বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জীব আসলে একটি ছত্রাক—ওরেগনের ‘হিউমঙ্গাস ফাঙ্গাস’ কীভাবে এত বিশাল হলো?

পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জীব আসলে একটি ছত্রাক—ওরেগনের ‘হিউমঙ্গাস ফাঙ্গাস’ কীভাবে এত বিশাল হলো?
মাটির নিচে বিস্তৃত পৃথিবীর এক বিস্ময়কর দৈত্যাকার জীব

‘পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জীব’ কথাটি শুনলে আমাদের কল্পনায় সাধারণত নীল তিমি, বিশাল সিকোইয়া গাছ কিংবা কোনো দৈত্যাকার সামুদ্রিক প্রাণীর ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু জীবজগতের সবচেয়ে বিস্ময়কর দৈত্যদের একটি চোখের সামনে দাঁড়িয়েও প্রায় দেখা যায় না। কারণ তার অধিকাংশ দেহ লুকিয়ে রয়েছে মাটির নিচে। যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের ব্লু মাউন্টেনস অঞ্চলের একটি বিশাল বনভূমির নিচে ছড়িয়ে থাকা আর্মিলারিয়া ছত্রাকের একটি একক জীব এত বড় যে এর বিস্তার প্রায় সাড়ে নয় বর্গকিলোমিটার। এর সঠিক মোট ভর সরাসরি মাপা সম্ভব নয়, তবে বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী তা কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার টন পর্যন্ত হতে পারে। এই কারণেই একে পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী একক জীবের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এখানেই প্রথম বিস্ময়টি তৈরি হয়। আমরা সাধারণত ছত্রাক বলতে মাটির ওপর জন্মানো ব্যাঙের ছাতা বা মাশরুম বুঝি। অথচ একটি মাশরুম পুরো ছত্রাক নয়। সেটি মূলত ছত্রাকের অস্থায়ী প্রজনন কাঠামো। প্রকৃত জীবটির বিশাল অংশ মাটি, মৃত কাঠ অথবা জীবন্ত গাছের শিকড়ের ভেতরে অদৃশ্য অবস্থায় থাকতে পারে। অসংখ্য অতিসূক্ষ্ম সুতার মতো ছত্রাকসূত্র একত্র হয়ে বিশাল জাল তৈরি করে। এই জালই ছত্রাকের মূল দেহের প্রধান অংশ।

ওরেগনের এই বিশাল জীবটি আর্মিলারিয়া অস্টোয়ে নামের এক ধরনের ছত্রাক। আর্মিলারিয়ার বিভিন্ন প্রজাতিকে সাধারণভাবে মধু ছত্রাকও বলা হয়, কারণ নির্দিষ্ট ঋতুতে তাদের যে মাশরুম জন্মায়, সেগুলোর অনেকগুলোর রং মধুর মতো হলুদাভ বা বাদামি। কিন্তু মাটির ওপরের এই ছোট মাশরুম দেখে নিচে থাকা জীবটির প্রকৃত আকার কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্ব ওরেগনের মালহিউর জাতীয় অরণ্যে বিজ্ঞানীরা এই অস্বাভাবিক ছত্রাকটির সন্ধান পান। বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ছিল এবং অনেক গাছ মারা যাচ্ছিল। আক্রান্ত গাছের শিকড় পরীক্ষা করে আর্মিলারিয়াজনিত শিকড় পচা রোগের লক্ষণ পাওয়া যায়। প্রথমে মনে হতে পারে, বিভিন্ন স্থানে আলাদা আলাদা ছত্রাক এসব গাছকে আক্রান্ত করছে। কিন্তু বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করার পর গবেষকেরা আরও বিস্ময়কর একটি চিত্র দেখতে পান।

অনেক দূরে দূরে থাকা আক্রান্ত স্থান থেকে সংগ্রহ করা ছত্রাকের নমুনার জিনগত বৈশিষ্ট্য তুলনা করে দেখা যায়, বিশাল এলাকার বহু নমুনা একই জিনগত ব্যক্তিসত্তার অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ একটি গাছের নিচে থাকা ছত্রাক এবং অনেক দূরের আরেকটি গাছের শিকড়ে থাকা ছত্রাক আলাদা জীব নয়; তারা একই বিশাল জীবের অংশ। মাটির নিচে এবং গাছের শিকড়ের ভেতর দিয়ে সেই জীব ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করেছে।

এই আর্মিলারিয়ার বিস্তার প্রায় দুই হাজার তিন শতাধিক একর বনভূমিজুড়ে বলে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা প্রায় সাড়ে নয় বর্গকিলোমিটারের সমান। তুলনা করলে এর বিশালত্ব আরও স্পষ্ট হয়। হাজার হাজার ফুটবল মাঠের সমান এলাকা জুড়ে একই ছত্রাকীয় ব্যক্তিসত্তার অংশ থাকতে পারে। অথচ উপর থেকে তাকালে এমন কোনো দৈত্যাকার জীব দেখা যাবে না। দেখা যাবে সাধারণ পাহাড়ি বন, গাছ, মাটি, শুকনো কাঠ এবং নির্দিষ্ট সময়ে কিছু ছোট মাশরুম। আসল দৈত্যটি রয়েছে চোখের আড়ালে।

তবে এত বড় এলাকায় একই প্রজাতির ছত্রাক পাওয়া আর একই ‘একটি জীব’ পাওয়া এক বিষয় নয়। একটি বনে একই প্রজাতির হাজার হাজার আলাদা ছত্রাক থাকতে পারে। তাই গবেষকদের মূল কাজ ছিল প্রমাণ করা যে দূরের নমুনাগুলো সত্যিই একই ব্যক্তিসত্তার অংশ। এ জন্য নমুনাগুলোর জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং তাদের পারস্পরিক সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা হয়। একই জিনগত পরিচয়ের অংশগুলো শনাক্ত করার মাধ্যমেই বোঝা যায়, দৃশ্যত বিচ্ছিন্ন মনে হওয়া ছত্রাক আসলে একই দীর্ঘজীবী জীবের বিস্তৃত অংশ।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই ছত্রাককে একটি বিশাল গোলাকার মাংসল দেহ হিসেবে কল্পনা করা ভুল। এর দেহ বনভূমির নিচে সমানভাবে কোনো বিশাল চাদরের মতো বিছিয়ে নেই। বরং এটি অসংখ্য সূক্ষ্ম ছত্রাকসূত্র, ছত্রাকজাল এবং বিশেষ দড়ির মতো গঠনের মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। আর্মিলারিয়ার ক্ষেত্রে এই দড়ির মতো গঠনগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো দেখতে অনেকটা কালো বা গাঢ় বাদামি জুতার ফিতার মতো। এগুলোর মাধ্যমে ছত্রাক মাটির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে পারে এবং নতুন গাছের শিকড়ে পৌঁছাতে পারে।

একটি উপযুক্ত গাছের শিকড়ে পৌঁছানোর পর ছত্রাকটি তার জীবন্ত টিস্যুতে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে গাছের বাকলের নিচের জীবন্ত অংশে ছত্রাকীয় বৃদ্ধি ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত গাছ ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। শিকড়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে গাছের পানি ও পুষ্টি গ্রহণের ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে গাছ মারা যেতে পারে। মৃত গাছ তখন আবার ছত্রাকটির জন্য পুষ্টির উৎস হয়ে ওঠে। অর্থাৎ আর্মিলারিয়া একদিকে জীবন্ত গাছের রোগসৃষ্টিকারী পরজীবী হিসেবে কাজ করতে পারে, অন্যদিকে মৃত কাঠ ভেঙে পুষ্টি গ্রহণকারী জীব হিসেবেও টিকে থাকতে পারে।

এই দ্বৈত ক্ষমতাই সম্ভবত তার দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের অন্যতম কারণ। কোনো একটি গাছ মারা গেলেই ছত্রাকটির জীবন শেষ হয় না। সে মৃত শিকড় ও কাঠে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে পারে এবং সেখান থেকে ধীরে ধীরে আশপাশের নতুন গাছের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি বনভূমিতে যদি উপযুক্ত গাছের শিকড় কাছাকাছি থাকে, তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ছত্রাকটির বিস্তার চলতে পারে।

এখানে সময়ের মাত্রাটিও অবিশ্বাস্য। ওরেগনের এই বিশাল ছত্রাকটির সঠিক বয়স জানা সম্ভব নয়। এর বৃদ্ধির সম্ভাব্য হার এবং বর্তমান বিস্তারের আকার থেকে অনুমান করা হয়েছে, এটি অন্তত কয়েক হাজার বছরের পুরোনো হতে পারে। কিছু হিসাব এটিকে দুই হাজার বছরের বেশি পুরোনো বলে নির্দেশ করে, আবার বৃদ্ধির হার সম্পর্কে ভিন্ন অনুমান ব্যবহার করলে বয়স আরও অনেক বেশি হতে পারে। অর্থাৎ মানুষ যখন প্রাচীন সভ্যতা নির্মাণ করছিল, তখনও এই জীবটির কোনো পূর্ববর্তী অংশ হয়তো ওরেগনের মাটির নিচে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছিল।

কিন্তু একটি ছত্রাক কীভাবে হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকতে পারে? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে তার দেহের গঠনে। মানুষের মতো প্রাণীর দেহ অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। হৃদ্‌যন্ত্র, মস্তিষ্ক বা অন্য কোনো অপরিহার্য অঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো জীবটি মারা যেতে পারে। বিশাল ছত্রাকজাল অনেক বেশি ছড়ানো। এর কোনো এক অংশ নষ্ট হলেও অন্য অংশ জীবিত থাকতে পারে। মাটির নিচে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য অংশ উপযুক্ত পরিবেশে বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে পারে। ফলে স্থানীয় ক্ষতি পুরো জীবের অবসান ঘটায় না।

এ কারণেই ‘একটি জীব’ বলতে আমরা কী বুঝি, আর্মিলারিয়া সেই ধারণাকেও নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। মানুষের ক্ষেত্রে একটি শরীরের সীমানা সহজেই নির্ধারণ করা যায়। একটি হাতি কোথায় শুরু এবং কোথায় শেষ, তা চোখে দেখা যায়। একটি বিশাল ছত্রাকের ক্ষেত্রে বিষয়টি এত সরল নয়। তার জীবন্ত অংশ মাটির নিচে বিচ্ছিন্ন খণ্ডের মতো দেখা যেতে পারে, আবার সেগুলো একই জিনগত ব্যক্তিসত্তার ধারাবাহিক অংশ হতে পারে। জীববিজ্ঞানে তাই ব্যক্তিসত্তা নির্ধারণে দৃশ্যমান সংযোগের পাশাপাশি জিনগত পরিচয়, উৎপত্তি ও বৃদ্ধির ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এখন প্রশ্ন হলো, একে কেন পৃথিবীর ‘সবচেয়ে ভারী’ জীব বলা হয়? এখানেই কিছু সতর্কতা জরুরি। এই ছত্রাককে মাটি থেকে তুলে কোনো বিশাল দাঁড়িপাল্লায় ওজন করা হয়নি। সেটি কার্যত অসম্ভব। বিজ্ঞানীরা এর বিস্তারের আয়তন, বিভিন্ন স্থানে ছত্রাকীয় টিস্যুর উপস্থিতি, সম্ভাব্য ঘনত্ব এবং মাটির নিচে ও কাঠের মধ্যে থাকা জীবন্ত অংশের পরিমাণের ভিত্তিতে মোট ভরের আনুমানিক হিসাব করেন। ব্যবহৃত অনুমান পরিবর্তিত হলে ফলও উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে নির্দিষ্ট একটি ওজনকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বলা ঠিক নয়।

এই কারণেই ‘পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জীব নিশ্চিতভাবেই এই ছত্রাক’ বলার চেয়ে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী পরিচিত একক জীবের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার’ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে বেশি যথার্থ। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঞ্চলের প্যান্ডো নামের বিশাল অ্যাসপেন গাছের উপনিবেশও একক জিনগত জীব হিসেবে পরিচিত এবং তার ভরও অত্যন্ত বিশাল। কোন জীবকে সবচেয়ে ভারী বলা হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে জীবের সীমানা কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে এবং ভর কী পদ্ধতিতে হিসাব করা হচ্ছে তার ওপর।

তবে আয়তনের বিচারে ওরেগনের আর্মিলারিয়ার অসাধারণত্ব নিয়ে সন্দেহ খুব কম। কারণ একটি একক জিনগত ছত্রাকীয় ব্যক্তিসত্তা প্রায় সাড়ে নয় বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হওয়া জীবজগতের এক অসাধারণ ঘটনা। এটি এমন এক জীব, যার সম্পূর্ণ দেহ একবারে দেখা সম্ভব নয়। এমনকি তার মাঝখানে দাঁড়িয়েও একজন মানুষ বুঝতে পারবেন না যে তিনি একটি জীবের বিস্তৃত অঞ্চলের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন।

আরও মজার বিষয় হলো, মাটির ওপর দেখা মাশরুমগুলো এই বিশাল জীবটির ক্ষুদ্র ও ক্ষণস্থায়ী অংশ মাত্র। অনুকূল আর্দ্রতা ও তাপমাত্রায় ছত্রাক প্রজননের জন্য মাশরুম তৈরি করতে পারে। মাশরুম থেকে অসংখ্য অণুবীজ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। উপযুক্ত স্থানে অণুবীজ অঙ্কুরিত হয়ে নতুন ছত্রাকীয় ব্যক্তিসত্তার জন্ম দিতে পারে। কিন্তু ওরেগনের বিখ্যাত বিশাল জীবটির বর্তমান বিস্তার মূলত দীর্ঘ সময় ধরে তার ভূগর্ভস্থ বৃদ্ধির ফল।

এর উপস্থিতি বনভূমির জন্য কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের বিষয় নয়। আর্মিলারিয়া গাছের গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে। আক্রান্ত অঞ্চলে গাছের বৃদ্ধি কমে যাওয়া, পাতার দুর্বলতা, শিকড়ের ক্ষয় এবং শেষ পর্যন্ত গাছের মৃত্যু ঘটতে পারে। একটি গাছ মারা যাওয়ার পর সেই স্থান বন ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যা তৈরি করতে পারে, কারণ ছত্রাকটি মৃত শিকড়ে দীর্ঘ সময় টিকে থেকে ভবিষ্যতে সেখানে জন্মানো নতুন গাছকেও আক্রান্ত করতে পারে।

তবে প্রকৃতিতে ছত্রাককে শুধু ‘বন ধ্বংসকারী শত্রু’ হিসেবে দেখাও ভুল। বনভূমির বাস্তুতন্ত্রে মৃত জৈব পদার্থ ভাঙার ক্ষেত্রে ছত্রাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৃত কাঠের জটিল উপাদান ভেঙে ছত্রাক পুষ্টি আবার মাটি ও বাস্তুতন্ত্রে ফিরিয়ে দেয়। ফলে বনাঞ্চলে পদার্থের পুনর্ব্যবহার ঘটে। আর্মিলারিয়ার মতো ছত্রাক একই সঙ্গে রোগসৃষ্টিকারী, পচনকারী এবং বনভূমির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের একটি প্রাকৃতিক চালিকাশক্তি হতে পারে।

বনের কোনো অংশে বড় গাছ মারা গেলে আলো নিচে পৌঁছানোর সুযোগ বাড়ে। সেখানে নতুন উদ্ভিদ জন্মাতে পারে, নতুন প্রাণীর আবাস তৈরি হতে পারে এবং বনের গঠন পরিবর্তিত হতে পারে। অর্থাৎ একটি বিশাল ছত্রাকের কার্যকলাপ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পুরো বনভূমির চেহারা ও প্রজাতিগত বিন্যাসে প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা যে বনকে স্থির একটি দৃশ্য হিসেবে দেখি, বাস্তবে সেটি জন্ম, প্রতিযোগিতা, রোগ, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের ক্রমাগত পরিবর্তনশীল ব্যবস্থা।

আর্মিলারিয়ার গল্পটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনে—পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীব মানেই সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান শরীর নয়। নীল তিমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী একক প্রাণী হিসেবে বিখ্যাত। দৈত্যাকার সিকোইয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বিশাল একক গাছের উদাহরণ। কিন্তু ছত্রাক সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে বিশাল হতে পারে। তাকে আকাশের দিকে শত মিটার উঁচু হতে হয় না কিংবা সমুদ্রে শত টনের দেহ নিয়ে সাঁতার কাটতে হয় না। সে মাটির নিচে নীরবে অনুভূমিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে—কয়েক মিটার নয়, কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত।

এই জীবটির অস্তিত্ব আমাদের দৈনন্দিন উপলব্ধির একটি সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে। মানুষ দৃশ্যমান জগতকে বেশি গুরুত্ব দেয়। একটি বিশাল প্রাণী আমাদের সহজেই বিস্মিত করে, কারণ তার আকার চোখে ধরা পড়ে। কিন্তু পৃথিবীর জীবমণ্ডলের বিরাট অংশ আমাদের চোখের আড়ালে কাজ করে। মাটির এক মুঠো অংশের মধ্যেও অসংখ্য অণুজীব ও ছত্রাকীয় সূত্র থাকতে পারে। একটি বনকে তাই শুধু গাছের সমষ্টি ভাবলে তার প্রকৃত জীববৈচিত্র্যের বড় অংশই বাদ পড়ে যায়।

ওরেগনের আর্মিলারিয়া সেই অদৃশ্য জগতের সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণগুলোর একটি। বনভূমিতে হাঁটতে থাকা একজন পর্যটক হয়তো তার সামনে একটি ছোট বাদামি মাশরুম দেখে পাশ কাটিয়ে যাবেন। তিনি হয়তো জানতেও পারবেন না যে তার পায়ের নিচের মাটি, আশপাশের গাছের শিকড় এবং বহু দূরের বনভূমি পর্যন্ত একই প্রাচীন ছত্রাকীয় জীবের অংশ ছড়িয়ে থাকতে পারে।

আর তাই পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জীবের অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত শুধু কোনো রেকর্ডের গল্প নয়। এটি জীবনের গঠন সম্পর্কে আমাদের ধারণার গল্প। একটি জীবকে আলাদা হতে হবে, চোখে দেখা যেতে হবে এবং তার স্পষ্ট শরীর থাকতে হবে—প্রকৃতি এমন কোনো নিয়ম মানতে বাধ্য নয়। আর্মিলারিয়া দেখিয়ে দেয়, একটি জীব একই সঙ্গে ক্ষুদ্র এবং বিশাল হতে পারে। তার দৃশ্যমান মাশরুম হাতের তালুতে ধরে রাখা সম্ভব, অথচ সেই মাশরুম যে জীবের অংশ, তার সম্পূর্ণ বিস্তার দেখতে হলে আকাশ থেকে একটি বিশাল বনভূমির দিকে তাকাতে হবে।

ওরেগনের পাহাড়ি বনের নিচে তাই এক ধরনের জীবন্ত দৈত্য নিঃশব্দে অবস্থান করছে। তার কোনো বিশাল মুখ নেই, নেই হাত-পা বা একক দৃশ্যমান দেহ। আছে অসংখ্য সূক্ষ্ম ছত্রাকসূত্র, গাছের শিকড়ের মধ্যে বিস্তার এবং হাজার বছরের ধীর বৃদ্ধি। আমাদের চোখে বনটির প্রধান চরিত্র হয়তো বিশাল গাছগুলো, কিন্তু মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা আর্মিলারিয়া মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির সবচেয়ে বিস্ময়কর জীবটি কখনো কখনো আমাদের সামনে নয়, ঠিক আমাদের পায়ের নিচেই থাকতে পারে।


আপনার পছন্দ হতে পারে