বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মরুভূমির বালু কখনো ‘গান গায়’ কেন? সিংগিং স্যান্ড ডিউনের রহস্য

মরুভূমির বালু কখনো ‘গান গায়’ কেন? সিংগিং স্যান্ড ডিউনের রহস্য
বালুকণার সমবেত কম্পনেই জন্ম নেয় মরুভূমির রহস্যময় সুর

মরুভূমিকে আমরা সাধারণত নিঃশব্দ একটি জগৎ বলে কল্পনা করি। চারদিকে অসীম বালু, দূরে ঢেউয়ের মতো বালিয়াড়ি, মাথার ওপর বিশাল আকাশ এবং মাঝেমধ্যে বয়ে যাওয়া বাতাস—এমন পরিবেশে হঠাৎ যদি মাটির নিচ থেকে গভীর গুঞ্জনের মতো শব্দ উঠতে শুরু করে, তাহলে প্রথমবার শুনলে সেটিকে প্রাকৃতিক ঘটনা বলে বিশ্বাস করাই কঠিন। কখনো সেই শব্দ দূরের বিমানের ইঞ্জিনের মতো, কখনো মৌমাছির বিশাল ঝাঁকের গুঞ্জনের মতো, আবার কখনো নিচু স্বরের বাদ্যযন্ত্রের দীর্ঘ সুরের মতো শোনায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর জন্য মাটির নিচে কোনো যন্ত্র, ভূমিকম্প বা লুকানো জলপ্রবাহের প্রয়োজন হয় না। শব্দটি তৈরি করতে পারে বালিয়াড়ির বালু নিজেই।

এই বিস্ময়কর ঘটনাকে সাধারণভাবে ‘গান গাওয়া বালু’ বা ‘গান গাওয়া বালিয়াড়ি’ বলা হয়। তবে ‘গান’ কথাটি এখানে কিছুটা কাব্যিক। বালিয়াড়ি মানুষের মতো আলাদা আলাদা সুর তৈরি করে না; বরং বিশেষ পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক বালুকণার সম্মিলিত চলাচল থেকে শক্তিশালী, দীর্ঘস্থায়ী এবং তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট স্বরের গুঞ্জন বা গর্জন সৃষ্টি হয়। শব্দটি কখনো এত জোরে হতে পারে যে অনেক দূর থেকেও শোনা যায় এবং কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

সব মরুভূমির বালু কিন্তু এমন শব্দ তৈরি করতে পারে না। পৃথিবীর অসংখ্য বালিয়াড়ির মধ্যে তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক স্থানে এই ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। কারণ শুধু প্রচুর বালু থাকলেই হবে না; বালুকণার আকার, আকৃতি, পৃষ্ঠের অবস্থা, শুষ্কতা, বালিয়াড়ির ঢাল এবং কণাগুলোর একসঙ্গে নিচে নামার ধরন—সবকিছুর একটি বিশেষ সমন্বয় প্রয়োজন। এই কারণেই পাশাপাশি দেখতে প্রায় একই রকম দুটি বালিয়াড়ির একটি জোরে গুঞ্জন করতে পারে, অন্যটি সম্পূর্ণ নীরব থাকতে পারে।

ঘটনাটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বালিয়াড়ির খাড়া ঢালে বালুর ক্ষুদ্র তুষারধস। বাতাস বালুকণাকে ধীরে ধীরে বালিয়াড়ির এক পাশ দিয়ে ওপরে তুলে নিয়ে যায়। চূড়া অতিক্রম করার পর কণাগুলো বিপরীত পাশের খাড়া ঢালে জমতে থাকে। একসময় ঢাল এতটাই খাড়া হয়ে যায় যে ওপরের বালু আর স্থির থাকতে পারে না। তখন একটি অংশ একসঙ্গে নিচের দিকে সরে আসে। বাইরে থেকে এটিকে ছোট বালুধস বলে মনে হলেও এর ভেতরে লক্ষ-কোটি বালুকণা একই সময়ে চলতে, ঘষতে, ধাক্কা খেতে এবং কম্পিত হতে থাকে।

এক মুঠো সাধারণ বালু হাত থেকে ফেললে আমরা শক্তিশালী সুর শুনি না। কারণ কণাগুলোর চলাচল তখন বিশৃঙ্খল এবং তাদের উৎপন্ন ক্ষুদ্র কম্পনগুলো পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একটি কণার ক্ষুদ্র শব্দ অন্যটির শব্দকে শক্তিশালী করার বদলে এলোমেলোভাবে মিশে যায়। কিন্তু গান গাওয়া বালিয়াড়িতে বিশেষ অবস্থায় বিপুলসংখ্যক কণার গতি একটি সম্মিলিত ছন্দে আবদ্ধ হতে পারে। অনেক কণা যখন কাছাকাছি হারে কম্পিত ও সরে যেতে থাকে, তখন তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কম্পন একত্রিত হয়ে অনেক বড় শব্দে রূপ নিতে পারে।

এখানেই ‘সমলয়’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশাল জনসমাবেশে সবাই যদি এলোমেলো সময়ে হাততালি দেয়, তাহলে শুধু অস্পষ্ট কোলাহল শোনা যায়। কিন্তু হাজার মানুষ যদি একই ছন্দে হাততালি দেয়, শব্দ হঠাৎ অনেক বেশি শক্তিশালী ও ছন্দময় হয়ে ওঠে। গান গাওয়া বালুর ঘটনায় ব্যাপারটি হুবহু এমন নয়, তবে তুলনাটি মূল ধারণাটি বুঝতে সাহায্য করে। বালুকণার বিপুল সমষ্টির ক্ষুদ্র কম্পন কোনোভাবে পরস্পরের সঙ্গে সমন্বিত হলে একটি প্রধান কম্পাঙ্ক শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং আমরা সেটিকে দীর্ঘ গুঞ্জন হিসেবে শুনি।

বালুকণার আকার এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গান গাওয়া বালিয়াড়িতে সাধারণত এমন বালু পাওয়া যায় যার বিপুলসংখ্যক কণা তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি আকারের। যদি একই স্তরে অত্যন্ত ছোট, মাঝারি এবং খুব বড় কণা এলোমেলোভাবে মিশে থাকে, তাহলে তাদের চলাচল ও সংঘর্ষের বৈশিষ্ট্যও অনেক বেশি বিচিত্র হয়। ফলে একটি নির্দিষ্ট ছন্দে বৃহৎ পরিসরে কম্পন গড়ে ওঠা কঠিন হতে পারে। কাছাকাছি আকারের কণা থাকলে তাদের পারস্পরিক গতিবিধির মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি সামঞ্জস্য তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।

কণার আকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে বাতাসের মাধ্যমে পরিবাহিত হওয়া বালুকণা একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ঘর্ষণের কারণে অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে গোলাকার ও মসৃণ হয়ে ওঠে। তবে শুধু গোলাকার হলেই কোনো বালু গান গাইবে এমন নয়। কণার পৃষ্ঠ কতটা মসৃণ, তার ওপর কী ধরনের সূক্ষ্ম আবরণ রয়েছে এবং কণাগুলোর মধ্যে ঘর্ষণের বৈশিষ্ট্য কেমন—এসবও তাদের সম্মিলিত গতির ওপর প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ বালুকে শুধু চোখে দেখে তার শব্দ তৈরির ক্ষমতা নিশ্চিতভাবে বোঝা সবসময় সম্ভব নয়।

শুষ্কতা সম্ভবত সবচেয়ে সহজে বোঝা যায় এমন শর্তগুলোর একটি। বালুকণার মাঝখানে অল্প পরিমাণ পানিও তাদের আচরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দিতে পারে। আর্দ্র বালু দিয়ে আমরা সহজেই আকৃতি বানাতে পারি, কিন্তু একেবারে শুকনো বালু হাত থেকে ছেড়ে দিলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর কারণ পানির সূক্ষ্ম স্তর বালুকণার মধ্যে আকর্ষণ বাড়াতে পারে। গান গাওয়া বালিয়াড়িতে কণাগুলোর স্বাধীনভাবে সরে যাওয়া দরকার। অতিরিক্ত আর্দ্রতা সেই চলাচল এবং প্রয়োজনীয় ঘর্ষণগত আচরণ ব্যাহত করতে পারে। তাই দীর্ঘ শুষ্ক আবহাওয়ার পর কোনো বালিয়াড়ি প্রবলভাবে শব্দ করলেও বৃষ্টির পর সেটি নীরব হয়ে যেতে পারে।

বালিয়াড়ির ঢালও এই প্রাকৃতিক বাদ্যযন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। বাতাসে তৈরি বালিয়াড়ির এক পাশ সাধারণত তুলনামূলক মৃদু ঢালবিশিষ্ট হয়, অন্য পাশটি অনেক বেশি খাড়া হতে পারে। খাড়া পাশে বালু একটি সীমার বেশি জমে গেলে মহাকর্ষ তাকে নিচে টেনে আনে। তখন চলমান বালুর একটি স্তর তৈরি হয়। এই স্তরের পুরুত্ব এবং বালুকণার গতি উৎপন্ন শব্দের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ শব্দ শুধু পৃথক কণার সংঘর্ষ থেকে আসে—এভাবে ব্যাখ্যা করলে ঘটনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়; চলমান বালুর পুরো স্তরটিকেই একটি সম্মিলিত গতিশীল ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হয়।

গান গাওয়া বালুর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার স্বর। সাধারণ বালুধসে অসংখ্য সংঘর্ষ ঘটার কারণে কেবল এলোমেলো খসখস শব্দ হওয়ার কথা। কিন্তু কিছু বালিয়াড়ি দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় একই ধরনের নিচু স্বরের গুঞ্জন তৈরি করে। এর অর্থ, চলমান বালুর ভেতরে কোনো প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট কম্পনকে অন্য অনেক এলোমেলো কম্পনের তুলনায় বেশি শক্তিশালী করছে। বিজ্ঞানীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে মূল প্রশ্ন ছিল—এই সমন্বয় ঠিক কোথায় এবং কীভাবে তৈরি হয়?

একসময় ধারণা করা হতো, পুরো বালিয়াড়িটি হয়তো বিশাল বাদ্যযন্ত্রের অনুনাদকক্ষের মতো কাজ করে। অর্থাৎ বালুর নিচের স্তর, বালিয়াড়ির আকার অথবা অভ্যন্তরীণ কোনো কাঠামো নির্দিষ্ট শব্দকে বাড়িয়ে তুলছে। কিন্তু বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষায় দেখা গেছে, শুধু বালিয়াড়ির বিশাল আকৃতি দিয়ে সব বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা কঠিন। বরং চলমান বালুর স্তরের মধ্যেই শব্দ তৈরির মৌলিক প্রক্রিয়ার বড় অংশ ঘটে বলে শক্তিশালী ধারণা তৈরি হয়েছে। কণাগুলোর পারস্পরিক ঘর্ষণ, সংঘর্ষ, পিছলে যাওয়া এবং তাদের গতির সমলয় আচরণ এখানে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে।

আরও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, কোনো কোনো গান গাওয়া বালু সংগ্রহ করে উপযুক্তভাবে একটি পাত্র বা ঢালু পৃষ্ঠে নাড়ালেও ক্ষুদ্র পরিসরে শব্দ উৎপন্ন করা যায়। এর অর্থ, রহস্যটি কেবল একটি নির্দিষ্ট বিশাল বালিয়াড়ির ভূগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বালুর নিজস্ব ভৌত বৈশিষ্ট্যের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র রয়েছে। তবে প্রকৃত বালিয়াড়ির বিশাল বালুধস লক্ষ-কোটি কণাকে একসঙ্গে যুক্ত করায় শব্দের শক্তি ও গভীরতা অনেক বেশি হয়।

বালিয়াড়ির শব্দ সব জায়গায় একই নয়। কোনোটি গভীর গর্জনের মতো, কোনোটি তুলনামূলক উঁচু গুঞ্জন তৈরি করে। এর সঙ্গে বালুকণার গড় আকারের সম্পর্ক পাওয়া যায়। সাধারণভাবে কণার আকার ও তাদের পারস্পরিক গতির বৈশিষ্ট্য বদলালে উৎপন্ন প্রধান কম্পাঙ্কও বদলে যেতে পারে। ফলে ভিন্ন মরুভূমির গান গাওয়া বালিয়াড়ির যেন নিজস্ব ‘কণ্ঠস্বর’ রয়েছে। একই বালিয়াড়িতেও পরিস্থিতি বদলালে শব্দের তীব্রতা ও কিছু বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হতে পারে।

শব্দের উৎস বোঝার জন্য আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ঘর্ষণ মানেই শুধু শক্তি নষ্ট হওয়া নয়। আমরা সাধারণত ঘর্ষণকে গতির বিরোধী শক্তি হিসেবে দেখি। কিন্তু অসংখ্য কণার একটি গতিশীল ব্যবস্থায় ঘর্ষণ তাদের পারস্পরিক গতি নিয়ন্ত্রণ এবং কম্পন সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। চলমান কণা স্থির বা অপেক্ষাকৃত ধীর কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, ক্ষুদ্র চাপের পরিবর্তন সৃষ্টি হয়, আবার কণা পিছলে যায়। এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া যদি উপযুক্ত অবস্থায় ঘটে, তাহলে এলোমেলো গতির মধ্য থেকে একটি সম্মিলিত কম্পন গড়ে উঠতে পারে।

এ কারণে ‘বালুকণাগুলো একে অপরের সঙ্গে ঘষা খায়, তাই গান হয়’—এই জনপ্রিয় ব্যাখ্যাটি পুরোপুরি ভুল না হলেও অত্যন্ত অসম্পূর্ণ। সাধারণ সৈকতের বালুতেও কণা একে অপরের সঙ্গে ঘষা খায়, অথচ সেখানে সাধারণত বিশাল গম্ভীর গুঞ্জন শোনা যায় না। আসল রহস্য হলো কীভাবে বিপুলসংখ্যক কণার ঘর্ষণ ও গতি একটি সংগঠিত কম্পনে পরিণত হয় এবং কীভাবে সেই কম্পন বাতাসে যথেষ্ট শক্তিশালী চাপতরঙ্গ সৃষ্টি করে আমাদের কানে পৌঁছায়।

এখানে আরেক ধরনের শব্দের সঙ্গে বিভ্রান্তি হতে পারে। কিছু সৈকতে শুকনো বালুর ওপর হাঁটলে পায়ের নিচে কিঁচকিঁচ বা চিঁচিঁ ধরনের শব্দ শোনা যায়। একে অনেক সময় ‘সিংগিং স্যান্ড’ বলা হলেও বিশাল বালিয়াড়ির গভীর গর্জনের সঙ্গে এর ভৌত আচরণ পুরোপুরি এক নয়। সৈকতের শব্দ সাধারণত পায়ের চাপে অল্পসংখ্যক কণার পারস্পরিক ঘর্ষণ ও সরে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তুলনামূলকভাবে তীক্ষ্ণ ও ক্ষণস্থায়ী। অন্যদিকে বিশাল বালিয়াড়ির ‘বুমিং’ শব্দ অনেক নিচু, শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

মানুষ এই শব্দ বহু শতাব্দী ধরে লক্ষ্য করেছে। আধুনিক পদার্থবিদ্যা তৈরি হওয়ার অনেক আগেই মরুভূমির যাত্রীদের কাছে শব্দটি ছিল রহস্যময়। নির্জন মরুভূমিতে কোনো দৃশ্যমান প্রাণী বা যন্ত্র ছাড়াই পাহাড়সম বালিয়াড়ি থেকে গম্ভীর আওয়াজ উঠলে অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কোথাও একে মরুভূমির আত্মার কণ্ঠ, কোথাও অদৃশ্য শক্তির সংকেত হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। প্রকৃত কারণ জানার পর ঘটনাটি অবশ্য কম বিস্ময়কর হয়ে যায় না; বরং বোঝা যায় সাধারণ বালুকণাও সম্মিলিতভাবে কত জটিল আচরণ করতে পারে।

পৃথিবীর বিভিন্ন শুষ্ক অঞ্চলে এমন শব্দকারী বালিয়াড়ি রয়েছে। চীন, মঙ্গোলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন মরু অঞ্চলে এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু একই অঞ্চলের সব বালিয়াড়ি শব্দ করে না। এমনকি শব্দকারী একটি বালিয়াড়ির বালু অন্য পরিবেশে নিয়ে গেলে তার আচরণ বদলে যেতে পারে। কারণ কণার বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি স্থানীয় শুষ্কতা, তাপমাত্রা, বাতাসে বালুর বাছাই, ঢালের অবস্থা এবং বালুধসের আকারও গুরুত্বপূর্ণ।

বাতাস এই প্রক্রিয়ায় নীরব কিন্তু অপরিহার্য নির্মাতার ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ সময় ধরে বাতাস বিভিন্ন আকারের কণাকে আলাদা করতে পারে। অপেক্ষাকৃত হালকা কণা দূরে চলে যায়, অন্য কণা নির্দিষ্ট স্থানে জমা হয়। এই প্রাকৃতিক বাছাইয়ের ফলে কোনো কোনো বালিয়াড়ির নির্দিষ্ট অংশে কাছাকাছি আকারের বালুকণা বেশি জমা হতে পারে। একই সঙ্গে বারবার সংঘর্ষ কণার পৃষ্ঠ পরিবর্তন করে। ফলে হাজার হাজার বছরের বায়ুপ্রবাহ ধীরে ধীরে এমন বালুর ভাণ্ডার তৈরি করতে পারে, যা বিশেষ পরিস্থিতিতে অসাধারণ ধ্বনিগত আচরণ দেখায়।

একটি গান গাওয়া বালিয়াড়িকে তাই বিশাল প্রাকৃতিক বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা গেলেও এর কোনো তার, ঝিল্লি বা ধাতব নল নেই। এখানে বাদ্যযন্ত্রের উপাদান হলো অসংখ্য স্বাধীন বালুকণা, শক্তির উৎস হলো মহাকর্ষ, প্রস্তুতকারক হলো বাতাস এবং সুর শুরু করার ঘটনাটি হলো বালুধস। এই চারটি উপাদানের সঙ্গে কণার আকার, আকৃতি, পৃষ্ঠ ও শুষ্কতার মতো সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়ে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে, যেখানে বিশৃঙ্খল কণার প্রবাহ হঠাৎ সংগঠিত শব্দে রূপ নিতে পারে।

এই ঘটনা দানাদার পদার্থের পদার্থবিদ্যা বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বালু দেখতে কঠিন পদার্থের মতো হলেও পরিস্থিতি অনুযায়ী এটি কঠিন, তরল এবং কখনো গ্যাসসদৃশ আচরণের কিছু বৈশিষ্ট্য দেখাতে পারে। স্থির অবস্থায় বালুর ওপর দাঁড়ানো যায়, ঢাল বেয়ে নামার সময় সেটি তরলের মতো প্রবাহিত হয়, আবার প্রবল বাতাসে পৃথক কণা বাতাসে ছিটকে যেতে পারে। এই বহুরূপী আচরণের কারণে বালু নিয়ে গবেষণা শুধু মরুভূমি বোঝার জন্য নয়; শস্য, গুঁড়া পদার্থ, খনিজ কণা এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত দানাদার পদার্থ বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

গান গাওয়া বালিয়াড়ি আমাদের আরেকটি গভীর বৈজ্ঞানিক ধারণার সামনে দাঁড় করায়—অসংখ্য সাধারণ উপাদান একত্রে এমন আচরণ তৈরি করতে পারে, যা একটি পৃথক উপাদান দেখে অনুমান করা কঠিন। একটি বালুকণা গান গায় না। দশটি কণাও মরুভূমির গম্ভীর সুর তৈরি করতে পারে না। কিন্তু সঠিক বৈশিষ্ট্যের বিপুলসংখ্যক কণা যখন সঠিক পরিবেশে একই প্রবাহের অংশ হয়ে ওঠে, তখন পুরো ব্যবস্থায় নতুন একটি আচরণ জন্ম নেয়। অর্থাৎ রহস্যটি কোনো বিশেষ ‘জাদুকরী’ বালুকণায় নয়; রহস্যটি তাদের সম্মিলিত আচরণে।

এ কারণেই মরুভূমির গান আসলে নিঃসঙ্গ কোনো বালুকণার শব্দ নয়। এটি কোটি কোটি ক্ষুদ্র কণার সমবেত পদার্থবিদ্যা। বাতাস বছরের পর বছর ধরে বালুকে বাছাই ও সাজায়, মহাকর্ষ তাকে ঢাল বেয়ে নামায়, ঘর্ষণ ও সংঘর্ষ কণাগুলোর গতিকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং উপযুক্ত পরিস্থিতিতে সেই ক্ষুদ্র কম্পনগুলো একত্রিত হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে গভীর গুঞ্জন হিসেবে। দূর থেকে শুনলে মনে হয় বিশাল মরুভূমি নিজেই যেন সুর তুলেছে। বাস্তবে সেই সুরের পেছনে রয়েছে প্রকৃতির এমন এক সূক্ষ্ম সমন্বয়, যেখানে অসংখ্য ক্ষুদ্র বালুকণা এক মুহূর্তের জন্য একসঙ্গে আচরণ করে একটি সম্পূর্ণ বালিয়াড়িকে বিশাল প্রাকৃতিক বাদ্যযন্ত্রে পরিণত করে।


আপনার পছন্দ হতে পারে