চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি
অধ্যায় ১ : মৃত্যুর পরে
বৃষ্টি হচ্ছিল ভোর থেকে।
ঢাকার উপকণ্ঠের সেই পুরোনো তিনতলা বাড়িটা বৃষ্টিতে আরও চুপচাপ হয়ে গেছে। ইটের গায়ে ভেজা দাগ, উঠোনে কাদা, আর সামনের জবা গাছটার পাতায় জলের ছোট ছোট ফোঁটা—সব মিলিয়ে বাড়িটাকে যেন অনেক দিনের অসুস্থ একজন মানুষের মতো লাগছিল, যে এখনো বিছানা ছাড়েনি।
আব্দুল কাদের সাহেবের মৃত্যুটা খুব বড় কোনো শব্দ করে আসেনি।
যেমনটা তিনি ছিলেন—নীরব, সংযত, নিজেরই কথা নিজে রেখে দেওয়া মানুষ।
সোহান গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
বৃষ্টি এখনো থামেনি। ছাতাটা ভাঁজ করে সে একপাশে রাখল, তারপর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। বারান্দার নিচে বাবার পুরোনো স্যান্ডেলজোড়া পড়ে আছে। জোড়াটা কেউ সরায়নি। সোহান একবার সেদিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর হাত বাড়িয়ে স্যান্ডেলটার একপাশে হালকা ছুঁয়ে আবার আগের জায়গায় রেখে দিল।
করিম চাচা বারান্দার ওদিক থেকে এগিয়ে এলেন।
বয়স হয়েছে তার, কিন্তু হাঁটার ভঙ্গিটা একই রকম। বাড়ির গায়ে গায়ে যেন তার শ্বাস লেগে থাকে।
“এসেছ বাবা,” তিনি বললেন।
সোহান মাথা নাড়ল। “চাচা, সবাই এসেছে?”
“মেহরিন আপা একটু আগে ঢুকেছে। অর্ণব ভাইও আসবে বলে ফোন করেছিল।”
সোহান কিছু বলল না।
করিম চাচা তাকিয়ে রইলেন তার মুখের দিকে। তারপর ধীরে বললেন, “আপনার আব্বা এই স্যান্ডেলজোড়া শেষ দিন পর্যন্ত ওইখানেই রাখতেন।”
সোহান আবার বারান্দার দিকে তাকাল।
কিছু জিনিস আছে, সরানো হয় না। কিছু জিনিস আছে, সরালেই বোঝা যায় কতদিন কেউ ফিরে আসেনি।
ভেতরে মেহরিন দাঁড়িয়ে ছিল।
সে মায়ের পুরোনো ঘড়িটা হাতে নিয়েছে। ঘড়িটা দেয়াল থেকে নামিয়ে টেবিলের ওপর রেখেছিল, তারপর কয়েকবার কাঁটা ঘুরিয়ে দেখেছে। কিন্তু ঘড়ি চলছে না। সে আবার দম দিয়ে কাচটা মুছল। কোনো লাভ হলো না।
সোহান ঢুকতেই মেহরিন বলল, “ঘড়িটা আবার নষ্ট।”
“নাকি বন্ধ করে রাখা,” সোহান বলল।
মেহরিনের মুখে একটুখানি হাসি এলো, কিন্তু তা টিকল না। সে ঘড়িটা টেবিলের ওপর রেখেই বলল, “এই বাড়ির সবকিছুই যেন বন্ধ করে রাখা।”
সোহান উত্তর দিল না।
দুই ভাইবোনের মাঝখানে কথাগুলো সহজ, কিন্তু থেমে থাকে অনেক কিছু।
অর্ণব এলো একটু পরে।
গাড়ি থেকে নামতে নামতে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে নিল। বৃষ্টি তখন একটু কমেছে, কিন্তু বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ রয়ে গেছে। অর্ণব ঢুকেই নাক কুঁচকে বলল, “এই বাড়ির গন্ধটা এখনও একই রকম।”
করিম চাচা ওদিকে দাঁড়িয়েই বললেন, “বাড়ির গন্ধ বদলায় না বাবা। মানুষ বদলায়।”
অর্ণব হেসে ফেলল। “তাহলে মানুষই খারাপ।”
করিম চাচা কিছু বললেন না।
মেহরিন অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল, “সব জায়গায় এসে একই রকম বোকা কথা বলিস?”
“না,” অর্ণব বলল। “আমি শুধু সত্যি কথা বলি, বেশি মনে হয় বলে।”
সোহান একপাশে দাঁড়িয়ে থাকল।
এই তিনজন একসঙ্গে থাকলেই ঘরে যেন আলাদা একটা চাপা বাতাস তৈরি হয়। কিছু কথার সঙ্গে অভিমান জড়িয়ে থাকে, কিছু কথার সঙ্গে পুরোনো অভ্যাস। কেউ কাউকে খুব কাছে টানে না, আবার দূরেও রাখতে পারে না।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো।
রান্নাঘরে ভাত বসেছে। বুয়া বারবার দরজার কাছে এসে জিজ্ঞেস করছে, “চা দেব?” কেউ স্পষ্ট করে বলছে না, কিন্তু কেউ না-ও বলছে না। বাড়ির জানালায় বৃষ্টির শব্দ ধীরে ধীরে পাতলা হলো। উঠোনের জবা গাছটা ভিজে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো ফুল নেই, তবু গাছটা যেন নিজের ভাষায় কিছু বলছে।
সোহান একসময় বারান্দায় বেরিয়ে এল।
সেখানে রাখা ছিল বাবার পুরোনো চেয়ারটা। কাঠের চেয়ার, হাতল একটু ক্ষয়ে গেছে। সে চেয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। বসল না। শুধু দেখল। তার মনে হলো, এই বাড়িতে এসে সবাই কিছু না কিছু দেখছে—কেউ ঘড়ি, কেউ স্যান্ডেল, কেউ পুরোনো চেয়ার। কিন্তু কেউ কিছু বলছে না।
পেছনে করিম চাচার পায়ের শব্দ শোনা গেল।
“আপনার আব্বা শেষ কয়দিন তৃতীয় তলায় একাই থাকতেন,” তিনি বললেন।
সোহান ফিরে তাকাল। “কখনো কাউকে ঢুকতে দিতেন না?”
করিম চাচা মাথা নাড়লেন। “না, বাবা। একদম না। শুধু মাঝে মাঝে আমাকে ডাকতেন। জবা গাছে পানি দিতে ভুলিস না—এইটাই বলতেন বেশি।”
সোহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “আর কিছু?”
করিম চাচা একটু ভাবলেন। “শেষ রাতে বলছিলেন, ‘উপরে আলোটা যেন নিভিয়ে রাখিস।’”
“উপরে?”
“তৃতীয় তলা।”
সোহান আর প্রশ্ন করল না।
বাড়ির ভেতর তখন ভাতের গন্ধ ছড়াচ্ছে, আর সেই গন্ধের ভেতরেও একটা অদ্ভুত শূন্যতা রয়ে গেছে। করিম চাচা চলে গেলেন। সোহান আবার চেয়ারের দিকে তাকাল। এই চেয়ারটায় বাবার শরীরের ছাপ আছে কি না, সে জানে না। কিন্তু আছে বলে মনে হয়।
রাত নামার পর খাবার টেবিলে তিনজন বসল।
খাওয়া খুব কম কথায় হলো।
মেহরিন একবার শুধু বলল, “মা থাকলে আজ…”
বাকিটা সে শেষ করল না।
অর্ণব ভাতের থালা নামিয়ে রেখে বলল, “মা থাকলে কী হতো, সেটা আমরা কেউ জানি না।”
সোহান মাথা নিচু করে খেল।
বাবার ছবি দেয়ালে ঝুলে আছে। সেই ছবির দিকে তাকাতে তার ইচ্ছে হলো না। মানুষ মরে গেলে ছবিটা থেকেই যায়; ছবিটা দেখে কোনো কথা শোনা যায় না।
খাওয়া শেষ হতে না হতেই আলো গেল।
হঠাৎ পুরো বাড়িটা অন্ধকার হয়ে গেল।
এক মুহূর্তের জন্য কারও মুখ দেখা গেল না। বাইরে বৃষ্টির শব্দ, ভিতরে নিস্তব্ধতা। বুয়া দৌড়ে একটা মোমবাতি খুঁজে আনল। করিম চাচা বকবক করতে করতে জেনারেটর দেখার জন্য উঠোনের দিকে গেলেন।
অর্ণব অন্ধকারেই বলল, “চমৎকার। বাবার বাড়িতে এসে আমরা এখন কুসংস্কারও মেনে নিতে পারি।”
মেহরিন গম্ভীরভাবে বলল, “চুপ কর।”
“কেন? অন্ধকারে বললে সত্যি কম শোনা যায় নাকি?”
সোহান মোমবাতির আলোতে টেবিলের পাশে বসে রইল।
টেবিলের এক কোণে একটা খাম ছিল। সে তখনই দেখল। সাদা কাগজের খাম, একেবারে সাদামাটা। যেন সেখানে কোনো জিনিস নেই, কিন্তু তার উপস্থিতিটাই বাড়িটাকে আরও নিঃশব্দ করে দিয়েছে।
করিম চাচা তখনই ফিরে এলেন।
হাতে একটা কলের গান নেই, শুধু বাড়ির বাইরের বাতাসের সোঁদা গন্ধ।
“স্যার আসবেন,” তিনি বললেন।
“কে?” অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
করিম চাচা উত্তর দিলেন, “আইনজীবী সাহেব।”
কেউ আর কিছু বলল না।
মোমবাতির শিখা একটু নড়ল। দেয়ালের ওপর বাবার ছবিটার ছায়া কেঁপে উঠল।
আইনজীবী এলেন কিছুক্ষণ পরে।
ভেজা ছাতা, সাদা শার্ট, হাতে একটি ফাইল। তিনি খুব বেশি কথা বলেন না—যাদের মুখে কাজের কথা থাকে, তাদের ভাষাও সোজা হয়। সবার দিকে একবার তাকিয়ে বললেন, “আপনারা তিনজনই আছেন?”
“আছি,” সোহান বলল।
আইনজীবী চেয়ারে বসলেন। ফাইল খুললেন। তারপর খুব সাধারণ গলায় বললেন, “আব্দুল কাদের সাহেব একটি নির্দেশ রেখে গেছেন। মৃত্যুর পরে আপনাদের তিনজনকে একসঙ্গে এই বাড়িতে উপস্থিত হতে হবে। তখন তৃতীয় তলার ঘরটি খোলা যাবে।”
সবাই চুপ করে রইল।
সোহান আইনজীবীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঘরে কী আছে?”
আইনজীবী বললেন, “আমি জানি না।”
“আপনি দেখেননি?” অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
“দেখিনি।”
সোজা উত্তর।
আইনজীবী টেবিলের ওপর একটা খাম রাখলেন।
খামটা বাবার নির্দেশের সঙ্গে এসেছে। সাদা খাম, এক কোণে পাতলা সিল। তিনজনই তাকিয়ে রইল। কেউ হাত বাড়াল না।
করিম চাচা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মোমবাতির আলোতে তার মুখটা একটু কঠিন দেখাচ্ছিল। বাইরে উঠোনের জবা গাছটা অন্ধকারে নীরব। বাড়ির পুরোনো চেয়ারটা বারান্দায়। ঘড়িটা এখনো চলছে না।
মেহরিন আস্তে বলল, “তাহলে এখন?”
আইনজীবী বললেন, “এখন আপনারা চাইলে খামটা রাখতে পারেন। কাল তৃতীয় তলার ঘর খুলবেন।”
কেউ উত্তর দিল না।
টেবিলের ওপর খামটা পড়ে ছিল। তিনজনই তাকিয়ে ছিল। কিন্তু কেউ হাত বাড়াল না।