বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মার্কারি ও অ্যাপোলো: বাণিজ্য, ভবিষ্যদ্বাণী, সংগীত ও চিকিৎসার দেবতা

সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি

মার্কারি ও অ্যাপোলো: বাণিজ্য, ভবিষ্যদ্বাণী, সংগীত ও চিকিৎসার দেবতা
বার্তা ও বিনিময় থেকে ভবিষ্যদ্বাণী, সংগীত ও নিরাময়ের দেবজগৎ।

প্লুটোর পাতালরাজ্যে আত্মার যাত্রা নিয়ে রোমান কল্পনা দেখিয়েছিল, মৃত্যুর পরও পথ, সীমান্ত এবং পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন থাকে। জীবিত পৃথিবীতে ফিরে এলে একই প্রশ্ন নতুন রূপ নেয়—কে বার্তা পৌঁছে দেয়, কে বাণিজ্যের চলাচল রক্ষা করে, আর কে অজানা ভবিষ্যতের সংকেত ব্যাখ্যা করে? এই জগতে সামনে আসেন মার্কারি ও অ্যাপোলো। একজন দূত, বণিকের সহায়ক এবং সীমান্ত অতিক্রমের পথপ্রদর্শক; অন্যজন ভবিষ্যদ্বাণী, সংগীত ও নিরাময়ের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের কাহিনিতে রোমানরা যোগাযোগ, জ্ঞান ও দক্ষতার শক্তিকে ভিন্ন কিন্তু সম্পর্কিত দৈবপরিচয়ে কল্পনা করেছিল।

মার্কারির রোমান পরিচয়ের কেন্দ্রে ছিল বাণিজ্য ও লাভজনক বিনিময়। তাঁর নামের সঙ্গে পণ্য ও বাণিজ্যসংক্রান্ত লাতিন শব্দের সম্পর্ক রয়েছে। বাজারে দরদাম, দূরদেশ থেকে পণ্য আনা এবং ব্যবসায়িক সুযোগ কাজে লাগানোর মধ্যে তাঁর অনুকূলতা চাওয়া হতো। গ্রিক হার্মিসের সঙ্গে সমীকরণের ফলে দূত, ভ্রমণকারী, চতুর কৌশলী এবং মৃতআত্মার পথপ্রদর্শকের বৈশিষ্ট্যও তাঁর পরিচয়ে যুক্ত হয়। মার্কারি শুধু অর্থলাভের দেবতা ছিলেন না; মানুষ, পণ্য ও বার্তার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছানোর দৈবপ্রতিনিধিও হয়ে ওঠেন।

রোমে তাঁর মন্দির প্রতিষ্ঠার প্রচলিত তারিখ খ্রিস্টপূর্ব ৪৯৫ সাল। আভেন্তাইন ও প্যালাটাইনের মধ্যবর্তী সার্কাস ম্যাক্সিমাসের কাছে এই উপাসনাকেন্দ্র ছিল। অবস্থানটি বাণিজ্য ও জনসমাগমের জগতের সঙ্গে মানানসই। ১৫ মে পালিত মার্কারির উৎসব, মার্কুরালিয়ায় বণিকদের শুদ্ধিকরণ ও অনুকূলতার প্রার্থনার উল্লেখ পাওয়া যায়। ওভিদের বর্ণনায় ব্যবসায়ীরা পবিত্র জল ব্যবহার করে নিজেদের ও পণ্য শুদ্ধ করত। কবি প্রার্থনার মধ্যে ব্যবসায়িক অসত্যের প্রসঙ্গ এনে রসিকতাও করেছেন; সেই সাহিত্যিক ব্যঙ্গকে সব বণিকের অভিন্ন আচরণের বিবরণ বলা যায় না।

মার্কারির পরিচিত অবয়বে থাকে অর্থথলি, ভ্রমণটুপি, ডানাযুক্ত স্যান্ডেল এবং দূতদণ্ড। দুই সাপ জড়ানো এই দণ্ডকে সাধারণভাবে ক্যাডুসিয়াস বলা হয়। এটি দূতের কর্তৃত্ব ও মধ্যস্থতার সঙ্গে যুক্ত। আধুনিক ব্যবহারে একে কখনো চিকিৎসার প্রতীক বানানো হলেও প্রাচীন পরিচয়ে সেটি মার্কারি বা হার্মিসের দণ্ড। চিকিৎসার দেবতা অ্যাসক্লেপিয়াসের দণ্ডে থাকে একটি সাপ। দুই প্রতীক দেখতে কাছাকাছি হলেও তাদের পৌরাণিক উৎস ও ভূমিকা আলাদা। মার্কারির ডানাযুক্ত সাজ তাঁর দ্রুতগতি এবং দূরত্ব অতিক্রমের ক্ষমতাকে দৃশ্যমান করে।

এনিয়েডে এই বার্তাবাহকের ভূমিকাই রোমের ভবিষ্যৎকে এগিয়ে দেয়। এনিয়াস কার্থেজে দিদোর সঙ্গে অবস্থান করতে থাকলে বৃহস্পতি মার্কারিকে পাঠান। দেবদূত তাঁকে ইতালির দায়িত্ব এবং ছেলে আসকানিয়ুসের ভবিষ্যৎ স্মরণ করিয়ে দেন। ব্যক্তিগত আশ্রয় ও সম্পর্কের মধ্যে থেমে থাকা বীরকে আবার যাত্রায় ফিরতে হয়। মার্কারি এখানে নিজের ইচ্ছায় গন্তব্য নির্ধারণ করেন না; উচ্চতর দৈবনির্দেশ পৌঁছে দেন। তাঁর বার্তা এনিয়াসের সিদ্ধান্ত বদলায়, কিন্তু দিদোর জীবনে করুণ পরিণতির সূচনাও ঘটায়। যোগাযোগের শক্তি তাই কাহিনিতে নিরপেক্ষ বা মূল্যহীন নয়।

মৃতআত্মার পথপ্রদর্শক হিসেবেও মার্কারির পরিচয় গ্রিক হার্মিসের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। তিনি আত্মাকে মৃতলোকের দিকে নিয়ে যেতে পারেন। এই ভূমিকা তাঁকে প্লুটোর বিকল্প বানায় না: একজন পথ দেখান, অন্যজন গন্তব্যের রাজ্য শাসন করেন। ক্যারনের নৌকা পারাপারের কাজও আলাদা। মার্কারির বিশেষ ক্ষমতা হলো বিভিন্ন জগতের সীমা পেরিয়ে চলাচল করা। জীবিতের বাজার, দেবতাদের সভা এবং মৃতদের পথ—এই বিচিত্র পরিসরে তাঁর উপস্থিতির মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে।

অ্যাপোলো রোমে প্রবেশ করেন আরও স্পষ্ট গ্রিক পরিচয় নিয়ে। অনেক গ্রিক দেবতার রোমান নাম বদলে গেলেও তাঁর নাম প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। রোমান ঐতিহ্যে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে মহামারির প্রেক্ষাপটে তাঁর মন্দিরের অঙ্গীকার ও প্রতিষ্ঠার কথা রয়েছে; খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১ সালে মন্দির উৎসর্গের প্রচলিত বিবরণ পাওয়া যায়। এখানে তাঁর নিরাময়কারী পরিচয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। রোমে অ্যাপোলোর প্রতিষ্ঠিত উপস্থিতি দেখায়, বিদেশি দেবতার উপাসনা নির্দিষ্ট নাগরিক সংকট মোকাবিলার প্রয়োজনে গ্রহণ করা যেতে পারত। পরে সংগীত ও ভবিষ্যদ্বাণীর পরিচয়ও আরও দৃশ্যমান হয়।

গ্রিক কাহিনি অনুসারে অ্যাপোলো জিউস ও লেটোর সন্তান এবং আর্টেমিসের যমজ ভাই। রোমান সমীকরণে জিউস জুপিটার, লেটো লাতোনা এবং আর্টেমিস ডায়ানা নামে পরিচিত হন। ধনুক, লিরা এবং লরেল তাঁর প্রধান প্রতীক। কিন্তু অ্যাপোলোকে সব যুগে সূর্যদেবতার একমাত্র পরিচয় বলা ঠিক নয়। গ্রিক হেলিওস এবং রোমান সোলের পৃথক উপাসনা ছিল; পরবর্তী সাহিত্য ও চিন্তায় তাঁদের সঙ্গে অ্যাপোলোর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। তাঁর উজ্জ্বলতা ও শৃঙ্খলার ধারণা সূর্যের প্রতীকের সঙ্গে মিললেও পরিচয়গুলো সম্পূর্ণ অভিন্ন ছিল না।

মার্কারি ও অ্যাপোলোর সবচেয়ে বিখ্যাত যৌথ কাহিনি আসে হার্মিসের শৈশবের গ্রিক গল্প থেকে। জন্মের অল্প পরেই হার্মিস অ্যাপোলোর গবাদিপশু চুরি করেন এবং পদচিহ্ন নিয়ে কৌশল করেন। পাশাপাশি কচ্ছপের খোলস দিয়ে লিরা তৈরি করেন। চুরি ধরা পড়লে বিরোধ সৃষ্টি হয়, কিন্তু সংগীতযন্ত্রের সৌন্দর্য শেষ পর্যন্ত সমঝোতার সুযোগ দেয়। হার্মিসের লিরা অ্যাপোলোর হাতে যায়। রোমান নাম ব্যবহার করে এই কাহিনি মার্কারি ও অ্যাপোলোর সম্পর্কেও বলা হয়। চতুরতা ও সংগীত এখানে সংঘর্ষ থেকে বিনিময়ের পথ তৈরি করে।

অ্যাপোলোর ভবিষ্যদ্বাণীর সবচেয়ে বিখ্যাত কেন্দ্র গ্রিসের ডেলফি। সেখানে পিথিয়া নামে পরিচিত পুরোহিত্রী দেবতার বাণী দিতেন। রোমানরাও গ্রিক ভবিষ্যদ্বাণীর ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত ছিল। এনিয়াসের যাত্রায় অ্যাপোলোর দেববাণী গুরুত্বপূর্ণ, আবার কুমাইয়ের সিবিল তাঁর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু দেববাণী শুনলেই তার অর্থ সহজে বোঝা যেত না। এনিয়াসের দল মাতৃভূমির নির্দেশ ভুল ব্যাখ্যা করে ক্রিটে যায়। ভবিষ্যতের সংকেত পাওয়া এবং যথাযথভাবে বোঝা দুটি আলাদা কাজ—পৌরাণিক অভিযানে এই পার্থক্য বারবার বিপদ তৈরি করে।

সংগীতের দেবতা হিসেবে অ্যাপোলো সুর, দক্ষতা এবং শিল্পের মর্যাদা প্রকাশ করেন। মিউজদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কবিতা ও সংগীতের বৃহত্তর জগৎকে সামনে আনে। কিন্তু প্রতিযোগিতার কাহিনিতে তাঁর কঠোরতাও দেখা যায়। মার্সিয়াসের সঙ্গে সংগীতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভয়াবহ শাস্তিতে শেষ হয়। এই গল্প দেবতার শিল্পক্ষমতার পাশাপাশি দৈবমর্যাদাকে চ্যালেঞ্জ করার বিপদ তুলে ধরে। অ্যাপোলোকে তাই নিছক কোমল সৌন্দর্যের দেবতা ভাবা অসম্পূর্ণ। শৃঙ্খলা রক্ষার তাঁর দাবি কখনো নির্মম রূপ নিতে পারে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রেও তাঁর পরিচয় দ্বিমুখী। অ্যাপোলো রোগ দূর করতে পারেন, আবার গ্রিক মহাকাব্যে তাঁর তীর মহামারি ডেকে আনে। রোগ ও নিরাময়ের ওপর একই দেবতার ক্ষমতা মানুষের অসহায়তার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে। তাঁর পুত্র অ্যাসক্লেপিয়াস, রোমান পরিচয়ে এসকুলাপিয়ুস, চিকিৎসার বিশেষ দেবতা হয়ে ওঠেন। রোমে এসকুলাপিয়ুসের পৃথক উপাসনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অ্যাপোলোর নিরাময়কারী মর্যাদা থাকলেও চিকিৎসার সমস্ত ধর্মীয় ভূমিকা তাঁর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অন্য দেবতা, বাস্তব চিকিৎসক এবং রোগীর পরিচর্যাও সেই জগতের অংশ।

অগাস্টাসের শাসনকালে অ্যাপোলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়ে। প্যালাটাইন পাহাড়ে তাঁর মন্দির খ্রিস্টপূর্ব ২৮ সালে উৎসর্গ করা হয়। অ্যাক্টিয়ামের বিজয় এবং নতুন শাসনের আত্মপরিচয়ে দেবতার অনুকূলতা বিশেষ স্থান পায়। সংগীত, ভবিষ্যদ্বাণী ও শৃঙ্খলার দেবতা সাম্রাজ্যিক স্থিতির প্রতীক হতে পারেন। কিন্তু এটি অ্যাপোলোর সম্পূর্ণ উপাসনার ইতিহাস নয়; পুরোনো দেবতার পরিচয় নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে পুনর্ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। মার্কারির বাণিজ্যিক চলাচল এবং অ্যাপোলোর সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব—দুই শক্তিই রোমের বিস্তৃত জীবনে কার্যকর ছিল।

মার্কারি ও অ্যাপোলোর কাহিনি দেখায়, রোমান দেবজগতে জ্ঞান শুধু ভবিষ্যৎ জানার বিষয় নয়; বার্তা পৌঁছানো, দরদাম করা, সুর সৃষ্টি এবং রোগের মোকাবিলাও তার অংশ। একজন সীমান্ত পার করেন, অন্যজন সংকেত ও সুরের মাধ্যমে অর্থ প্রকাশ করেন। তাঁদের পৌরাণিক সম্পর্কের মধ্যে চুরি থেকে সমঝোতা, নির্দেশ থেকে বিচ্ছেদ এবং নিরাময় থেকে বিপদের নানা অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেবতাদের ক্ষমতা মানুষের জীবনের একই জটিলতা বহন করে। বাজার ও উপাসনাকেন্দ্র পেরিয়ে সেই জীবন আবার গৃহে ফিরে আসে, যেখানে প্রতিদিনের আগুন, খাদ্য এবং পরিবারের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য অন্য দেবশক্তিদের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে ওঠে।