বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সালেমের ডাইনি বিচার: স্পেকট্রাল এভিডেন্স, বিশেষ আদালত ও ব্রিজেট বিশপের ফাঁসি

সিরিজ: সালেমের ডাইনি বিচার

সালেমের ডাইনি বিচার: স্পেকট্রাল এভিডেন্স, বিশেষ আদালত ও ব্রিজেট বিশপের ফাঁসি
সন্দেহজনক সাক্ষ্য থেকে সালেমের প্রথম ফাঁসি

টিটুবার স্বীকারোক্তির পর সালেম ভিলেজে আর শুধু প্রথম তিন অভিযুক্তকে নিয়ে আলোচনা চলছিল না। তিনি আরও অজ্ঞাত মানুষের জড়িত থাকার কথা বলেছিলেন। ফলে কারও অসুস্থতা, পুরোনো ঝগড়া কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ নতুন অভিযোগের সূত্র হয়ে উঠতে পারত। মার্চ থেকে বসন্তের শেষ ভাগ পর্যন্ত সন্দেহ সালেমের বাইরেও ছড়ায়; আটক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। শুরুতে স্থানীয় বিচারকেরা অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কারাগারে পাঠাচ্ছিলেন। কিন্তু কাউকে সন্দেহের ভিত্তিতে আটক রাখা আর অপরাধী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া এক বিষয় নয়। সেই দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছানোর জন্য আদালত প্রয়োজন ছিল।

এই বিচারপ্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ছিল এমন এক ধরনের সাক্ষ্য, যা সাধারণ প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ থেকে আলাদা। কোনো সাক্ষী বলতেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁর সামনে শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকলেও তাঁর মতো দেখতে একটি অদৃশ্য বা প্রেতরূপ এসে আঘাত করেছে। ইংরেজিতে একে বলা হতো স্পেকট্রাল এভিডেন্স। সালেমে বিশ্বাস করা হচ্ছিল, ডাইনি শয়তানের সাহায্যে নিজের রূপ দূরে পাঠিয়ে মানুষকে যন্ত্রণা দিতে পারে। কিন্তু সাক্ষী যাকে দেখেছেন বলে দাবি করছেন, সেটি অন্য কেউ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারতেন না। অভিযুক্তের শরীর অন্যত্র থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে আক্রমণের দাবি করা যাচ্ছিল।

সমস্যাটি শুধু অদ্ভুত বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি প্রমাণ যাচাইয়ের পথও সংকুচিত করেছিল। অভিযুক্ত বললে যে তিনি কখনো ঘটনাস্থলে যাননি, অভিযোগকারী উত্তর দিতে পারতেন—তাঁর শরীর নয়, তাঁর রূপ এসেছিল। সাক্ষীর যন্ত্রণা বাস্তব মনে হলেও তা নির্দিষ্ট অভিযুক্তের কাজ কি না, সেই প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা ছিল না। কেউ কষ্ট পাওয়ার সময় অভিযুক্ত নড়াচড়া করেছেন, এমন মিলও আদালতের দর্শকদের কাছে অর্থবহ হয়ে উঠত। এভাবে সন্দেহের ব্যাখ্যা বারবার সন্দেহকেই শক্তিশালী করছিল। প্রেতরূপ দেখার দাবিকে গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযুক্তের জন্য গভীর অসুবিধা তৈরি করে।

১৬৯২ সালের মে মাসে ম্যাসাচুসেটসে নতুন ঔপনিবেশিক সনদ ও গভর্নর উইলিয়াম ফিপস আসেন। তখন কারাগারে ডাইনিবিদ্যার অভিযোগে আটক মানুষের মামলা জমে ছিল। ২৭ মে ফিপস একটি বিশেষ আদালত গঠন করেন—কোর্ট অব ওয়ার অ্যান্ড টার্মিনার, যার নামের অর্থ অভিযোগ শুনে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আদালত। আদালতের প্রধান ছিলেন উইলিয়াম স্টটন। জুনের শুরুতে সালেমে এর কার্যক্রম শুরু হয়। বসন্তে স্থানীয় বিচারকদের সামনে যে বক্তব্য অভিযুক্তদের আটক রাখার ভিত্তি হয়েছিল, এখন তারই কিছু অংশ অপরাধ প্রমাণের আলোচনায় প্রবেশ করল।

এই আদালত বুঝতে হলে একটি পার্থক্য মনে রাখতে হয়। মার্চে টিটুবা, সারাহ গুড ও সারাহ অসবোর্নের জিজ্ঞাসাবাদকে সাধারণভাবে সালেমের ডাইনি বিচার বলা হলেও সেগুলো ছিল প্রাথমিক পরীক্ষা। জুনে বিশেষ আদালতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার ও রায় দেওয়া শুরু হয়। আদালত কেবল শিশুদের প্রেতরূপ দেখার দাবি শোনেনি; পুরোনো বিরোধ, অসুখের পর কারও সন্দেহ, অস্বাভাবিক জিনিস পাওয়ার দাবি—এমন নানা বক্তব্যও গ্রহণ করেছে। কিন্তু স্পেকট্রাল সাক্ষ্যকে গ্রহণযোগ্য মনে করা মামলাগুলোর ভিত্তিকে বিশেষভাবে দুর্বল ও বিপজ্জনক করে তুলেছিল।

বিশেষ আদালতের সামনে প্রথম যে অভিযুক্তের মামলা আনা হয়, তিনি ব্রিজেট বিশপ। তিনি প্রথম তিন অভিযুক্তের একজন ছিলেন না। সালেম টাউনের এই নারীকে ঘিরে আগে থেকেই নানা গুজব ও বিরূপ ধারণা ছিল; বহু বছর আগেও তাঁর বিরুদ্ধে ডাইনিবিদ্যার অভিযোগ উঠেছিল। তাঁর কথা বলার ধরন, পোশাক বা সামাজিক আচরণ নিয়ে পরবর্তী বর্ণনায় অতিরঞ্জন আছে, তাই তাঁকে কেবল ‘অন্যরকম নারী’ বলে মামলাটি ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, আগের সন্দেহগুলো ১৬৯২ সালের নতুন অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে একটি বড় গল্প তৈরি করেছিল।

ব্রিজেটের বিরুদ্ধে কিশোরী অভিযোগকারীরা বলেন, তাঁর রূপ তাঁদের যন্ত্রণা দিয়েছে। অন্য সাক্ষীরা বহু বছর আগের অসুস্থতা, অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা কিংবা ব্রিজেটের সঙ্গে বিবাদের পর ঘটে যাওয়া দুর্ভাগ্যের কথা তোলেন। একটি বাড়ির দেয়ালে সুঁচ ফোটানো কাপড়ের পুতুল পাওয়ার দাবিও মামলায় উঠে আসে; বাড়িটির সঙ্গে ব্রিজেটের পূর্ববর্তী বসবাসের সম্পর্ক ছিল। পুতুলগুলো কার তৈরি, কেন সেখানে ছিল, অথবা তাদের সঙ্গে ব্রিজেটের কোনো যোগ ছিল কি না—এসব স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবু আদালতে এমন বস্তু সন্দেহের পক্ষে শক্ত ইঙ্গিত হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছিল।

পুরোনো ঘটনার সাক্ষ্যও বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। কেউ বছর কয়েক আগে ঘুমের মধ্যে ব্রিজেটকে দেখেছেন বা তাঁর সঙ্গে ঝগড়ার পর পরিবারের সদস্য অসুস্থ হয়েছেন—এমন বর্ণনা আদালতে এসেছিল। কিন্তু একটি ঘটনার পরে আরেকটি ঘটলেই প্রথম ঘটনাটি দ্বিতীয়টির কারণ হয়ে যায় না। সালেমে সাক্ষীরা নিজেদের অভিজ্ঞতাকে যে অর্থ দিচ্ছিলেন, আদালত তা যাচাইয়ের কঠোর সীমা বজায় রাখতে পারেনি। অনেক বিচ্ছিন্ন স্মৃতি একত্র করা হলে সেগুলো শক্তিশালী গল্পের মতো শোনাতে পারে, অথচ গল্পটি অপরাধের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নাও হতে পারে।

২ জুন ব্রিজেট বিশপের বিচার শুরু হয়। তিনি নিজেকে নির্দোষ বলেন। আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং প্রেতরূপে আক্রমণের দাবি উপস্থাপিত হয়। বিচারকেরা ও জুরি এমন এক পরিবেশে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, যেখানে ইতিমধ্যে বহু মানুষ কারাগারে, আর গ্রামের একাংশ বিশ্বাস করছে যে শয়তানের সহযোগীদের বড় একটি দল সক্রিয়। ব্রিজেটের বিরুদ্ধে কোন সাক্ষ্যকে কতখানি গুরুত্ব দেওয়া হলো, তা আজ সম্পূর্ণ নিশ্চিতভাবে পুনর্গঠন করা কঠিন। তবে এটি স্পষ্ট যে আদালত তাঁর বিরুদ্ধে আনা অসাধারণ দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করেনি। সেদিনই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

রায়ের পর কয়েক দিন সময় গেলেও ব্রিজেটের জন্য সিদ্ধান্ত বদলায়নি। ৮ জুন তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরোয়ানা জারি হয়। ১০ জুন ১৬৯২ সালে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তিনি সেই বছরের সালেম ডাইনি বিচারে ফাঁসিতে নিহত প্রথম ব্যক্তি। এ বিষয়ে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হলো অভিযুক্তদের আগুনে পোড়ানো হয়েছিল; ব্রিজেটকে ফাঁসি দেওয়া হয়, পোড়ানো হয়নি। তাঁর মৃত্যু কেবল একজন নারীর বিরুদ্ধে অন্যায় রায়ের পরিণতি ছিল না। এটি দেখাল, বিশেষ আদালত সন্দেহজনক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বাস্তবেই কার্যকর করবে।

ব্রিজেটের ফাঁসি অন্য বন্দিদের জন্য ভয়াবহ বার্তা হয়ে আসে। এত দিন তাঁরা জানতেন, অভিযোগ তাঁদের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারে; এখন স্পষ্ট হলো, তা জীবনও কেড়ে নিতে পারে। আদালতের কাছেও প্রথম রায়টি একটি নজির তৈরি করল। পরের মামলায় একই ধরনের সাক্ষ্য ও পুরোনো সন্দেহ আবার হাজির করা সম্ভব ছিল। তবে সবাই আদালতের পদ্ধতি নিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন না। ব্রিজেটের মৃত্যুর পর উপনিবেশের কয়েকজন ধর্মযাজক স্পেকট্রাল সাক্ষ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করার বিষয়ে সতর্ক করেন। সেই সতর্কতা এল যখন প্রথম ফাঁসি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে।

সালেমের এই পর্যায়ে আতঙ্ক ও বিচার একে অন্যকে চালিত করছিল। অভিযোগ বাড়লে আদালতের সামনে আরও মামলা আসত; আদালত অভিযোগ গ্রহণ করলে নতুন অভিযোগকারীরা তাঁদের বক্তব্যের গুরুত্ব দেখতে পেতেন। ব্রিজেট বিশপের মামলায় প্রেতরূপের দাবি, বহু দিনের গুজব ও অনিশ্চিত বস্তুগত ইঙ্গিত একসঙ্গে একটি মৃত্যুদণ্ডের ভিত্তি হলো। কোনো সাক্ষী নিজের অভিজ্ঞতা আন্তরিকভাবে বলেছেন কি না, আর সেই অভিজ্ঞতা একজন অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণ করে কি না—এই দুই প্রশ্ন আলাদা রাখা যায়নি।

১০ জুনের পর সালেমের কারাগারগুলোতে অপেক্ষারত মানুষের সামনে কঠিন বাস্তবতা দাঁড়াল: ব্রিজেটের মতো তাঁদেরও বিশেষ আদালতে তোলা হতে পারে। ইতিমধ্যে অভিযোগ প্রথম দিকের সামাজিকভাবে দুর্বল নারীদের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়েছে। কারও পূর্বপরিচিত সুনামও তাঁকে নিশ্চিত সুরক্ষা দিচ্ছিল না। ব্রিজেট বিশপের ফাঁসি মৃত্যুর দুয়ার খুলেছিল; এরপর সেই দুয়ারের সামনে এসে দাঁড়াবেন সালেমের আরও বহু অভিযুক্ত।