বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ওয়ালেনস্টাইনের রহস্যময় পতন ও নর্ডলিঙ্গেনের যুদ্ধ: হ্যাবসবার্গদের পুনরুত্থান ও ত্রিশ বছরের যুদ্ধের নতুন মোড়

Series: ত্রিশ বছরের যুদ্ধ: ধর্মীয় সংঘাত থেকে ইউরোপের ক্ষমতার মহাযুদ্ধ

  • Author: Admin
  • September 06, 2026
ওয়ালেনস্টাইনের রহস্যময় পতন ও নর্ডলিঙ্গেনের যুদ্ধ: হ্যাবসবার্গদের পুনরুত্থান ও ত্রিশ বছরের যুদ্ধের নতুন মোড়
ওয়ালেনস্টাইনের পতন থেকে হ্যাবসবার্গদের প্রত্যাবর্তন

১৬৩৪ সাল ত্রিশ বছরের যুদ্ধের ইতিহাসে এমন এক সন্ধিক্ষণ, যখন কয়েক মাসের ব্যবধানে দুই নাটকীয় ঘটনা যুদ্ধের ক্ষমতার ভারসাম্য আবার বদলে দেয়। প্রথমে রহস্য, সন্দেহ ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মধ্যে নিহত হন সম্রাট দ্বিতীয় ফার্দিনান্দের একসময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাপতি আলব্রেখট ফন ওয়ালেনস্টাইন। এরপর সেপ্টেম্বরে নর্ডলিঙ্গেনের যুদ্ধে সুইডিশ ও তাদের জার্মান প্রোটেস্ট্যান্ট মিত্ররা এমন বিপর্যয়কর পরাজয়ের মুখে পড়ে, যা গুস্তাভাস অ্যাডলফাসের ব্রাইটেনফেল্ড বিজয়ের পর গড়ে ওঠা সুইডিশ আধিপত্যকে কার্যত ভেঙে দেয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে থাকে, হ্যাবসবার্গরা আবারও যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে এনেছে।

ওয়ালেনস্টাইনের উত্থান নিজেই ছিল ত্রিশ বছরের যুদ্ধের অস্বাভাবিক চরিত্রের প্রতীক। বোহেমিয়ার একজন অভিজাত থেকে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক এবং তারপর সম্রাটের অপরিহার্য সামরিক সংগঠকে পরিণত হয়েছিলেন। ডেনমার্কের হস্তক্ষেপের সময় দ্বিতীয় ফার্দিনান্দের জন্য বিশাল সাম্রাজ্যিক সেনাবাহিনী গড়ে তোলার ক্ষমতা তাঁকে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। তাঁর বাহিনী মূলত বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আদায় করা অর্থ ও সরবরাহের মাধ্যমে নিজেদের রক্ষণাবেক্ষণ করত।

কিন্তু তাঁর এই সাফল্যই রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি করেছিল। ওয়ালেনস্টাইনের হাতে কয়েক দশ হাজার সৈন্যের আনুগত্য, বিপুল সম্পদ এবং মেকলেনবুর্গের মতো ভূখণ্ডের ওপর কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত হওয়ায় জার্মান রাজপুত্রদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একজন সেনাপতি ক্রমে এমন স্বাধীন ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিলেন, যাঁর শক্তি অনেক রাজপুত্রের চেয়েও বেশি। ক্যাথলিক শাসকেরাও তাঁর সেনাবাহিনীর বাধ্যতামূলক অর্থ ও সরবরাহ আদায়ের পদ্ধতিতে ক্ষুব্ধ ছিলেন।

এই চাপের ফলেই ১৬৩০ সালে দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ ওয়ালেনস্টাইনকে সামরিক নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেন। কিন্তু সিদ্ধান্তটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একই বছর গুস্তাভাস অ্যাডলফাস জার্মানিতে প্রবেশ করেন এবং ১৬৩১ সালের ব্রাইটেনফেল্ডের যুদ্ধে টিলির বাহিনীকে পরাজিত করার পর সাম্রাজ্যিক পরিস্থিতি দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ১৬৩২ সালে সুইডিশ বাহিনী বাভারিয়ায় প্রবেশ করলে ফার্দিনান্দ আবার সেই ব্যক্তির সাহায্য চান, যাঁকে তিনি রাজনৈতিক চাপে অপসারণ করেছিলেন।

ওয়ালেনস্টাইন দ্বিতীয়বার দায়িত্ব নেওয়ার সময় আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত স্বাধীনতা দাবি করেন। দ্রুত নতুন সেনাবাহিনী গঠন করে তিনি গুস্তাভাসের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে শুরু করেন। নুরেমবার্গ ও আল্টে ফেস্টের অভিযানে তাঁর কৌশল প্রমাণ করে যে সুইডিশ রাজাকে সরাসরি খোলা যুদ্ধে মোকাবিলা না করেও দুর্বল করা সম্ভব। এরপর ১৬৩২ সালের লুটজেনের যুদ্ধে ওয়ালেনস্টাইন যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে গেলেও গুস্তাভাস অ্যাডলফাস নিহত হন।

গুস্তাভাসের মৃত্যু ওয়ালেনস্টাইনের সামনে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। কিন্তু এখান থেকেই তাঁর আচরণ আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। তিনি শুধু সামরিক বিজয়ের দিকে মনোযোগ না দিয়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে স্বাধীন শান্তি আলোচনা ও গোপন যোগাযোগের চেষ্টা করতে থাকেন। স্যাক্সনি, সুইডিশপন্থী শক্তি এবং অন্যান্য প্রোটেস্ট্যান্ট প্রতিনিধির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নিয়ে ভিয়েনায় সন্দেহ বাড়তে থাকে।

ওয়ালেনস্টাইন আসলে কী চেয়েছিলেন, তা ইতিহাসবিদদের দীর্ঘ বিতর্কের বিষয়। তিনি কি সম্রাটকে বিশ্বাসঘাতকতা করে নিজস্ব রাজনৈতিক সাম্রাজ্য গড়তে চেয়েছিলেন? নাকি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ত্রিশ বছরের যুদ্ধ সামরিকভাবে পুরোপুরি জেতা সম্ভব নয় এবং তাই একটি বৃহত্তর জার্মান শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলেন? তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রমাণ জটিল এবং সব অভিযোগ সমানভাবে নিশ্চিত নয়। কিন্তু ফার্দিনান্দের দরবারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ওয়ালেনস্টাইন কী করতে চেয়েছিলেন তা নয়—বরং তাঁর হাতে এত ক্ষমতা ছিল যে তিনি চাইলে কী করতে পারতেন।

১৬৩৩ সালের শেষভাগে সন্দেহ আরও তীব্র হয়। সম্রাটের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ওয়ালেনস্টাইনের সামরিক কার্যকলাপ সবসময় ভিয়েনার প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছিল না। একই সময়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা পিলসেনার রিভার্স নামে পরিচিত আনুগত্যের ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন, যেখানে তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে ওয়ালেনস্টাইনের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। ভিয়েনার কাছে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত ছিল। একজন সাম্রাজ্যিক সেনাপতির প্রতি সৈন্য ও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত আনুগত্য সম্রাটের কর্তৃত্বের সরাসরি বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

১৬৩৪ সালের জানুয়ারিতে ফার্দিনান্দ গোপনে ওয়ালেনস্টাইনকে নেতৃত্ব থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমদিকে বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি। তাঁর প্রধান কর্মকর্তাদের ওয়ালেনস্টাইন থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলে। পরে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ সামনে আনা হয়। সামরিক আনুগত্য দ্রুত ভেঙে পড়তে শুরু করে।

ওয়ালেনস্টাইন পরিস্থিতি বুঝতে পেরে পিলসেন ছেড়ে পশ্চিম বোহেমিয়ার এগার বা বর্তমান খেব শহরের দিকে যান। তিনি সম্ভবত সুইডিশ বা অন্যান্য বিরোধী শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজের অবস্থান রক্ষার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে তাঁর চারপাশের বিশ্বস্ততার কাঠামো ভেঙে পড়েছে।

১৬৩৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এগারে ওয়ালেনস্টাইনের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা প্রথমে হত্যা করা হয় এবং পরে ওয়ালেনস্টাইন নিজেও নিহত হন। তাঁর হত্যাকারীরা ছিল সাম্রাজ্যিক পক্ষের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা ও সৈন্য। সম্রাট সরাসরি হত্যার নির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন নিয়ে দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে; তবে ওয়ালেনস্টাইনকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে ঘোষণা করে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবেশ যে সম্রাটের সিদ্ধান্তেই তৈরি হয়েছিল, তা স্পষ্ট।

ওয়ালেনস্টাইনের মৃত্যু ছিল এক যুগের অবসান। তিনি কোনো সাধারণ সেনাপতি ছিলেন না; তিনি ছিলেন যুদ্ধকে নিজেই অর্থায়ন করতে সক্ষম বিশাল ভাড়াটে সামরিক ব্যবস্থার প্রতীক। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তাঁর মৃত্যু সাম্রাজ্যিক বাহিনীকে ধ্বংস করেনি। বরং ফার্দিনান্দ এখন সেনাবাহিনীর ওপর আরও প্রত্যক্ষ রাজবংশীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পান।

সাম্রাজ্যিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন সম্রাটের পুত্র হাঙ্গেরির রাজা ফার্দিনান্দ, যিনি পরে সম্রাট তৃতীয় ফার্দিনান্দ হন। একই সময়ে স্প্যানিশ হ্যাবসবার্গরাও মধ্য ইউরোপীয় অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে প্রস্তুত হচ্ছিল। অস্ট্রিয়ান ও স্প্যানিশ হ্যাবসবার্গদের এই সহযোগিতাই কয়েক মাস পর নর্ডলিঙ্গেনে নির্ণায়ক হয়ে ওঠে।

গুস্তাভাস অ্যাডলফাসের মৃত্যুর পর সুইডিশ যুদ্ধনীতি পরিচালনায় অ্যাক্সেল অক্সেনস্টিয়ার্না কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। ১৬৩৩ সালের হাইলব্রন লীগ দক্ষিণ ও পশ্চিম জার্মানির বিভিন্ন প্রোটেস্ট্যান্ট শক্তিকে সুইডিশ নেতৃত্বে একত্রিত করার চেষ্টা করে। সামরিকভাবে সুইডিশ বাহিনী তখনও শক্তিশালী ছিল। কিন্তু গুস্তাভাসের মতো একক রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের অভাব ক্রমে অনুভূত হচ্ছিল।

১৬৩৪ সালে সাম্রাজ্যিক বাহিনী নর্ডলিঙ্গেন শহর অবরোধ করলে প্রোটেস্ট্যান্ট পক্ষ শহরটি রক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। নর্ডলিঙ্গেন দক্ষিণ জার্মানির কৌশলগত যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি হারালে সুইডিশ ও তাদের জার্মান মিত্রদের দক্ষিণ জার্মানিতে অবস্থান গুরুতরভাবে দুর্বল হয়ে পড়ত।

ঠিক এই সময় অস্ট্রিয়ান হ্যাবসবার্গ বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় স্প্যানিশ বাহিনী। এর নেতৃত্বে ছিলেন কার্ডিনাল-ইনফান্তে ফার্দিনান্দ, স্পেনের রাজা চতুর্থ ফিলিপের ভাই। তিনি স্প্যানিশ নেদারল্যান্ডসের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন এবং তাঁর অভিজ্ঞ সেনাবাহিনী সাম্রাজ্যিক বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ায় হ্যাবসবার্গদের শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

অন্যদিকে প্রোটেস্ট্যান্ট বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন স্যাক্স-ভাইমারের বার্নহার্ড এবং সুইডিশ সেনাপতি গুস্তাভ হর্ন। তাঁদের সামনে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। অপেক্ষা করলে আরও মিত্রবাহিনী আসতে পারত, কিন্তু নর্ডলিঙ্গেনের পতনের ঝুঁকিও ছিল। শেষ পর্যন্ত তাঁরা দ্রুত আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন।

১৬৩৪ সালের ৫–৬ সেপ্টেম্বরের নর্ডলিঙ্গেনের যুদ্ধ সুইডিশ পর্যায়ের সবচেয়ে বিপর্যয়কর সংঘর্ষে পরিণত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রের কেন্দ্রে ছিল আলবুখ পাহাড়, যেখানে হ্যাবসবার্গ বাহিনী শক্তিশালী প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছিল। এই উচ্চভূমি দখল করতে পারলে প্রোটেস্ট্যান্টরা শত্রুর অবস্থান ভেঙে দিতে পারত।

গুস্তাভ হর্নের বাহিনী বারবার আলবুখের ওপর আক্রমণ চালায়। প্রথমদিকে কিছু সাফল্যের সম্ভাবনা তৈরি হলেও সমন্বয়ের সমস্যা এবং হ্যাবসবার্গ বাহিনীর শক্তিশালী প্রতিরোধ পরিস্থিতি বদলে দেয়। স্প্যানিশ পদাতিক বাহিনীর শৃঙ্খলা ও প্রতিরোধ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একের পর এক আক্রমণে সুইডিশ ও জার্মান সৈন্যরা ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে।

প্রোটেস্ট্যান্ট পরিকল্পনার মূল সমস্যা ছিল তারা প্রতিপক্ষের শক্তি পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি। অস্ট্রিয়ান সাম্রাজ্যিক বাহিনীর সঙ্গে স্প্যানিশ শক্তি যুক্ত হওয়ায় হ্যাবসবার্গদের সংখ্যা ও যুদ্ধক্ষমতা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল। আলবুখ দখলের ব্যর্থতা পুরো যুদ্ধপরিকল্পনাকে বিপদের মুখে ফেলে দেয়।

একপর্যায়ে হ্যাবসবার্গ বাহিনী পাল্টা আক্রমণে যায়। প্রোটেস্ট্যান্ট যুদ্ধরেখার বিভিন্ন অংশে চাপ সৃষ্টি হলে সংগঠন দ্রুত ভেঙে পড়ে। গুস্তাভ হর্ন বন্দি হন এবং সুইডিশ-জার্মান বাহিনীর বড় অংশ নিহত, বন্দি অথবা ছত্রভঙ্গ হয়। বার্নহার্ড সীমিত বাহিনী নিয়ে পালাতে সক্ষম হন।

নর্ডলিঙ্গেনের পরাজয় ব্রাইটেনফেল্ডের ঠিক বিপরীত প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৬৩১ সালে ব্রাইটেনফেল্ড সুইডিশ সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল; ১৬৩৪ সালে নর্ডলিঙ্গেন সেই অজেয়তার ধারণা ধ্বংস করে দেয়। দক্ষিণ জার্মানিতে সুইডিশ অবস্থান দ্রুত ভেঙে পড়ে এবং বহু জার্মান প্রোটেস্ট্যান্ট শাসক বুঝতে পারেন যে সুইডেনের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।

হ্যাবসবার্গদের জন্য বিজয় ছিল অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ালেনস্টাইনের মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস পরই তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হয় যে তাঁর ব্যক্তিগত নেতৃত্ব ছাড়াও সাম্রাজ্যিক সামরিক শক্তি কার্যকর থাকতে পারে। অস্ট্রিয়ান ও স্প্যানিশ হ্যাবসবার্গ সহযোগিতা সুইডিশদের বিরুদ্ধে এমন এক বিজয় এনে দেয়, যা মধ্য ও দক্ষিণ জার্মানির ক্ষমতার ভারসাম্য আবার সম্রাটের দিকে ঘুরিয়ে দেয়।

এর রাজনৈতিক ফল দ্রুত দেখা যায়। স্যাক্সনিসহ বিভিন্ন জার্মান প্রোটেস্ট্যান্ট শাসক সম্রাটের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজতে শুরু করেন। এর পরিণতিতে ১৬৩৫ সালের প্রাগের শান্তিচুক্তি হয়, যার মাধ্যমে ফার্দিনান্দ দ্বিতীয় ও স্যাক্সনির নির্বাচকের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরে বহু জার্মান রাজ্য সেই বন্দোবস্তে যুক্ত হয়। এডিক্ট অব রেস্টিটিউশনের কঠোর প্রয়োগও কার্যত অনেকাংশে পিছিয়ে দেওয়া হয়।

এতে মনে হতে পারত যে ত্রিশ বছরের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পথে। বোহেমিয়ার বিদ্রোহ বহু আগেই পরাজিত, ডেনমার্ক যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে গেছে, গুস্তাভাস মৃত, ওয়ালেনস্টাইনও নেই এবং নর্ডলিঙ্গেনে সুইডিশ বাহিনী বিধ্বস্ত। ১৬৩৪–৩৫ সালে দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ আবার এমন একটি অবস্থানে পৌঁছান, যেখান থেকে একটি জার্মান রাজনৈতিক সমঝোতা সম্ভব বলে মনে হচ্ছিল।

কিন্তু নর্ডলিঙ্গেনের বিজয়ই আবার নতুন আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি করে। হ্যাবসবার্গরা যদি জার্মানিতে স্থিতিশীল আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে এবং স্প্যানিশ ও অস্ট্রিয়ান শাখা কার্যকরভাবে সহযোগিতা করতে পারে, তবে ফ্রান্সের কৌশলগত অবস্থান গুরুতরভাবে বিপন্ন হতে পারত। কার্ডিনাল রিশেলিয়ুর কাছে এটি গ্রহণযোগ্য ছিল না।

এতদিন ফ্রান্স সুইডেন, ডাচ এবং অন্যান্য হ্যাবসবার্গবিরোধী শক্তিকে অর্থ ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েছিল। কিন্তু নর্ডলিঙ্গেনের পর শুধু পরোক্ষ সহায়তার ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৬৩৫ সালে ক্যাথলিক ফ্রান্স সরাসরি হ্যাবসবার্গ স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবেশ করে। এখান থেকেই ত্রিশ বছরের যুদ্ধের ধর্মীয় চরিত্র আরও স্পষ্টভাবে বৃহত্তর ইউরোপীয় ভূরাজনৈতিক যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়।

এই কারণে নর্ডলিঙ্গেনের হ্যাবসবার্গ বিজয়ের মধ্যেও একটি গভীর বৈপরীত্য ছিল। তারা সুইডিশ আধিপত্য ভেঙেছিল, কিন্তু সেই সাফল্য ফ্রান্সকে সরাসরি যুদ্ধে নামতে উৎসাহিত করে। ফলে যে বিজয় যুদ্ধ শেষ করতে পারত বলে মনে হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত সংঘাতের আরও দীর্ঘ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দরজা খুলে দেয়।

ওয়ালেনস্টাইনের মৃত্যু ও নর্ডলিঙ্গেনের যুদ্ধকে পাশাপাশি দেখলে ত্রিশ বছরের যুদ্ধের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়—এই যুদ্ধে কোনো একটি ব্যক্তির মৃত্যু বা কোনো একটি নির্ণায়ক বিজয় স্থায়ীভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণ করতে পারেনি। ওয়ালেনস্টাইনকে সরিয়ে দিয়েও হ্যাবসবার্গরা জিতেছিল; গুস্তাভাসকে হারিয়েও সুইডেন যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল; আর নর্ডলিঙ্গেনে সুইডিশদের পরাজিত করেও সম্রাট যুদ্ধ শেষ করতে পারেননি।

১৬৩৪ সালে হ্যাবসবার্গরা নিঃসন্দেহে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণের একটি বড় অংশ পুনরুদ্ধার করেছিল। ওয়ালেনস্টাইনের বিপজ্জনক স্বাধীন ক্ষমতাকেন্দ্র বিলুপ্ত হয়, সাম্রাজ্যিক সেনাবাহিনী রাজবংশীয় নিয়ন্ত্রণে আসে এবং নর্ডলিঙ্গেনে সুইডিশ-প্রোটেস্ট্যান্ট বাহিনী বিধ্বস্ত হয়। কিন্তু এই পুনরুত্থানই ইউরোপের আরেক বৃহৎ শক্তিকে বুঝিয়ে দেয় যে হ্যাবসবার্গদের বিজয় ঠেকাতে এখন সরাসরি অস্ত্র ধরতে হবে। ফলে ওয়ালেনস্টাইনের রক্তাক্ত পতন ও নর্ডলিঙ্গেনের হ্যাবসবার্গ বিজয় যুদ্ধের সমাপ্তি নয়—বরং ত্রিশ বছরের যুদ্ধের সবচেয়ে স্পষ্ট ভূরাজনৈতিক অধ্যায়, ফরাসি-সুইডিশ বনাম হ্যাবসবার্গ মহাসংঘাতের সূচনা তৈরি করে।


You may also like