বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আত্তিলা দ্য হান ও কাতালাউনিয়ান সমভূমির যুদ্ধ: ৪৫১ সালে কীভাবে বড় বিপদ ঠেকিয়েছিল পশ্চিম রোম?

Series: পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন: ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে এক সাম্রাজ্যের অবসান

  • Author: Admin
  • September 07, 2026
আত্তিলা দ্য হান ও কাতালাউনিয়ান সমভূমির যুদ্ধ: ৪৫১ সালে কীভাবে বড় বিপদ ঠেকিয়েছিল পশ্চিম রোম?
৪৫১ সালে আত্তিলার বিরুদ্ধে রোমের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ

পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য যখন একের পর এক প্রদেশ, রাজস্ব ও সামরিক সক্ষমতা হারাচ্ছিল, তখন ইউরোপে এমন এক শক্তির উত্থান ঘটে যার নাম পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে আতঙ্কের প্রতীকে পরিণত হয়—আত্তিলা দ্য হান। তাঁর নেতৃত্বে হুনদের সাম্রাজ্য মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। ৪৫১ খ্রিষ্টাব্দে আত্তিলা বিশাল বাহিনী নিয়ে গলে প্রবেশ করলে পশ্চিম রোমের সামনে এমন একটি সংকট দেখা দেয়, যা সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট কর্তৃত্বকেও বিপন্ন করতে পারত। কিন্তু রোমের সবচেয়ে দক্ষ সেনাপতিদের একজন ফ্লাভিয়াস অ্যাতিয়ুস এমন এক জোট গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে রোমের পুরোনো শত্রু ভিসিগথরাই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। এই জোটের সঙ্গে আত্তিলার সংঘর্ষই ইতিহাসে পরিচিত কাতালাউনিয়ান সমভূমির যুদ্ধ নামে।

হুনরা আত্তিলার সময়ে হঠাৎ করে ইউরোপে আবির্ভূত হয়নি। চতুর্থ শতাব্দীর শেষদিকে তাদের পশ্চিমমুখী সম্প্রসারণ ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। হুনদের চাপেই গথদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর একটি অংশ ৩৭৬ সালে দানিয়ুবের দিকে সরে এসে রোমান সাম্রাজ্যে আশ্রয় চেয়েছিল, যার পরিণতিতে ৩৭৮ সালের অ্যাড্রিয়ানোপলের যুদ্ধ ঘটে। পরবর্তী কয়েক দশকে হুনরা দানিয়ুবের উত্তরে ও মধ্য ইউরোপে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে নিজেদের অধীন বা মিত্রে পরিণত করে একটি বিশাল সামরিক জোট গড়ে তোলে।

আত্তিলা ও তাঁর ভাই ব্লেদা ৪৩৪ সালের দিকে যৌথভাবে হুনদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। পরে ব্লেদার মৃত্যুর পর আত্তিলা একক শাসকে পরিণত হন। তাঁর শক্তির ভিত্তি শুধু হুন যোদ্ধাদের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না। অস্ট্রোগথ, গেপিড এবং অন্যান্য অধীন বা সহযোগী জনগোষ্ঠীও তাঁর সামরিক ব্যবস্থার অংশ ছিল। ফলে ‘হুন বাহিনী’ বলতে একটি একক জাতিগত সেনাবাহিনী বোঝা ভুল; এটি ছিল আত্তিলার রাজনৈতিক কর্তৃত্বে সংগঠিত একটি বৃহৎ বহুজাতিক সামরিক শক্তি।

প্রথমদিকে আত্তিলার প্রধান লক্ষ্য ছিল পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য। তিনি বলকান অঞ্চলে একাধিক অভিযান পরিচালনা করেন এবং কনস্টান্টিনোপলের সরকারকে বিপুল অর্থ প্রদানে বাধ্য করেন। পূর্ব রোমের শক্তিশালী প্রাচীরের কারণে কনস্টান্টিনোপল দখল করা সহজ ছিল না, কিন্তু হুনরা সাম্রাজ্যের বলকান প্রদেশগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম হয়। আত্তিলার সামরিক শক্তির অন্যতম বড় অস্ত্র ছিল শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয় নয়, সেই বিজয়ের ভয়কে ব্যবহার করে অর্থ ও রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করা।

পশ্চিম রোমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুরুতে এত সরল শত্রুতাপূর্ণ ছিল না। পশ্চিমের শক্তিশালী সেনাপতি ফ্লাভিয়াস অ্যাতিয়ুস তাঁর কর্মজীবনের একটি পর্যায়ে হুনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং রোমের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়েও হুন যোদ্ধাদের সহায়তা ব্যবহার করেছিলেন। পঞ্চম শতাব্দীর রোমান রাজনীতিতে এমন সম্পর্ক অস্বাভাবিক ছিল না। আজ যে শক্তি মিত্র, আগামীকাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে সেই শক্তিই শত্রু হয়ে উঠতে পারত।

অ্যাতিয়ুস নিজেও পশ্চিম রোমের পরিবর্তিত সামরিক বাস্তবতার প্রতীক ছিলেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে গলে রোমান কর্তৃত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করেন এবং ভিসিগথ, ফ্রাঙ্ক, বার্গান্ডিয়ানসহ বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখেন। তাঁর লক্ষ্য সব গোষ্ঠীকে ধ্বংস করা নয়; বরং তাদের একে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে পশ্চিম রোমের অবশিষ্ট কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখা। কারণ পশ্চিমা সরকারের কাছে আর আগের শতাব্দীর মতো সীমাহীন সৈন্য ও অর্থ ছিল না।

৪৫০ সালের দিকে পশ্চিম রোম ও আত্তিলার সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সম্রাট তৃতীয় ভ্যালেন্টিনিয়ানের বোন হনোরিয়া। তাঁকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি বিয়েতে বাধ্য করার পরিকল্পনা করা হলে তিনি আত্তিলার কাছে সাহায্য চেয়ে বার্তা ও একটি আংটি পাঠিয়েছিলেন বলে প্রাচীন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। আত্তিলা ঘটনাটিকে বিয়ের প্রস্তাব হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং হনোরিয়াকে নিজের স্ত্রী হিসেবে দাবি করেন।

এর সঙ্গে তিনি দাবি করেন পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের একটি বড় অংশকে যৌতুক হিসেবে দিতে হবে। এই দাবি কতটা বাস্তব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং কতটা যুদ্ধের অজুহাত ছিল তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। একই সময়ে গলের ফ্রাঙ্কদের উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিরোধ এবং ভিসিগথদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কও আত্তিলার সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে। যাই হোক, ৪৫১ সালে তিনি পশ্চিমের বিরুদ্ধে বিশাল অভিযান শুরু করেন।

আত্তিলার বাহিনী রাইন অতিক্রম করে গলে প্রবেশ করে। তাঁর সঙ্গে শুধু হুন নয়, অস্ট্রোগথ, গেপিড এবং অন্যান্য অধীন জনগোষ্ঠীর যোদ্ধারাও ছিল। গলের বিভিন্ন নগর ও অঞ্চলে আক্রমণ হয়। মেত্‌জসহ কয়েকটি শহর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আত্তিলার অগ্রযাত্রা শেষ পর্যন্ত অরেলিয়ানুম—বর্তমান অর্লেয়াঁ—অঞ্চলের দিকে পৌঁছে যায়।

অ্যাতিয়ুস বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর নিজস্ব রোমান বাহিনী দিয়ে এই বিশাল জোটকে মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন। পশ্চিম রোমের সামরিক ও আর্থিক অবস্থা তখন আগের তুলনায় অনেক দুর্বল। উত্তর আফ্রিকা ইতিমধ্যে গাইজেরিকের ভ্যান্ডালদের হাতে চলে গেছে, ব্রিটেন হারিয়ে গেছে এবং গলেরও বিভিন্ন অঞ্চল কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই তিনি এমন একটি পদক্ষেপ নেন যা আগের যুগের রোমানদের কাছে হয়তো অকল্পনীয় মনে হতো—রোমকে বাঁচাতে রোমের সাবেক শত্রুদের নিয়ে একটি জোট গঠন করেন।

এই জোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ভিসিগথরা। তাদের রাজা প্রথম থিওডোরিক দক্ষিণ-পশ্চিম গলে শক্তিশালী রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। মাত্র চার দশক আগে আলারিকের গথরা রোম নগরী লুণ্ঠন করেছিল। এখন সেই গথিক শক্তিরই আরেক অংশ আত্তিলার বিরুদ্ধে রোমের পাশে দাঁড়াচ্ছে। কারণ আত্তিলার বিজয় ভিসিগথদের স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থানের জন্যও বিপজ্জনক হতে পারত।

রোমান-ভিসিগথ জোটে আরও বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠী যুক্ত হয়। ফলে কাতালাউনিয়ান সমভূমির যুদ্ধকে ‘রোমান বনাম হুন’ হিসেবে দেখা বিভ্রান্তিকর। যুদ্ধের দুই পক্ষই ছিল বহুজাতিক জোট। একদিকে অ্যাতিয়ুসের নেতৃত্বাধীন রোমান, ভিসিগথ ও অন্যান্য মিত্র; অন্যদিকে আত্তিলার নেতৃত্বাধীন হুন, অস্ট্রোগথ, গেপিড ও অন্যান্য গোষ্ঠী। পঞ্চম শতাব্দীর পশ্চিম ইউরোপের বাস্তবতা তখন এতটাই পরিবর্তিত হয়েছিল যে ‘রোমান’ ও ‘বর্বর’ পরিচয়ের সরল বিভাজন যুদ্ধক্ষেত্রেও আর কার্যকর ছিল না।

৪৫১ সালের জুন মাসে দুই বাহিনী গলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মুখোমুখি হয়। যুদ্ধটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সাধারণভাবে একে কাতালাউনিয়ান সমভূমির যুদ্ধ অথবা Battle of the Catalaunian Plains বলা হয়; আবার Battle of the Campus Mauriacus বা শালোঁর যুদ্ধ নামেও পরিচিত। সম্ভবত বর্তমান ফ্রান্সের শ্যাম্পেন অঞ্চলের কোথাও এই সংঘর্ষ ঘটেছিল।

যুদ্ধের আগে উভয় পক্ষই সুবিধাজনক উঁচু ভূমি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। প্রাচীন বর্ণনা অনুযায়ী অ্যাতিয়ুস তাঁর বাহিনীর বিন্যাস এমনভাবে করেছিলেন যাতে ভিসিগথরা গুরুত্বপূর্ণ অংশে অবস্থান করে। আত্তিলার কেন্দ্রে ছিল হুন বাহিনী এবং তাঁর দুই পাশে বিভিন্ন মিত্র গোষ্ঠী। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল অস্ট্রোগথ ও ভিসিগথদের মুখোমুখি সংঘর্ষ—গথিক বিশ্বের দুই রাজনৈতিক শাখা বিপরীত জোটে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছিল।

যুদ্ধ অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী হয়। ভিসিগথিক রাজা প্রথম থিওডোরিক যুদ্ধের মধ্যেই নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি নিশ্চিত নয়। একটি বর্ণনায় বলা হয় তিনি ঘোড়া থেকে পড়ে নিজের সৈন্যদের পদতলে চাপা পড়েছিলেন; অন্য বর্ণনায় শত্রুর অস্ত্রে নিহত হন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু ভিসিগথদের যুদ্ধ থেকে সরিয়ে দেয়নি। বরং তাঁর ছেলে থোরিসমুন্ড নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

অ্যাতিয়ুসের জোট গুরুত্বপূর্ণ উচ্চভূমি ধরে রাখতে সক্ষম হয় এবং আত্তিলার বাহিনী শেষ পর্যন্ত নিজেদের ওয়াগনবেষ্টিত শিবিরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। প্রাচীন সূত্রে বলা হয়েছে, আত্তিলা পরাজয় অনিবার্য হলে নিজের জন্য একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ড প্রস্তুত করেছিলেন, যেন বন্দী হওয়ার বদলে আগুনে মৃত্যুবরণ করতে পারেন। ঘটনাটি কতটা ঐতিহাসিক আর কতটা নাটকীয় সাহিত্যিক বর্ণনা, তা নিশ্চিত নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আত্তিলা যুদ্ধক্ষেত্রে পশ্চিমা জোটকে ধ্বংস করতে পারেননি এবং তাঁর গল অভিযান থেমে যায়। তিনি শিবির থেকে সরে পূর্বদিকে ফিরে যান। এই অর্থে অ্যাতিয়ুসের কৌশল সফল হয়েছিল—গলে হুনদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করা হয়।

তবে কাতালাউনিয়ান সমভূমির যুদ্ধকে আত্তিলার সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ ধ্বংস বা চূড়ান্ত পরাজয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তাঁর বাহিনী যুদ্ধের পরও কার্যকর ছিল। মাত্র পরের বছর, ৪৫২ সালে আত্তিলা আবার পশ্চিম রোমে আক্রমণ করেন—এবার সরাসরি ইতালিতে। তিনি আল্পস অতিক্রম করে আকুইলিয়া অবরোধ ও ধ্বংস করেন এবং উত্তর ইতালির আরও কয়েকটি নগরীতে অগ্রসর হন।

এ থেকেই বোঝা যায় ৪৫১ সালে অ্যাতিয়ুস আত্তিলাকে ‘শেষ করে দেননি’। বরং তিনি একটি নির্দিষ্ট অভিযানের কৌশলগত লক্ষ্য ব্যর্থ করেছিলেন। আত্তিলা গলে স্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি এবং তাঁর বাহিনীকে ফিরে যেতে হয়েছিল। পশ্চিম রোমের মতো দুর্বল হয়ে পড়া রাষ্ট্রের জন্য এটিই ছিল বিশাল সাফল্য।

৪৫২ সালে ইতালিতে আত্তিলার অভিযান আবার বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত তিনি রোমের দিকে অগ্রসর না হয়ে ফিরে যান। কেন তিনি ফিরে গিয়েছিলেন তা নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। পোপ প্রথম লিওর নেতৃত্বে একটি দূতদল তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিল, যা পরবর্তী খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যে অত্যন্ত বিখ্যাত হয়ে ওঠে। কিন্তু শুধু পোপের কথায় আত্তিলা ফিরে গিয়েছিলেন—এমন সরল ব্যাখ্যার যথেষ্ট ভিত্তি নেই। খাদ্যসংকট, রোগ, ইতালির বিধ্বস্ত অবস্থা এবং পূর্ব রোমের পক্ষ থেকে হুন ভূখণ্ডে সামরিক চাপ তাঁর সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

৪৫৩ সালে আত্তিলা আকস্মিকভাবে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলেদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং হুনদের অধীন বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বিদ্রোহ করে। ৪৫৪ সালের নেদাওয়ের যুদ্ধের পর মধ্য ইউরোপে হুন সাম্রাজ্যের আধিপত্য দ্রুত ভেঙে পড়ে। যে শক্তিকে কয়েক বছর আগেও পশ্চিম ও পূর্ব উভয় রোমের জন্য ভয়াবহ হুমকি মনে হচ্ছিল, সেটি অল্প সময়ের মধ্যেই রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

কিন্তু পশ্চিম রোম এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুনরুত্থান করতে পারেনি। বরং এক ভয়াবহ রাজনৈতিক ভুল ঘটে। আত্তিলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রধান স্থপতি ফ্লাভিয়াস অ্যাতিয়ুসকে ৪৫৪ সালে সম্রাট তৃতীয় ভ্যালেন্টিনিয়ান নিজ হাতে হত্যা করেন। সম্রাট সম্ভবত তাঁর অত্যধিক ক্ষমতাকে নিজের সিংহাসনের জন্য হুমকি মনে করেছিলেন।

প্রচলিত একটি বিখ্যাত মন্তব্য অনুযায়ী, সম্রাটকে বলা হয়েছিল তিনি অ্যাতিয়ুসকে হত্যা করে নিজের ডান হাত দিয়ে বাম হাত কেটে ফেলেছেন। উক্তিটির যথার্থতা যাই হোক, বাস্তব রাজনৈতিক ফল ছিল গুরুতর। পশ্চিম রোম এমন একজন সেনাপতিকে হারাল, যিনি বহু বছর ধরে গল, হুন এবং বিভিন্ন জার্মানিক শক্তির মধ্যে অত্যন্ত জটিল ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখেছিলেন।

মাত্র কয়েক মাস পরে, ৪৫৫ সালে ভ্যালেন্টিনিয়ান নিজেও নিহত হন। এরপর পশ্চিমের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও তীব্র হয় এবং একই বছর গাইজেরিকের ভ্যান্ডালরা রোম লুণ্ঠন করে। অর্থাৎ কাতালাউনিয়ান সমভূমিতে যে রাষ্ট্র বিশাল একটি জোট গড়ে আত্তিলাকে ঠেকাতে পেরেছিল, মাত্র চার বছরের মধ্যে সেই রাষ্ট্র আবার নিজের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

এই কারণেই ৪৫১ সালের যুদ্ধ পশ্চিম রোমের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করেছিল যে পশ্চিমা সাম্রাজ্য তখনও কূটনীতি, সামরিক নেতৃত্ব এবং জোট গঠনের মাধ্যমে বিশাল হুমকি মোকাবিলা করতে সক্ষম ছিল। রোমের শক্তি সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু সেই শক্তির প্রকৃতি বদলে গিয়েছিল। অ্যাতিয়ুস আর শুধু রোমান লিজিয়নের ওপর নির্ভর করে যুদ্ধ জিততে পারেননি; তাঁকে ভিসিগথ ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সহযোগিতা নিতে হয়েছিল।

এখানেই বিজয়ের মধ্যেও দুর্বলতার সংকেত ছিল। একসময় যে রোম বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে নিজের নির্দেশে যুদ্ধে পাঠাত, এখন তাকে তাদের সঙ্গে সমমর্যাদার কাছাকাছি রাজনৈতিক দর-কষাকষি করে জোট গঠন করতে হচ্ছিল। ভিসিগথরা রোমকে সাহায্য করেছিল কারণ তাদের নিজেদের স্বার্থও আত্তিলাকে প্রতিহত করার সঙ্গে যুক্ত ছিল। অর্থাৎ পশ্চিমের নিরাপত্তা ক্রমেই এমন শক্তিগুলোর সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছিল, যাদের ওপর রাভেনার সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব ছিল না।

তাই কাতালাউনিয়ান সমভূমির যুদ্ধকে পশ্চিম রোমের ‘শেষ যুদ্ধ’ বা ‘শেষ বিজয়’ বলা আক্ষরিক অর্থে সঠিক নয়। পশ্চিম রোম এর পরও যুদ্ধ করেছে এবং সামরিক সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু ৪৫১ সালের সংঘর্ষ ছিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যিক সরকারের সংগঠিত সবচেয়ে স্মরণীয় বৃহৎ প্রতিরোধগুলোর একটি, যেখানে অসাধারণ কূটনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকে একত্র করে ইউরোপের সবচেয়ে ভয়ংকর সামরিক নেতাদের একজনকে থামানো হয়েছিল।

আত্তিলা গল জয় করতে পারেননি। পশ্চিম রোম আরও একবার বড় বিপদ এড়িয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধটি একই সঙ্গে দেখিয়ে দিয়েছিল সাম্রাজ্যের নতুন বাস্তবতা—রোম তখন আর একা পশ্চিম ইউরোপের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারছিল না। তার বেঁচে থাকা নির্ভর করছিল অ্যাতিয়ুসের মতো ব্যক্তির দক্ষতা এবং ভিসিগথদের মতো আধা-স্বাধীন শক্তির সহযোগিতার ওপর। মাত্র ২৫ বছর পর ৪৭৬ সালে পশ্চিমের শেষ সম্রাট অপসারিত হবেন। তাই ৪৫১ সালের যুদ্ধ ছিল শুধু আত্তিলাকে ঠেকানোর গল্প নয়; এটি ছিল পতনের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া একটি সাম্রাজ্যের শেষ যুগের অসাধারণ সামরিক সক্ষমতা এবং গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা—দুটোরই একসঙ্গে প্রকাশ।


You may also like