বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বিল ক্লিনটনের অভিশংসন ১৯৯৮–১৯৯৯: যৌন কেলেঙ্কারি, মিথ্যা সাক্ষ্য ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঐতিহাসিক বিচার

বিল ক্লিনটনের অভিশংসন ১৯৯৮–১৯৯৯: যৌন কেলেঙ্কারি, মিথ্যা সাক্ষ্য ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঐতিহাসিক বিচার
বিল ক্লিনটনের অভিশংসন সংকট, ১৯৯৮–১৯৯৯

১৯৯৮ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি এমন এক কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হয়েছিল, যা প্রথমে একজন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান হিসেবে দেখা দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সাংবিধানিক সংকটে রূপ নেয়। প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সাবেক শিক্ষানবিশ মনিকা লিউইনস্কির সম্পর্ক, সেই সম্পর্ক অস্বীকার করে শপথের অধীনে দেওয়া বক্তব্য এবং সত্য গোপন করার সম্ভাব্য প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় এক বিস্ফোরক তদন্ত। শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ক্লিনটনকে অভিশংসিত করে এবং সিনেটে তাঁর বিচার অনুষ্ঠিত হয়। তবে রাজনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রেসিডেন্টের পদ হারাননি। ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিনেট তাঁকে উভয় অভিযোগ থেকেই খালাস দেয়। এই ঘটনা শুধু একটি যৌন কেলেঙ্কারির ইতিহাস নয়; এটি ব্যক্তিগত অসদাচরণ, শপথের অধীনে সত্য বলার আইনি বাধ্যবাধকতা, প্রেসিডেন্টের জবাবদিহি এবং অভিশংসনের সাংবিধানিক সীমা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিতর্ক।

কেলেঙ্কারিটির প্রকৃত শিকড় বুঝতে হলে মনিকা লিউইনস্কির ঘটনার আগের আরেকটি মামলার দিকে তাকাতে হয়। আরকানসাসের সাবেক সরকারি কর্মচারী পলা জোন্স অভিযোগ করেছিলেন, ১৯৯১ সালে ক্লিনটন যখন আরকানসাসের গভর্নর ছিলেন, তখন তিনি তাঁর প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আচরণ করেছিলেন। ক্লিনটন অভিযোগ অস্বীকার করেন। জোন্স পরে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করেন। এই মামলাটিই পরবর্তী সংকটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ জোন্সের আইনজীবীরা ক্লিনটনের অতীতের সম্ভাব্য অন্যান্য সম্পর্ক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি আচরণগত ধারা প্রতিষ্ঠা করা, যা জোন্সের অভিযোগকে শক্তিশালী করতে পারে।

এই অনুসন্ধানের মধ্যেই সামনে আসে মনিকা লিউইনস্কির নাম। লিউইনস্কি ১৯৯৫ সালে হোয়াইট হাউসে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন এবং পরে বেতনভুক্ত চাকরিতে যোগ দেন। তাঁর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তী তদন্তে ক্লিনটন স্বীকার করেন যে তাঁদের মধ্যে অনুপযুক্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সংকটের কেন্দ্রে শুধু সম্পর্কটি ছিল না। মূল আইনি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—ক্লিনটন কি এই সম্পর্ক সম্পর্কে শপথের অধীনে মিথ্যা বলেছিলেন এবং পরে সত্য প্রকাশ ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন?

ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেন লিন্ডা ট্রিপ, যিনি লিউইনস্কির সহকর্মী ও পরিচিত ছিলেন। লিউইনস্কি তাঁর কাছে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্কের বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন। ট্রিপ গোপনে তাঁদের কথোপকথন ধারণ করতে শুরু করেন। এসব কথোপকথনে শুধু সম্পর্কের বিবরণই ছিল না, পলা জোন্সের মামলায় লিউইনস্কিকে কীভাবে সাক্ষ্য দিতে হতে পারে এবং সম্পর্কের তথ্য কীভাবে গোপন রাখা যেতে পারে—সেসব বিষয়ও উঠে আসে। ট্রিপ পরে এই তথ্য স্বাধীন কৌঁসুলি কেনেথ স্টারের তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেন।

কেনেথ স্টার তখন ইতিমধ্যে ক্লিনটন প্রশাসন সম্পর্কিত বিভিন্ন অভিযোগ তদন্ত করছিলেন। তাঁর তদন্তের সূচনা হয়েছিল আরকানসাসের হোয়াইটওয়াটার নামে পরিচিত একটি ভূমি বিনিয়োগ বিতর্ককে কেন্দ্র করে। সময়ের সঙ্গে তদন্তের পরিধি আরও কয়েকটি বিষয়ে বিস্তৃত হয়। লিউইনস্কি সম্পর্কিত তথ্য সামনে আসার পর স্টারের তদন্ত সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তাঁকে এই বিষয়েও তদন্তের অনুমতি দেয়।

১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে সংবাদমাধ্যমে ক্লিনটন-লিউইনস্কি সম্পর্কের অভিযোগ প্রকাশিত হলে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটে। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন প্রকাশ্যে অভিযোগ অস্বীকার করেন। ২৬ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে স্ত্রী হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটনকে পাশে নিয়ে তিনি জোরালোভাবে বলেন যে লিউইনস্কির সঙ্গে তাঁর যৌন সম্পর্ক ছিল না। এই অস্বীকার পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে ওঠে, কারণ কয়েক মাস পর তাঁকে সম্পর্কের প্রকৃতি সম্পর্কে ভিন্ন বক্তব্য দিতে হয়।

তবে অভিশংসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সংবাদ সম্মেলনে বলা কথা নয়, বরং শপথের অধীনে দেওয়া বক্তব্য। পলা জোন্সের মামলায় ১৯৯৮ সালের ১৭ জানুয়ারি ক্লিনটনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। সেখানে লিউইনস্কির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। মামলায় ব্যবহৃত যৌন সম্পর্কের সংজ্ঞা ছিল অত্যন্ত নির্দিষ্ট এবং পরবর্তী বিতর্কে ক্লিনটনের আইনজীবীরা সেই সংজ্ঞার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেন। ক্লিনটনের দাবি ছিল, নির্ধারিত সংজ্ঞার ভিত্তিতে তাঁর দেওয়া উত্তর সরাসরি মিথ্যা ছিল না। বিরোধীরা যুক্তি দেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ভাষাগত কৌশল ব্যবহার করে সত্যকে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করেছিলেন।

এই পর্যায়ে তদন্তকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সরাসরি প্রমাণ। ক্লিনটন ও লিউইনস্কি দুজনেই সম্পর্কের বিষয়টি অস্বীকার করলে অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হতে পারত। কিন্তু লিউইনস্কির কাছে থাকা একটি গাঢ় নীল পোশাক তদন্তের গতিপথ আমূল বদলে দেয়। পোশাকটিতে প্রেসিডেন্টের জৈবিক নমুনা থাকার সম্ভাবনা দেখা দেয়। পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ক্লিনটনের কাছ থেকে নেওয়া নমুনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে নির্ধারিত হয়। ফলে সম্পর্কটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করার অবস্থান কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

১৯৯৮ সালের ১৭ আগস্ট ক্লিনটন একটি বৃহৎ বিচারকমণ্ডলীর সামনে সাক্ষ্য দেন। সেদিন সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি স্বীকার করেন যে লিউইনস্কির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল এবং সেটি অনুপযুক্ত ছিল। তিনি নিজের আচরণের দায় স্বীকার করলেও জোর দিয়ে বলেন যে তিনি আইনগত অর্থে মিথ্যা সাক্ষ্য দেননি। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ও অপরাধমূলক আচরণের মধ্যে পার্থক্য। কিন্তু বিরোধীরা মনে করতেন, প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগত লজ্জা এড়ানোর জন্য বিচারিক প্রক্রিয়ায় সত্য গোপন করেছেন এবং তাঁর পদমর্যাদা ব্যবহার করে তদন্তকে বিভ্রান্ত করেছেন।

কেনেথ স্টারের তদন্ত এরপর অভিশংসনের সম্ভাবনাকে সরাসরি সামনে নিয়ে আসে। ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি কংগ্রেসে একটি বিশদ প্রতিবেদন পাঠান। এতে অভিযোগ করা হয় যে ক্লিনটনের আচরণ অভিশংসনের ভিত্তি হতে পারে। প্রতিবেদনে মিথ্যা সাক্ষ্য, বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা, সম্ভাব্য সাক্ষীদের প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং তদন্তের প্রশ্নে বিভ্রান্তিকর বক্তব্যসহ একাধিক বিষয় তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনের অনেক ব্যক্তিগত বিবরণ প্রকাশ্যে চলে আসায় মার্কিন সমাজে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। কেউ এটিকে প্রেসিডেন্টের গুরুতর অসদাচরণের প্রমাণ হিসেবে দেখেন, আবার কেউ মনে করেন তদন্ত অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যক্তিগত ও যৌন বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করেছে।

মার্কিন সংবিধানে প্রেসিডেন্টকে রাষ্ট্রদ্রোহ, ঘুষ অথবা অন্যান্য গুরুতর অপরাধ ও অসদাচরণের জন্য অভিশংসনের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু “গুরুতর অপরাধ ও অসদাচরণ” বলতে ঠিক কী বোঝায়, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। প্রতিটি অপরাধমূলক কাজ যে অভিশংসনযোগ্য হবে এমন নয়; আবার এমন রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহারও অভিশংসনের ভিত্তি হতে পারে, যা সাধারণ ফৌজদারি আইনে সহজে সংজ্ঞায়িত নয়। ক্লিনটনের ঘটনায় তাই প্রশ্ন ছিল দ্বিমুখী—তিনি আইন ভেঙেছেন কি না এবং ভেঙে থাকলেও সেই আচরণ তাঁকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরানোর মতো সাংবিধানিক গুরুতরতা বহন করে কি না।

প্রতিনিধি পরিষদের বিচারবিষয়ক কমিটি স্টারের প্রতিবেদন ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে অভিশংসনের ধারাগুলো বিবেচনা করতে শুরু করে। রিপাবলিকান সদস্যদের বড় অংশ মনে করতেন, প্রেসিডেন্ট যদি শপথের অধীনে মিথ্যা বলেন এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেন, তবে তাঁর পদ যাই হোক না কেন তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ডেমোক্র্যাটরা পাল্টা যুক্তি দেন যে ক্লিনটনের আচরণ নৈতিকভাবে নিন্দনীয় হতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্ক গোপন করতে দেওয়া বিভ্রান্তিকর বক্তব্যকে রাষ্ট্রক্ষমতার এমন অপব্যবহার হিসেবে দেখা যায় না, যার জন্য একটি নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে।

১৯৯৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলও এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে আসন হারায়। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে আসন বাড়াতে সক্ষম হয়। অনেক বিশ্লেষকের কাছে এটি ইঙ্গিত দেয় যে ভোটারদের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্লিনটনের আচরণে অসন্তুষ্ট হলেও তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করছিল না। তবু রিপাবলিকান নেতৃত্ব অভিশংসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যায়।

১৯৯৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রতিনিধি পরিষদে ক্লিনটনের বিরুদ্ধে অভিশংসনের ধারাগুলো নিয়ে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। চারটি প্রস্তাবের মধ্যে দুটি অনুমোদিত হয়। প্রথমটি ছিল বৃহৎ বিচারকমণ্ডলীর সামনে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অভিযোগ এবং দ্বিতীয়টি ছিল বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ। পলা জোন্স মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য সম্পর্কিত আরেকটি ধারা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার সম্পর্কিত একটি ধারা পর্যাপ্ত ভোট পায়নি। এর ফলে বিল ক্লিনটন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রতিনিধি পরিষদ কর্তৃক অভিশংসিত দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট হন। তাঁর আগে ১৮৬৮ সালে অ্যান্ড্রু জনসন অভিশংসিত হয়েছিলেন।

এখানে “অভিশংসন” ও “পদচ্যুতি”র পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হওয়ার অর্থ প্রেসিডেন্ট সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতা হারান না। প্রতিনিধি পরিষদ মূলত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনে। এরপর সিনেটে বিচার হয় এবং প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে সরাতে উপস্থিত সিনেটরদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। ফলে ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে ক্লিনটন অভিশংসিত হলেও তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবেই দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।

১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে সিনেটে ক্লিনটনের বিচার শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি উইলিয়াম রেনকুইস্ট বিচার পরিচালনায় সভাপতিত্ব করেন। প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা অভিযোগপক্ষের ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেন এবং ক্লিনটনের আইনজীবীরা তাঁর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। বিচারটি ছিল একই সঙ্গে আইনগত, সাংবিধানিক ও গভীরভাবে রাজনৈতিক। মূল প্রশ্ন শুধু ক্লিনটন সত্য গোপন করেছিলেন কি না ছিল না; তাঁর আচরণ একটি জাতীয় নির্বাচনের ফল বাতিল করে তাঁকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরানোর মতো গুরুতর কি না, সেটিই ছিল সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু।

অভিযোগপক্ষ যুক্তি দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আইনের ঊর্ধ্বে নন। একজন সাধারণ নাগরিক যদি শপথের অধীনে মিথ্যা বলেন বা বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। প্রেসিডেন্ট একই কাজ করলে শুধু তাঁর রাজনৈতিক পদমর্যাদার কারণে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী। তাঁদের মতে, ক্লিনটনের আচরণ ছিল ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি ঢাকার চেয়ে বেশি কিছু; তিনি বিচারব্যবস্থার সত্য অনুসন্ধানের ক্ষমতাকে দুর্বল করেছিলেন।

ক্লিনটনের প্রতিরক্ষা দল ভিন্ন যুক্তি দেয়। তাদের বক্তব্য ছিল, প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত আচরণ নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও সংবিধানের অভিশংসন ব্যবস্থা মূলত রাষ্ট্রক্ষমতার গুরুতর অপব্যবহার থেকে প্রজাতন্ত্রকে রক্ষার জন্য তৈরি। ক্লিনটন কোনো নির্বাচনী ফল জাল করেননি, ঘুষ নেননি, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিক্রি করেননি বা প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে স্বৈরাচারী সুবিধা অর্জন করেননি। তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানো হলে অভিশংসন ভবিষ্যতে দলীয় রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হতে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রতিরক্ষা পক্ষ তুলে ধরে।

১৯৯৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সিনেটে চূড়ান্ত ভোট হয়। মিথ্যা সাক্ষ্যের অভিযোগে ক্লিনটনকে দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে ৪৫ এবং খালাসের পক্ষে ৫৫ ভোট পড়ে। বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার অভিযোগে ফল হয় ৫০–৫০। কোনো অভিযোগেই প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পাওয়া যায়নি। ফলে ক্লিনটন উভয় অভিযোগ থেকে খালাস পান এবং প্রেসিডেন্টের পদে বহাল থাকেন।

ঘটনাটির একটি বিস্ময়কর রাজনৈতিক দিক ছিল ক্লিনটনের জনসমর্থন। কেলেঙ্কারির বিস্তারিত প্রকাশ এবং অভিশংসনের পরও তাঁর কাজের প্রতি জনসমর্থন তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল। এর একটি কারণ ছিল নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অর্থনীতি, কম বেকারত্ব, বাজেট পরিস্থিতির উন্নতি এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তুলনামূলক স্থিতিশীলতার ধারণা। অনেক ভোটার ক্লিনটনের ব্যক্তিগত চরিত্র ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর কর্মদক্ষতাকে আলাদাভাবে বিচার করেছিলেন। তাঁরা তাঁর আচরণকে অনৈতিক মনে করলেও পদচ্যুতির পক্ষে ছিলেন না।

হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটনের ভূমিকাও এই সংকটে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেলেঙ্কারির প্রথম দিকে তিনি স্বামীর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন এবং অভিযোগগুলোর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। পরে সম্পর্কের সত্যতা প্রকাশ পাওয়ায় ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তবু তিনি প্রকাশ্যে বিবাহ ও রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব বজায় রাখেন। এই সময়ে তাঁর দৃশ্যমানতা পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়ে মার্কিন সিনেটে প্রবেশ করেন।

মনিকা লিউইনস্কির ক্ষেত্রে ঘটনাটির মানবিক মূল্য ছিল অত্যন্ত কঠিন। তিনি তখন অল্পবয়সী একজন নারী ছিলেন, অথচ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তিদের একজনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক আন্তর্জাতিক সংবাদে পরিণত হয়। সংবাদমাধ্যম, রসিকতা, রাজনৈতিক প্রচারণা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে তাঁকে ব্যাপকভাবে অপমান ও উপহাসের মুখোমুখি হতে হয়। পরবর্তী দশকগুলোতে এই ঘটনাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, কর্মক্ষেত্রে সম্পর্ক, নারীদের প্রতি সংবাদমাধ্যমের আচরণ এবং জনসমক্ষে অপমানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আলোচনায় লিউইনস্কির অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

ক্লিনটনের জন্য সিনেটে খালাস পাওয়া মানে সব আইনি সমস্যা শেষ হয়ে যাওয়া ছিল না। পলা জোন্সের দেওয়ানি মামলা শেষ পর্যন্ত সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয় এবং ক্লিনটন অর্থ প্রদান করতে সম্মত হন, যদিও তিনি জোন্সের অভিযোগ স্বীকার করেননি। পরে তাঁর সাক্ষ্যসংক্রান্ত আচরণ নিয়েও আইনি পরিণতি আসে। প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার আগে তিনি আরকানসাসে আইন পেশার অনুমতি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত রাখতে সম্মত হন এবং আর্থিক জরিমানাও মেনে নেন। ফলে সিনেটে খালাস পেলেও তাঁর বক্তব্যের আইনি ও পেশাগত পরিণতি একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি।

এই কেলেঙ্কারি মার্কিন সংবাদমাধ্যমকেও পরিবর্তিত করেছিল। চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদচক্র, দ্রুত বিকাশমান অন্তর্জালভিত্তিক সংবাদ এবং রাজনৈতিক মন্তব্যের নতুন সংস্কৃতি একই সঙ্গে এই ঘটনায় ভূমিকা রাখে। ব্যক্তিগত গুজব, তদন্তের ফাঁস হওয়া তথ্য এবং আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংবাদ প্রায় একই গতিতে জনগণের সামনে পৌঁছাতে থাকে। ফলে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত জীবন ও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এক ধরনের অবিরাম গণমাধ্যমীয় নাটকে পরিণত হয়। পরবর্তী মার্কিন রাজনৈতিক কেলেঙ্কারিগুলোতে যে দ্রুত সংবাদপ্রবাহ ও তীব্র দলীয় ব্যাখ্যা দেখা যায়, ক্লিনটন সংকট ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরি।

অভিশংসন প্রক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রের দলীয় বিভাজনকেও আরও স্পষ্ট করে তোলে। রিপাবলিকানদের কাছে বিষয়টি ছিল আইনের শাসন ও প্রেসিডেন্টের সততার প্রশ্ন। ডেমোক্র্যাটদের বড় অংশের কাছে এটি ছিল ব্যক্তিগত অসদাচরণকে ব্যবহার করে রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে দুর্বল করার অতিরিক্ত প্রচেষ্টা। এই দুই ব্যাখ্যা এতটাই বিপরীত ছিল যে একই প্রমাণ দেখে দুই পক্ষ সম্পূর্ণ ভিন্ন সাংবিধানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। পরবর্তী দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীর হওয়ার প্রেক্ষাপটে ক্লিনটনের অভিশংসনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখা হয়।

ঘটনাটি প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত নৈতিকতা এবং সরকারি দায়িত্বের সম্পর্ক নিয়েও জটিল প্রশ্ন রেখে গেছে। একজন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত অসততা কখন সাংবিধানিক অপরাধে পরিণত হয়? শপথের অধীনে মিথ্যা বলা যদি ব্যক্তিগত বিষয় সম্পর্কেও হয়, তবে সেটি কি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্মকর্তার পদে থাকার যোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত? আবার নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে পদচ্যুত করার ক্ষমতা যদি ব্যক্তিগত অসদাচরণের ক্ষেত্রেও সহজে ব্যবহার করা হয়, তাহলে কি অভিশংসন দলীয় প্রতিশোধের অস্ত্রে পরিণত হতে পারে? ক্লিনটন সংকটের সময় এসব প্রশ্নের কোনো সর্বসম্মত উত্তর তৈরি হয়নি।

বিল ক্লিনটন ২০০১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ সম্পন্ন করেন। অর্থাৎ প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি নির্বাচিত মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে তাই দুটি বিপরীত বাস্তবতা স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়। একদিকে তাঁর শাসনামল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাজেট উদ্বৃত্ত, অভ্যন্তরীণ নীতির পরিবর্তন ও শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ সময়; অন্যদিকে তাঁর নামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে যায় মনিকা লিউইনস্কি কেলেঙ্কারি এবং অভিশংসন।

১৯৯৮–১৯৯৯ সালের এই সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এটাই যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত আচরণও কখনো কখনো সাংবিধানিক প্রশ্নে পরিণত হতে পারে, বিশেষত যখন সেটি আদালত, শপথ, সাক্ষ্য এবং বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ক্লিনটন-লিউইনস্কি সম্পর্ক নিজে মার্কিন সরকারকে সাংবিধানিক সংকটে ফেলেনি; সংকট তৈরি হয়েছিল সম্পর্কটি গোপন করার প্রক্রিয়া এবং সেই প্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট আইন লঙ্ঘন করেছিলেন কি না—এই প্রশ্ন থেকে। এখানেই একটি ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষায় পরিণত হয়।

বিল ক্লিনটনের অভিশংসনের ইতিহাস তাই শুধু একজন প্রেসিডেন্ট, একজন তরুণী এবং একটি বহুল আলোচিত সম্পর্কের গল্প নয়। এটি দেখায় কীভাবে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত আদালতের সাক্ষ্যে প্রবেশ করতে পারে, আদালতের প্রশ্ন কংগ্রেসের তদন্তে রূপ নিতে পারে এবং সেই তদন্ত শেষ পর্যন্ত একটি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নির্ধারণের সাংবিধানিক বিচারে পৌঁছাতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদ ক্লিনটনকে অভিশংসিত করেছিল, কিন্তু সিনেট তাঁকে পদচ্যুত করেনি। এই দুই সিদ্ধান্তের মধ্যকার ব্যবধানেই ঘটনাটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিহিত—আইন ভঙ্গের অভিযোগ, নৈতিক ব্যর্থতা এবং একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সাংবিধানিক মানদণ্ড সব সময় একই বিষয় নয়। সেই বিতর্কই বিল ক্লিনটনের ১৯৯৮–১৯৯৯ সালের অভিশংসনকে মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত প্রেসিডেন্টীয় কেলেঙ্কারিগুলোর একটি করে রেখেছে।


আপনার পছন্দ হতে পারে