ইংল্যান্ডের ‘প্রিন্সেস ইন দ্য টাওয়ার’: দুই রাজপুত্রের রহস্যময় অন্তর্ধানের পেছনে কে ছিল?
Series: ইতিহাসের আড়ালে ষড়যন্ত্রের রহস্য
- Author: Admin
- August 13, 2026
ইংল্যান্ডের ‘প্রিন্সেস ইন দ্য টাওয়ার’
১৪৮৩ সালের গ্রীষ্মে ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যেন টাওয়ার অব লন্ডনের পাথরের দেয়ালের মধ্যে আটকে পড়েছিল। সেখানে অবস্থান করছিল দুই কিশোর রাজপুত্র—১২ বছর বয়সী পঞ্চম এডওয়ার্ড এবং তাঁর ছোট ভাই রিচার্ড, ডিউক অব ইয়র্ক। একজন ইংল্যান্ডের বৈধ রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল, অন্যজন ছিল সিংহাসনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকারী। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তারা জনসমক্ষে দেখা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। তারপর যেন ইতিহাস থেকেই অদৃশ্য হয়ে যায়।
তাদের মৃতদেহ নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি। নির্ভরযোগ্য কোনো প্রত্যক্ষদর্শী হত্যাকাণ্ড দেখেছে বলে জানা যায় না। হত্যার নির্দেশ বহনকারী কোনো চিঠিও আবিষ্কৃত হয়নি। তবু পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সন্দেহের কেন্দ্রে রয়েছেন একজন মানুষ—তাদের চাচা, ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় রিচার্ড।
কিন্তু তিনি কি সত্যিই দুই শিশুকে হত্যা করিয়েছিলেন? নাকি পরবর্তী টিউডর শাসন তাঁর বিরুদ্ধে এমন একটি রাজনৈতিক কাহিনি তৈরি করেছিল, যা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসে পরিণত হয়েছে?
এই রহস্যের শুরু বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় ওয়ার্স অব দ্য রোজেস বা গোলাপের যুদ্ধের অস্থির ইংল্যান্ডে। পঞ্চদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে রাজপরিবারের ইয়র্ক ও ল্যাঙ্কাস্টার শাখার মধ্যে সিংহাসন নিয়ে দীর্ঘ সংঘর্ষ চলছিল। রাজা চতুর্থ এডওয়ার্ড ইয়র্কপন্থীদের নেতৃত্ব দিয়ে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কিন্তু তাঁর শাসনও পরিবারগত দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে মুক্ত ছিল না।
১৪৮৩ সালের ৯ এপ্রিল চতুর্থ এডওয়ার্ড আকস্মিকভাবে মারা যান। তাঁর বড় ছেলে এডওয়ার্ড তখন লাডলোতে অবস্থান করছিল। আইনগতভাবে সে-ই নতুন রাজা—পঞ্চম এডওয়ার্ড। কিন্তু বয়স কম হওয়ায় বাস্তব ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
মৃত রাজা তাঁর ভাই রিচার্ড, ডিউক অব গ্লস্টারকে রাজ্যের রক্ষক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিয়ে গিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। রিচার্ড ছিলেন অভিজ্ঞ সৈনিক ও প্রশাসক। অন্যদিকে নতুন রাজার মাতৃপরিবার উডভিলরা দ্রুত ক্ষমতার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিল।
এই দুই পক্ষের সংঘর্ষ খুব দ্রুত প্রকাশ্যে আসে।
রিচার্ড নতুন রাজাকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার পথে তাঁর মাতৃপরিবারের প্রভাবশালী কয়েকজন সদস্যকে আটক করেন। এডওয়ার্ডকে তাঁর কাছ থেকে আলাদা করে রিচার্ড নিজের তত্ত্বাবধানে নেন। পরে তরুণ রাজাকে টাওয়ার অব লন্ডনে রাখা হয়।
আজকের চোখে টাওয়ার অব লন্ডন মানেই যেন কারাগার ও মৃত্যুদণ্ডের স্থান। কিন্তু তখন এর ভূমিকা আরও বিস্তৃত ছিল। এটি ছিল রাজপ্রাসাদ, দুর্গ, প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং নিরাপদ রাজকীয় আবাস। কোনো রাজা অভিষেকের আগে সেখানে অবস্থান করা অস্বাভাবিক ছিল না।
তাই শুরুতে পঞ্চম এডওয়ার্ডের টাওয়ারে থাকা নিজে সন্দেহজনক ঘটনা ছিল না।
কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় যখন তাঁর ছোট ভাই রিচার্ডকেও সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের মা এলিজাবেথ উডভিল ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের স্যাংচুয়ারিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক চাপের পর তিনি ছোট রাজপুত্র রিচার্ডকে হস্তান্তর করতে বাধ্য হন।
এখন ইংল্যান্ডের দুই প্রধান কিশোর উত্তরাধিকারী একই দুর্গের ভেতরে।
এরপর শুরু হয় আরও বড় রাজনৈতিক নাটক।
দাবি তোলা হয়, চতুর্থ এডওয়ার্ড এলিজাবেথ উডভিলকে বিয়ে করার আগে অন্য এক নারীর সঙ্গে বৈধ বিবাহের প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ ছিলেন। যদি সেই পূর্বচুক্তি আইনগতভাবে বৈধ হয়ে থাকে, তাহলে এলিজাবেথের সঙ্গে তাঁর বিবাহ অবৈধ এবং তাঁদের সন্তানরাও বৈধ উত্তরাধিকারী নয়।
এই যুক্তির ভিত্তিতে পঞ্চম এডওয়ার্ড ও তাঁর ভাইয়ের সিংহাসনের দাবি বাতিল করা হয়। পরবর্তীকালে Titulus Regius নামের আইনের মাধ্যমে এই অবস্থানকে আনুষ্ঠানিকতা দেওয়া হয়।
১৪৮৩ সালের জুনে রিচার্ড নিজেই রাজা হন—তৃতীয় রিচার্ড।
আর এখানেই ইতিহাসের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
কারণ দুই রাজপুত্র জীবিত থাকলে রিচার্ডের সিংহাসনের জন্য তারা সব সময় সম্ভাব্য হুমকি হয়ে থাকতে পারত। তাদের বৈধতা বাতিল করা হলেও বিরোধী পক্ষ সহজেই তাদের একজনকে প্রতীকী রাজা হিসেবে ব্যবহার করতে পারত। মধ্যযুগীয় রাজনীতিতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী উত্তরাধিকারীর শুধু জীবিত থাকাই বিদ্রোহের জন্য যথেষ্ট কারণ হতে পারত।
অর্থাৎ দুই রাজপুত্রের মৃত্যু হলে সবচেয়ে সরাসরি রাজনৈতিক সুবিধা পেতেন তৃতীয় রিচার্ড।
এই কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে সন্দেহ এত প্রবল।
১৪৮৩ সালের গ্রীষ্মের প্রথম দিকে দুই ভাইকে টাওয়ারের আঙিনায় খেলতে দেখা যাওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের প্রকাশ্যে দেখা কমে আসে। এরপর তারা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়।
কবে তাদের শেষবার নির্ভরযোগ্যভাবে দেখা গিয়েছিল, তা নিয়েও কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে বছরের শেষ নাগাদ ইংল্যান্ডে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে দুই রাজপুত্রকে হত্যা করা হয়েছে।
এই গুজব রিচার্ডের জন্য রাজনৈতিকভাবে মারাত্মক ছিল।
যদি অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা হয়ে থাকে, তাহলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—রাজা কেন দুই রাজপুত্রকে জীবিত অবস্থায় জনসমক্ষে এনে গুজব বন্ধ করলেন না?
এটি রিচার্ডের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত সবচেয়ে শক্তিশালী পরোক্ষ যুক্তিগুলোর একটি। কারণ দুই শিশু তখন তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন দুর্গে ছিল। তারা জীবিত থাকলে তাদের প্রদর্শন করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারত।
তবে প্রমাণের অভাবকে সরাসরি হত্যার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
রিচার্ডের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বিস্তারিত পরবর্তী অভিযোগগুলোর একটি আসে স্যার থমাস মোরের লেখায়। তিনি দাবি করেন, রিচার্ডের নির্দেশে দুই রাজপুত্রকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হয় এবং হত্যায় স্যার জেমস টায়রেল জড়িত ছিলেন। পরে টায়রেল নাকি অপরাধ স্বীকারও করেছিলেন।
সমস্যা হলো, মোর ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না। তিনি লিখছিলেন কয়েক দশক পরে, যখন টিউডর রাজবংশ ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর বিবরণ ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিকে আদালতের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের মতো ব্যবহার করা যায় না।
আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম হলো হেনরি স্ট্যাফোর্ড, ডিউক অব বাকিংহাম।
শুরুতে তিনি রিচার্ডের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক ছিলেন এবং সিংহাসন দখলের সময় তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। বাকিংহাম রিচার্ডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়েন এবং পরে মৃত্যুদণ্ড পান।
কিছু ইতিহাসবিদ ও লেখক ধারণা করেছেন, বাকিংহাম নিজেই হয়তো দুই রাজপুত্রকে হত্যা করেছিলেন—রিচার্ডের নির্দেশে অথবা নিজের উদ্যোগে।
তাঁরও সম্ভাব্য উদ্দেশ্য ছিল। রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল এবং উত্তরাধিকার প্রশ্নে নিজস্ব উচ্চাকাঙ্ক্ষাও থাকতে পারে। আবার রিচার্ডের প্রতি আনুগত্য প্রমাণ করার জন্যও তিনি এমন পদক্ষেপ নিতে পারেন—এমন অনুমান করা হয়েছে।
কিন্তু বাকিংহামের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ প্রমাণও নেই।
তৃতীয় সম্ভাব্য নাম আরও নাটকীয়—হেনরি টিউডর, পরবর্তী রাজা সপ্তম হেনরি।
১৪৮৫ সালে বসওয়ার্থের যুদ্ধে রিচার্ডকে পরাজিত করে হেনরি টিউডর ইংল্যান্ডের রাজা হন। তাঁর সিংহাসনের দাবি খুব শক্তিশালী ছিল না। তিনি পরে পঞ্চম এডওয়ার্ডের বোন এলিজাবেথ অব ইয়র্ককে বিয়ে করে নিজের বৈধতা শক্তিশালী করেন।
এই কারণে কেউ কেউ যুক্তি দেন, দুই রাজপুত্র জীবিত থাকলে হেনরির জন্যও তারা বড় রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে উঠত।
কিন্তু এই তত্ত্বের প্রধান অসুবিধা হলো সময়।
রাজপুত্রেরা সম্ভবত ১৪৮৩ সালের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, যখন হেনরি টিউডর ইংল্যান্ডের ক্ষমতা থেকে অনেক দূরে ছিলেন। টাওয়ার অব লন্ডনের ওপর তাঁর কোনো সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ফলে হেনরিকে হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে ধরে নিতে হয় যে রাজপুত্রেরা ১৪৮৫ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিল—যার পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ নেই।
রিচার্ডের মৃত্যুর পর অবশ্য তাঁর চরিত্র নিয়ে টিউডর যুগের রাজনৈতিক প্রচারণা ক্রমশ শক্তিশালী হয়। পরবর্তী লেখকেরা তাঁকে বিকৃত শরীর, নিষ্ঠুর মন এবং ক্ষমতার জন্য আত্মীয়হত্যায় প্রস্তুত এক অত্যাচারী হিসেবে চিত্রিত করেন।
উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের Richard III নাটক এই ভাবমূর্তিকে অমর করে দেয়। সেখানে রিচার্ড প্রায় শুরু থেকেই পরিকল্পিত খলনায়ক।
কিন্তু নাটকের রিচার্ড আর ঐতিহাসিক রিচার্ড এক ব্যক্তি নন।
২০১২ সালে লেস্টারে তাঁর কঙ্কাল আবিষ্কারের পর জানা যায়, তাঁর মেরুদণ্ডে স্কোলিওসিস ছিল, কিন্তু পরবর্তী প্রচারণায় দেখানো অতিরঞ্জিত বিকৃত শরীরের অনেক বিবরণ সত্য নয়। এই আবিষ্কার আবারও মনে করিয়ে দেয় যে টিউডর যুগের রাজনৈতিক বিবরণকে সতর্কতার সঙ্গে পড়তে হয়।
তবু রিচার্ডকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করাও কঠিন। তাঁর হাতে উদ্দেশ্য, সুযোগ ও নিয়ন্ত্রণ—তিনটিই ছিল। রাজপুত্ররা তাঁর রাজনৈতিক হেফাজতে থাকার সময় অদৃশ্য হয়েছিল এবং তিনি তাদের ভাগ্য সম্পর্কে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রকাশ্য ব্যাখ্যা দেননি।
রহস্য আরও গভীর হয় ১৬৭৪ সালে।
টাওয়ার অব লন্ডনের হোয়াইট টাওয়ারের একটি সিঁড়ির নিচে নির্মাণকাজের সময় শিশুদের বলে মনে হওয়া কিছু অস্থি পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় এগুলো নিখোঁজ রাজপুত্রদের হতে পারে। রাজা দ্বিতীয় চার্লসের নির্দেশে অস্থিগুলো ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে সমাহিত করা হয়।
১৯৩৩ সালে অস্থিগুলো পরীক্ষা করা হয়েছিল। সে সময় পরীক্ষকেরা ধারণা করেছিলেন সেগুলো দুই শিশুর হতে পারে। কিন্তু সেই যুগের ফরেনসিক পদ্ধতি বর্তমান মানের তুলনায় সীমিত ছিল। তাদের লিঙ্গ, সুনির্দিষ্ট বয়স এবং পরিচয় নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি।
ফলে টাওয়ারে পাওয়া অস্থি দুই রাজপুত্রের—এটি এখনও প্রমাণিত সত্য নয়।
আধুনিক ডিএনএ পরীক্ষা সম্ভব হলে রহস্যের কিছু অংশ সমাধান হতে পারে। কিন্তু পরিচয় নির্ধারণের জন্য শুধু অস্থির ডিএনএ নয়, উপযুক্ত রাজবংশীয় তুলনামূলক নমুনাও দরকার এবং ঐতিহাসিক সমাধি পুনরায় খোলার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
রহস্যের আরেকটি অদ্ভুত অধ্যায় হলো পরবর্তী সময়ে এমন কিছু ব্যক্তি আবির্ভূত হয়েছিলেন যারা নিজেদের হারিয়ে যাওয়া রাজপুত্রদের একজন বলে দাবি করেন।
সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন পারকিন ওয়ারবেক। পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে তিনি দাবি করেন যে তিনি আসলে ছোট রাজপুত্র রিচার্ড, ডিউক অব ইয়র্ক এবং টাওয়ার থেকে কোনোভাবে বেঁচে বেরিয়ে এসেছিলেন। ইউরোপের কিছু শাসক তাঁকে সমর্থনও দিয়েছিলেন।
সপ্তম হেনরির জন্য ওয়ারবেক গুরুতর হুমকি হয়ে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ধরা পড়েন এবং ১৪৯৯ সালে মৃত্যুদণ্ড পান। অধিকাংশ ইতিহাসবিদ তাঁকে প্রতারক হিসেবেই বিবেচনা করেন, কিন্তু তাঁর দাবি দেখিয়ে দেয় যে রাজপুত্রদের ভাগ্য সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় রাজনৈতিকভাবে সেই রহস্য কত সহজে ব্যবহার করা যেত।
তাহলে সবচেয়ে সম্ভাব্য উত্তর কী?
ঐতিহাসিক প্রমাণের বিচারে তৃতীয় রিচার্ড প্রধান সন্দেহভাজনই থেকে যান, কারণ তাঁর কাছে রাজপুত্রদের হেফাজত, তাদের সরিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং টাওয়ারে প্রবেশাধিকারসম্পন্ন লোকদের ওপর কর্তৃত্ব ছিল।
কিন্তু “প্রধান সন্দেহভাজন” এবং “প্রমাণিত হত্যাকারী” একই বিষয় নয়।
আমাদের কাছে এমন কোনো সমসাময়িক নথি নেই যেখানে রিচার্ড হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো নিশ্চিত মৃতদেহ নেই। হত্যার স্থান, সময় বা পদ্ধতিও জানা নেই। টায়রেলের কথিত স্বীকারোক্তির আসল নথিও টিকে নেই।
এ কারণেই প্রিন্সেস ইন দ্য টাওয়ারের রহস্য আজও প্রকৃত ইতিহাসের রহস্য—শুধু জনপ্রিয় ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নয়।
দুই শিশু সম্ভবত মারা গিয়েছিল—কারণ পরবর্তী জীবনে তাদের নির্ভরযোগ্য উপস্থিতির কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু কে তাদের হত্যা করেছিল, কার নির্দেশে হত্যা হয়েছিল কিংবা আদৌ হত্যাকাণ্ড ঠিক কীভাবে ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অনুমাননির্ভর।
ঘটনাটির সবচেয়ে অন্ধকার দিক সম্ভবত হত্যাকারীর পরিচয়ও নয়। বরং এটি দেখায় মধ্যযুগীয় রাজনীতিতে একটি শিশুর পরিচয়ও কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারত।
পঞ্চম এডওয়ার্ড কোনো যুদ্ধ পরিচালনা করেননি। তাঁর ছোট ভাইও কোনো বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয়নি। তাদের অপরাধ ছিল তারা এমন একটি রাজপরিবারে জন্মেছিল, যেখানে তাদের অস্তিত্বই অন্য কারও সিংহাসনের দাবিকে দুর্বল করতে পারত।
তাই টাওয়ার অব লন্ডনের এই রহস্য শুধু দুই হারিয়ে যাওয়া শিশুর গল্প নয়। এটি ক্ষমতার এমন এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার প্রতীক, যেখানে রক্তের সম্পর্ক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছিল না, চাচা সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারতেন এবং রাজমুকুট কখনো কখনো পরিবারের সবচেয়ে অল্পবয়স্ক সদস্যকেও রাজনৈতিক হুমকিতে পরিণত করত।
পাঁচ শতাব্দীর বেশি সময় পরে এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না সেই গ্রীষ্মের শেষে টাওয়ারের অন্ধকার কক্ষে ঠিক কী ঘটেছিল। কিন্তু দুই রাজপুত্রের নীরব অন্তর্ধান ইংরেজ রাজনীতির একটি যুগকে এমন রহস্য দিয়ে ঢেকে দিয়েছে, যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়তো ইতিহাসের সঙ্গে চিরতরে হারিয়ে গেছে।
জুলিয়াস সিজার হত্যার ষড়যন্ত্র: ব্রুটাস কেন যোগ দিয়েছিলেন রোমের রক্তাক্ত চক্রান্তে?
ক্যাটিলাইন ষড়যন্ত্র: রোমান প্রজাতন্ত্র দখলের ব্যর্থ গোপন পরিকল্পনার ইতিহাস
ইতিহাসের বিখ্যাত ষড়যন্ত্র: গোপন চক্রান্ত যেভাবে বদলে দিয়েছে সভ্যতার গতিপথ
আলেকজান্দ্রিয়ার ফারোস: প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের কিংবদন্তি বাতিঘরের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস
হারকিউলিসের টাওয়ার: দুই হাজার বছর ধরে টিকে থাকা রোমান যুগের বিস্ময়কর বাতিঘর
প্যাটারা বাতিঘর: প্রাচীন রোমের হারিয়ে যাওয়া সামুদ্রিক পথনির্দেশকের ইতিহাস