বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ময়ূর কেন বিশাল রঙিন পেখম তৈরি করেছে? সৌন্দর্যের পেছনে বিবর্তনের অদ্ভুত খেলা

  • Author: Admin
  • September 09, 2026
ময়ূর কেন বিশাল রঙিন পেখম তৈরি করেছে? সৌন্দর্যের পেছনে বিবর্তনের অদ্ভুত খেলা
সৌন্দর্যের আড়ালে ময়ূরের বিবর্তনীয় সংকেত

ময়ূরের পেখম দেখলে প্রথমেই যে প্রশ্নটি মনে আসে, সেটি সম্ভবত সৌন্দর্য নিয়ে নয়, বরং প্রয়োজন নিয়ে। একটি বন্য প্রাণীর শরীরে এত বড়, এত উজ্জ্বল এবং এত জটিল অলংকার থাকার দরকার কী? বনে বেঁচে থাকার জন্য দ্রুত দৌড়ানো, শত্রুর চোখ এড়ানো, খাবার খুঁজে পাওয়া এবং কম শক্তি ব্যয় করা যেখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে পুরুষ ময়ূর কেন এমন এক বিশাল পেখম বহন করে, যা তাকে আরও চোখে পড়ার মতো করে তোলে? আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই পেখম সরাসরি উড়তে সাহায্যও করে না। বরং এটি বহন করা, তৈরি করা এবং প্রদর্শন করার জন্য শরীরকে যথেষ্ট সম্পদ ব্যয় করতে হয়। এই আপাত অসঙ্গতির উত্তর লুকিয়ে আছে বিবর্তনের এমন একটি শক্তির মধ্যে, যেখানে শুধু বেঁচে থাকাই যথেষ্ট নয়—নিজের বংশধর রেখে যাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা সাধারণত বিবর্তনের কথা ভাবলে প্রাকৃতিক নির্বাচনের কথা ভাবি। যে বৈশিষ্ট্য কোনো প্রাণীকে পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে, সেটি পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু একটি প্রাণী দীর্ঘদিন বেঁচে থেকেও যদি বংশবিস্তার করতে না পারে, তবে বিবর্তনের হিসাবে তার সাফল্য সীমিত। বিপরীতে, কোনো বৈশিষ্ট্য বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে সামান্য অসুবিধা সৃষ্টি করলেও যদি সেটি সঙ্গী পাওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়, তবে সেই বৈশিষ্ট্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় যৌন নির্বাচন। ময়ূরের পেখম এই শক্তির সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর একটি।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য জানা দরকার। আমরা সাধারণভাবে যেটিকে ময়ূরের বিশাল “লেজ” বলি, তার পুরোটা প্রকৃত লেজের পালক নয়। চোখের মতো নকশাযুক্ত দীর্ঘ, ঝলমলে পালকগুলো মূলত লেজের ওপরের দিকের অত্যন্ত দীর্ঘায়িত আবরণী পালক। প্রকৃত লেজের শক্ত পালকগুলো এর পেছনে থাকে এবং প্রদর্শনের সময় বিশাল পেখমটিকে ওপরে তুলে ধরে রাখতে সাহায্য করে। অর্থাৎ আমরা যে বিশাল রঙিন পাখাটি দেখি, সেটি প্রকৃত লেজের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষ প্রদর্শনী কাঠামো।

পুরুষ ময়ূর এবং স্ত্রী ময়ূরের চেহারার পার্থক্যও এই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুরুষের শরীরে উজ্জ্বল নীল, সবুজ ও ধাতব আভা এবং বিশাল অলংকারপূর্ণ পেখম দেখা যায়। স্ত্রী ময়ূর তুলনামূলকভাবে অনাড়ম্বর বাদামি ও ধূসরাভ রঙের। এই পার্থক্য কেবল ঘটনাচক্রে তৈরি হয়নি। স্ত্রীকে আকর্ষণ করার প্রতিযোগিতা পুরুষের দেহে এমন বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটাতে পারে, যা স্ত্রীদের শরীরে একইভাবে বিকশিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ফলে একই প্রজাতির দুই লিঙ্গের চেহারায় বিস্ময়কর পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

প্রজননের সময় পুরুষ ময়ূরের আচরণ দেখলে পেখমের প্রকৃত ভূমিকা আরও পরিষ্কার হয়। পুরুষ তার দীর্ঘ পালকগুলো ওপরে তুলে বিশাল অর্ধবৃত্তাকার পাখার মতো ছড়িয়ে দেয়। তারপর সে স্ত্রী ময়ূরের সামনে নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে দাঁড়ায়, শরীরের অবস্থান পরিবর্তন করে এবং পালকগুলো কাঁপাতে থাকে। এই কম্পনের সময় পেখমের সূক্ষ্ম অংশগুলো নড়ে ওঠে এবং অসংখ্য চোখের মতো নকশা যেন জীবন্ত হয়ে ঝিলমিল করতে থাকে। অর্থাৎ পেখম কোনো স্থির চিত্র নয়; এটি চলমান একটি দৃশ্যমান প্রদর্শনী।

পেখমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো অসংখ্য চোখের মতো গোলাকার নকশা। এগুলোকে সাধারণভাবে চোখের ছাপ বলা যায়। প্রতিটি নকশার মধ্যে নীল, সবুজ, ব্রোঞ্জ, সোনালি ও গাঢ় রঙের স্তর এমনভাবে সাজানো থাকে যে দূর থেকে সত্যিকারের চোখের মতো মনে হতে পারে। একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষের পেখমে বিপুলসংখ্যক এমন নকশা থাকতে পারে। এগুলোর সংখ্যা, বিন্যাস, সামঞ্জস্য, পালকের অবস্থা এবং প্রদর্শনের গুণমান সম্ভাব্য সঙ্গিনীর কাছে পুরুষটির সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য বহন করতে পারে।

ময়ূরের পালকের নীল ও সবুজ রং সম্পর্কে আরও একটি বিস্ময়কর ব্যাপার রয়েছে। এই রঙের সবটাই সাধারণ রঞ্জক পদার্থের কারণে তৈরি হয় না। পালকের অত্যন্ত সূক্ষ্ম গঠন আলোকে বিশেষভাবে প্রতিফলিত ও বিচ্ছুরিত করে। আলোর বিভিন্ন তরঙ্গ একে অপরের সঙ্গে ক্রিয়া করে নির্দিষ্ট রংকে বেশি দৃশ্যমান করে তোলে। ফলে দেখার কোণ বা আলোর অবস্থান বদলালে পালকের রংও বদলে যাচ্ছে বলে মনে হয়। এই কারণেই ময়ূরের পেখম কখনো সবুজ, কখনো নীলচে, আবার কখনো ব্রোঞ্জ বা সোনালি আভায় ঝলমল করে। প্রকৃতি এখানে শুধু রঞ্জক দিয়ে ছবি আঁকেনি; পালকের অতি সূক্ষ্ম স্থাপত্যকেই আলো নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রে পরিণত করেছে।

কিন্তু স্ত্রী ময়ূর কেন এমন অলংকার পছন্দ করবে? এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, ভালো অবস্থার একটি পেখম পুরুষের শারীরিক সক্ষমতার সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে। বড় ও সুগঠিত অলংকার তৈরি করা সহজ নয়। পালক গজাতে পুষ্টি ও শক্তি লাগে, পালক ভালো অবস্থায় রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা দরকার এবং পুরো প্রদর্শনী পরিচালনা করতেও শারীরিক সামর্থ্য লাগে। কোনো পুরুষ যদি এসব ব্যয় বহন করেও সুস্থ, সক্রিয় এবং সফলভাবে প্রজনন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে, তবে তার প্রদর্শনী স্ত্রীকে তার সামগ্রিক গুণমান সম্পর্কে কিছু তথ্য দিতে পারে।

তবে বিষয়টিকে “স্ত্রী ময়ূর সব সময় সবচেয়ে বড় পেখমের পুরুষকেই বেছে নেয়”—এমন সরল নিয়মে নামিয়ে আনা ঠিক হবে না। বাস্তবে সঙ্গী নির্বাচনে পেখমের দৈর্ঘ্য, চোখের নকশার সংখ্যা, পালকের অবস্থা, প্রদর্শনের কোণ, কম্পনের ধরন, পুরুষের আচরণ এবং পরিবেশগত পরিস্থিতিসহ একাধিক সংকেত ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় এসব বৈশিষ্ট্যের গুরুত্ব নিয়ে ভিন্ন ফল পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ময়ূরের প্রেমের ভাষা শুধু একটি সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; এটি বহু সংকেতের সমন্বয়ে গঠিত একটি জটিল প্রদর্শনী ব্যবস্থা।

এই প্রক্রিয়া কীভাবে এত দূর যেতে পারে, সেটি বোঝার জন্য একটি কাল্পনিক প্রাচীন ময়ূরগোষ্ঠীর কথা ভাবা যায়। ধরা যাক, কোনো সময় পুরুষদের পালক আজকের তুলনায় অনেক ছোট ছিল। স্ত্রীদের মধ্যে যদি সামান্য লম্বা বা বেশি উজ্জ্বল পালকের পুরুষের প্রতি সামান্য পছন্দ তৈরি হয়, তবে সেই পুরুষেরা গড়ে কিছুটা বেশি সন্তান রেখে যেতে পারে। তাদের সন্তানদের মধ্যে বাবার আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এবং মায়ের সেই বৈশিষ্ট্যের প্রতি পছন্দ—উভয়ের বংশগত ভিত্তি ছড়িয়ে পড়তে পারে। বহু প্রজন্ম ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে অলংকার এবং অলংকারের প্রতি আকর্ষণ একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে।

এটি যৌন নির্বাচনের এক অসাধারণ প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তৈরি করতে পারে। কোনো বৈশিষ্ট্য প্রথমে খুব সামান্য সুবিধা দিলেও সঙ্গী নির্বাচনের ধারাবাহিক প্রভাব সেটিকে ক্রমে অতিরঞ্জিত করতে পারে। পুরুষের পেখম আরও বড় ও আকর্ষণীয় হয়, স্ত্রীদের পছন্দও সেই দিকেই নির্বাচনকে চালিত করে। একসময় বৈশিষ্ট্যটি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে সেটি শুধু কার্যকর নয়, অত্যন্ত নাটকীয় হয়ে ওঠে।

এখানেই একটি বড় প্রশ্ন আসে—এই প্রক্রিয়া তাহলে অসীম পর্যন্ত চলে না কেন? ময়ূরের পেখম কেন আরও দ্বিগুণ বা দশ গুণ বড় হয়নি? কারণ যৌন নির্বাচনের পাশাপাশি প্রাকৃতিক নির্বাচনও কাজ করছে। অতিরিক্ত বড় অলংকার তৈরি করতে বেশি সম্পদ লাগতে পারে, চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে এবং পরিবেশগত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ধরনের অসুবিধা দেখা দিতে পারে। ফলে সঙ্গী আকর্ষণের সুবিধা এবং বেঁচে থাকার ব্যয়ের মধ্যে একটি বিবর্তনীয় ভারসাম্য তৈরি হয়। যে পর্যায়ের অলংকার প্রজনন সাফল্য বাড়ায় কিন্তু তার ব্যয় পুরো সুবিধাকে ছাড়িয়ে যায় না, সেই পরিসরেই বৈশিষ্ট্যটি টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি।

ময়ূরের পেখম নিয়ে আরেকটি বহুল আলোচিত ধারণা হলো “ব্যয়বহুল সংকেত”। কোনো সংকেত যদি তৈরি ও বজায় রাখা কঠিন হয়, তবে সেটি নকল করাও কঠিন হতে পারে। একটি দুর্বল বা অপুষ্ট পুরুষের জন্য অত্যন্ত সুগঠিত পেখম তৈরি করা, সেটিকে ভালো অবস্থায় রাখা এবং শক্তিশালী প্রদর্শনী করা তুলনামূলক কঠিন হতে পারে। ফলে অলংকারের ব্যয়ই কিছু ক্ষেত্রে তার বিশ্বাসযোগ্যতার অংশ হয়ে উঠতে পারে। তবে ময়ূরের পেখমকে এই একটি ধারণা দিয়েই সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায় না। বাস্তবে জিনগত বৈশিষ্ট্য, শারীরিক অবস্থা, পরিবেশ, স্ত্রীদের পছন্দ এবং পুরুষদের পারস্পরিক প্রতিযোগিতা একসঙ্গে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো, ময়ূরের প্রদর্শনী শুধু স্ত্রীদের জন্য দৃশ্যমান সৌন্দর্যের ব্যাপার নয়। পুরুষ যখন তার পেখম কাঁপায়, তখন সূক্ষ্ম যান্ত্রিক কম্পন সৃষ্টি হয়। পালকের বিভিন্ন অংশ এমনভাবে গঠিত যে প্রদর্শনের সময় চোখের নকশাগুলো তুলনামূলক স্থিতিশীল দেখাতে পারে, অথচ চারপাশের সূক্ষ্ম পালক দ্রুত কাঁপতে থাকে। এর ফলে চোখের নকশাগুলো যেন কাঁপতে থাকা ঝলমলে পটভূমির মধ্যে ভাসমান অবস্থায় দেখা যায়। এই গতিশীল দৃশ্য স্ত্রী ময়ূরের দৃষ্টি আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

আলোও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে। পুরুষ ময়ূর শুধু পেখম খুলে যেকোনো দিকে দাঁড়ালেই একই দৃশ্য তৈরি হয় না। পালকের গঠনগত রং আলোর কোণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় পুরুষের অবস্থান এবং পেখমের দিক পরিবর্তনের সঙ্গে প্রদর্শনের উজ্জ্বলতাও বদলে যায়। ফলে প্রজনন প্রদর্শনীকে এক ধরনের জীবন্ত আলোকপ্রদর্শনী বলা যায়। শরীর, পালক, সূর্যের আলো এবং নড়াচড়া—সব মিলিয়ে তৈরি হয় সেই দৃশ্য, যেটিকে আমরা শুধু “সুন্দর পেখম” বলে দেখি।

পুরুষদের মধ্যকার প্রতিযোগিতাও এই বিবর্তনের অংশ। যৌন নির্বাচন সব সময় সরাসরি মারামারির মাধ্যমে ঘটে না। অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারানোর আরেকটি পথ হলো বেশি আকর্ষণীয় প্রদর্শনী করা। ময়ূরের ক্ষেত্রে প্রজনন মৌসুমে পুরুষেরা নির্দিষ্ট প্রদর্শনী এলাকায় অবস্থান করে স্ত্রীদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করতে পারে। স্ত্রী সেখানে এসে সম্ভাব্য সঙ্গীদের পর্যবেক্ষণ করে। ফলে প্রতিযোগিতাটি অনেকাংশে হয়ে ওঠে কে বেশি কার্যকরভাবে নিজের বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করতে পারে তার লড়াই।

তাহলে স্ত্রী ময়ূরের শরীরে এমন বিশাল পেখম নেই কেন? কারণ স্ত্রীদের ওপর নির্বাচনের চাপ ভিন্ন। ডিম উৎপাদন, বাসা তৈরি, ডিমে তা দেওয়া এবং ছানাদের নিরাপত্তার মতো কাজ তাদের প্রজনন সাফল্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। মাটিতে বাসা করা একটি পাখির ক্ষেত্রে তুলনামূলক অনাড়ম্বর রং পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকতে সাহায্য করতে পারে। তাই পুরুষের ক্ষেত্রে যেখানে দৃশ্যমানতা সঙ্গী আকর্ষণে সুবিধা দিতে পারে, সেখানে স্ত্রী ময়ূরের ক্ষেত্রে কম চোখে পড়া অনেক পরিস্থিতিতে সুবিধাজনক হতে পারে।

ময়ূরের পেখমের জীবনচক্রও উল্লেখযোগ্য। এটি একবার তৈরি হয়ে সারাজীবন একই অবস্থায় থাকে না। প্রজনন মৌসুমের সঙ্গে সম্পর্কিত সময়ে পুরুষের দীর্ঘ অলংকারপূর্ণ পালক পূর্ণ বিকাশ লাভ করে এবং পরে পালক বদলের সময় সেগুলো ঝরে যায়। এরপর আবার নতুন পালক গজায়। অর্থাৎ প্রতি বছর একটি পুরুষকে তার এই বিশাল প্রদর্শনী কাঠামোর বড় অংশ নতুন করে তৈরি করতে হয়। এটি দেখায় যে পেখম একটি স্থায়ী মৃত অলংকার নয়; বরং শরীরের নিয়মিত বিনিয়োগের ফল।

পেখমের চোখের মতো নকশা আমাদের কাছে এত আকর্ষণীয় কেন, সেটিও আলাদা প্রশ্ন। মানুষ প্রতিসাম্য, পুনরাবৃত্ত নকশা এবং উজ্জ্বল বৈপরীত্য সহজেই লক্ষ্য করে। ময়ূরের পেখমে এই তিনটিই অসাধারণ মাত্রায় উপস্থিত। শত শত পালক একসঙ্গে ছড়ালে প্রত্যেকটির চোখের নকশা মিলে বিশাল একটি জ্যামিতিক বিন্যাস তৈরি করে। কিন্তু মানুষের নান্দনিক অনুভূতি এই কাঠামোর কারণ নয়। মানুষ পৃথিবীতে আসার বহু আগে থেকেই ময়ূরের পূর্বপুরুষদের মধ্যে যৌন নির্বাচন কাজ করছিল। আমরা আসলে এমন একটি বিবর্তনীয় সংকেতকে সুন্দর বলে অনুভব করছি, যার মূল দর্শক ছিল স্ত্রী ময়ূর।

এই ঘটনাটি বিবর্তন সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণাও ভেঙে দেয়। বিবর্তন সব সময় প্রাণীর শরীরকে আরও সরল, আরও দক্ষ বা শুধু বেঁচে থাকার জন্য সর্বোত্তম করে তোলে না। কোনো বৈশিষ্ট্যের সাফল্য নির্ভর করে সেটি পরবর্তী প্রজন্মে জিন পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা কতটা বাড়ায় তার ওপর। তাই হরিণের বিশাল শিং, কিছু পাখির দীর্ঘ অলংকারপূর্ণ পালক, অনেক প্রাণীর উজ্জ্বল রং কিংবা জটিল প্রজনন নৃত্যের মতো বৈশিষ্ট্য তৈরি হতে পারে। এগুলোর অনেকটাই দৈনন্দিন জীবন সহজ করার জন্য নয়; বরং প্রজননের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার ফল।

ময়ূরের পেখম তাই প্রকৃতির এক ধরনের আপসের দলিল। একদিকে আছে শিকারি, খাদ্যের সীমাবদ্ধতা, চলাচলের প্রয়োজন এবং শরীরের শক্তি সাশ্রয়ের চাপ। অন্যদিকে আছে সঙ্গিনীকে আকর্ষণ করার প্রবল প্রতিযোগিতা। এই দুই শক্তির টানাপোড়েনের মধ্যেই তৈরি হয়েছে আজকের পুরুষ ময়ূরের বিস্ময়কর চেহারা। পেখম যতটা সৌন্দর্যের বস্তু, ততটাই এটি প্রজনন কৌশল, সংকেত, প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসের ফল।

আরও গভীরে গেলে বোঝা যায়, ময়ূর নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কে মানুষের মতো কোনো নান্দনিক পরিকল্পনা করেনি। কোনো প্রাচীন ময়ূর সিদ্ধান্ত নেয়নি যে তার বংশধরদের পেখম আরও বড় হওয়া দরকার। অসংখ্য প্রজন্ম ধরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পার্থক্য তৈরি হয়েছে। কিছু পুরুষের প্রদর্শনী অন্যদের তুলনায় বেশি সফল হয়েছে। তারা বেশি বংশধর রেখে গেছে। সেই বংশধরদের মধ্যেও অনুরূপ বৈশিষ্ট্য ছড়িয়েছে। নির্বাচন বারবার একই দিকে কাজ করতে করতে এমন একটি কাঠামো সৃষ্টি করেছে, যা দেখে আজ মনে হয় যেন কোনো শিল্পী সচেতনভাবে প্রতিটি পালক সাজিয়েছে।

এই কারণেই ময়ূরের পেখম বিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্যমান উদাহরণগুলোর একটি। এটি আমাদের শেখায়, প্রকৃতিতে “সুন্দর” এবং “উপকারী” সব সময় একই অর্থ বহন করে না। কোনো বৈশিষ্ট্য দৌড়াতে সাহায্য না করেও উপকারী হতে পারে, যদি সেটি সফলভাবে সঙ্গী পেতে সাহায্য করে। আবার সেই সুবিধারও সীমা রয়েছে, কারণ অলংকারের ব্যয় অত্যধিক হয়ে গেলে প্রাকৃতিক নির্বাচন তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

একটি পুরুষ ময়ূর যখন সূর্যের আলোয় পেখম মেলে দাঁড়ায়, তখন আমরা তাই শুধু রঙিন পালক দেখছি না। আমরা দেখছি বহু প্রজন্মের সঙ্গী নির্বাচন, পুরুষদের প্রতিযোগিতা, আলো নিয়ন্ত্রণকারী পালকের সূক্ষ্ম গঠন, শারীরিক সক্ষমতার সংকেত এবং প্রাকৃতিক ও যৌন নির্বাচনের মধ্যে দীর্ঘ টানাপোড়েনের দৃশ্যমান ফল। প্রতিটি ঝলমলে চোখের নকশার পেছনে রয়েছে এমন এক ইতিহাস, যেখানে সামান্য প্রজনন সুবিধা হাজার হাজার প্রজন্ম ধরে জমতে জমতে একসময় অসাধারণ সৌন্দর্যে রূপ নিয়েছে।

ময়ূরের বিশাল পেখমের সবচেয়ে চমকপ্রদ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—প্রকৃতিতে সৌন্দর্য সব সময় বিলাসিতা নয়। কখনো কখনো সৌন্দর্য নিজেই প্রতিযোগিতার অস্ত্র, তথ্য বহনকারী সংকেত এবং বংশধর রেখে যাওয়ার কৌশল। যে পেখম আমাদের চোখে শিল্পকর্ম, বিবর্তনের ভাষায় সেটি একটি দীর্ঘ পরীক্ষার ফল। আর সেই পরীক্ষার বিচারক ছিল কোনো মানুষ নয়, ছিল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঙ্গী নির্বাচন করা স্ত্রী ময়ূর এবং তাদের চারপাশের কঠিন প্রাকৃতিক পরিবেশ।