯৪৫ সালের পর কোনো যুদ্ধে আর পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহৃত হয়নি। এই বিরতিকে কখনো “পারমাণবিক নিষেধ” বলা হয়—একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক সীমা, যা অতিক্রম করলে বিশ্বব্যাপী নিন্দা এবং অনিয়ন্ত্রিত প্রতিশোধের আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু এই নিষেধ কোনো নিশ্চয়তা নয়। যত দিন অস্ত্রগুলো প্রস্তুত অবস্থায় থাকবে, দুর্ঘটনা, ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা পরিকল্পিত ব্যবহারের সম্ভাবনাও থাকবে। পারমাণবিক শান্তি এমন এক শান্তি, যার পেছনে সর্বদা পারস্পরিক ধ্বংসের ছায়া উপস্থিত।
হিরোশিমা ও নাগাসাকির বোমা যুদ্ধের সমাপ্তি ত্বরান্বিত করেছিল, কিন্তু একই সঙ্গে এমন এক যুগের সূচনা করেছিল যেখানে মানবজাতি নিজেকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার প্রযুক্তি অর্জন করে। বোমা ব্যবহার অপরিহার্য ছিল কি না—এই বিতর্ক হয়তো কখনো শেষ হবে না। তবে এর পরিণতি নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই: দুটি শহরে বিপুল বেসামরিক প্রাণহানি, প্রজন্মব্যাপী শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা এবং বিশ্বজুড়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতা। এই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার তাই কোনো পক্ষকে নিঃশর্তভাবে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করা নয়; বরং বোঝা যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বৈজ্ঞানিক সাফল্য ও সামরিক প্রয়োজন একত্রিত হলে মানবসভ্যতা কত দ্রুত এমন সীমা অতিক্রম করতে পারে, যেখান থেকে ফিরে আসার সুযোগ নাও থাকতে পারে।
কম্বোডিয়া ও লাওসে ভিয়েতনাম যুদ্ধ: গোপন বোমাবর্ষণ, হো চি মিন ট্রেইল ও লাম সন ৭১৯
নিক্সনের ভিয়েতনামাইজেশন: সেনা প্রত্যাহার, হ্যামবার্গার হিল ও দক্ষিণের যুদ্ধ
আমেরিকায় যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন: টেট, কেন্ট স্টেট ও পেন্টাগন পেপারসের প্রভাব
হুয়ে যুদ্ধ ও মাই লাই গণহত্যা: ভিয়েতনাম যুদ্ধের অন্ধকার অধ্যায়
সোভিয়েত আক্রমণ ও জাপানের আত্মসমর্পণ: পারমাণবিক বোমা কতটা প্রভাব ফেলেছিল?